নতুন সরকারের অর্থনৈতিক চ্যালেঞ্জ

সবধরনের শঙ্কা কাটিয়ে বাংলাদেশের ত্রয়োদশ সংসদ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়েছে। বাংলাদেশের ঘুরে দাঁড়ানোর সুযোগ সৃষ্টি হলো; কিন্তু সামনে আছে অনেক চ্যালেঞ্জ ও ঝুঁকি। আছে আশাবাদী হওয়ার ও এগিয়ে যাওয়ার সুযোগ। দেশকে সমৃদ্ধি ও উন্নয়নের শিখরে নিয়ে যেতে প্রয়োজন সঠিক ও সময়োপযোগী পরিকল্পনা এবং সুসমন্বিত কার্যক্রম। প্রয়োজন দেশপ্রেম, সততা, নৈতিকতা ও ত্যাগের মনোভাব এবং পরমতসহিষ্ণুুতা।

নির্বাচনে বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল-বিএনপি নিরঙ্কুশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা অর্জন করেছে। শহীদ প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমান ও দেশনেত্রী বেগম খালেদা জিয়ার প্রতি জনগণের আস্থা ও ভালোবাসার প্রতি শ্রদ্ধা রেখে নতুন সরকারকে পরিকল্পনা নিতে হবে। জনগণের প্রত্যাশা পূরণে পরিকল্পনা নিতে হবে।

এ মুহূর্তে অর্থনীতির চ্যালেঞ্জ : বর্তমানে বাংলাদেশের অর্থনীতির প্রধান চ্যালেঞ্জ হলো উচ্চ ও অস্থিতিশীল মূল্যস্ফীতি, ব্যাংকিং খাতে খেলাপি ঋণের উচ্চ হার এবং কর্মসংস্থান সৃষ্টি। এ ছাড়া জ্বালানি ও বিদ্যুৎসঙ্কট শিল্পে উৎপাদন ব্যাহত করছে, সরকারি ঋণের বোঝা বাড়ছে, যা অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির গতি মন্থর করছে। দীর্ঘ ১৫ বছরের একদলীয় শাসনে অর্থনীতি নানা সঙ্কটের মুখোমুখি। রাজনৈতিক দলগুলোর অনাস্থা, সঠিক নির্বাচন প্রক্রিয়া না থাকা, জনমনে অস্থিরতা, একই সাথে আমলাতান্ত্রিক জটিলতা, দুর্নীতি ও সুশাসনের অভাব ছিল প্রকট। শেয়ারবাজার কারসাজির পাশাপাশি ব্যাংক থেকে টাকা হ্যাকিংয়ের মতো ঘটনাগুলো আর্থিক খাতের অস্থিরতা প্রকাশ করেছে। এ ছাড়া নিত্যপণ্যের মূল্যবৃদ্ধি সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রা দুর্বিষহ করে তোলে। অর্থনীতি বিশ্লেষকরা মনে করেন, নতুন সরকারকে পাঁচটি প্রধান চ্যালেঞ্জ মোকাবেলা করতে হবে— ১. শিল্প ও ব্যবসা সচল করা; ২. কর্মসংস্থান সৃষ্টি; ৩. মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ; ৪. ব্যাংকিং খাতের সংস্কার এবং ৫. রাজস্ব বোর্ড-এনবিআরের সংস্কার ও প্রাতিষ্ঠানিক সক্ষমতা বাড়ানো।

শিল্প ও ব্যবসা সচল করা : শিল্প ও ব্যবসা সচল না হলে কর্মসংস্থান হবে না, আর কর্মসংস্থান ছাড়া মানুষের ক্রয়ক্ষমতা বাড়ানো অসম্ভব। স্বৈরাচারী আমলে শিল্পক্ষেত্রে যেসব সমস্যা ও প্রতিবন্ধকতা ছিল তা আমলে নিয়ে সমস্যার সমাধানে পদক্ষেপ নিতে হবে। শিল্পের কাঁচামাল সরবরাহ ও জ্বালানি সমস্যার সমাধান করতে হবে। সরবরাহ চেইন ও উৎপাদনের সমন্বয় ঠিক রাখতে হবে। বাজার ব্যবস্থাপনায় নজর দিতে হবে। এ ক্ষেত্রে ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্প-এসএমই শক্তিশালী করার পদক্ষেপ নেয়া বাস্তবসম্মত পথ।

মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ : অর্থনীতিতে মূল্যস্ফীতি এক বহুমাত্রিক সমস্যা। শুধু মুদ্রানীতি দিয়ে এর নিয়ন্ত্রণ সম্ভব নয়; এর সাথে সরবরাহ ব্যবস্থা ও জ্বালানিমূল্য জড়িত। নিত্যপণ্যের মূল্যবৃদ্ধি সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রা কঠিন করে তুলেছে। চাল, ডাল, তেল, পেঁয়াজ, মাছ, গোশতের মতো নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের দাম ক্রয়ক্ষমতার বাইরে চলে গেছে। বিশ্বব্যাংকের মতে— বাংলাদেশে ২০২৩ সালে মূল্যস্ফীতির হার ছিল গড়ে ৯ দশমিক ৫ শতাংশ। যদিও এ অবস্থার কিছুটা উন্নতি ঘটেছে। বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরো-বিবিএসের তথ্যে উঠে এসেছে— ২০২৫ সালের জানুয়ারিতে খাদ্য মূল্যস্ফীতি কমে ১০ দশমিক ৭২ শতাংশে নেমে এসেছে, যা ডিসেম্বরে ছিল ১২ দশমিক ৯২ শতাংশ। বর্তমানে মূল্যস্ফীতি প্রায় সাড়ে ৮ শতাংশের মধ্যে থাকলেও বাজার ব্যবস্থাপনায় দুর্বলতা, মজুদদারি ও চোরাচালানের মতো সমস্যা এখনো বিদ্যমান। নতুন সরকারকে এ সমস্যার সমাধানে বাজার মনিটরিং জোরদার করতে হবে এবং মজুদদারদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নিতে হবে।

রাজস্ব বোর্ডের সংস্কার ও রাজস্ব আদায়ে ঘাটতি : রাজস্ব আদায়ে ঘাটতি অর্থনীতির বড় চ্যালেঞ্জ। আইএমএফের প্রতিবেদন অনুযায়ী— বাংলাদেশের রাজস্ব আদায়ের হার জিডিপির মাত্র ১০ শতাংশের কাছাকাছি, যা দক্ষিণ এশিয়ার অন্যান্য দেশের তুলনায় অত্যন্ত কম। কর ফাঁকি, অবৈধ অর্থপ্রবাহ ও প্রশাসনিক দুর্বলতার কারণে রাজস্ব আদায়ের লক্ষ্যমাত্রা অর্জিত হয়নি। এতে সরকারের উন্নয়ন প্রকল্প বাস্তবায়ন বাধাগ্রস্ত হয়। সঠিক সময়ে প্রকল্পের কাজ শেষ না হওয়া, বারবার ব্যয় বাড়ানো, প্রকল্পের মেয়াদ বাড়ানো দুর্নীতির জন্ম দেয়। সরকারকে রাজস্ব আদায় বাড়াতে কর প্রশাসনের সংস্কার, ডিজিটালাইজেশন ও কর ফাঁকি রোধে কঠোর হতে হবে।

ব্যাংকিং খাতের দুর্বলতা : উচ্চ খেলাপি ঋণ, সুশাসনের ঘাটতি এবং তারল্যসঙ্কট ব্যাংকিং খাতের বড় দুর্বলতা। অন্তর্বর্তী সরকার ব্যাংক খাতের কিছু সংস্কার শুরু করেছিল। তাতে কিছুটা আশার আলো দেখা দিয়েছিল। নতুন সরকারের নীতি ও কৌশল যেন আবার নতুন কোনো সমস্যার জন্ম না দেয় সে দিকে নজর রাখতে হবে। আইএমএফ বলেছে— ব্যাংকিং খাতের সমস্যা সমাধানে আর্থিক সংস্কার অত্যন্ত জরুরি। দুর্বল ব্যাংক চিহ্নিত করে একটি বিশ্বাসযোগ্য কৌশল প্রণয়ন করতে হবে। সেখানে মূলধন ঘাটতি, প্রয়োজনীয় সরকারি সহায়তা, আইনি কাঠামোয় পুনর্গঠন এবং অর্থের উৎস নির্ধারণ করা থাকবে। এ ছাড়া রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংকের সম্পদ মান পর্যালোচনা প্রয়োজন। ব্যাংক পরিচালনা, স্বচ্ছতা, নিরাপত্তা ও খেলাপি ঋণ পুনরুদ্ধার প্রক্রিয়া উন্নয়নের প্রচেষ্টা অব্যাহত রাখতে হবে। স্বৈরাচারী আমলে যেভাবে ব্যাংক লুট করা হয় তা যেন আর না হয়। শুধু এককালীন কোনো সিদ্ধান্তে ব্যাংক খাতের সমস্যার সমাধান সম্ভব নয়। ব্যাংকিং খাতের কাঠামোগত দুর্বলতা দূর করতে ধারাবাহিক সংস্কার প্রয়োজন। একই সাথে নিয়ন্ত্রক সংস্থার সক্ষমতা বৃদ্ধি এবং বাজারে গ্রাহকদের আস্থা ফিরিয়ে আনা জরুরি। এ ছাড়া দেশের অর্থনীতি টেকসই করতে হলে ব্যাংক-নির্ভরতা কমাতে হবে। জোর দিতে হবে শেয়ারবাজার ও বন্ড মার্কেটের দিকে। ইক্যুইটি পার্টিসিপেশন ও বন্ড মার্কেট ছাড়া ব্যবসাবাণিজ্যের দীর্ঘমেয়াদি অর্থায়ন টেকসই হয় না। ব্যাংক খাতের সংস্কার ও স্থিতিশীলতা ফেরাতে অন্তর্বর্তী সরকারের নেয়া উদ্যোগগুলো এগিয়ে নেয়া উচিত।

জ্বালানি খাত : জ্বালানি খাত খুবই গুরুত্বপূর্ণ। ভবিষ্যতে এটি বড় সঙ্কট সৃষ্টি করতে পারে। দেশীয় গ্যাস অনুসন্ধান, অফশোর ড্রিলিং এবং সৌরশক্তির মতো বিকল্প জ্বালানি উন্নয়নে বেশি জোর দিতে হবে। দেশে সৌরশক্তির বিপুল সম্ভাবনা থাকলেও তাতে প্রত্যাশিত অগ্রগতি হয়নি।

বিদেশে পাচার হওয়া অর্থ ফেরানোর বিষয়ে নতুন সরকারের গুরুত্ব দেয়া উচিত। অর্থপাচার বন্ধে ব্যবস্থা না নিলে অর্থনীতিতে সঙ্কট মারাত্মক হতে পারে। প্রয়োজন সরকারি বিভিন্ন সংস্থা ও এজেন্সির মধ্যে জোরালো সমন্বয়।

কর্মসংস্থানের ঘাটতি : কর্মসংস্থানের ব্যবস্থা করা বড় ধরনের চ্যালেঞ্জ। এটি অর্থনীতির দীর্ঘস্থায়ী সমস্যা। দেশে বেকারত্বের হার ৪ দশমিক ৪৯ শতাংশ। ১৫ থেকে ২৯ বছর বয়সীদের মধ্যে বেকারত্বের হার উল্লেখযোগ্যভাবে বেশি, যা ১৭ দশমিক ৭ শতাংশ পর্যন্ত হতে পারে। সরকারি ও বেসরকারি খাতে নতুন চাকরির সুযোগ সীমিত। যুবসমাজে হতাশা বাড়ছে। এ ক্ষেত্রে সরকারকে বেসরকারি খাতের সাথে সমন্বয় করে কর্মসংস্থান সৃষ্টির কার্যকর পরিকল্পনা নিতে হবে।

বিশ্লেষকদের মতে, নতুন সরকারকে নিজেদের কাজে স্বচ্ছতা নিশ্চিত করে জোর দিতে হবে দুর্নীতি প্রতিরোধে। আগামী দিনের অর্থনীতি কতটা গতি পাবে, তা নির্ভর করছে রাজনৈতিক স্থিতির ওপর।

লেখক : অর্থনীতি বিশ্লেষক ও ব্যাংকার