দিনপঞ্জির খেরোখাতা

মনে হচ্ছে, প্রশাসন নির্দিষ্ট প্রার্থীর প্রতি সহানুভূতিসম্পন্ন। এভাবে নিরপেক্ষ ও উৎসবমুখর নির্বাচন কিভাবে সম্ভব– নির্বাচন কমিশন খোলাসা করবে কি?

অধ্যাপক ডা: শাহ মো: বুলবুল ইসলাম
অধ্যাপক ডা: শাহ মো: বুলবুল ইসলাম |নয়া দিগন্ত গ্রাফিক্স

এ মাসের ১৬ থেকে ২৪ তারিখ পর্যন্ত আমাকে সারা দেশে আড়াআড়িভাবে ছুটতে হয়েছে ব্যক্তিগত ও দাফতরিক কাজে। যাত্রা শুরু চট্টগ্রামে, শেষ পঞ্চগড়ে। চট্টগ্রাম আমার জীবনের স্প্রিংবোর্ড। চট্টগ্রাম মেডিক্যাল কলেজে ১৯৬৮ সালে পদচারণা শুরু এবং এমবিবিএস পাস করার পর সেখানেই শুরু চাকরি জীবনের। ১৯৮০ পর্যন্ত সুদীর্ঘ সময় কেটেছে এই আঙিনায়। এই কলেজ আমাকে চোখ মেলতে শিখিয়েছে, জীবনের পথ দেখিয়েছে, স্বপ্ন দেখিয়েছে। কলেজ হোস্টেল, হলের মসজিদ, ডাইনিং হল, তার কর্ণফুলীর পানির মতো টলটলে ডাল সবই জীবনের অবিচ্ছেদ্য অংশ। শ্রদ্ধেয় শিক্ষকরা, কলেজের স্টাফ, সহপাঠী দু-একজন ছাড়া কেউ এখন বেঁচে নেই। কলেজের চত্বর পরিবর্তিত হয়েছে। কিন্তু আমার স্মৃতির মণিকোঠায় তা এক স্বর্ণোজ্জ্বল অধ্যায়। কলেজ, হোস্টেল, হাসপাতাল, ডক্টরস হোস্টেল– সর্বত্রই স্মৃতিগুলো যেন বাঙময় হয়ে উঠতে চায় এই চত্বরে পা দেয়ার সাথে সাথে। মায়ের মতো আদরে, স্নেহে জড়িয়ে রাখা এই প্রতিষ্ঠানের পঞ্চম প্রাক্তন ছাত্র পুনর্মিলনী। ১৭ এবং ১৮ জানুয়ারি। আমি সহধর্মিণীসহ, আমার বড় ছেলে সপরিবারে উপস্থিত এই অনুষ্ঠানে। ছেলেও এই কলেজে পড়াশুনা করেছে। এখন ঢাকায় অধ্যাপনা করছে। এরকম পিঠাপিঠি দুই প্রজন্ম সপরিবারে এ ধরনের অনুষ্ঠানে এক আশ্চর্য ব্যতিক্রম! যা হোক, পুরনো সহপাঠী, জ্যেষ্ঠ ও কনিষ্ঠদের সাহচর্য্য এবং ভাব বিনিময়ের এমন অপূর্ব সুযোগ হাতছাড়া করতে চাইনি। স্মৃতিচারণের পালায় স্বাধীনতা যুদ্ধে এই মেডিক্যাল কলেজের অনন্য ভূমিকা আড়ালেই থেকে গেছে। এই প্রতিষ্ঠানের একদল দামাল ছেলের স্মৃতিচারণে বেরিয়ে এলো সেই অনুক্ত কাহিনী। মুক্তিযুদ্ধের প্রস্তুতিপর্বে শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের সাথে এখানকার মুক্তিযোদ্ধাদের যোগাযোগ, যার পরিপ্রেক্ষিতে এই কলেজে তার গোপন পদচারণার কথা জানালেন সেই সব কিংবদন্তিতুল্য মুক্তিযোদ্ধারা। চট্টগ্রাম বেতারের ট্রান্সমিটার কালুরঘাটে বয়ে নিয়ে যাওয়া এসব মুক্তিযোদ্ধার অকুতোভয় কর্মকাণ্ডের বিবরণ আজো শরীরে শিহরণ জাগায়। জিয়াউর রহমান সাহেবের ঘোষণাপত্র রচনাকারী এক মুক্তিযোদ্ধা জানালেন এ সম্পর্কিত তার স্মৃতি। এটি শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান এবং মুক্তিযুদ্ধের এক অজানা অধ্যায়। চট্টগ্রাম মেডিক্যাল কলেজের দ্বিতীয় ব্যাচের ছাত্রের স্মৃতি রোমন্থন দিয়ে স্মৃতিচারণ শুরু। বৈচিত্র্যে ভরা এগুলো। স্মৃতিচারণ শেষে সন্ধ্যায় সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান। এখানে আশাহত হয়েছে কমবেশি সবাই। রবীন্দ্রসঙ্গীতের প্রাধান্য ছিল অনুষ্ঠানে। জাতীয় কবি নজরুলকে এড়িয়ে যাওয়া হয়েছে সুকৌশলে। ১০-১২টি রবীন্দ্রসঙ্গীতের বিপরীতে নামকাওয়াস্তে একটিমাত্র নজরুলের গান; এ যেন জাতীয় কবিকে ইচ্ছাকৃত অপমান করা।

আমার পরম পাওয়া ছিল একমাত্র জীবিত শিক্ষক, অ্যানাটমির অধ্যাপক পরে অধ্যক্ষ ৯৬ বছর বয়সী অধ্যাপক ডি. পি বড়ুয়ার সাথে সাক্ষাৎ। আমি সস্ত্রীক তার তার বাসায় যাই; তিনি অবাক বিস্ময়ে আমাকে জড়িয়ে ধরেন। আমি যখন নিজেকে ১২তম ব্যাচের ছাত্র হিসেবে নিজের পরিচয় দিচ্ছিলাম (এখন ৬৮তম ব্যাচ চলছে), তিনি আমাকে থামিয়ে দিয়ে আমার নাম জানতে চাইলেন। নাম বলতেই তিনি শুধু চিনলেন না, সাথে সাথে আমার অন্য কয়েকজন সহপাঠীর কথাও জিজ্ঞাসা করলেন। কে কেমন আছে, কোথায় আছে জানতে চাইলেন। এই বর্ষীয়ান শিক্ষকের স্মৃতিশক্তি দেখে অবাক বিস্ময়ে তাকিয়ে রইলাম।

চট্টগ্রামের পর স্বল্পকালীন যাত্রা শুরু রংপুর, ঠাকুরগাঁও, পঞ্চগড়ের উদ্দেশে। পঞ্চগড় আমার নিজ জেলা। সেখানে সামাজিকতার পাশাপাশি সমসাময়িক নানা প্রসঙ্গে কথা বললেন অনেকেই। পঞ্চগড়েও এখন নির্বাচনী আমেজ চলছে। রাস্তায় দেখা হলো আমার আসনে বিএনপি মনোনীত প্রার্থীর সাথে। তিনি গ্রামে গ্রামে ছুটছেন গণসংযোগের জন্য। সাথে তার দলীয় নেতারা। এর মধ্যে চোখে পড়ল চব্বিশের আগস্টের আগে এলাকার ত্রাস সৃষ্টিকারী দু’-একজনকে। এলাকায় দিনের চিত্র একরকম, রাতে আরেক রকম। দিনে যারা বিনয়ের অবতার, রাতে তারাই ভীতির নায়ক। যাদেরকে মনে করা হচ্ছে, অন্যদলের, রাতের আঁধারে তাদের বাড়িতে হানা দেয়া হচ্ছে লাঠিসোটা নিয়ে। বলা হচ্ছে, নির্দিষ্ট মার্কায় ভোট দিতে। সাথে সাথে চলছে মব সন্ত্রাস। বিরোধী শিবিরের কাউকে একা পেলেই তাদের ওপর ঝাঁপিয়ে পড়ছে হায়েনার মতো। থানাও এসব ব্যাপারে নির্লিপ্ত। এদের হাত থেকে মহিলারাও নিষ্কৃতি পাচ্ছে না। কয়েক দিন আগে এক নির্বাচন প্রার্থীর স্ত্রী তার বাবার বাড়ি যাওয়ার পথে এরকম মব সন্ত্রাসের শিকার হন। বলতে গেলে গোটা এলাকায় নীরব সন্ত্রাসের কালো ছায়া। মাননীয় সিইসি জোর গলায় দাবি করছেন, ভোটারদের নিশ্ছিদ্র নিরাপত্তার। অথচ এখনো মানুষের মনের ভয়-ভীতি দূর করতে পারছেন না। তিনি কিভাবে এসব মোকাবেলা করবেন? এভাবেই চলছে লেভেল প্লেয়িং ফিল্ড তৈরির নাটক। সর্বত্রই আলাপচারিতায় একই প্রশ্নের মুখোমুখি হয়েছি। ভোট তো হবে, আমরা ভোট দিতে পারব তো? ভোট পূর্ব এবং ভোট পরবর্তী সহিংসতার ভয়ে আতঙ্কিত গ্রামের মানুষ। পতিত সরকারের স্থানীয় সন্ত্রাসীরা এখন বিশেষ দলের নির্বাচনী প্রচারে সবার আগে। ঠাকুরগাঁওয়ে দেখা গেল রাতারাতি সব রাস্তার আইল্যান্ডসহ সর্বত্র, গাছ সব এক বিশেষ প্রার্থীর ফেস্টুন ও ব্যানারে ছেয়ে গেছে। অথচ নির্বাচন কমিশন ফেস্টুন ও ব্যানারের সংখ্যা সীমিত করে দিয়েছে। বিশেষ প্রার্থীর ব্যানারে রাস্তাঘাট, বাসস্ট্যান্ড, রিকশাস্ট্যান্ড, আদালতপাড়া ভরাট। কর্তৃপক্ষের চোখের সামনে এটি ঘটলেও তারা নীরব। মনে হচ্ছে, প্রশাসন নির্দিষ্ট প্রার্থীর প্রতি সহানুভূতিসম্পন্ন। এভাবে নিরপেক্ষ ও উৎসবমুখর নির্বাচন কিভাবে সম্ভব– নির্বাচন কমিশন খোলাসা করবে কি?

লেখক : চক্ষুরোগ বিশেষজ্ঞ
[email protected]