তালগাছটির আর একপায়ে দাঁড়িয়ে থাকা হলো না। বাবুইয়ের ছানাদের আর আলোর মুখ দেখা হলো না। একটি খবর আমাকে অত্যন্ত বিব্রত, রাগান্বিত ও অস্থির করে তুলল। খবরটি ঝালকাঠি জেলার অন্তর্গত গুয়াটন এলাকার। গুয়াটনের একটি বিশাল তালগাছ কেটে ফেলেছে। যে গাছে শতাধিক বাবুই পাখির বাসা ছিল। শত শত ছানা ও ডিম ছিল ওই বাসাগুলোতে। গত ২৮ জুনের খবর এটি। ঘটনাটি ঘটেছে তার একদিন আগে, ২৭ জুন বিকেলে। মোবারক আলী ফকিরের মালিকানাধীন জমির পার্শ্ববর্তী সড়কের পাশে। গাছটি কাটেন মিজানুর রহমান নামের এক ব্যক্তি। এই গাছটিই ছিল এলাকাজুড়ে বাবুই পাখিদের নিরাপদ প্রজনন কেন্দ্র ও একমাত্র আশ্রয়স্থল। তালগাছটির মালিক মোবারক আলী না সরকার তা স্পষ্ট নয়। গাছটি কাটার সময় বাসা থেকে অনেক ছানা পড়ে মারা যায়, আর অসংখ্য ডিম নষ্ট হয়ে যায়। এমন নিষ্ঠুরতায় এলাকাবাসী ক্ষোভ ও দুঃখ প্রকাশ করেন।
আসলে বাংলাদেশে বন্যপ্রাণী ব্যবস্থাপনা থাকা দূরের কথা, এমনকি সংরক্ষণের জন্য কোনো স্বাধীন অথরিটি নেই, নিদেনপক্ষে বন বিভাগের মতো বন্যপ্রাণী সংরক্ষণের বিভাগও নেই। আমাদের বন্যপ্রাণী যেভাবে উপেক্ষিত হচ্ছে তা পৃথিবীর অন্য কোনো দেশে আছে বলে আমার জানা নেই। অথচ বনের চেয়েও বন্যপ্রাণীর প্রতি সংরক্ষণ ও ব্যবস্থাপনার ব্যাপারে বরং অগ্রাধিকার প্রয়োজন। বন্যপ্রাণী বিলুপ্ত হলে আর রিভাইভাল প্রায় সম্ভবই নয়। যাই হোক, পরবর্তীতে জানা গেল- লোকটির বিরুদ্ধে পদক্ষেপ নেয়া হয়েছে।
বন্যপ্রাণী সংরক্ষণ ব্যবস্থাপনার কোনো মা নেই; বরং এর দায়িত্ব রয়ে গেছে মাসীর হাতে। যার ফলে বন্যপ্রাণীর দুর্যোগ বিপাকের সময় বন বিভাগের মাসী শুধু সাত-পাঁচ ভাবে, যথাযথ পদক্ষেপ নিতে পারে না। এখনো সময় আছে বন্যপ্রাণী সংরক্ষণের জন্য অচিরেই একটি আলাদা বিভাগ করার। বন বিভাগের বন্যপ্রাণী নিয়ে ভাবনা ও কর্মকাণ্ডের যথাযথ অভাবে না হচ্ছে গবেষণা, না হচ্ছে আইনের প্রয়োগ।
বাবুই পাখি ফসলের কোনো ক্ষতি করে না। আমাদের এক গবেষণায় আমরা দেখেছি, বাবুই পাখি ১৪০ প্রকার পোকামাকড় খায় ও এসব পোকার শুককীট মুককীট শিশু বাবুইদের খাওয়ায় যেন তারা দ্রুত বেড়ে ওঠে। যেমন- আমরা শিশুদেরও বেড়ে ওঠার সময় যথেষ্ট আমিষের ব্যবস্থা রাখি। আমিষ খাদ্যের ব্যবস্থা রাখি যাতে শিশু যথাযথ বেড়ে ওঠে, যথাযথ শারীরিক বৃদ্ধি ঘটে। বাবুই পাখির প্রজনন সময় মার্চ থেকে আগস্ট-সেপ্টেম্বর। এই সময় দলে দলে বাবুই পাখি ফসলের ক্ষেতে ঝাঁপিয়ে পড়ে প্রচুর পোকা খাদ্য হিসেবে খায় ও ধরে এনে শিশুদের খাওয়ায়। তবে হ্যাঁ, বাবুই-চড়ুই এরা কৃষকের ফসলের ক্ষেতের কিছু ধান গম প্রভৃতি খায়। তবে তা অতি সামান্য পরিমাণ। এরা সাধারণত ফসলের ক্ষতিকারক পোকা নিধনই করে বেশি। নিজেরা পোকা ধরে গপাগপ খায় ও শিশুদের জন্য শুককীট মুককীট নিয়ে যায়। তা না হলে কৃষকের ঘরে ফসল উঠত না, দেখা দিত দুর্ভিক্ষ। এ প্রেক্ষিতে আমরা মাও সেতুংয়ের একটি কর্মকাণ্ড তুলে ধরলাম।
১৯৫৮ সাল। ঘটনাটি চীনের। চড়ুই ফসলের ক্ষেতের ব্যাপক ক্ষতি করে ভেবে মাও সেতুং নির্দেশ দিলেন দেশের সব চড়ুই নিধন করতে। তারা হিসাব করে দেখেছেন, একটি চড়ুই বছরে চার-পাঁচ কেজি শস্য খায়। প্রতি ১০ লাখ চড়ুইয়ের খাবার বাঁচিয়ে প্রায় ৬০ হাজার মানুষের খাদ্যের জোগান দেয়া যায়। তাই শুরু হলো চড়ুই নিধনযজ্ঞ। শুরু হলো চড়ই নিধন প্রচারণা। তৈরি হলো লাখো রঙিন পতাকা। চড়ুই মারার উৎসবে মেতে উঠল গোটা দেশের মানুষ। আকর্ষণীয় পুরস্কার ঘোষণা করা হলো চড়ুই মারার জন্য। বিভিন্ন পদ্ধতিতে চড়ুই নিধন করতে লাগল। যেমন- খুব জোরে জোরে ড্রাম বাজাতেই চড়ুই উড়ে উড়ে ক্লান্ত হয়ে মাটিতে পড়তে লাগল। অসংখ্য ডিম নষ্ট করা হলো। রাতারাতি তছনছ করা হলো বাসা। জাল দিয়ে ধরা হলো লাখ লাখ চড়ুই। বন্দুক দিয়ে মারা হলো অসংখ্য চড়ুই। এমনকি এসব কাজের জন্য তৈরি হলো ‘স্পারো আর্মি’। এভাবে ‘দ্য গ্রেট স্পারো ক্যাম্পেইন’ নামে প্রচারণার মাধ্যমে চড়ুইশূন্য হলো গোটা চীন।
১৯৬১-৬২ সাল। চীনে দেখা দিলো দুর্ভিক্ষ। না খেয়ে মারা গেল প্রায় চার কোটি মানুষ। ফসলের ক্ষেতে বিভিন্ন ক্ষতিকর পোকার আক্রমণ এত বেড়ে গেল যে, ক্ষেত থেকে ফসল আর ঘরেই তোলা গেল না। টনক নড়ল দেশটির সরকারের। নিরূপায় হয়ে প্রকৃতিতে চড়ুই ফিরিয়ে আনতে সোভিয়েত ইউনিয়ন থেকে শুরু হলো চড়ুই আমদানি।
বাবুইকে বলা হয় স্থপতি পাখি। স্ত্রী পাখি ইনটেরিওর ডিজাইনার. প্রকৃতির ইঞ্জিনিয়ারদের হত্যাকারীদের প্রকৃতি কখনো ক্ষমা করবে না। আর যারা নিষ্পাপ বাবুই ছানাগুলোকে মেরেছে তাদের ক্ষমা নয়। ক্ষমা করা হলে খুনের দায় ক্ষমাদানকারীর কাঁধে বর্তাবে। এ ধরনের অপরাধ ভবিষ্যতে আরো ঘটবে। এসব মানুষই দেশে তথা প্রকৃতিতে দুর্ভিক্ষ নিয়ে আসছে। তালগাছ রোপণ করতে হবে বজ্রপাত থেকে শুধু মানুষের মৃত্যু ঠেকানোর জন্যই নয়; বাবুই পাখি তথা প্রকৃতি বাঁচানোর জন্য, দুর্ভিক্ষের হাত থেকে মানুষ বাঁচানোর জন্যও।
উল্লেখ্য, বস্তুতপক্ষে আমাদের চড়ুই-বাবুই ফসলের হয়তো কিছুটা খেয়ে ফেলে কিন্তু এরা প্রচুর পোকামাকড় খেয়ে থাকে এবং এসব পোকামাকড় না খেলে আমরা ফসল ঘরে তুলতে পারতাম না। দেশে বিপুলসংখ্যক চড়ুই-বাবুই ধরা হচ্ছে ফসলের ক্ষেতে জাল বিছিয়ে এবং এসব পাখি গোপনে ধরে ধরে বিক্রি করা হচ্ছে প্রতিটি ২০ টাকা দরে। বলা হচ্ছে, বাজারে গোশতের দাম বৃদ্ধি পাওয়াই নাকি এর প্রধান কারণ। এসব ব্যবসায়ও কম মারাত্মক নয়। বাছবিচারহীনভাবে মানুষ যা পাচ্ছে তাই খাচ্ছে। এতে দেখা যাবে- অতি অল্প সময়ের মধ্যে প্রকৃতির ভাণ্ডার ফুরিয়ে এসেছে।
লেখক : পরিবেশ ও বন্যপ্রাণী বিশেষজ্ঞ, প্রফেসর ও সাবেক চেয়ারম্যান, প্রাণিবিদ্যা বিভাগ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়



