ড. রাধেশ্যাম সরকার
দেশে এখন জোরেশোরে ভোটের হাওয়া বইছে। বাংলাদেশে নির্বাচন মানেই নানা প্রতিশ্রুতি, রাজনৈতিক অঙ্গীকারের সমাহার। শিক্ষা, স্বাস্থ্য ও অবকাঠামোর পাশাপাশি কৃষি খাতও নির্বাচনী আলোচনার গুরুত্বপূর্ণ অংশ হয়ে ওঠে। কারণ বাংলাদেশ মূলত কৃষিনির্ভর। দেশের খাদ্য নিরাপত্তা, গ্রামীণ কর্মসংস্থান এবং অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতার প্রধান ভিত্তি কৃষি খাত। ফলে নির্বাচনে কৃষি উন্নয়নের প্রতিশ্রুতি শুধু একটি খাতের বিষয় নয়; বরং জাতীয় উন্নয়নের অন্যতম মৌলিক প্রশ্ন।
বিভিন্ন রাজনৈতিক দল কৃষি ও কৃষককে কেন্দ্র করে নানা প্রতিশ্রুতি দিচ্ছে। কেউ বলছেন, কৃষকদের জন্য কৃষিকার্ড চালু করা হবে। কেউ প্রতিশ্রুতি দিচ্ছেন কৃষিপণ্যের ন্যায্যমূল্য নিশ্চিত করার। আবার কেউ কৃষিকে লাভজনক ও আধুনিক খাতে রূপান্তরের অঙ্গীকার করছেন। পাশাপাশি কৃষিঋণের সুদের হার কমানো, ভর্তুকি বৃদ্ধি, উন্নত বীজ ও সার সহজলভ্য করা, সেচব্যবস্থার উন্নয়ন এবং কৃষিপণ্যের সংরক্ষণ ও বিপণনের জন্য আধুনিক অবকাঠামো গড়ে তোলার কথাও নির্বাচনী ইশতেহারে উঠে আসছে। কিছু রাজনৈতিক দল জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব মোকাবেলায় সহনশীল কৃষিব্যবস্থা গড়ে তোলা এবং কৃষিপণ্য রফতানির নতুন বাজার তৈরির পরিকল্পনার কথাও বলছে। এসব নিঃসন্দেহে আশাব্যঞ্জক। কিন্তু বাংলাদেশের বাস্তবতায় একটি প্রশ্ন থেকেই যায়, নির্বাচনের পর এসব অঙ্গীকার কতটা বাস্তবায়ন হবে!
দেশের মোট শ্রমশক্তির বড় অংশ প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে কৃষির সাথে যুক্ত। কৃষি খাত দেশের খাদ্যনিরাপত্তা নিশ্চিত করার পাশাপাশি শিল্প ও সেবা খাতের কাঁচামাল সরবরাহ করে। গত কয়েক দশকে কৃষি উৎপাদনে উল্লেখযোগ্য সাফল্য এসেছে। খাদ্য ঘাটতি কাটিয়ে দেশ আজ খাদ্যে কিছুটা স্বয়ংসম্পূর্ণতার পথে এগিয়েছে। ধান উৎপাদন বৃদ্ধি, সবজি ও মাছ উৎপাদনে গুরুত্বপূর্ণ অর্জন এবং কৃষিতে প্রযুক্তির ব্যবহার বেড়েছে, যা কৃষির অগ্রগতির চিত্র তুলে ধরে। কিন্তু এর পেছনে ঘাম ঝরানো কৃষক সমাজ কতটা লাভবান হচ্ছেন, সেটিই প্রশ্ন।
নির্বাচনী অঙ্গীকারের অন্যতম আলোচিত বিষয় কৃষি কার্ড। রাজনৈতিক দলগুলো দাবি করছে এই কার্ডের মাধ্যমে কৃষকদের বিভিন্ন সুবিধা দেয়া হবে। কিন্তু এই কার্ড কারা পাবেন, কিভাবে কৃষক শনাক্ত করা হবে এবং কার্ডের মাধ্যমে কী ধরনের সেবা দেয়া হবে— এসব প্রশ্নের স্পষ্ট উত্তর নেই। বাংলাদেশের বাস্তবতায় দেখা যায়, অনেক সময় প্রকৃত ক্ষুদ্র ও প্রান্তিক কৃষকরা সরকারি সুবিধা থেকে বঞ্চিত হন। প্রভাবশালী ব্যক্তি বা ভুয়া কৃষকরা বিভিন্ন সুবিধা পেয়ে যান। ফলে কৃষি কার্ড যদি স্বচ্ছ ও নির্ভুল পদ্ধতিতে বাস্তবায়ন করা না যায়, তবে এটি কেবল নির্বাচনী প্রতিশ্রুতি হিসেবেই থেকে যেতে পারে।
নির্বাচনী অঙ্গীকার হিসেবে অনেক রাজনৈতিক দল জানাচ্ছে, সেচ ও পানি ব্যবস্থাপনা আরো উন্নত করা হবে, বাজার অবকাঠামো শক্তিশালী করা হবে, এলাকাভিত্তিক কৃষিবাজার গড়ে তোলা হবে এবং কৃষিপণ্যের ন্যায্যমূল্য নিশ্চিত করার কার্যকর কৌশল নেয়া হবে। এ ছাড়াও কৃষিঋণ পুনঃতফসিল বা মওকুফ করা, ভর্তুকি ও প্রণোদনা বাড়ানো এবং কৃষিপণ্য রফতানির সুযোগ সম্প্রসারণের কথাও বলা হচ্ছে। পাশাপাশি অনেকেই তরুণদের কৃষি উদ্যোক্তা হিসেবে গড়ে তোলার বিশেষ পরিকল্পনার কথাও উল্লেখ করছেন। এসব প্রতিশ্রুতি যদি স্পষ্টভাবে এবং বাস্তবায়নযোগ্য পরিকল্পনার সাথে যুক্ত করা হয়, তবে কৃষকের আস্থা অর্জন করা অনেক সহজ হবে।
বাংলাদেশের কৃষি খাতের অন্যতম বড় চ্যালেঞ্জ হলো কৃষিপণ্যের ন্যায্যমূল্য নিশ্চিত করা। প্রায়শ দেখা যায়, বাম্পার ফলন হলেও কৃষক লাভবান হন না; বরং মধ্যস্বত্বভোগীরা অধিকাংশ সুবিধা নিয়ে নেয়। এই অবস্থার অবসানে রাজনৈতিক দলগুলো অঙ্গীকার করেছে, সরকারি ক্রয়ব্যবস্থা কৃষকের কাছে সরাসরি সম্প্রসারণ করা হবে, ডিজিটাল বাজার তথ্যব্যবস্থা চালু করা হবে এবং সিন্ডিকেট দমনে কার্যকর ও সুসংগঠিত নীতিমালা প্রণয়ন করা হবে। দলগুলো নিশ্চিত করতে চায়, কৃষক তার ফসলের যথাযথ মূল্য পাবে, যাতে উৎপাদনে আগ্রহ বাড়ে এবং দীর্ঘমেয়াদে বিনিয়োগও বাড়ে। ন্যায্যমূল্য নিশ্চিত না হলে শুধু কৃষি খাতই ক্ষতিগ্রস্ত হয় না; বরং দেশের খাদ্যনিরাপত্তা, গ্রামীণ জীবিকা এবং অর্থনীতিতেও দীর্ঘমেয়াদি ঝুঁকি তৈরি হয়। তাই ভোটারদের মনোযোগ আকর্ষণ করতে এসব পরিকল্পনার কথা পরিষ্কারভাবে বলা হচ্ছে।
বর্তমান প্রজন্মের কাছে কৃষি অনেকটা আকর্ষণহীন পেশা হিসেবে বিবেচিত হয়। ফলে কৃষিতে তরুণদের অংশগ্রহণ কমছে। এই বাস্তবতায় নির্বাচনী পরিকল্পনায় প্রযুক্তিনির্ভর ও উদ্যোক্তামুখী কৃষির ওপর গুরুত্ব দেয়া হচ্ছে। স্মার্ট সেচব্যবস্থা, কৃষির যান্ত্রিকীকরণ, ডিজিটাল কৃষি পরামর্শসেবা এবং কৃষিভিত্তিক স্টার্টআপের সুযোগ তৈরি করা গেলে তরুণ সমাজ কৃষির প্রতি আগ্রহী হতে পারে। এতে শুধু কৃষি খাতই শক্তিশালী হবে না; বরং দেশের কর্মসংস্থান সমস্যারও কার্যকর সমাধান হতে পারে।
কৃষি বর্তমানে জলবায়ু পরিবর্তনের বড় ঝুঁকির মুখে। বন্যা, খরা, লবণাক্ততা এবং ঘূর্ণিঝড় কৃষি উৎপাদন অনিশ্চয়তার দিকে ঠেলে দিচ্ছে। তাই নির্বাচনী ইশতেহারে ফসল বীমা চালু, কৃষিমূল্য কমিশন গঠন এবং স্থানীয় অভিযোজন প্রকল্প বাস্তবায়নের কথা বলা হচ্ছে। এসব উদ্যোগ কৃষকের ঝুঁকি কমাতে সাহায্য করবে এবং গ্রামীণ জনগোষ্ঠীর মধ্যে আত্মবিশ্বাস তৈরি করবে।
কৃষির উন্নয়ন শুধু ফসলের উৎপাদন বাড়ানো নয়; কৃষকের জীবনমান উন্নততর করা। গ্রামীণ সড়ক, বিদ্যুৎ, সংরক্ষণাগার এবং কোল্ড স্টোরেজের অভাব আজও দেশের অনেক কৃষকের আর্থিক ক্ষতির প্রধান কারণ। বহু রাজনৈতিক দলের নির্বাচনী অঙ্গীকারে স্পষ্টভাবে বলা হয়েছে, এসব অবকাঠামো দ্রুত ও কার্যকরভাবে উন্নত করা হবে। প্রার্থীরা প্রতিশ্রুতি দিচ্ছেন, তাদের নির্বাচনী এলাকার নির্দিষ্ট কৃষি রোডম্যাপ ভোটারদের সামনে বিস্তারিতভাবে উপস্থাপন করা হবে, যাতে কৃষক ও সাধারণ মানুষ সরাসরি দেখতে পারেন।
দেশের রাজনৈতিক ইতিহাস বিশ্লেষণে দেখা যায়, নির্বাচনী অঙ্গীকার প্রায়ই বাস্তবায়নের ধারাবাহিকতায় থাকে না; বরং প্রায়শই শুধু কাগজে বা বক্তৃতায় সীমাবদ্ধ থাকে। নীতিগত অগ্রাধিকার পরিবর্তন, প্রশাসনিক জটিলতা, দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনার অভাব এবং পর্যাপ্ত তত্ত্বাবধায়ক ব্যবস্থার অনুপস্থিতি কৃষি উন্নয়নের পথে বড় বাধা হয়ে দাঁড়ায়। ফলে কৃষকরা ভোটের সময় উৎসাহের সাথে আশায় থাকলেও, বাস্তবে কাঙ্ক্ষিত পরিবর্তন বা প্রয়োজনীয় সহায়তা কমই পান। এই বাস্তবতা বিবেচনায় রেখে নির্বাচনী প্রতিশ্রুতিগুলো টেকসই ও বাস্তবায়নযোগ্য উন্নয়ন পরিকল্পনায় রূপান্তর করা জরুরি। কৃষি খাতের উন্নয়নের জন্য দীর্ঘমেয়াদি নীতিমালা গ্রহণ, পর্যাপ্ত বাজেট বরাদ্দ নিশ্চিত করা, জবাবদিহিমূলক বাস্তবায়ন কাঠামো তৈরি এবং নিয়মিত অগ্রগতি মূল্যায়ন অপরিহার্য। এছাড়াও কৃষি নীতিনির্ধারণ প্রক্রিয়ায় কৃষক, গবেষক, উদ্যোক্তা এবং স্থানীয় জনগোষ্ঠীর সক্রিয় অংশগ্রহণ নিশ্চিত করতে হবে, যাতে পরিকল্পনা বাস্তবসম্মত ও মাঠ পর্যায়ে কার্যকর হয় এবং দেশের কৃষি খাতের উন্নয়ন ও কৃষকের জীবনমানের ধারাবাহিক উন্নয়ন নিশ্চিত করা যায়।
দেশের খাদ্যনিরাপত্তা, পুষ্টিনিরাপত্তা এবং অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা অনেকাংশেই নির্ভর করে কৃষির টেকসই উন্নয়নের ওপর। তাই কৃষি-সম্পর্কিত নির্বাচনী প্রতিশ্রুতি যেন শুধুই রাজনৈতিক বক্তৃতা বা প্রচারণায় সীমাবদ্ধ না থাকে; বরং এগুলোকে বাস্তব নীতিমালা, সময়বাঁধা কর্মসূচি এবং কার্যকর উদ্যোগের মাধ্যমে বাস্তবে রূপ দিতে হবে। নির্বাচনের উত্তাপ স্তিমিত হয়ে গেলেও কৃষকের সংগ্রাম থেমে যায় না। মাঠে ফসল ফলাতে গিয়ে তিনি প্রতিদিন প্রকৃতি, বাজারের অস্থিরতা এবং অর্থনৈতিক অনিশ্চয়তার সাথে সংগ্রাম চালিয়ে যান। তাই নির্বাচনোত্তর সময় কৃষি ও কৃষকের প্রতি দেয়া অঙ্গীকার কতটা বাস্তবায়িত হবে, সেটিই নির্ধারণ করবে দেশের স্থায়ী উন্নয়নের ভবিষ্যৎ পথরেখা। কৃষি শক্তিশালী হলে শক্তিশালী হবে দেশের অর্থনীতি, খাদ্যব্যবস্থা এবং সামাজিক স্থিতি। কৃষকের স্বপ্ন বাস্তবায়ন মানেই জাতির স্বপ্ন বাস্তবায়ন, এই গভীর উপলব্ধি যদি রাজনৈতিক অঙ্গীকারের কেন্দ্রে সঠিকভাবে স্থান পায়, তবে নির্বাচনোত্তর বাংলাদেশ সত্যিকার অর্থেই নতুন দিগন্তে পৌঁছাতে পারবে, যেখানে টেকসই উন্নয়ন, সামাজিক নিরাপত্তা এবং খাদ্য ও অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা একসাথে নিশ্চিত হবে।
লেখক : সিনিয়র কৃষিবিদ, অবসরপ্রাপ্ত সরকারি কর্মকর্তা



