এসআইআর নিয়ে অগ্নিগর্ভ পশ্চিমবঙ্গ

এই প্রথম বিজেপি সরকার এসআইআরের অজুহাত হিসেবে ব্যবহার করে পশ্চিমবঙ্গের প্রান্তিক মানুষকে বাংলাদেশী অনুপ্রবেশকারী সাজিয়ে এক কোটির বেশি প্রান্তজনকে ভোটার তালিকা থেকে বাদ দেয়ার ষড়যন্ত্র করছে নির্বাচন কমিশনকে কাজে লাগিয়ে। নির্বাচন কমিশনের নিরপেক্ষতা নিয়ে উঠেছে প্রশ্ন। পশ্চিমবঙ্গের চতুর্দিকে শুধু ক্ষোভ আর ক্ষোভ। পশ্চিমবঙ্গ কার্যত অগ্নিগর্ভ।

বিহারে একজনও বাংলাদেশী অনুপ্রবেশকারী অথবা রোহিঙ্গা উগ্রবাদী পাওয়া যায়নি। পশ্চিমবঙ্গেও একজন বাংলাদেশী উগ্রবাদী বা অনুপ্রবেশকারী পাওয়া যায়নি এসআইআর প্রক্রিয়ায়। খসড়া তালিকা তার প্রমাণ। কিন্তু নির্বাচন কমিশনের ম্যাপিং ও ইলজিক্যাল ডিস্ক্রিপেন্সির জটিলতায় এখন পশ্চিমবঙ্গে প্রান্তিক মানুষ চূড়ান্ত তালিকায় ভোটাধিকার হারাতে চলেছেন। জন্মতারিখের প্রমাণ হিসেবে মাধ্যমিক পরীক্ষার অ্যাডমিট কার্ড পর্যন্ত স্বীকার করা হচ্ছে। প্রান্তিক মানুষের হাফ-ডজন সন্তান প্রবল বাধা তৈরি করছে। বাধা তৈরি করছে চার পুরুষের দলিল। এর ফলে প্রান্তিক মানুষের বিক্ষোভে পশ্চিমবঙ্গের প্রায়ই ৪০০ থানা এলাকা ও ৩৪২টি ব্লক এলাকা জনবিক্ষোভে উত্তাল। এক দিকে ভিনরাজ্যে কাজ করতে যাওয়া বাংলাভাষী পরিযায়ী বিশেষ বাংলাভাষী মুসলিম শ্রমিকরা মব-সন্ত্রাসের শিকার; তেমনি ভোটাধিকার হারানোর আতঙ্কে এ রাজ্যের প্রায় ১০০ প্রান্তিক মানুষ মারা গেছেন। তাদের মধ্যে এসআইআর প্রক্রিয়ায় কর্মরত বুথ লেবেল অফিসারও আছেন। বয়স্ক নাগরিকও রয়েছেন।

পশ্চিমবঙ্গে জনরোষ বাড়ছে। এ জনরোষ কোথায় গিয়ে পৌঁছাবে, তা একমাত্র ভবিষ্যৎ বলতে পারে। ভারতের সর্বোচ্চ আদালত সুপ্রিম কোর্ট এক নির্দেশে বিষয়টি সরলীকরণ করলেও, এটি জটিল আকার ধারণ করেছে বলে পশ্চিমবঙ্গের ওয়াকিবহাল মনে করছেন। একের পর এক মৃত্যু, পশ্চিমবঙ্গকে তীব্র সামাজিক বিশৃঙ্খলার মধ্যে ফেলে দেয় কি না তাই এখন বড় প্রশ্ন।

ভারতের নির্বাচন-ব্যবস্থা বিশ্বের বৃহত্তম গণতান্ত্রিক কাঠামো হিসেবে পরিচিত। এ ব্যবস্থার অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ ভিত্তি হলো ভোটার তালিকা। কে ভোট দেবেন, কার ভোট গণ্য হবে, এ প্রশ্নগুলোর উত্তর নির্ধারণ করে নাগরিকত্বের কার্যকর অর্থ। এ প্রেক্ষাপটে নির্বাচন কমিশন পরিচালিত স্পেশাল ইনটেনসিভ রিভিশন বা এসআইআর একটি প্রশাসনিকভাবে গুরুত্বপূর্ণ প্রক্রিয়া বলে বিবেচিত।

কিন্তু সাম্প্রতিক সময়ে পশ্চিমবঙ্গের অভিজ্ঞতা দেখিয়েছে, এ তথাকথিত ‘নিরপেক্ষ’ প্রশাসনিক প্রক্রিয়া বাস্তবে পরিণত হচ্ছে ভয়, বাদ পড়া, নোটিশ, শুনানি ও অনিশ্চয়তার একটি যন্ত্রে। এ যন্ত্রের নিচে চূর্ণ হচ্ছে মূলত একটি নির্দিষ্ট শ্রেণী, কথিত ছোটলোক, প্রান্তিক, গরিব, সংখ্যালঘু, পরিযায়ী শ্রমিক ও দলিত জনগোষ্ঠী। এখান থেকে প্রশ্ন উঠে আসে, এসআইআরের ফাঁদে কেন বারবার তারা পড়ে, অভিজাতশ্রেণী কেন তুলনামূলকভাবে অক্ষত থেকে যায়? এ লেখা সেই প্রশ্নের কাঠামোগত, রাজনৈতিক ও সামাজিক উত্তর অনুসন্ধানের চেষ্টা।

এসআইআর বা স্পেশাল ইনটেনসিভ রিভিশন হলো ভোটার তালিকার একটি বিশেষ সংশোধন প্রক্রিয়া, যার আওতায় মৃত বা স্থানান্তরিত ভোটারের নাম বাদ দেয়া, ভুল ঠিকানা বা বয়স সংশোধন, নতুন যোগ্য ভোটারের নাম সংযোজন এবং ডুপ্লিকেট বা ভুয়া এন্ট্রি বাতিল করা হয়। কিন্তু এখন তা প্রান্তিক মানুষের ভোটাধিকার কেড়ে নেয়ার শামিল। ভারতে প্রতি বছর জাতীয় ভোটার দিবস পালিত হয়। সেখানে বলা হয়— এ বছর নতুন ভোটারের সংখ্যা বেড়েছে। কাগজ-কলমে এটি সম্পূর্ণ নিরপেক্ষ, নিয়মতান্ত্রিক ও আইনসঙ্গত একটি প্রক্রিয়া। কিন্তু অতিরিক্ত জটিলতার শিকার হচ্ছেন প্রান্তিক মানুষ। বিশেষ করে যারা ধর্মীয় সংখ্যালঘু তারা বেশি শিকার।

কিন্তু রাষ্ট্রবিজ্ঞানের একটি মৌলিক সত্য হলো— কোনো আইন বা প্রশাসনিক প্রক্রিয়া কতটা ন্যায়সঙ্গত, তা তার ভাষা দিয়ে নয়; বরং সে প্রক্রিয়া কাকে বেশি আঘাত করছে, তার মাধ্যমে নির্ধারিত হয়। এসআইআরের বাস্তব প্রয়োগ সেই নিরপেক্ষতার দাবিকে প্রশ্নের মুখে দাঁড় করায়।

এসআইআর মূলত একটি নথিনির্ভর প্রক্রিয়া। এখানে নাগরিকত্ব কার্যত কাগজের ওপর দাঁড়িয়ে থাকে। যার কাছে যত বেশি নথি, সে তত বেশি নিরাপদ নাগরিক। এ বাস্তবতায় অভিজাতশ্রেণীর অবস্থান অত্যন্ত সুবিধাজনক। জন্মসনদ, স্কুল সার্টিফিকেট, প্যান, আধার, পাসপোর্ট, একাধিক ঠিকানার প্রমাণ, ডিজিটাল অ্যাক্সেস, আইনজীবী ও রাজনৈতিক যোগাযোগ— সব তাদের নাগালে। ফলে কোনো ভুল হলে সেটিকে সহজেই ‘clerical error’ বা ‘system glitch’ বলে ব্যাখ্যা করা যায়, সময় বাড়ে, সমাধানের পথ খুলে যায়; কিন্তু প্রান্তিক মানুষদের ক্ষেত্রে কি সেই সুবিধা আছে?

প্রান্তিক মানুষের বাস্তবতা সম্পূর্ণ ভিন্ন। অনেকের জন্ম নথি নেই, নামের বানান বা পরিচয় বিভিন্ন নথিতে ভিন্ন, বিয়ের পর নাম বদল হলেও কাগজ বদলায়নি, বারবার ঘর বদলে স্থায়ী ঠিকানার প্রমাণ নেই। ডিজিটাল ফর্ম তাদের কাছে দুর্বোধ্য, শুনানি মানে কাজের ছুটি ও মজুরি ক্ষতি। ফলে সামান্য ভুলও তাদের ক্ষেত্রে নোটিশ, সন্দেহ ও ভয় তৈরি করে। সেই সাথে শেষ পর্যন্ত নাম কেটে যাওয়ার ঝুঁকি বাড়ায়। একই নিয়ম এখানে দুই শ্রেণীর জন্য দুই রকম ফল বয়ে আনে।

রাষ্ট্রীয় প্রশাসনের একটি অঘোষিত কিন্তু সুস্পষ্ট নীতি হলো, নজরদারি সবসময় নিচের দিকে প্রবাহিত হয়। বুথ লেভেল অফিসাররা (বিএলও) যান বস্তি, গ্রাম ও শ্রমিক কলোনিতে। এলিট পাড়াগুলো অনেকসময় আগেভাগে ‘ভেরিফাইড’ ধরে নেয়া হয়। গেটেড কমপ্লেক্সে ঢুকতে বিএলওয়ের অনুমতির প্রয়োজন পড়ে। এখানে কাজ করে শ্রেণিভিত্তিক প্রোফাইলিং, যেখানে দরিদ্র মানে সন্দেহজনক নাগরিক।

একই ভুলের বিচার এখানে শ্রেণিভেদে আলাদা হয়। এলিটদের ক্ষেত্রে সময় বাড়ে, ব্যক্তিগত শুনানি হয়, নোটিশের ভাষা নম্র থাকে এবং সংশোধনের একাধিক সুযোগ তৈরি হয়। অথচ প্রান্তিক মানুষের ক্ষেত্রে সময়সীমা কঠোর, হাজিরা না দিলে নাম বাদ, বিএলওয়ের রিপোর্টই চূড়ান্ত সত্য এবং আপিলের বাস্তব সুযোগ প্রায় নেই। এটি আর রুল অব ল থাকে না, হয়ে ওঠে রুল বাই ডিসক্রিয়েশন।

বিএলও নিজেরাও প্রান্তিক কর্মী, কম বেতন, অতিরিক্ত কাজের চাপ ও প্রশাসনিক হুমকির মধ্যে কাজ করেন। যখন তাদের অসম্ভব লক্ষ্য দেয়া হয়, পর্যাপ্ত সময় ও কর্মী ছাড়া কাজ চাপানো হয় এবং উপরতলার সিদ্ধান্তের দায় নিচের স্তরে চাপিয়ে দেয়া হয়, তখন তারা কার্যত অসহায় হয়ে পড়েন। এ প্রক্রিয়ায় প্রান্তিক নাগরিক হয়ে ওঠে ক্ষতির বস্তু। এটি হয়তো সরাসরি ঘুষের দুর্নীতি নয়; কিন্তু এটি স্পষ্টত ক্ষমতার দুর্নীতি।

এসআইআর কার্যকর হয় ভয় দিয়ে। যারা চাকরি হারানোর ভয় পান, থানার নামে আতঙ্কিত হন, আদালতে যাওয়ার সামর্থ্য রাখেন না, তাদের ওপর এ ভয় সবচেয়ে বেশি কাজ করে। এলিট, শিক্ষিত ও আইনি সহায়তাসম্পন্ন শ্রেণী এই ভয়ের বাইরে থাকে। যেখানে ভয় কাজ করে না, সেখানে এসআইআর কার্যত কাজ করে না।

কাগজ-কলমে এসআইআর ধর্মনিরপেক্ষ; কিন্তু বাস্তবে দলিত মানে দুর্বল নথি, মুসলমান মানে বাড়তি সন্দেহ, পরিযায়ী শ্রমিক মানে স্থায়ী ঠিকানার অভাব, আদিবাসী মানে প্রশাসনিক অদৃশ্যতা। এ বাস্তবতায় এসআইআর ধীরে ধীরে একটি সিটিজেনশিপ অ্যাংজাইটি মেশিনে পরিণত হয়।

এলিট সোসাইটি অদৃশ্য থাকে, কারণ তারা প্রশাসনের অংশ, মিডিয়ার ভাষা নির্ধারণে সক্ষম, ভুল হলে আইনি চাপ তৈরি করতে পারে এবং রাষ্ট্রের চোখে তারা ‘নিরাপদ নাগরিক’। রাষ্ট্র নিজের ভিত্তিকে প্রশ্ন করে না; সে প্রশ্ন তোলে প্রান্তিকদের ওপর।

এসআইআর কোনো বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়। উচ্ছেদ অভিযান হয়েছে বস্তিতে, এনআরসি আঘাত করেছে গরিব ও মুসলমানদের ওপর, নোটবন্দী বিপর্যস্ত করেছে অসংগঠিত শ্রমকে, এসআইআর লক্ষ্য করেছে প্রান্তিক ভোটারদের। প্রতিবার লক্ষ্য এক, ঝুঁকিপূর্ণ নাগরিক তৈরি করা।

ভোটাধিকার কেবল ভোট দেয়ার অধিকার নয়; এটি স্বীকৃত নাগরিকত্বের চিহ্ন। যখন রাষ্ট্র কাউকে বারবার নিজের নাগরিকত্ব প্রমাণ করতে বাধ্য করে, তখন সে আর নাগরিক থাকে না, অভিযুক্তে পরিণত হয়। এখানে গণতন্ত্রের সবচেয়ে বড় বিপদ লুকিয়ে আছে। এসআইআরের ফাঁদে প্রান্তিকরা পড়ে, কারণ রাষ্ট্র তাদের নাগরিকত্বকে প্রশ্ন করে, এলিটদের নাগরিকত্ব ধরে নেয়। এটি কোনো প্রশাসনিক ভুল নয়; এটি ক্ষমতার রাজনীতি। গণতন্ত্র তখনই বিপন্ন হয়, যখন ভোটাধিকার কাগজের দয়ার ওপর দাঁড়ায়।

এটি কোনো অভিযোগপত্র নয়; এটি একটি সতর্কতার দলিল। কারণ আজ প্রান্তিক, আগামীকাল যে কেউ।

এই প্রথম বিজেপি সরকার এসআইআরের অজুহাত হিসেবে ব্যবহার করে পশ্চিমবঙ্গের প্রান্তিক মানুষকে বাংলাদেশী অনুপ্রবেশকারী সাজিয়ে এক কোটির বেশি প্রান্তজনকে ভোটার তালিকা থেকে বাদ দেয়ার ষড়যন্ত্র করছে নির্বাচন কমিশনকে কাজে লাগিয়ে। নির্বাচন কমিশনের নিরপেক্ষতা নিয়ে উঠেছে প্রশ্ন। পশ্চিমবঙ্গের চতুর্দিকে শুধু ক্ষোভ আর ক্ষোভ। পশ্চিমবঙ্গ কার্যত অগ্নিগর্ভ।

লেখক : কলকাতার বিশিষ্ট কলামিস্ট, প্রাবন্ধিক ও কবি