খালেদা জিয়াকে বাড়ি থেকে উচ্ছেদের দুই হোতা

বেগম খালেদা জিয়াকে বাড়ি থেকে উৎখাতের ব্যাপারে ডিজিএফআইয়ের অপতৎপরতার বিষয়টি ব্যাপকভাবে আলোচিত হলেও ঘটনার সূত্রপাত ঘটান যে দু’জন সাংবাদিক তাদের নিয়ে কোনো আলোচনা নেই।

প্রকৌশলী রুমা রহমান

২০০৯ সালে সংঘটিত বিডিআর বিদ্রোহ ছিল বাংলাদেশের ইতিহাসে সংঘটিত একটি নৃশংস ও অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ঘটনা। ওই ঘটনার মাধ্যমে বাংলাদেশের অত্যন্ত সাহসী ও দক্ষ আধা সামরিক সীমান্তরক্ষী বাহিনীকে মুছে ফেলা হয়। সেই সাথে হত্যা করা হয় সেনাবাহিনীর ৫৭ চৌকস কর্মকর্তা, যা ছিল সেনাবাহিনীকে হীনবল করার মাধ্যমে আওয়ামী লীগের নিয়ন্ত্রণে নেয়ার প্রথম পদক্ষেপ। সেই সময়ে আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ ঘটনারও সূত্রপাত করা হয়; যার পরিণতিতে বাংলাদেশের অত্যন্ত জনপ্রিয় নেত্রী বেগম খালেদা জিয়াকে তার ক্যান্টনমেন্টের বাড়ি থেকে উচ্ছেদ করা হয় এবং তা ধ্বংস করা হয়। কারণ ওই বাড়িটি ছিল স্বাধীনতার ঘোষক শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের স্মৃতিবিজড়িত বাড়ি।

বেগম খালেদা জিয়াকে বাড়ি থেকে উৎখাতের ব্যাপারে ডিজিএফআইয়ের অপতৎপরতার বিষয়টি ব্যাপকভাবে আলোচিত হলেও ঘটনার সূত্রপাত ঘটান যে দু’জন সাংবাদিক তাদের নিয়ে কোনো আলোচনা নেই। ওই দু’জন সাংবাদিক হচ্ছেন সৈয়দ বোরহান কবীর এবং অন্যজন আমাদের সময় পত্রিকার প্রকাশক ও সম্পাদক নাইমুল ইসলাম খান। নাইমুল ইসলাম খান তার সুকর্মের (পড়তে হবে অপকর্ম) পুরস্কার হিসেবে পরবর্তীতে শেখ হাসিনার প্রেস সেক্রেটারির দায়িত্ব পান। বোরহান কবীর পান প্রচুর অর্থ। শেখ হাসিনাকে নোবেল পুরস্কার পাইয়ে দেয়ার কথা বলে অর্থনীতিবিদ আবুল বারাকাতের নেতৃত্বে যে ক’জন ব্যক্তি পৃথিবীর নানা দেশে ঘুরে বেড়িয়ে ছিলেন, বোরহান কবীর ছিলেন তাদের অন্যতম।

বিডিআর বিদ্রোহের শুরুতে ইলেকট্রনিক মিডিয়ায় মুন্নি সাহা গং সেনাবাহিনীর বিরুদ্ধে বিষোদগার শুরু করে বিদ্রোহকে যৌক্তিকতা দিতে অপচেষ্টা চালান। কিন্তু পরে যখন সেনা কর্মকর্তাদের নির্মম হত্যাকাণ্ডের খবর ফাঁস হয়ে যায় তখন তারা ভোল পাল্টে ফেলেন। সে সময় পত্রপত্রিকায় সেনা কর্মকর্তাদের নির্মম হত্যাকাণ্ডের বিভিন্ন ঘটনা নিয়ে লেখালেখি চলছিল। তার একপর্যায়ে নাইমুল ইসলাম খানের আমাদের সময় পত্রিকায় সৈয়দ বোরহান কবীরের একটি লেখা প্রকাশিত হয়। লেখার শিরোনাম ছিল- ‘মাননীয় বিরোধী দলের নেত্রী একটু ভেবে দেখবেন প্লিস’। আপাত দৃষ্টিতে নিরীহ শিরোনামের ওই লেখাটি ছিল বেগম খালেদা জিয়াকে বাড়ি থেকে উৎখাতের ষড়যন্ত্রের শুরু। স্মরণযোগ্য যে, বিডিআর বিদ্রোহ সংঘটিত হয় ২০০৯ সালের ২৫ ফেব্রুয়ারি। লেখাটি ছাপানো হয় ১৯ মার্চ। বোরহান কবীর তার ওই লেখার মাধ্যমে চতুরতার সাথে খালেদা জিয়াকে ক্যান্টনমেন্টের বাড়ি থেকে সরানোর বিষয়টি প্রকাশ্যে নিয়ে আসেন। সরকার তা বাস্তবায়নে দ্রুততার সাথে কাজ শুরু করে।

বোরহান কবীর লিখেন- ‘গত ২৫ ফেব্রুয়ারি যেসব সেনা কর্মকর্তা শহীদ হয়েছেন, তাদের স্মৃতি এখনো জ্বলজ্বলে। তরুণ প্রাণ এসব মেধাবী কর্মকর্তার মৃত্যুতে জাতির যে ক্ষতি হলো তা পূরণ হওয়ার নয়। সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন শহীদদের পরিবারগুলো। নিহত সেনা কর্মকর্তাদের বেশির ভাগ মধ্যস্তরের সেনা কর্মকর্তা। অনেকে পরিবারের একমাত্র উপার্জনক্ষম ব্যক্তি ছিলেন। তাদের মৃত্যুর ফলে পরিবারগুলো শুধু শোকের সাগরে ভাসেননি, এক ভয়াবহ অর্থনৈতিক অনিশ্চয়তার মুখোমুখি দাঁড়িয়েছেন। সরকার ও সেনাবাহিনী মিলে নিহতদের পরিবারের জন্য ১৫ লাখ টাকা করে বরাদ্দের ঘোষণা দেয়া হয়েছে। কিন্তু আজকের বাস্তবতায় এ টাকা কত অপ্রতুল তা নিশ্চয় আমরা সবাই অনুভব করি। আমরা লক্ষ করছি, প্রধানমন্ত্রী শহীদ পরিবারের সাথে দেখা করেছেন। ব্যক্তিগত উদ্যোগে তাদের সন্তানদের লেখাপড়ার ভার গ্রহণ করেছেন। এ মহৎ উদ্যোগের জন্য প্রধানমন্ত্রী অবশ্যই জাতির শ্রদ্ধা ও ভালোবাসা পাবেন। আমরা এটি দেখে খুশি হয়েছি যে, বিরোধীদলীয় নেত্রী বেগম খালেদা জিয়াও শোকসন্তপ্ত পরিবারের সাথে দেখা করেছেন। তাদের সাথে সাক্ষাৎ করেছেন। বিরোধী দলের নেত্রী ও সাবেক প্রধানমন্ত্রী বেগম খালেদা জিয়া শহীদদের কষ্ট গভীরভাবে বুঝতে পারবেন। ১৯৮১ সালের ৩০ মে এমনই এক মর্মান্তিক ঘটনায় তৎকালীন রাষ্ট্রপতি, মুক্তিযুদ্ধের সেক্টর কমান্ডার বীর উত্তম জিয়াউর রহমান মারা যান। ওই ঘটনাটাও গোটা জাতি শোকে বিহŸল হয়ে পড়েছিল। তখনো বিরোধী দলের নেত্রী আজকের শহীদ পরিবারের মতো নিঃস্ব ছিলেন। তখন বেগম জিয়া ও তার সন্তানদের নিশ্চিত ভবিষ্যতের জন্য সরকার বেশ কিছু উদ্যোগ নেয়। এর মধ্যে ছিল- ১. ক্যান্টনমেন্টের বাসভবন বসবাসের জন্য বরাদ্দ; ২. গুলশানে এক টাকা মূল্যে একটি বাড়ি প্রদান; ৩. নগদ অর্থ প্রদান; ৪. তার দুই সন্তানের শিক্ষার ব্যয়ভার রাষ্ট্র কর্তৃক বহন।

জিয়াউর রহমান পরিবার যে বিপুল রাষ্ট্রীয় আনুকূল্য ও সহায়তা পেয়েছে বাংলাদেশে অন্য কোনো রাষ্ট্রপতি, রাজনীতিবিদ বা সেনা কর্মকর্তা মৃত্যুর পর এর কানাকড়িও পাননি। সময় প্রবাহে বেগম জিয়া গৃহবধূ থেকে রাজনীতিতে এসেছেন। তিনবার প্রধানমন্ত্রী নির্বাচিত হয়েছেন। তার সেই অনিশ্চিত অর্থনৈতিক অবস্থা এখন আর নেই। তার সন্তানরাও সফল ব্যবসায়ী। জেনারেল জিয়াউর রহমানের সমসাময়িক কর্মকর্তাদের তুলনায় শিক্ষায় না হোক, বিত্তের দিক থেকে তার সন্তানরা অনেক এগিয়ে। তারা এখন বিত্তবান। তাদের এ বিত্তের প্রসার ঘটুক, আমাদের আপত্তি নেই। বেগম জিয়া আজ সচ্ছল ও স্বাচ্ছন্দ্যের জীবনযাপন করছেন। আমার বিশ্বাস, আজ শহীদ পরিবারগুলোর পাশে দাঁড়িয়ে তিনি ’৮১ তে তারা অবস্থার স্মৃতি রোমন্থন করছেন। মাননীয় বিরোধী দলের নেত্রী, তাই আপনার কাছে একটি বিনীত প্রস্তাব রাখতে চাই। আপনি বাংলাদেশে একজন জননন্দিত নেত্রী। যে দেশের ৬২ শতাংশ মানুষ ভূমিহীন সে দেশে দুটো প্রাসাদোপম বাড়ি রাষ্ট্রের কাছ থেকে গ্রহণ কি আপনার করা উচিত?

আপনার ক্যান্টনমেন্টের বাড়িটি সাড়ে ৯ বিঘার ওপর। আমরা জানি, এ বাড়িকে ঘিরে আপনার অনেক আবেগ, অনেক স্মৃতি। তাই সে স্মৃতি ধরে রাখার জন্য আমরা একটি মিউজিয়াম করতে পারি, বাকি জায়গার ওপর সেনা কল্যাণ সংস্থার সহায়তায় নির্মাণ করা যেতে পারে বহুতল অ্যাপার্টমেন্ট। এ অ্যাপার্টমেন্টগুলো বিডিআর বিদ্রোহের শহীদ পরিবারদের দেয়া যায়। এতে এ পরিবারগুলো তাদের সন্তানরা সারা জীবনের জন্য মাথা গোঁজার একটি ঠাঁই পাবে। আপনি তো জানেন, মাননীয় বিরোধী দলের নেত্রী, একটি আবাস তাদের জন্য কত প্রয়োজন। এ অ্যাপার্টমেন্ট কমপ্লেক্সের নাম হতে পারে ‘বীর উত্তম জিয়াউর রহমান কমপ্লেক্স’ এই কমপ্লেক্সের বেড়ে ওঠা শিশুরা যেমন জিয়াউর রহমানকে স্মরণ করবে, তেমনি আপনার নামও উচ্চারণ করবে গভীর শ্রদ্ধায়।

আপনি ক্যান্টনমেন্টের বাসায় নানান বিপত্তির মধ্যে বসবাস করেন। আপনি একটি বড় রাজনৈতিক দলের নেত্রী। ক্যান্টনমেন্টের বাসায় থেকে আপনার রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডের অনেক সমস্যা হয়। নেতাকর্মীরা ঠিকমতো যেতে পারেন না। নিরাপত্তার কারণে আপনার চলাচলও নিয়ন্ত্রিত হয়। আপনি গণতান্ত্রিক আন্দোলনে বেড়ে ওঠা নেত্রী, কেন এমন শৃঙ্খলিত বসবাস করবেন?

প্রিয় বিরোধী দলের নেত্রী, আজ আপনি অভাব-অনটনের স্পর্শের বাইরে। আমরা জানি, আপনি বলেন- ব্যক্তির চেয়ে দল বড়, দলের চেয়ে দেশ বড়। আর দেশের স্বার্থে, ক্যান্টনমেন্টের বাড়িটি আপনি শহীদ পরিবারের জন্য উৎসর্গ করে এক মহা দৃষ্টান্ত অনুসরণ করুন। আপনি গুলশানের বাড়িতে চলে যান। এ গরিব দেশে এরকম দু’টি বাসভবন নেয়া কি আপনাকে মানায়? এর মাধ্যমে আপনি প্রমাণ করুন, আপনি একজন বীর মুক্তিযোদ্ধার স্ত্রী, দেশের জন্য আপনি এতটুকু ত্যাগ স্বীকারে মোটেও কুণ্ঠিত নন। মাননীয় বিরোধী দলের নেত্রী, নগণ্য নাগরিকের প্রস্তাবটি আপনি ভেবে দেখবেন প্লিস।’

লেখক : নির্বাহী পরিচালক, পরিপ্রেক্ষিত

বোরহান কবীরের লেখা ছাপা হওয়ার পর সরকার দ্রুততার সাথে খালেদা জিয়াকে তার ক্যান্টনমেন্টের বাড়ি থেকে উচ্ছেদের প্রক্রিয়া শুরু করে। ৮ এপ্রিল মন্ত্রিসভার বৈঠকে ওই বাড়ির লিজ বাতিলের সিদ্ধান্ত গ্রহণ করা হয় এবং খালেদা জিয়াকে বাড়ি থেকে উচ্ছেদের জন্য ক্যান্টনমেন্ট বোর্ডকে ব্যবস্থা নিতে বলা হয়। ক্যান্টনমেন্ট বোর্ড লিজ বাতিলের আইন পর্যালোচনার পর ২০ এপ্রিল বাড়ি ছাড়ার নোটিশ দেয়। পাঁচটি শর্তভঙ্গের কারণ উল্লেখ করে ১৫ দিনের মধ্যে বাড়ি ছাড়ার নোটিশ জারি করা হয়। নোটিশের বৈধতা চ্যালেঞ্জ করে খালেদা জিয়ার পক্ষে হাইকোর্টে রিট করা হয়। হাইকোর্ট ২০১০ সালের ১৩ অক্টোবর রিটটি খারিজ করে দেন। সেই সাথে বাড়ি খালি করতে এক মাসের সময় দিতে সরকারকে আদেশ দেয়। রিট খারিজ হওয়ার পর হাইকোর্টের রায় রিভিউ করতে আপিল বিভাগে আবেদন করা হয়। কিন্তু সরকার রিভিউ আবেদন নিষ্পত্তির আগে ১২ নভেম্বর খালেদা জিয়াকে বাড়ি থেকে জোর করে বের করে দেয়। স্মরণযোগ্য যে, খালেদা জিয়ার ওই বাড়িটি ভেঙে বহুতল ভবন নির্মাণ করা হলেও সেখানে শহীদ সেনা কর্মকর্তাদের পরিবারের স্থান হয়নি। সেখানে বর্তমানে সেনাবাহিনীর চাকরিরত কর্মকর্তা ও তাদের পরিবার বসবাস করছে।