রাজনীতিতে তর্ক হবে, বিতর্ক হবে। নির্বাচন এলে তা তীব্র হবে। মাঠে তাপ-উত্তাপ বাড়বে। কিন্তু সেটা প্রাণহরণের পর্যায়ে চলে যাবে মানা যায় না। বুধবার শেরপুরের জামায়াত নেতা মাওলানা রেজাউল করিম হত্যার শিকার হলেন। এটিকে বিচ্ছিন্ন ঘটনা বলে সাইড লাইনে ফেলে রাখা যায় না।
প্রতিপক্ষকে ঘায়েল করতে দলের শীর্ষ পর্যায়ের পাল্টাপাল্টি বক্তব্য আর বিভিন্ন জেলার তৃণমূল নেতাকর্মীদের মধ্যে সঙ্ঘাত-সংঘর্ষের ঘটনায় নির্বাচনের আগেই ভোটের মাঠ ক্রমেই উত্তপ্ত করে দিয়েছে। এ নির্বাচনে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি কেমন থাকবে– এ নিয়ে বেশ আগে থেকেই উদ্বেগ ছিল। তা এখনো কাটেনি। ঢাকাসহ শহরগুলোর পাশাপাশি মফস্বল জেলাগুলোতেও বেশ উত্তেজনা রয়েছে। ঢাকা-৮ আসনে একটি যুদ্ধ যুদ্ধ ভাব। এ আসনে ১১ দলীয় জামায়াত জোটের প্রার্থী ও জাতীয় নাগরিক পার্টির মুখ্য সমন্বয়ক নাসীরুদ্দীন পাটওয়ারী। তিনি কথার গোলা ছুড়ছেন তার প্রতিপক্ষ বিএনপির প্রার্থী মির্জা আব্বাসের বিরুদ্ধে।
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে দেয়া পোস্টের জেরে শরীয়তপুরের নড়িয়ায় বিএনপি-জামায়াতের সংঘর্ষ হয়েছে। গত ক’দিনে এ ধরনের আরো কিছু ঘটনা রয়েছে। বেশির ভাগ ঘটনা বিএনপি ও জামায়াত নেতাকর্মীদের মধ্যে। নাটোর-১ লালপুর-বাগাতিপাড়া আসনে প্রতিপক্ষের বিরুদ্ধে নির্বাচনী ব্যানার পুড়িয়ে দেয়ার অভিযোগ করেছেন বিএনপি ও জামায়াত প্রার্থীরা। নড়াইলে প্রতিদ্বন্দ্বী প্রার্থীর বিরুদ্ধে নির্বাচনী কার্যালয়ে আগুন দেয়ার অভিযোগ করছেন একজন প্রার্থী। ভোলার বোরহানউদ্দিন উপজেলায় বিএনপি ও জামায়াত নেতাকর্মীদের মধ্যে সংঘর্ষে বেশ ক’জন আহত হয়েছেন। লালমনিরহাটের হাতীবান্ধায় বিএনপি ও জামায়াত কর্মী-সমর্থকদের মধ্যে সংঘর্ষে অন্তত ১৫ জন আহত হন। চুয়াডাঙ্গার আলমডাঙ্গায় বিএনপি ও জামায়াত সমর্থকদের মধ্যে সংঘর্ষে অন্তত ১৩ জন আহত হয়েছেন। ময়মনসিংহে বিএনপির প্রার্থী ও দলটির বিদ্রোহী প্রার্থীর সমর্থকদের মধ্যে হামলা ও কার্যালয় ভাঙচুর হয়েছে।
নাসীরুদ্দীন পাটওয়ারীর ডিম হামলার শিকার হওয়া নিয়ে কাঁচা-পাকা কথা মাত্রা ছাড়িয়ে যাচ্ছে। এ ঘটনায় প্রতিদ্বন্দ্বী বিএনপি প্রার্থী মির্জা আব্বাসের বিরুদ্ধে অভিযোগ তুলেছেন তিনি। অন্যদিকে জামায়াত-এনসিপি জোটের প্রার্থীর বিরুদ্ধে ‘উসকানিমূলক ও অশালীন’ বক্তব্য দেয়ার অভিযোগ এনেছে বিএনপি। সামাজিক মাধ্যমেও এ নিয়ে চলছে নানা আলোচনা। নতুন ধারার রাজনীতির কথা বললেও ভোটের মাঠে প্রতিপক্ষকে ঘায়েল করতে আবারো পুরনো ধারারই চর্চা হচ্ছে। আর দোষারোপের রাজনীতিতে ফিরবেন না– নির্বাচনে অংশ নেয়া প্রধান রাজনৈতিক দলের নেতারা অতীতে এমন কথা বললেও প্রচারণার শুরু থেকেই এর ব্যত্যয়। কেবল গালমন্দ নয়, একে অন্যের বিরুদ্ধে প্রচারণায় বাধা, নেতাকর্মীদের ওপর হামলা, হুমকিসহ নানা অভিযোগ যেমন আনছেন, তেমনি প্রতিপক্ষকে ঘায়েল করতে অতীতের নানা বিষয়ও সামনে আনছেন কেউ কেউ। নির্বাচনের প্রচার-প্রচারণা শুরুর পর থেকেই কথার লড়াইয়ে বিএনপি-জামায়াত-এনসিপিসহ কয়েকটি দল কেউ কাউকে ছেড়ে কথা বলছে না।
নানা কারণে এবারের নির্বাচনটি আকাক্সক্ষার দিক থেকে ভিন্ন মাত্রার। বহুল প্রতীক্ষা, নানা সংশয় ও অনিশ্চয়তার পর ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের আনুষ্ঠানিক প্রচার শুরু হয়েছে। প্রচারণায় প্রতিশ্রুতির বন্যা অস্বাভাবিক নয়। কে কী করবেন, তা বলবেন। ওয়াদা দেবেন। বাস্তবায়ন পরের ব্যাপার। সাধারণ মানুষও এসব ওয়াদার ওজন বুঝে। এবার গুজবের ব্যাপকতা ভয়াবহ পর্যায়ে। গুজব, মিথ্যাকে সত্য, সত্যকে মিথ্যা, এমনকি দিনকে রাত বানিয়ে ফেলার ম্যাজিক মেশিন স্বাভাবিক যাপিত জীবনকেই এরই মধ্যে বিষাক্ত করে তুলেছে। যে বা যারা এর ছোবলের শিকার হয়েছেন তারাই হাড়ে হাড়ে উপলব্ধি করছেন, এ বিষের কী যন্ত্রণা। এবারের ভোট চ্যালেঞ্জে পড়বে– এমন শঙ্কা সিইসি আরো আগেই করে রেখেছেন। স্বয়ং প্রধান উপদেষ্টাও উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন। যে যা পারছে, করছে। কে কখন কাকে টার্গেট করে এ আই দিয়ে কী বানিয়ে ছেড়ে দিচ্ছেন, রোখা যাচ্ছে না। মানুষ বিভ্রান্ত হচ্ছে, গোলমাল বাধছে; উদ্দেশ্য সাধন হয়ে যাচ্ছে মহল বিশেষের। দেশ, সরকার, নির্বাচন কমিশন, প্রার্থী, ভোটার সর্বোপরি জনগণ সবাই এ সাইবার আক্রমনের শিকার।
ভুয়া তথ্য ও বিভ্রান্তি মোকাবেলায় জাতিসঙ্ঘের মানবাধিকার কার্যালয়, ইউরোপীয় ইউনিয়নসহ আন্তর্জাতিক বিভিন্ন সংস্থার সহায়তা চেয়েছে সরকার। এ ছাড়া ভুয়া তথ্য, বিভ্রান্তিকর কনটেন্ট ও গুজব প্রতিরোধে আগামী জাতীয় নির্বাচন পর্যন্ত একটি বিশেষ সেল গঠন করেছে জাতীয় সাইবার সুরক্ষা এজেন্সি-এনসিএসএ। প্রধান উপদেষ্টার প্রেস উইং, প্রেস ইনস্টিটিউট বাংলাদেশ-পিআইবি, বাংলাদেশ সংবাদ সংস্থা-বাসস, বাংলাদেশ টেলিযোগাযোগ নিয়ন্ত্রণ কমিশন-বিটিআরসি ও আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীগুলোর সাথেও সমন্বয় করছে এনসিএসএ। নির্বাচনে ভুয়া তথ্য ও গুজব ঠেকাতে কাজ করছে পুলিশের অপরাধ তদন্ত বিভাগ সিআইডিও। আইনশৃঙ্খলা বাহিনীগুলোর সাইবার সিকিউরিটি বিভাগকে সর্বোচ্চ সতর্ক ও তৎপর থাকার নির্দেশ দেয়া হয়েছে। কিন্তু চেষ্টায় কুলাচ্ছে না। থামানো যাচ্ছে না অপতথ্য ও গুজবের স্রোত। ফ্যাক্টচেকিং প্রতিষ্ঠান রিউমার স্ক্যানারের পরিসংখ্যান বলছে, নির্বাচন যত ঘনিয়ে আসছে, গুজব ও ডিপফেক ভিডিওতে সয়লাব হচ্ছে অনলাইন। শুধু গত ডিসেম্বরেই ৪৪৬টি রাজনৈতিক ভুল তথ্য শনাক্ত করেছে প্রতিষ্ঠানটি। বছর কয়েক আগেও কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা আর্টিফিশিয়াল ইন্টেলিজেন্স-এআই ছিল দূর ভবিষ্যতের একটি কাল্পনিক বিষয়। এখন তা দৈনন্দিন জীবনের অংশ হতে চলেছে। হাতে হাতে মোবাইল। দুনিয়া ডিজিটাল। মানুষও ডিজিটাল। এর অপব্যবহার হয়ে উঠেছে নষ্টের কারণ।
আর্টিফিশিয়াল ইন্টেলিজেন্স অর্থ হচ্ছে এক কথায়– কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা। মুহূর্তের মধ্যে যেকোনো ফলাফল বা ব্যাখ্যা সহজেই লিখে দিতে পারে। এ আই এমন একটি পদ্ধতি যা মানুষের মতো অথবা কিছুক্ষেত্রে মানুষের থেকেও বেশি অগ্রিম চিন্তাভাবনা করতে সক্ষম। বিভিন্ন ক্রিটিকাল চিন্তাভাবনা ও পরিকল্পনার মাধ্যেমে, সূক্ষ্ম থেকে সূক্ষ্মতর ডাটা এ্যানালাইসিস করে উন্নত অ্যালগরিদম ব্যবহার করে ডাটা প্রসেসিং করাই মূলত এর কাজ। তাই এর প্রতি সবার আগ্রহটা অনেকটা বেশি। মানুষের ব্যক্তিগত তথ্য সংগ্রহ এবং বিশ্লেষণ করতে সক্ষম বলে এর অপব্যবহারে বিভিন্ন পক্ষ নির্বাচন সামনে রেখে বেপরোয়া হয়ে উঠেছে। ‘ডিপফেক’ ভিডিও বা ছবি তৈরির মাধ্যমে রাজনৈতিক ও সামাজিক উদ্দেশ্যে ভুল তথ্য প্রচার করা হচ্ছে। এটি নির্বাচনী প্রক্রিয়া এবং সামাজিক অস্থিরতার ক্ষেত্রে বিপজ্জনক হয়ে উঠছে। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার জন্য স্পষ্ট নীতিমালা এবং আইন তৈরি করা জরুরি, যাতে এর অপব্যবহার প্রতিরোধ করা যায়। সরকারের পাশাপাশি আন্তর্জাতিক সংস্থাগুলোকে এর নিয়ন্ত্রণের জন্য একযোগে কাজ না করলে সামনে বিপদের ঘনঘটা। সব কিছুর উপকারের পাশাপাশি কিছু অপকারও থাকে।
যুক্তরাষ্ট্র, তুরস্ক, স্লোভাকিয়া, আর্জেন্টিনা, ইন্দোনেশিয়া, ভারত, পোল্যান্ড, বুলগেরিয়া, তাইওয়ান, জাম্বিয়া, ফ্রান্সের মতো দেশের নির্বাচনগুলোতেও এর অপব্যবহার হয়েছে। বাংলাদেশের ’২৪ সালের ডামি নির্বাচনেও হয়েছে। আক্রান্ত বা ক্ষতিগ্রস্তদের তা জানতে জানতে সরকারের বিদায়ক্ষণ ঘনিয়ে আসে। যদিও ২০২৪ সালের শুরুতে এআই এত উন্নত ও সহজলভ্য ছিল না। সহজলভ্যতার কারণে এবার কী হতে পারে, সেই উৎকণ্ঠা এখন বিভিন্ন মহলে। অথচ অন্তর্বর্তীকালীন সরকার একটি শান্তিপূর্ণ, অবাধ ও সুষ্ঠু নির্বাচন নিশ্চিত করতে প্রতিশ্রুতিবদ্ধ। সরকার কি এ প্রতিশ্রুতি পূরণ করতে পারবে? প্রশ্ন ঘুরছে দেশজুড়ে। বাংলাদেশে বছরের পর বছর ধরে যে প্রতিহিংসা ও প্রতিপক্ষ নির্মূলের রাজনীতি চলছে, তা থেকে তবে বের হওয়ার আশা কি ছেড়ে দিতে হবে?
লেখক : সাংবাদিক ও কলামিস্ট



