মাসুম মুরাদাবাদী
আগস্টের শেষ সপ্তাহে ভারতের সুপ্রিম কোর্ট বাংলাভাষী মুসলমানদের বাংলাদেশী আখ্যায়িত করার কর্মসূচি প্রসঙ্গে কেন্দ্রীয় সরকারের প্রতি কয়েকটি তীর্যক প্রশ্ন করেছেন। আদালত এ বিষয়ে নারাজি প্রকাশ করে বলেছেন, শুধু ভাষার ওপর নির্ভর করে কাউকে কিভাবে বিদেশী আখ্যায়িত করা যায়? স্মরণযোগ্য, এ মুহূর্তে ভারতের কয়েকটি রাজ্যে বাংলাভাষী মুসলমানদের বাংলাদেশী অভিহিত করে হেনস্তা করা হচ্ছে। এ কর্মসূচি বিজেপিশাসিত কয়েকটি রাজ্যে চলমান, কিন্তু সবচেয়ে বেশি এর শিকার হচ্ছেন আসামের মুসলমানরা। সেখানে রাজ্য সরকার তাদের সব মৌলিক নাগরিক অধিকার থেকে বঞ্চিত করছে। আসামে এ কর্মসূচির আওতায় এখন পর্যন্ত ৫০ হাজারের বেশি মুসলমানকে উচ্ছেদ করা হয়েছে। তারা অত্যন্ত কষ্টে জীবন কাটাচ্ছেন। সম্প্রতি মানবাধিকারকর্মীদের একটি দল আসামের ওই অঞ্চলগুলো সফর করে এসেছে, যেখানে মুসলমানদের বাংলাদেশী অভিহিত করে ভয়াবহ অন্যায় ও নির্যাতনের লক্ষ্যবস্তু বানানো হচ্ছে। ওই দলে থাকা পরিকল্পনা কমিশনের সাবেক সদস্য ও মানবাধিকারের মুখপাত্র ড. সায়্যেদা সায়্যিদিন হামিদের একটি বক্তব্যকে সঙ্ঘপরিবার অতিরঞ্জন করেছে। তিনি বলেছিলেন, যদি এখানে বাংলাদেশী থাকে, তাহলে তাতে দোষের কী আছে? তারাও তো শেষ পর্যন্ত মানুষ। আল্লাহর পৃথিবী এত প্রশস্ত যে, যেকোনো মানুষ যেকোনো স্থানে থাকতে পারে। এ বক্তব্যকে অতিরঞ্জিত করে বলা হয়েছে যে, তিনি আসামে অনুপ্রবেশকারীদের সাহস জোগাচ্ছেন। অথচ তার বক্তব্য ছিল মানবিক। কে না জানেন, ভারত সরকার তার স্বার্থ ও রাজনৈতিক প্রয়োজনে এখানে বাংলাদেশীদের আশ্রয় দিয়ে থাকে। বড় দৃষ্টান্ত বাংলাদেশের সাবেক প্রধানমন্ত্রী হাসিনা ওয়াজেদ, যিনি এখানে রাজনৈতিক আশ্রয়ে বাস করছেন। এর আগে ইসলামবিদ্বেষী তসলিমা নাসরিনকেও ভারত আশ্রয় দিয়েছিল। তিনি আজো আছেন। যদি বাংলাদেশীদের প্রতি এতটা বিদ্বেষ ভাব থাকে, তাহলে প্রথমে এ দু’জনকে ভারত থেকে বের করে দেয়া উচিত।
ভারতে বাংলাভাষীদের বিরুদ্ধে অভিযানের সূচনা হয়েছে মূলত বাংলাদেশে রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর। এ ভয়ঙ্কর অভিযানের নিশানা প্রত্যেক বাংলাভাষী মুসলমান। অথচ এ কথা সবাই জানেন, পশ্চিমবঙ্গ ও আসামে বসবাসকারী অসংখ্য মুসলমান বাংলা ভাষায় কথা বলেন, বাংলা তাদের মাতৃভাষা। কিন্তু দেশের কয়েকটি রাজ্যে পশ্চিমবঙ্গের বাংলাভাষী মুসলমানদের গ্রেফতার করে সীমান্তের ওপারে ঠেলে দেয়া হয়েছে, অথচ তাদের কাছে ভারতের নাগরিকত্বের সব প্রমাণ আছে।
বাংলাদেশী নাম দিয়ে মুসলমানদের উচ্ছেদ করার সবচেয়ে বেশি অভিযান চলছে আসামে। এ অভিযান পর্যবেক্ষণ করতে ও নির্যাতিতদের সাথে সাক্ষাৎ করতে নাগরিক অধিকারের সদস্যদের প্রতিনিধিদল আসাম গিয়েছিল, যার মধ্যে বিশিষ্ট লোকজন শামিল ছিলেন। প্রতিনিধি দলে সাবেক আইএএস হর্ষ মন্দার, সুপ্রিম কোর্টের প্রখ্যাত উকিল প্রশান্ত ভূষণ, রাজ্যসভার সাবেক সদস্য জওহার সরকার, পরিকল্পনা কমিশনের সাবেক সদস্য ড. সায়্যেদা সায়্যিদিন হামিদ, সাবেক চিফ ইনফরমেশন কমিশনার ওয়াজাহাত হাবিবুল্লাহ শামিল ছিলেন। দলটি গত ২৩ ও ২৪ আগস্ট উচ্ছেদ অভিযানে ক্ষতিগ্রস্ত গোয়ালপাড়া ও কামরূপ জেলা সফর করে। প্রতিনিধিদলের সদস্যরা এক প্রেস কনফারেন্সে সবিস্তারে জানান, কিভাবে উচ্ছেদ অভিযানে বেআইনিভাবে শুধু মুসলমানদের নিশানা বানানো হচ্ছে। উকিল প্রশান্ত ভূষণ বলেন, হিমন্ত বিশ্বশর্মার সরকার আইনের কোনো পরোয়া করে না। তিনি বলেন, আমাকে জেলার আদিবাসীরা বলেছে, সরকারের মাধ্যমে খালি করা জমিগুলো বড় বড় করপোরেশনের কাছে বিক্রয় হয়েছে যে, তারা সেখানে সোলার প্রজেক্ট, সিমেন্ট ও পামওয়েল তৈরির কারখানা বানাবে। মূলত এই উদ্দেশ্যেই বাংলাভাষী মুসলমানদের টার্গেট বানানো হচ্ছে।
মুসলমানদের বাংলাদেশী অভিহিত করে উচ্ছেদের নেতৃত্ব রয়েছে আসামের মুখ্যমন্ত্রীর হাতে, যিনি চরম সাম্প্রদায়িক ও মুসলিমবিদ্বেষী।
হিমন্ত বিশ্বশর্মার বক্তব্য পর্যালোচনা করলে বোঝা যাবে, তার জীবনের একমাত্র লক্ষ্য আসামের ভূখণ্ডকে মুসলমানদের থেকে পবিত্র করা। এ কারণে তিনি মিয়াদের (মুসলমান) বিরুদ্ধে অত্যন্ত উসকানিমূলক ও ঘৃণাসূচক বক্তব্য দিয়ে থাকেন। অথচ মুখ্যমন্ত্রীর পদে অধিষ্ঠিত হওয়ার আগে তিনি শপথ নিয়েছিলেন, রাজ্যের কোনো অধিবাসীর সাথে ধর্ম, জাত-পাত বা বংশের ভিত্তিতে ভেদাভেদ করবেন না। কিন্তু তার কর্মকাণ্ডে মনে হচ্ছে, তিনি শুধু হিন্দুদের মুখ্যমন্ত্রী।
সবাই জানেন, আসামে মুসলিম জনসংখ্যা প্রায় ৪০ শতাংশ। অতীতেও আসামের মুসলমানদের অনুপ্রবেশকারী অভিহিত করে তাদের বিরুদ্ধে সহিংস অভিযান চালানো হয়েছে। আশির দশকে সেখানে নেলির মতো গণহত্যাও হয়েছে। মুখ্যমন্ত্রী শর্মার বক্তব্য থেকে অনুমান করা যায়, তিনি আসামে আবারো ওই ধরনের আগুন উসকে দিতে চাচ্ছেন। তার নোংরা মানসিকতার পরিচয় নানাভাবে পাওয়া যায়। আগস্টের তৃতীয় সপ্তাহে জমিয়তুল ওলামার প্রধান মাওলানা মাহমুদ মাদানি মুসলমানদের উচ্ছেদ অভিযানের বিরুদ্ধে বক্তব্য দিলে মুখ্যমন্ত্রী নির্লজ্জভাবে এ কথা বলেন যে, তারা যদি জমিয়তের প্রধানকে কোথাও পেয়ে যান, তাহলে তাকেও বাংলাদেশে পাঠিয়ে দেবেন। উল্লেখ্য, জমিয়ত একটি প্রস্তাব পাস করিয়ে আসামের মুখ্যমন্ত্রীকে দ্রুত অপসারণ ও বিদ্বেষমূলক বক্তব্যের জন্য তার বিরুদ্ধে ফৌজদারি ব্যবস্থা গ্রহণের দাবি করেছেন।
সাত সদস্যের ফ্যাক্ট ফাইন্ডিং টিম সব সত্য তুলে ধরেছে, কিভাবে আসামের অধিবাসীদের বাংলাদেশী আখ্যায়িত করে উচ্ছেদ করা হচ্ছে। আর বুলডোজার দিয়ে তাদের ঘরবাড়ি গুঁড়িয়ে দেয়া হচ্ছে। ফ্যাক্ট ফাইন্ডিং টিমের বক্তব্য, এমন পরিবারকেও উচ্ছেদ করা হচ্ছে, যাদের কাছে যথেষ্ট পুরনো প্রমাণপত্র রয়েছে। টিম এ বিষয়ে আদালতের নীরবতা নিয়েও প্রশ্ন তুলেছে।
টিমের বক্তব্য, গোয়ালপাড়ায় ওই দুই মাসে তিনটি স্থানে লোকদের ঘরবাড়ি ও জমিজমা থেকে উচ্ছেদ করা হয়। হাসিলায় ৬৮০ পরিবারকে এবং অশুদুবি গ্রামে এক হাজার ৮৪ পরিবারকে উচ্ছেদ করা হয়েছে। হাসিলাবিলের পরিবারগুলো তাদের জমিজমার কাগজপত্র দেখিয়েছেন, যা ১৯৪৮ সালের। ১৯৫১ সালের এনআরসি তালিকা ও ১৯৫০ সালের ভোটার তালিকাতেও তাদের নাম আছে। জেলা প্রশাসন কোনো যাচাই ছাড়াই মুসলমান পরিবারগুলোকে উচ্ছেদ করেছে। একই ঘটনা অশুদুবি গ্রামেরও। এখানে আটটি মসজিদ, দু’টি মাদরাসা, ফসলের ক্ষেত এবং তাদের গবাদিপশুকেও রেহাই দেয়া হয়নি। বাস্তবচিত্র থেকে অনুমান করা যায়, আসামের মুসলমানদের ওপর কিভাবে বিপদের পাহাড় ভেঙে পড়ছে।
লেখক : ভারতের প্রখ্যাত সাংবাদিক ও কলামিস্ট লখনৌ থেকে প্রকাশিত দৈনিক আগ, ৩০ আগস্ট, ২০২৫ হতে উর্দু থেকে ভাষান্তর ইমতিয়াজ বিন মাহতাব



