প্রসঙ্গ দক্ষতা উন্নয়ন

বর্তমান বৈশ্বিক জীবনাচার এখন যন্ত্রসভ্যতার কাছে বন্দী। জীবনের প্রতিটি কাজে আমরা যন্ত্রনির্ভর। এ ক্ষেত্রে বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে বছরের পর বছর তত্ত্ব চর্চার পদ্ধতি আমাদেরকে ক্রমেই পেছনে নিয়ে যাচ্ছে। বাস্তবভিত্তিক পাঠ ও অনুশীলন এখন সময়ের দাবি। এ দাবি অস্বীকার করার অর্থই হচ্ছে অগ্রসরমান সভ্যতার মহাসড়ক থেকে ছিটকে পড়া, সমাজ সভ্যতার অলিন্দ থেকে হারিয়ে যাওয়া।

বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর তথ্যমতে, দেশে ২০ লাখের মতো বেকার রয়েছে। এদের ৩২ শতাংশ উচ্চশিক্ষিত। এ হিসাব বলে দিচ্ছে আমাদের বিশ্ববিদ্যালয়গুলো উচ্চশিক্ষার হার বাড়াচ্ছে ঠিকই; কিন্তু জাতীয় ও বৈশ্বিক মানবসম্পদ চাহিদার মানদণ্ডে উত্তীর্ণ হতে পারছে না। দক্ষতা উন্নয়ন ও উৎপাদনশীল কর্মসংস্থানের ক্ষেত্রে বিশ্ববিদ্যালয়গুলো আশঙ্কাজনকভাবে পিছিয়ে রয়েছে। ফলে বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষা শেষে যুবকরা কেবল বেকারের সংখ্যাই বাড়াচ্ছে। প্রাসঙ্গিকভাবে উচ্চ শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোর কথা এসে যায়। দেশে বর্তমানে ১৭০টির বেশি বিশ্ববিদ্যালয় আছে। আছে জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের অধীন ৮০০ কলেজে স্নাতকোত্তর শিক্ষার সুযোগ। ৬৫টি পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের পাশাপাশি আছে ১১৫টি বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়। লক্ষণীয় যে, ৬১টি বিশ্ববিদ্যালয়েরই অবস্থান ঢাকায়। ফলে উচ্চশিক্ষা মূলত ঢাকাকেন্দ্রিক হয়ে পড়েছে। এর ফলে সঙ্গত কারণেই উচ্চশিক্ষা সাধারণ মধ্যবিত্তের নাগালের বাইরে চলে যাচ্ছে।

বেশির ভাগ বেসরকারি এবং ক্ষেত্রবিশেষে পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ে যেসব বিষয়ে পড়ানো হয় তা জাতীয় এবং বৈশ্বিক চাহিদার ন্যূনতম সূচকও পূরণ করতে পারে না। ফলে সরকারি অফিসারদের ইংরেজি শেখার জন্য বিদেশে পাঠানোর কথা ভাবতে হয় সরকারকে। প্রাথমিক এবং মাধ্যমিক শিক্ষাপর্যায়ে শিক্ষকদের জন্য অনেক প্রশিক্ষণ প্রতিষ্ঠান থাকার পরও তাদের নতুন করে ইংরেজি শিক্ষার প্রশিক্ষণ দেয়ার কথা উঠেছে। এ ক্ষেত্রে একটি ঘটনার উল্লেখ অপ্রাসঙ্গিক হবে না। আমি নিজে একটি ইন্টারভিউ বোর্ডে ইংরেজিতে প্রথম শ্রেণী পাওয়া একজন প্রার্থীকে বলেছিলাম, ‘Present yourself in English.’ প্রার্থী ফ্যাল ফ্যাল করে তাকিয়ে থাকায় তাকে বললাম, তুমি ইংরেজিতে নিজের পরিচয় দাও। প্রার্থীর জবাব শুনে ইন্টারভিউ বোর্ডের সদস্যদের চোখ কপালে। তার জবাব ছিল, স্যার বাংলায় বললে হয় না? ঘটনাটির উল্লেখ করলাম বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়াশুনার মান বোঝাতে। এই যখন বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার মান তখন উচ্চশিক্ষিত বেকারের সংখ্যা বাড়ানোর জন্য নতুন বিশ্ববিদ্যালয় স্থাপনের প্রয়োজন কতটুকু ভাবা দরকার।

মানবসম্পদ উন্নয়ন ও কর্মদক্ষতা বৃদ্ধির লক্ষ্যে পেশাভিত্তিক শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান আছে ১১০টি, মেরিন ইনস্টিটিউট আছে ছয়টি। এর মধ্যে ২০২৬ সাল পর্যন্ত স্থাপিত হয়েছে ৪০টি। প্রশিক্ষণ যন্ত্রপাতির অপ্রতুলতা, শিক্ষকের ঘাটতি, মেশিন চালক এবং অন্যান্য সহযোগী পদে নিয়োগদানে স্থবিরতা, সর্বোপরি প্রয়োজনীয় অর্থ বরাদ্দের সমস্যা- সবমিলিয়ে এই প্রতিষ্ঠানগুলোর এখন রুগ্ণদশা। যে সুদূরপ্রসারী লক্ষ্য নিয়ে প্রতিষ্ঠানগুলোর প্রস্তাবনা এবং সূচনা করা হয়েছিল তা শুরুতেই মুখ থুবড়ে পড়েছে প্রয়োজনীয় অবকাঠামো, জনবল, অর্থবল এবং কারিগরি প্রযুক্তির অভাবে। এসব প্রতিষ্ঠানের লক্ষ্য বাস্তবায়িত হলে বেকার যুবশক্তির সংখ্যা বেশ কিছুটা কমার সম্ভাবনা তৈরির সাথে সাথে দেশের বাইরেও কর্মসৃজনের সুযোগ তৈরি হতো। সৃষ্টি হতো বৈদেশিক মুদ্রা আহরণের নতুন সুযোগ। বর্তমান যে ৪০টি কারিগরি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান কার্যক্রম চালিয়ে যাচ্ছে সেগুলোর বাস্তব চিত্রের বিপরীতে আরো ৫০টি নতুন কারিগরি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের অনুমোদন দেয়া হয়েছে। এর ফলে এসব প্রতিষ্ঠান কাগুজে প্রতিষ্ঠানে পরিণত হওয়ার আশঙ্কা অমূলক নয়।

কারিগরি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান মূলত স্বনির্ভর-কর্মক্ষম জনশক্তি তৈরির উদ্দেশ্যে প্রতিষ্ঠা করা হয়। প্রয়োজনীয় শিক্ষা অবকাঠামো, জনশক্তি এবং কারিগরি সুবিধা ছাড়া এসব প্রতিষ্ঠানে যারা পড়াশুনা করবেন তারাও নিঃসন্দেহে নতুন করে বেকারের খাতায় নাম লেখাবেন। এরা কোনোভাবে বিদেশে পাড়ি দিলে সেখানেও দেশের মর্যাদা কতটুকু রক্ষা করতে পারবেন এটা ভাবার অবকাশ অবশ্যই আছে। শুধু নতুন নতুন দৃষ্টিনন্দন স্থাপনা তৈরি করে অধ্যক্ষ, উপাধ্যক্ষ নিয়োগ দিয়ে ছাত্রছাত্রী ভর্তি করানোতে রাজনৈতিক সুবিধা পাওয়া যাবে ঠিকই; কিন্তু কর্মসৃজনের উদ্দেশ্য অপূর্ণই থেকে যাবে। শিক্ষিত বেকার জনশক্তির তালিকা ক্রমেই বাড়তে থাকবে।

জাতীয় ও বৈশ্বিক প্রয়োজনের নিরিখে নতুন করে সর্বস্তরে শিক্ষানীতির পুনর্বিন্যাসের প্রয়োজন। বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশনকে এ ক্ষেত্রে সাংগঠনিকভাবে আরো সক্রিয় এবং শক্তিশালী করা সময়ের দাবি। শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে রাজনৈতিক বিবেচনার পরিবর্তে মেধার ভিত্তিতে শিক্ষক নিয়োগ করা প্রয়োজন। না হলে শিক্ষার মান যে তিমিরে আছে, সে তিমিরেই থেকে যাবে। নৈতিক সচেতনতা ও মেধার সদ্ব্যবহারের মাধ্যমে উন্নত বৈষয়িক মানবসম্পদ তৈরির অভিযাত্রায় আমাদের অবস্থান সুদৃঢ় করতে না পারলে উচ্চশিক্ষার উদ্দেশ্য কোনোভাবেই দেশ ও জাতির কল্যাণে আসবে না। ব্যর্থ হবে সভ্যতা বিনির্মাণে আমাদের অংশগ্রহণ। বর্তমান বৈশ্বিক জীবনাচার এখন যন্ত্রসভ্যতার কাছে বন্দী। জীবনের প্রতিটি কাজে আমরা যন্ত্রনির্ভর। এ ক্ষেত্রে বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে বছরের পর বছর তত্ত্ব চর্চার পদ্ধতি আমাদেরকে ক্রমেই পেছনে নিয়ে যাচ্ছে। বাস্তবভিত্তিক পাঠ ও অনুশীলন এখন সময়ের দাবি। এ দাবি অস্বীকার করার অর্থই হচ্ছে অগ্রসরমান সভ্যতার মহাসড়ক থেকে ছিটকে পড়া, সমাজ সভ্যতার অলিন্দ থেকে হারিয়ে যাওয়া।

লেখক : চক্ষুরোগ বিশেষজ্ঞ