রাজনীতিবিদ ও সাংবাদিকদের মধ্যে বন্ধুত্ব বেশ কঠিন। তবে সাংবাদিক ও কূটনীতিবিদদের মধ্যে বন্ধুত্ব তেমন কঠিন নয়। এ বন্ধুত্বের মধ্যে জটিলতা ওই সময় দেখা দেয়, যখন সাংবাদিক সংবাদের পেছনে ছোটাছুটি বাদ দিয়ে কারো দূত হয়ে যায়, তখন তিনি আর সাংবাদিক থাকেন না। সে দিন সন্ধ্যায় এক বিদেশী রাষ্ট্রদূত আমার কাছে জানতে চাইলেন, পাকিস্তানের সাংবাদিকদের কাছে সংবাদ কম এবং গুজব বেশি থাকে। এর কারণ কী? আমি রাষ্ট্রদূতের সাথে শিষ্টাচারিতামূলক দ্বিমত পোষণ করে বললাম, সাংবাদিকদের কাছে আজও সংবাদের কোনো ঘাটতি নেই; কিন্তু তারা আপনার সাথে আসল সংবাদ শেয়ার করেন না এবং আপনাকে এদিক-ওদিকের গুজব শুনিয়ে কাজ সেরে নেন।
কারণ হচ্ছে সাংবাদিক ও কূটনীতিকদের মধ্যে আস্থার সঙ্কট তৈরি হয়েছে। এটি এমন এক ইস্যু, যা নিয়ে বিগত দিনগুলোতে কয়েকজন বিদেশী রাষ্ট্রদূতের সাথে আমার আলোচনা হয়েছে। অনেক পাকিস্তানি সাংবাদিকের অভিযোগ রয়েছে, তারা কোনো কূটনীতিকের সাথে অব দ্য রেকর্ড কথাবার্তায় কোন কথা বলেছেন এবং পরের দিনই এ কথা সেখানে পৌঁছে গেছে, যেখান থেকে সাংবাদিকদের জন্য কিছু জটিলতা তৈরি হয়। এমনও হয়েছে যে, কোনো সাংবাদিক কোনো কথা বলেনইনি; কিন্তু তার নামে কোনো ভ্রান্ত কথা যোগ করে দেয়া হয়েছে। এখানে ভ্রান্তিটা কোনো কূটনীতিক করেননি; বরং ওই অনুষ্ঠানে উপস্থিত অন্য সাংবাদিকরা করেছেন, যারা একাধিক সংস্থার জন্য রিপোর্ট করেন। যে কূটনীতিকের সাথে এ আলোচনা হচ্ছিল, এখন তার চাকরি ঝুঁকিতে রয়েছে।
ওই ভদ্রলোক বেশ কিছু দিন আগে তার সরকারকে বলেছিলেন, পাকিস্তান গাজায় শান্তি প্রতিষ্ঠার জন্য বাহিনী পাঠাবে। ওই কূটনীতিকের সোর্স ছিল একজন পাকিস্তানি সাংবাদিক, যাকে তিনি সরকারের খুব ঘনিষ্ঠ মনে করতেন। পাকিস্তানের উপপ্রধানমন্ত্রী ইসহাক দার যখন এটি স্পষ্ট করে বললেন, পাকিস্তান হামাসকে নিরস্ত্র করতে তার সেনাবাহিনী গাজায় প্রেরণ করবে না, তখন এ কূটনীতিক উদ্বিগ্ন হয়ে পড়েন। তিনি তার সোর্সকে জিজ্ঞাসা করেন, আপনার সংবাদটা ভুল হলো কেন? সোর্স জানালেন, তিনি তো এ সংবাদ সোশ্যাল মিডিয়ায় পড়েছিলেন। সোশ্যাল মিডিয়ায় ফেক নিউজ ও ফেক ভিডিওর আগ্রাসন অনেক সচেতন ব্যক্তিকে সোশ্যাল মিডিয়া থেকে দূরে সরাতে শুরু করেছে। সোশ্যাল মিডিয়া বলেছিল, ট্রাম্প ভেনিজুয়েলার পর ইরানে আক্রমণ করবে এবং পাকিস্তান ইরানে হামলার জন্য আমেরিকাকে ঘাঁটি দেবে।
৬ জানুয়ারি জাতিসঙ্ঘে পাকিস্তান ভেনিজুয়েলার বিরুদ্ধে ট্রাম্পের অভিযানের নিন্দা জানিয়ে আবারো সোশ্যাল মিডিয়াকে ভুল প্রমাণিত করেছে। ভেনিজুয়েলায় ট্রাম্প যা করলেন, তা পুরো বিশ্বকে কাঁপিয়ে দিয়েছে। এখন যদি রুশ প্রেসিডেন্ট পুতিনের নির্দেশে ইউক্রেনের প্রেসিডেন্ট জেলেনস্কিকে কোথাও থেকে অপহরণ করে মস্কো নিয়ে আসা হয়, তাহলে ট্রাম্প কী করবেন? ভারতের পার্লামেন্টের মুসলমান সদস্য আসাদুদ্দিন ওয়াইসি তার প্রধানমন্ত্রী মোদির কাছে দাবি করেছেন, যেভাবে ট্রাম্প ভেনিজুয়েলার প্রেসিডেন্টকে অপহরণ করে নিউ ইয়র্ক নিয়ে গেছেন, আপনি ভারতে হামলার কথিত অভিযুক্তদের পাকিস্তান থেকে অপহরণ করে দিল্লিতে কেন নিয়ে আসছেন না? ওয়াইসি অল ইন্ডিয়া মজলিসে ইত্তেহাদুল মুসলিমিন দলের প্রধান। পাকিস্তান গঠনের বহু বছর আগে কায়েদে আজমের সঙ্গী নওয়াব বাহাদুর ইয়ারজঙ্গ এ সংগঠন প্রতিষ্ঠা করেন। এ সংগঠন হায়দরাবাদের ডেকানের মুসলমানদের সামাজিক কল্যাণ ও উন্নয়নের দায়িত্বে নিয়োজিত ছিল। কিন্তু নওয়াব বাহাদুরের মৃত্যুর পর সংগঠনটি রাজনৈতিক প্ল্যাটফর্মে বদলে যায়।
বর্তমানে আসাদুদ্দিন ওয়াইসি এ প্ল্যাটফর্ম থেকে নিজেকে ভারতের প্রতি নিজের আনুগত্য প্রমাণ করতে এমন সব বক্তব্য দেন যে, কখনো হাসি পায়, কখনো তার প্রতি করুণা হয়। একটি বিদেশী গণমাধ্যম আমাকে জিজ্ঞাসা করেছে, আসাদুদ্দিন ওয়াইসির বক্তব্যের পর আপনি কি আরো একটি পাক-ভারত যুদ্ধের ঝুঁকি দেখছেন না? আমি জবাবে বললাম, ঝুঁকিতে তো ওয়াইসি নজরে আসছে। আইএসপিআরের ডিজি লেফট্যানেন্ট জেনারেল আহমদ শরিফ তো স্পষ্ট বাক্যে বলে দিয়েছেন, আজকাল ভারতের মিডিয়ায় এ দাবি করা হচ্ছে, ২০২৬ সালে ভারত ও আফগানিস্তান থেকে পাকিস্তানের ওপর যৌথ হামলা করা হবে এবং পাকিস্তান হামলাকারীকে উচিত শিক্ষা দিতে প্রস্তুত আছে। আইএসপিআরের ডিজি আফগান তালেবানের ব্যাপারে এমন ভাষা ও ভঙ্গি ব্যবহার করার পর এক আফগান সাংবাদিক আমাকে প্রশ্ন করেছিলেন, পাকিস্তান আফগান নেতাদেরকে হেলিকপ্টারের মাধ্যমে অপহরণ করার কোনো পরিকল্পনা করেনি তো? আমি বললাম, এ কেমন কথা বলছেন? আফগান সাংবাদিক বললেন, আফগান তালেবানবিরোধী নেতা ও আহমদ শাহ মাসউদের ছেলে আহমদ মাসউদ রীতিমতো বক্তব্য দিয়েছেন, যেভাবে ট্রাম্প ভেনিজুয়েলার প্রেসিডেন্টকে অপহরণ করেছেন, পাকিস্তানও আফগান তালেবান নেতা মোল্লা হায়বাতুল্লাহকে কান্দাহার থেকে অপহরণ করে নিয়ে যাবে। এ বক্তব্য ছিল বিস্ময়কর।
আফগান সাংবাদিক জিজ্ঞাসা করলেন, যদি পাকিস্তান বাহিনী অভিযান চালিয়ে আফগান তালেবানের নেতাদের শেষ করে দেয়, তাহলে কি পাকিস্তানের সমস্যার সমাধান হয়ে যাবে? কাবুলে কি একটি পাকিস্তানপন্থী সরকার গঠন হবে? আমি তাকে প্রশ্ন করলাম, যদি কাবুল থেকে তালেবানের শাসন শেষ হয়ে যায় তাহলে কী হবে? তিনি জবাবে বললেন, উত্তর আফগানিস্তান আহমদ মাসউদ ও আবদুর রশিদ দোস্তামের সমর্থকদের হাতে চলে যাবে। পূর্ব আফগানিস্তানে কোথাও তালেবান, কোথাও আইএসের আধিপত্য প্রতিষ্ঠা হবে। আর কাবুলে গৃহযুদ্ধ শুরু হবে।
২০১৩ সালে আবু বকর আল-বাগদাদি ইরাক ও সিরিয়ায় আইএস প্রতিষ্ঠা করেছিলেন। ২০১৫ সালে তালেবানের অন্যতম বিদ্রোহী নেতা হাফেজ সাইদ ওরাকজাই পাকিস্তান ও আফগানিস্তানে আইএসের শাখা প্রতিষ্ঠা করেন। আইএস ও তালেবান ২০১৫ সাল থেকে একে অন্যের ওপর হামলা করছে। আইএসের পক্ষ থেকে আফগান তালেবানকে পাকিস্তানের এজেন্ট বলা হতো। আর এখন পাকিস্তান সরকার আফগান তালেবানকে ভারতের এজেন্ট বলছে। ইরান সরকার আইএসকে ইসরাইলের তৈরি মনে করে; কেননা আইএসের যোদ্ধারা ইসরাইলের বিরুদ্ধে লড়াই বাদ দিয়ে ইরান ও আফগানিস্তানের দিকে এগোচ্ছে। গাজা নিয়ে আইএসের ভাবনা নেই। পাকিস্তান আইএসের অন্যতম কমান্ডার মুহাম্মদ শরিফুল্লাহকে গ্রেফতার করে গত বছর আমেরিকার হাতে তুলে দিয়েছিল।
সম্প্রতি আইএসের আরো এক আফগান নেতা সুলতান আজিজ আজ্জাম পাকিস্তানে গ্রেফতার হয়েছেন। তিনি তার ‘সেদায়ে খেলাফত’ রেডিওতে আফগান তালেবানকে ভণ্ড বলে অভিহিত করতেন এবং আফগানদের পাশাপাশি পাকিস্তানিদেরও নিজ নিজ রাষ্ট্রের বিরুদ্ধে বিদ্রোহে উসকানি দিতেন। পাকিস্তানের উচিত, সুলতান আজিজ আজ্জামের বিষয়ে তদন্তের বিস্তারিত তথ্য প্রকাশ করা, যাতে জানা যায় আইএসের আসল মাস্টারমাইন্ড ইসরাইল নাকি অন্য কোনো পশ্চিমা দেশ। পাকিস্তানসহ এ অঞ্চলের সব দেশকে আফগানিস্তানের ব্যাপারে একটি যৌথ কৌশল নিতে হবে। আফগান তালেবানকেও প্রমাণ করতে হবে, তারা ভারতের নিয়ন্ত্রণে নেই। তা না হলে তাদের অবস্থা খুব খারাপ হতে পারে। অন্য দিকে পাকিস্তানকেও ভাবতে হবে, যদি আফগানিস্তান থেকে তালেবানের নিয়ন্ত্রণ শেষ হয়ে যায়, তাহলে কী হবে? আবার কি গৃহযুদ্ধ শুরু হবে, লাখ লাখ শরণার্থী পাকিস্তানে ছুটে আসবে?
পাকিস্তানের জাতীয় পত্রিকা দৈনিক জং ৮ জানুয়ারি, ২০২৬ হতে উর্দু থেকে ভাষান্তর ইমতিয়াজ বিন মাহতাব
হামিদ মীর : পাকিস্তানের প্রখ্যাত সাংবাদিক ও কলামিস্ট



