বাংলা নববর্ষ নিছক বছরের শুরু নয়

বাংলা নববর্ষ কেবল পঞ্জিকার একটি নতুন পাতা ওল্টানো বা পুরনো হিসাব চুকিয়ে ফেলার নাম নয়; এটি বাঙালির হাজার বছরের ইতিহাস, অবিরাম সংগ্রাম, সংস্কৃতি, অর্থনীতি এবং রাজনৈতিক চেতনার এক অসামান্য ও নিরবচ্ছিন্ন প্রবাহ। সময়ের সাথে সাথে যুগের প্রয়োজনে এর বাহ্যিক রূপ, কাঠামো ও উদযাপনের মাত্রায় পরিবর্তন এলেও এর অন্তর্নিহিত অসাম্প্রদায়িক, সাম্যবাদী ও মানবিক চেতনা অপরিবর্তিত রয়েছে। এটি আমাদের অতীত ইতিহাসের বঞ্চনা ও সংগ্রামের সাথে বর্তমানের প্রাপ্তিকে যুক্ত করে এবং ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য একটি আত্মমর্যাদাশীল, মানবিক ও নৈতিক রাষ্ট্র গঠনের অমসৃণ পথে এগিয়ে যাওয়ার অফুরন্ত প্রেরণা জোগায়। শুভ নববর্ষ কেবল একটি অভিবাদন নয়, এটি একটি জাতির সম্মিলিত পুনর্জাগরণের চিরন্তন স্লোগান

বাংলা নববর্ষ বা পয়লা বৈশাখ বাঙালির জাতীয় জীবনে নিছক একটি বর্ষপঞ্জির সূচনা বা একটি গতানুগতিক বার্ষিক আনন্দোৎসব নয়; এটি সুদীর্ঘ ঐতিহাসিক, রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক ও মনস্তাত্ত্বিক বিবর্তনের এক অপূর্ব ফসল। একটি রাষ্ট্রের বা জাতির প্রকৃত শক্তি কেবল তার ভৌগোলিক সীমানা, সামরিক সক্ষমতা বা অর্থনৈতিক মাপকাঠির মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকে না; বরং এর সত্যিকারের ভিত্তি নিহিত থাকে তার জনগণের গভীর সাংস্কৃতিক শেকড় এবং সামষ্টিক মূল্যবোধের ওপর। চতুর্দশ শতাব্দীর প্রখ্যাত সমাজবিজ্ঞানী ও মধ্যযুগীয় মনীষী ইবনে খালদুন তার কালজয়ী ‘আল মুকাদ্দিমা’ গ্রন্থে ‘আসাবিয়্যা’ বা সামাজিক সংহতির যে ধারণাটি উপস্থাপন করেছেন, সমাজতাত্ত্বিক দৃষ্টিকোণ থেকে বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, বাংলা নববর্ষ যেন বাঙালির সেই ‘আসাবিয়্যা’ বা সামাজিক সংহতি নির্মাণের সবচেয়ে শক্তিশালী ও অসাম্প্রদায়িক হাতিয়ার। অর্থনীতি, কৃষি, রাজনীতি, সংস্কৃতি এবং সর্বোপরি বাঙালি জাতিসত্তার গভীরতম শেকড়ের সাথে এটি এমনভাবে মিশে আছে যে, এর উৎপত্তি ও ক্রমবিকাশকে কোনো একক সময়, নির্দিষ্ট শাসক বা বিচ্ছিন্ন ঘটনার পরিণতি হিসেবে দেখার সুযোগ নেই। বরং এটি বহু শতাব্দী ধরে গড়ে ওঠা বাঙালির মনস্তাত্ত্বিক রূপান্তরের এক জীবন্ত দলিল।

বাংলা নববর্ষের উৎপত্তির ইতিহাস অনুসন্ধান করতে গেলে বহুমুখী মতভেদ লক্ষ করা যায়। প্রচলিত ও বহুল পঠিত ইতিহাস অনুযায়ী, মুঘল সম্রাট জালালউদ্দিন মুহাম্মদ আকবর বাংলা সনের প্রবর্তক। ইতিহাসবিদ শামসুজ্জামান খান এবং নীতিশ সেনগুপ্তসহ বরেণ্য গবেষকদের মতে, এই ধারণাটি একমাত্রিক এবং অসম্পূর্ণ। বাংলা পঞ্জিকার শেকড় যে প্রাক-মুঘল যুগে, বিশেষ করে বাংলার স্বাধীন সুলতানি আমল বা তারও আগে পাল ও সেন যুগে বিস্তৃত ছিল, তার নানাবিধ প্রমাণ পাওয়া যায়। প্রাচীনকালে এই ভূখণ্ডে সৌরভিত্তিক পঞ্জিকার ব্যবহার এবং বিভিন্ন প্রাচীন লিপিতে ‘বাংলাব্দ’ বা ‘বঙ্গাব্দ’ শব্দের ঐতিহাসিক উপস্থিতি এই ধারণাকেই শক্তিশালী করে। মুঘল শাসনামলে মূলত রাজস্ব আদায় হতো হিজরি চান্দ্রসনের ভিত্তিতে। কিন্তু বদ্বীপ অঞ্চলের কৃষিনির্ভর অর্থনীতির সাথে চান্দ্র মাসের কোনো সামঞ্জস্য ছিল না। চান্দ্রসন সৌরসন অপেক্ষা ১১ দিন ছোট হওয়ায়, ফসল বোনা ও কাটার সময়ের সাথে কর আদায়ের সময়ের বিরাট ফারাক তৈরি হতো। অসময়ে রাজস্ব দিতে গিয়ে বাংলার কৃষকরা শোষণের শিকার হতেন।

এই কাঠামোগত ও চরম প্রশাসনিক সমস্যার সমাধানে সম্রাট আকবর একটি বিজ্ঞানসম্মত বর্ষপঞ্জি প্রবর্তনের উদ্যোগ গ্রহণ করেন। তার নির্দেশে রাজদরবারের প্রখ্যাত জ্যোতির্বিদ আমির ফতুল্লাহ শিরাজী সৌর ও চান্দ্র পদ্ধতির এক অভাবনীয় সমন্বয়ে ১৫৮৪ সালে একটি নতুন বর্ষপঞ্জি প্রণয়ন করেন, যা সম্রাট আকবরের সিংহাসনে আরোহণের বছর ১৫৫৬ সাল থেকে কার্যকর ধরা হয়। এই নতুন বর্ষপঞ্জিটি প্রথমে ‘ফসলি সন’ এবং কালক্রমে ‘বঙ্গাব্দ’ বা বাংলা সন নামে পরিচিতি লাভ করে। ইতিহাসবিদ এরিক হবসবাম তার ‘উদ্ভাবিত’ ঐতিহ্য ধারণার মাধ্যমে দেখিয়েছেন যে, অনেক ঐতিহ্যই আধুনিক বা মধ্যযুগীয় সময়ে রাষ্ট্রীয় প্রয়োজনে নতুন করে নির্মিত বা পুনর্গঠিত হয়। সম্রাট আকবরের এই যুগান্তকারী পঞ্জিকা সংস্কার হবসবামের তত্ত্বের একটি উৎকৃষ্ট উদাহরণ, যেখানে প্রাচীন বাংলার আবহমান কৃষি সংস্কৃতি ও সৌর হিসাবের সাথে মুঘল সাম্রাজ্যের সুদূরপ্রসারী প্রশাসনিক প্রয়োজন সুনিপুণভাবে একত্রিত হয়েছিল।

বাংলা নববর্ষের প্রাথমিক চরিত্র ছিল সম্পূর্ণ অর্থনৈতিক এবং কৃষিনির্ভর। বদ্বীপের বহমান নদী, পলিময় প্রকৃতি এবং মৌসুমি বায়ুর ওপর নির্ভরশীল এই গ্রামীণ সমাজে চৈত্র মাসের শেষে ফসল তোলার পরই শুরু হতো নতুন অর্থবছর। এই অর্থনৈতিক প্রেক্ষাপটে ‘হালখাতা’ এবং ‘পুণ্যাহ’ ছিল দু’টি অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ গ্রামীণ রীতি। হালখাতা কেবল পুরনো হিসাব বন্ধ করে নতুন খাতা খোলার যান্ত্রিক বা গাণিতিক প্রক্রিয়া ছিল না; সমাজতাত্ত্বিক দৃষ্টিকোণ থেকে এটি ছিল সামাজিক সম্পর্ক পুনর্গঠন এবং ‘প্রাতিষ্ঠানিক আস্থা’ নির্মাণের একটি প্রতীকী আয়োজন। কৃষক, জমিদার, ক্রেতা ও বিক্রেতার মধ্যে নতুন করে আস্থা, পারস্পরিক নির্ভরতা ও সম্পর্ক স্থাপনের মধ্য দিয়ে এটি গ্রামীণ অর্থনীতিতে একধরনের সামাজিক বন্ধনকে দৃঢ় করত। চিন্তাবিদ আহমদ ছফা তার ‘বাঙালি মুসলমানের মন’ গ্রন্থে এবং ক্ষুরধার চিন্তক আহমদ শরীফ বাঙালির মনস্তাত্ত্বিক যে দ্বৈততার কথা উল্লেখ করেছেন-যেখানে চরম স্বার্থপরতা ও গভীর পরোপকারিতা পাশাপাশি অবস্থান করে। হালখাতা ও বৈশাখী উৎসব যেন বাঙালির ভেতরের সেই ব্যক্তিকেন্দ্রিক স্বার্থপরতাকে ছাপিয়ে সামষ্টিক আস্থার জায়গাটিকে প্রশস্ত করার একটি বার্ষিক সুযোগ তৈরি করে দিত।

ব্রিটিশ ঔপনিবেশিক শাসনামলে রাষ্ট্রীয় ও প্রশাসনিক কার্যক্রমে ইংরেজি ক্যালেন্ডারের (গ্রেগরীয় বর্ষপঞ্জি) একক আধিপত্য প্রতিষ্ঠিত হওয়ার ফলে বাংলা নববর্ষ তার রাষ্ট্রীয় ও প্রশাসনিক গুরুত্ব হারাতে থাকে। প্রশাসনিকভাবে চরম অবহেলিত হলেও, গ্রামীণ সমাজে এর শিকড় এতটাই গভীরে প্রোথিত ছিল যে, এর ঐতিহ্য অটুট থাকে। রাষ্ট্রীয় পৃষ্ঠপোষকতাহীন সেই উপনিবেশিক কালেই পয়লা বৈশাখ ধীরে ধীরে একটি নিছক অর্থনৈতিক হিসাব-নিকাশের দিন থেকে বৃহত্তর সামষ্টিক সাংস্কৃতিক উৎসবে রূপ নিতে শুরু করে। লোকজমেলা, হালখাতা, পিঠাপুলি, পুতুলনাচ, নাগরদোলা, লাঠিখেলা, ষাঁড়ের লড়াই ও বলিখেলার মতো গ্রামীণ উৎসবের মাধ্যমে এটি সামষ্টিক আনন্দের সর্বজনীন দিনে পরিণত হয়। এটি প্রমাণ করে যে, রাষ্ট্রীয় কাঠামো থেকে কোনো প্রথাকে দূরে সরিয়ে দিলেও, তা যদি জনমানুষের জীবনের সাথে মিশে থাকে, তার নিজস্ব শক্তিই তাকে টিকিয়ে রাখে।

বাংলাদেশে পয়লা বৈশাখ রাজনৈতিক প্রতিবাদী চরিত্র হয়ে উঠেছে। ১৯৮০-এর দশকে বাংলাদেশে যখন সামরিক স্বৈরাচার জেঁকে বসেছিল, তখন স্বৈরাচারবিরোধী আন্দোলনের উত্তাল সময়ে বৈশাখ হাজির হয়েছিল প্রতিবাদী চরিত্র নিয়ে। এটি ছিল সমাজের অশুভ শক্তি, স্বৈরাচার, বৈষম্য এবং দুর্নীতির বিরুদ্ধে সাধারণ মানুষের শৈল্পিক ও নৈতিক প্রতিবাদ। সময়ের পরিক্রমায় নববর্ষ হয়ে ওঠে অশুভকে তাড়িয়ে শুভকে বরণের প্রতীক। ২০১৬ সালে ইউনেস্কো পয়লা বৈশাখ নববর্ষ উদযাপনকে ‘মানবতার অমূর্ত সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য’ হিসেবে স্বীকৃতি প্রদান করে, যা বাঙালির এই প্রতিবাদী উৎসবকে আন্তর্জাতিক মর্যাদায় আসীন করে। স্বাধীন বাংলাদেশে বাংলা বর্ষপঞ্জিকে আধুনিক ও বিজ্ঞানসম্মত করার ক্ষেত্রেও প্রাতিষ্ঠানিক পদক্ষেপ নেয়া হয়। ১৯৬৬ সালে প্রখ্যাত ভাষাবিদ ড. মুহম্মদ শহীদুল্লাহ-এর নেতৃত্বে গঠিত বাংলা একাডেমি পঞ্জিকা সংস্কার কমিটির সুপারিশ অনুযায়ী বাংলা মাসগুলোর দিনসংখ্যা সুনির্দিষ্ট করা হয়। পরবর্তী সময়ে বাংলাদেশ সরকার এই সংস্কার আনুষ্ঠানিকভাবে গ্রহণ করে। এর ফলেই বর্তমানে প্রতি বছর ১৪ এপ্রিল নির্দিষ্টভাবে পয়লা বৈশাখ উদযাপিত হয়, যা জাতীয় জীবনে শৃঙ্খলা ও ধারাবাহিকতা বজায় রাখতে সাহায্য করছে।

বর্তমানে বাংলা নববর্ষ একটি বহুমাত্রিক, বর্ণিল ও সর্বজনীন সাংস্কৃতিক উৎসব, যা গ্রাম ও শহরের মেলবন্ধন ঘটিয়েছে। গ্রামে এটি আজও আংশিকভাবে কৃষি ও লোকজ ঐতিহ্যের সাথে যুক্ত, আর শহরে এটি নান্দনিকতা, শেকড়ের সন্ধান এবং সাংস্কৃতিক প্রকাশের মাধ্যমে উদযাপিত হয়। রমনা বটমূলের প্রভাতী আয়োজন, মঙ্গল শোভাযাত্রা, বৈশাখীমেলা, পান্তা-ইলিশ-সবমিলিয়ে এটি নাগরিক জীবনে এক সমন্বিত সাংস্কৃতিক অভিজ্ঞতা প্রদান করে। প্রখ্যাত রাজনৈতিক তাত্ত্বিক বেনেডিক্ট অ্যান্ডারসন তার আলোড়ন সৃষ্টিকারী গ্রন্থ ওসধমরহবফ ঈড়সসঁহরঃরবং-এ আধুনিক জাতিকে একটি ‘কল্পিত সম্প্রদায়’ হিসেবে ব্যাখ্যা করেছেন। পয়লা বৈশাখে বাংলার এই কল্পিত সম্প্রদায় যেন একটি বাস্তব, দৃশ্যমান ও স্পন্দনশীল অনুভূতিতে রূপ নেয়। এই একটি দিনে টেকনাফ থেকে তেঁতুলিয়া পর্যন্ত কোটি কোটি বাঙালি একই সাজে, একই আবেগে এবং অভিন্ন সাংস্কৃতিক চেতনায় যুক্ত হয়ে নিজেদের একটি অভিন্ন সত্তা হিসেবে অনুভব করে।

বাংলাদেশের সাম্প্রতিক সমাজতাত্ত্বিক ও রাজনৈতিক বাস্তবতার দিকে তাকালে পয়লা বৈশাখের অন্তর্নিহিত তাৎপর্য আরো গভীরভাবে উপলব্ধি করা যায়। সাম্প্রতিক সময়ে রাজনৈতিক দুর্নীতি, স্বজনপ্রীতি, লুটপাট ও স্বৈরাচারী আচরণের কারণে সমাজের যে ভয়াবহ নৈতিক অবক্ষয় ঘটেছিল, তার বিরুদ্ধে ২০২৪ সালের গণ-অভ্যুত্থানে জেনারেশন-জেড বা তরুণ প্রজন্মের যে ভয়ডরহীন অংশগ্রহণ দেখা গেছে, তার সাথে কালবৈশাখীর প্রলয়ঙ্করী কিন্তু শুদ্ধিকামী চরিত্রের অদ্ভুত মিল রয়েছে। বৈশাখের কালবৈশাখী ঝড় যেমন পুরনো, জীর্ণ, শুষ্ক ও অশুভ সবকিছুকে উড়িয়ে নিয়ে গিয়ে প্রকৃতির শুদ্ধি ঘটায় এবং নতুন প্রাণের সঞ্চার করে, তেমনি পয়লা বৈশাখের অন্তর্নিহিত দর্শন হলো সমাজের জঞ্জাল দূর করে এক নতুন, বৈষম্যহীন, ন্যায়ভিত্তিক ও নৈতিক রাষ্ট্র গঠনের প্রেরণা। দীর্ঘ দিনের স্বৈরাচারী শাসন, গুম-খুন ও অবিচারের বিরুদ্ধে ছাত্র-জনতার যে রক্তাক্ত অভ্যুত্থান, তা মূলত একটি জাতির পুঞ্জীভূত নৈতিক প্রতিবাদের বহিঃপ্রকাশ। এই প্রেক্ষাপটে বাংলা নববর্ষ কেবল একটি সাংস্কৃতিক উদযাপন নয়; বরং জনগণের নৈতিক পুনর্গঠন এবং রাষ্ট্রের গণতান্ত্রিক উত্তরণের এক শক্তিশালী রূপরেখা।

যখন কোনো জাতি আত্মপরিচয়ের সঙ্কটে ভোগে বা প্রাতিষ্ঠানিক অবক্ষয়ের শিকার হয়, তখন তারা তাদের শেকড় থেকে শক্তি সঞ্চয় করে ঘুরে দাঁড়ায়। পয়লা বৈশাখ বাঙালির সেই শেকড়, যা শত শত বছর ধরে কৃষিভিত্তিক সমাজব্যবস্থা, মুঘল প্রশাসনিক কাঠামো, ব্রিটিশবিরোধী লোকজ ঐতিহ্য, পাকিস্তানি জান্তার বিরুদ্ধে সাংস্কৃতিক প্রতিরোধ এবং স্বাধীন বাংলাদেশের অসাম্প্রদায়িক চেতনার মধ্য দিয়ে ক্রমাগত বিবর্তিত হয়েছে। এটি প্রমাণ করে যে, রাজনীতি ও অর্থনীতির উত্থান-পতন থাকতে পারে, কিন্তু একটি জাতির সাংস্কৃতিক ও নৈতিক ভিত্তি যদি দৃঢ় থাকে, তবে তারা যেকোনো ধ্বংসস্তূপের ওপর দাঁড়িয়ে নতুন করে সবকিছু নির্মাণ করতে পারে।

পরিশেষে, বাংলা নববর্ষ কেবল পঞ্জিকার একটি নতুন পাতা ওল্টানো বা পুরনো হিসাব চুকিয়ে ফেলার নাম নয়; এটি বাঙালির হাজার বছরের ইতিহাস, অবিরাম সংগ্রাম, সংস্কৃতি, অর্থনীতি এবং রাজনৈতিক চেতনার এক অসামান্য ও নিরবচ্ছিন্ন প্রবাহ। সময়ের সাথে সাথে যুগের প্রয়োজনে এর বাহ্যিক রূপ, কাঠামো ও উদযাপনের মাত্রায় পরিবর্তন এলেও এর অন্তর্নিহিত অসাম্প্রদায়িক, সাম্যবাদী ও মানবিক চেতনা অপরিবর্তিত রয়েছে। এটি আমাদের অতীত ইতিহাসের বঞ্চনা ও সংগ্রামের সাথে বর্তমানের প্রাপ্তিকে যুক্ত করে এবং ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য একটি আত্মমর্যাদাশীল, মানবিক ও নৈতিক রাষ্ট্র গঠনের অমসৃণ পথে এগিয়ে যাওয়ার অফুরন্ত প্রেরণা জোগায়। শুভ নববর্ষ কেবল একটি অভিবাদন নয়, এটি একটি জাতির সম্মিলিত পুনর্জাগরণের চিরন্তন স্লোগান।

লেখক : অধ্যাপক (অব:), সরকার ও রাজনীতি বিভাগ, জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়

[email protected]