লেজুরবৃত্তির ছাত্র রাজনীতি বন্ধ হোক

আশার কথা, ইতোমধ্যে জাতীয় সংসদে বিষয়টি নিয়ে কিছু বক্তব্য এসেছে। বিএনপির সংসদ সদস্য ও হুইপ রকিবুল ইসলাম বলেছেন, ‘আমাদের ছাত্র-ছাত্রীরা অনেক সময় নষ্ট করে ফেলেছে, তারা আর চায় না ক্যাম্পাস অশান্ত হোক। তারা চায় ক্যাম্পাস শান্ত থাকুক।’ গত ২৭ এপ্রিল জাতীয় সংসদে রাষ্ট্রপতির ভাষণের ওপর আনীত ধন্যবাদ প্রস্তাবের আলোচনায় অংশ নিয়ে তিনি এসব কথা বলেন। সরকার দলের এ সদস্য বলেন, উন্মুক্তভাবে রাজনীতির চর্চা হবে এবং যদি রাজনীতির কোনো আলোচনা করতে হয়, সবার মতামতের ভিত্তিতেই একটি রূপরেখা তৈরি করা যেতে পারে। যদি সংসদ মনে করে ক্যাম্পাসে কী ধরনের রাজনীতি চলবে সেটা নিয়েও আলোচনা হতে পারে। তিনি আরও বলেন, আমরা চাই ক্যাম্পাস শান্ত থাকুক

রাজশাহী প্রযুক্তি ও প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়-রুয়েটে ছাত্র রাজনীতি নিষিদ্ধ চেয়ে গত ২৬ এপ্রিল ক্যাম্পাসে মিছিল হয়েছে। ওই ক্যাম্পাসে ছাত্র রাজনীতি নিষিদ্ধ রয়েছে। শিক্ষার্থীদের অভিযোগ, ছাত্র রাজনীতি নিষিদ্ধ থাকার পরও ক্যাম্পাসে জাতীয়তাবাদী ছাত্রদল বিভিন্ন দলীয় কর্মসূচির আয়োজন করছে এবং ইসলামী ছাত্রশিবিরও সক্রিয়। প্রশাসন তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিচ্ছে না। ছাত্রদলের নামে ক্যাম্পাসের বিভিন্ন স্থানে গুপ্ত রাজনীতির বিরুদ্ধে দেয়াল লিখন করা হচ্ছে। সাধারণ ছাত্র-ছাত্রীরাও বিশ্ববিদ্যালয়ে সব ধরনের রাজনীতির বিরুদ্ধে দেয়াল লিখন করে। ছাত্রদলের রাজনীতির সাথে সম্পৃক্ত কিছু শিক্ষার্থী সাধারণ বিক্ষোভকারীদের বিরুদ্ধে অবস্থান নেয়। সাধারণ শিক্ষার্থীদের টানিয়ে দেওয়া ব্যানার ছাত্রদল সংশ্লিষ্টরা খুলে আগুনে পুড়িয়ে দেয়। ‘রুয়েট জাতীয়তাবাদী স্পন্দন’ নামে একটি ফেসবুক পেজে তা প্রচার করলে বিক্ষোভ ছড়িয়ে পড়ে গোটা ক্যাম্পাসে।

এর আগে পহেলা বৈশাখে নববর্ষের শুভেচ্ছা জানিয়ে বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রধান ফটকের সামনে ছাত্রদলের ব্যানার টানানো নিয়ে সাধারণ শিক্ষার্থীদের একটি অংশ ক্ষোভ প্রকাশ করে। স্বাধীনতা দিবসে ছাত্রদলের ব্যানারে কয়েকজন শিক্ষার্থী পুষ্পস্তবক অর্পণ করলে বিষয়টি নিয়ে সাধারণ শিক্ষার্থীরা তীব্র নিন্দা ও প্রতিবাদ জানান। ছাত্রদল ইতোমধ্যে মধ্যরাতে বিক্ষোভ প্রদর্শন করে। তারা স্লোগান দেয়, ‘শহীদ জিয়ার গড়া দল-জাতীয়তাবাদী ছাত্রদল, জিয়ার সৈনিক এক হও, লড়াই করো’ ইত্যাদি। অন্যপক্ষে সাধারণ ছাত্রদের মিছিলে উচ্চকিত স্লোগান ছিল এরকম, ‘ছাত্র রাজনীতির ঠিকানা এই রুয়েটে হবে না, নো মোর পলিটিক্স; ছাত্র রাজনীতির কালো হাত ভেঙে দাও গুঁড়িয়ে দাও, নো পলিটিক্স ইন রুয়েট’ ইত্যাদি। ছাত্র রাজনীতি নিষিদ্ধ চেয়ে সাধারণ ছাত্ররা সব ধরনের ক্লাস ও পরীক্ষা বর্জন করে।

এই ছোট্ট সংবাদে বড় মেসেজ রয়েছে। সংবাদটিকে যদি প্রতীকী অর্থে ক্যাম্পাস মনস্তত্ত্বের প্রতিফলন হিসাবে দেখতে চাই, তাহলে স্পষ্ট হয়ে ওঠে যে, ছাত্র রাজনীতি নিয়ে ক্যাম্পাস দ্বিধাবিভক্ত। সাধারণ ছাত্ররা পুরনো ছাত্র রাজনীতি চাইছে না। ছাত্র রাজনীতির বিরুদ্ধে তাদের মধ্যে সাধারণ মনস্তত্ত্ব তৈরি হয়েছে। অন্যদিকে বাংলাদেশে অনুসৃত রাজনৈতিক সংস্কৃতির ধারাবাহিকতায় ক্ষমতাসীন রাজনৈতিক দলের পক্ষেও ছাত্রদের সমর্থন রয়েছে। এই দ্বৈধতা দৃশ্যমান হয়ে ওঠে বিশেষ করে ২০২৪ সালের গণ-অভ্যুত্থানের পরবর্তী সময়ে, যখন ছাত্রদের নেতৃত্বে ও কর্তৃত্বে জনবিপ্লব সম্পন্ন হলো তার পরই ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়সহ দেশের সব ক্যাম্পাসে একটি সাধারণ দাবি উচ্চকিত হয়েছে। আর তা হচ্ছে, লেজুরবৃত্তির ক্যাম্পাসভিত্তিক ছাত্র রাজনীতি নিষিদ্ধ হোক। এজন্য ছাত্ররা সভা-সমিতি, মিটিং-আন্দোলন এমনকি রুয়েটের মতো জোরদার দাবি উত্থাপন করেছে। সঙ্গতভাবেই প্রশ্ন আসতে পারে যে, বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের নেতৃত্বে যে সাধারণ ছাত্ররা দেশের শাসন ব্যবস্থার পরিবর্তন ঘটাল, সেই রাজনীতিপ্রবণ ছাত্ররা কেন ক্যাম্পাসে রাজনৈতিক দলকেন্দ্রিক ছাত্র রাজনীতির বিরোধিতা করছে?

দীর্ঘ দেড় দশকে ক্যাম্পাসে ছাত্রলীগের তাণ্ডব দেখে ছাত্ররা ভীত। আবারো একই ধরনের রাজনীতির আগমন ঘটে কিনা তা নিয়ে তারা শঙ্কিত। সাধারণ ছাত্র রাজনীতি সব সময়ই সাধারণ ছিল। অসাধারণ তারাই যারা কারণে এবং অকারণে, সময়ে এবং অসময়ে শাসক দলের লাঠিয়াল বাহিনী হিসাবে ভূমিকা পালন করেছে। সাধারণ ছাত্রদের আশঙ্কা ছিল যে, পরবর্তী নির্বাচিত সরকারের ছাত্র সংগঠনও অনুরূপ ভূমিকা নিতে পারে। বিগত ৫০ বছরে এদেশের ছাত্ররাই বারবার মুক্তি এনে দিয়েছে। একইভাবে ক্ষমতাসীনরা এই ছাত্রদের আবার নগ্নভাবে ব্যবহার করে জাতির অধিকার হরণে কাজে লাগিয়েছে।

অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের হাতে একটা সুযোগ ছিল ছাত্র রাজনীতির বিষয়ে স্থায়ী সিদ্ধান্ত গ্রহণের। সরকারটি ছাত্রদের রক্তের মাধ্যমে প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল। বিশেষ করে ছাত্র রাজনীতির ব্যাপারে যৌক্তিক সিদ্ধান্ত নেয়ার অধিকার তাদেরই ছিল। বিপ্লব পরবর্তীকালে স্কুল থেকে বিশ্ববিদ্যালয় পর্যন্ত ছাত্ররা আবেগ উদ্বেল হয়েছিল। এ সুযোগটি কাজে লাগানো হয়নি। প্রয়োজন ছিল ছাত্রদেরকে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দিয়ে শিক্ষার জন্য একটি কমিশন করা। ছাত্র রাজনীতির সংবেদনশীলতার কারণে অন্তর্বর্তী সরকার এতে হাত দিতে চায়নি। ক্ষমতাশ্রয়ীরা মনে করেন, সেখানে হাত দিলে তাদের ক্ষমতায় আরোহণের সিঁড়িটি সরে যেতে পারে। যদিও ড. ইউনূস সরকারের হারানোর কিছু ছিল না। অথচ তারা রাষ্ট্রের এমন কোনো সেক্টর নেই যেখানে সংস্কারের প্রয়াস নেননি। ছাত্র রাজনীতির বিষয়ে সিদ্ধান্ত নিলে আজকে আমরা যে উত্তপ্ত ক্যাম্পাস দেখতে পাচ্ছি, হয়তো তা দেখতে হতো না। এজন্য প্রয়োজন ছিল অভিভাবকসুলভ সিদ্ধান্ত।

একটি রাজনৈতিক সরকারের পক্ষে ছাত্র রাজনীতির বিষয়ে সিদ্ধান্ত নেয়া খুবই ঝুঁকিপূর্ণ। বিচারপতি শাহাবুদ্দিন আহমেদ যখন রাষ্ট্রপতি, তখন তিনি ছাত্র রাজনীতি নিষিদ্ধের বা নিয়ন্ত্রণের উদ্যোগ নেন। ওসমানী মিলনায়তনে ছাত্র শিক্ষকদের সম্মিলিত সেমিনারে এই নিবন্ধকার ছাত্র রাজনীতি নিয়ন্ত্রণের পক্ষে জোর দাবি জানিয়েছিলেন। বিস্ময়ের ব্যাপার, ব্যক্তিগত আলাপচারিতায় যেসব শিক্ষক এবং উপাচার্য ছাত্র রাজনীতির বিষয়ে উষ্মা প্রকাশ করছিলেন, ওই সেমিনারে তারা ইনিয়ে বিনিয়ে ছাত্র রাজনীতির স্বপক্ষেই যুক্তি তুলে ধরেন। তার কারণ প্রকাশ্যে ছাত্র রাজনীতির বিপক্ষে গিয়ে কেউই তারা তাদের গদি নড়বড় করতে চাচ্ছিলেন না। সেসময়ে এই উদ্দেশ্যে Bangladesh Institute of International Strategic Studies-BIISS-এ একটি সেমিনার অনুষ্ঠিত হয়। সেখানেও স্ব-বিরোধিতার নজির দেখা যায়।

আগেই বলেছি, রাজনৈতিক সরকারের পক্ষে ছাত্র রাজনীতির বিষয়ে সিদ্ধান্ত নেয়া দুষ্কর। তবুও এই অসময়ে ছাত্র রাজনীতির বড় সংস্কার আনার সুপারিশ করছি, কারণ আমি একজন শিক্ষক। রাজনীতি-নিরাসক্তভাবে ছাত্রদের মঙ্গল-আকাক্সক্ষা আমার মতো হাজারও শিক্ষক ধারণ করেন। অভিভাবকরা চান, তাদের সন্তান যেন নিরাপদে শিক্ষাজীবন শেষ করতে পারে। আমরাও চাই, আমাদের সন্তানসম শিক্ষার্থীরা সুনাগরিক হয়ে বেড়ে উঠুক। সেজন্য একটি সুন্দর, সুশৃঙ্খল ও নিরাপদ শিক্ষাঙ্গন প্রয়োজন। বর্তমান জাতীয়তাবাদী সরকারের ২ মাসের খতিয়ান প্রমাণ করে তারাও একটি উৎপাদনশীল জাতির ভবিষ্যৎ গড়ে তুলতে চায়। ছাত্র রাজনীতির প্রয়োজনীয়তা অস্বীকার করা যায় না। কিন্তু অতীতের স্বৈরাচারী অভিজ্ঞতার কারণে এবং বর্তমান উত্তপ্ত ক্যাম্পাসের কারণে সরকারকে এ বিষয়ে ভাববার জন্য বিনীত অনুরোধ করি। ছাত্র রাজনীতির বিষয়ে সাধারণ ছাত্রদের নেতিবাচক সংবাদটি দিয়েই লেখাটি শুরু হয়েছে। সুতরাং সাধারণভাবে ছাত্র রাজনীতির ব্যাপারে প্রয়োজনীয় সংস্কারের পক্ষে থাকবে সাধারণ শিক্ষার্থীরা- এটাই স্বাভাবিক। আমি ছাত্র রাজনীতি পরিপূর্ণভাবে নিষিদ্ধের কথা বলছি না। ছাত্র রাজনীতিকে একটি নিয়মতান্ত্রিক, বুদ্ধিবৃত্তিক ও সৃশৃঙ্খল কাঠামোর মধ্যে আনার কথা বলছি। ছাত্র রাজনীতি থাকবে, তা হবে দলীয় লেজুরবৃত্তিমুক্ত। সেটা কীভাবে বা কী নিয়মানুবর্তিতা ও আইন কানুনের মাধ্যমে হবে তার সীমারেখা নির্ধারণের জন্য জাতীয় সংসদ সিদ্ধান্ত নিতে পারে।

আশার কথা, ইতোমধ্যে জাতীয় সংসদে বিষয়টি নিয়ে কিছু বক্তব্য এসেছে। বিএনপির সংসদ সদস্য ও হুইপ রকিবুল ইসলাম বলেছেন, ‘আমাদের ছাত্র-ছাত্রীরা অনেক সময় নষ্ট করে ফেলেছে, তারা আর চায় না ক্যাম্পাস অশান্ত হোক। তারা চায় ক্যাম্পাস শান্ত থাকুক।’ গত ২৭ এপ্রিল জাতীয় সংসদে রাষ্ট্রপতির ভাষণের ওপর আনীত ধন্যবাদ প্রস্তাবের আলোচনায় অংশ নিয়ে তিনি এসব কথা বলেন। সরকার দলের এ সদস্য বলেন, উন্মুক্তভাবে রাজনীতির চর্চা হবে এবং যদি রাজনীতির কোনো আলোচনা করতে হয়, সবার মতামতের ভিত্তিতেই একটি রূপরেখা তৈরি করা যেতে পারে। যদি সংসদ মনে করে ক্যাম্পাসে কি ধরনের রাজনীতি চলবে সেটা নিয়েও আলোচনা হতে পারে। তিনি আরও বলেন, আমরা চাই ক্যাম্পাস শান্ত থাকুক। রক্তের বিনিময়ে যে ক্যাম্পাস আমরা ফিরে পেয়েছি, এ ক্যাম্পাস আর নষ্ট করতে চাই না। আর চাই না কোনো মব ক্রিয়েট করে ফ্যাসিস্ট আমলের জামানায় ফিরে যেতে। আমরা চাই, মেধার ভিত্তিতে আগামী দিনের ছাত্র সমাজ গড়ে উঠুক। দেশের নেতৃত্ব দিক।

অপ্রিয় সত্যকথা বলা কঠিন। রাজনীতিবিদরা সবসময়ই দেশপ্রেমের নামে অথবা আদর্শের নামে ছাত্র রাজনীতি বহাল রাখতে চাইবেন। কেউ কেউ আমার মতো সাধারণ শিক্ষকের বক্তব্যকে প্রতিক্রিয়াশীল পশ্চাদমুখী বলতে চাইবেন, এরপরও আমি সেই পুরনো আপ্তবাক্যে ফিরে যেতে চাই, ‘ছাত্রানং অধ্যয়নং তপঃ’। অধ্যয়নই ছাত্রদের একমাত্র তপস্যা। কবি নজরুলের ভাষায়, শিক্ষার্থীদের উদ্দেশ্যে বলি, ‘চক্ষে জ্বলে জ্ঞানের মশাল বক্ষে দেশপ্রেম’।

লেখক : অধ্যাপক (অব:), সরকার ও রাজনীতি বিভাগ, জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়

[email protected]