বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমানের দীর্ঘ ১৭ বছর নির্বাসিত জীবন যাপনের পর স্বদেশের মাটিতে ঐতিহাসিক প্রত্যাবর্তন এক অবিস্মরণীয় ঘটনা। বিশেষ করে তার সংবর্ধনায় লাখ লাখ মানুষের উপস্থিতি ও দেশনেত্রী বেগম খালেদা জিয়ার এ যাবৎকালের সর্ববৃহৎ জানাজা জুলাই বিপ্লব-উত্তর গত ১৫ মাসের রাজনৈতিক ধ্যান-ধারণা সম্পূর্ণ বদলে দিয়েছে।
স্বীকার করতেই হবে, দীর্ঘ নির্বাসিত জীবন যাপন শেষে তারেক রহমান বীরের বেশেই দেশে ফিরেছেন, যা পৃথিবীর ইতিহাসে খুব কমই ঘটেছে। হয়তো পৃথিবীতে আরো অনেক রাজনীতিক আছেন যারা নির্বাসিত জীবন যাপন শেষে বীরের বেশে স্বদেশে ফিরেছেন, কিন্তু তাদের বেশির ভাগেরই রয়েছে স্বেচ্ছা নির্বাসনে থাকার কাহিনী। কিন্তু তারেক রহমানসহ বেশ কিছু রাজনৈতিক নেতা বাধ্য হয়ে নির্বাসনে ছিলেন। তাদের নির্বাসনে থাকতে বাধ্য করা হয়েছিল।
আবার টানা দীর্ঘ সময় নির্বাসিত জীবন যাপনের ইতিহাস হয়তো তাদের অনেকের ছিল না। এক্ষেত্রে সম্ভবত তারেক রহমানই প্রথম রাজনীতিবিদ যিনি সবচেয়ে বেশি সময় ধরে নির্বাসনে ছিলেন। তারপর ইরানের মহান নেতা ইমাম খোমেনির কথা উল্লেখ করা যায়। তিনি ১৪ বছর নির্বাসনে কাটান।
অন্যদিকে, টানা একটি দেশে ১৭ বছর নির্বাসনে থাকার রেকর্ডও বুঝি তারেক রহমানের। কারণ তিনি শুরু থেকেই শুধু ব্রিটেনে কাটিয়েছেন, অন্য কোনো দেশে যাননি বা থাকেননি। অন্যদিকে, ইরানের বিপ্লবী নেতা ইমাম খোমেনি ১৪ বছর নির্বাসনে থাকলেও প্রথমে তিনি আরব আমিরাতে, তারপর সেখান থেকে ফ্রান্সে যান। আরো অনেক নেতাই এভাবে কয়েক দেশ ঘুরে একটি জায়গায় স্থায়ী হয়েছেন।
এক-এগারোর কুশীলব এবং শেখ হাসিনার ফ্যাসিবাদী শাসন যাকে রাজনৈতিক, শারীরিক ও মানসিকভাবে নিঃশেষ করতে চেয়েছিল, সেই তারেক রহমান শেষ পর্যন্ত সব জল্পনা-কল্পনার অবসান ঘটিয়ে মাতৃভূমিতে পা রেখে আবেগ প্রকাশ করেছেন অন্যভাবে। অর্থাৎ, খালি পায়ে হেঁটে তিনি নিজ দেশের মাটির স্পর্শ অনুভব করতে চেয়েছেন। এটিকে তারেক রহমানের স্ট্যান্ডবাজি কখনো মনে হয়নি। বহু বছর পর জন্মভূমিতে ফিরে সত্যিই তিনি বুক ভরে নিঃশ্বাস নিয়ে যেন কবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের জন্মভূমি কবিতার প্রথম লাইনটি উচ্চারণ করতে চেয়েছিলেন, ‘সার্থক জনম আমার জন্মেছি এই দেশে।’
প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমান শহীদ হন ৪৫ বছর বয়সে, আর তারেক রহমান নির্বাসিত হন ৪৩ বছর বয়সে। তারপর টানা ১৭ বছরের নির্বাসিত জীবনে বহু চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি হয়েছেন। এর মধ্যে এক দিকে যেমন তিনি বিনা দোষে আদালতে সাজাপ্রাপ্ত হয়েছেন, অন্যদিকে তেমনই মা বেগম খালেদা জিয়ার সাজা ও গুরুতর অসুস্থতার কারণে তার নির্বাসিত জীবন কখনো সহনীয় হয়নি। তবে একটি বিষয় স্বীকার করতেই হবে, তিনি ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান হিসেবে বিএনপির ঐক্য ধরে রাখতে সক্ষম হয়েছেন। সুদূর বিলেতে বসে নানা ঘরানার, নানা মতামতের একটি দল চালানোর মতো কঠিন কাজটি তিনি করেছেন অবলীলায়। এ ব্যাপারে তার সফলতার বিষয়টি অস্বীকার করার মতো নয়।
সবচেয়ে বড় কথা, আওয়ামী লীগ নেতারা তারেক রহমানের হাওয়া ভবনকেন্দ্রিক যে দুর্নীতির অভিযোগ বারবার করে এসেছে, তার কোনোটিই তারা তাদের শাসনামলে প্রমাণ করতে পারেনি। এতে ব্যর্থ হয়ে তারা জিঘাংসা চরিতার্থ করতে এমন একটি মামলায় তাকে সাজা দিয়েছিল, যার সাথে তার সামান্যতম সংশ্লিষ্টতা ছিল না। যেমন করে আওয়ামী লীগ দেশনেত্রী বেগম খালেদা জিয়াকে মিথ্যা মামলায় জেল দিয়েছিল। বরং আওয়ামী লীগের ১৫ বছরের শাসনামলে বেপরোয়া দুর্নীতির পরিপ্রেক্ষিতে মা ও ছেলের এই নিষ্কলুষতা জনগণকে আরো বেশি আকৃষ্ট করেছে। আর এ কারণেই শুধু দলীয় নেতাকর্মী নয়, লাখ লাখ সাধারণ মানুষও তারেক রহমানের সংবর্ধনায় উপস্থিত হন।
এসব সত্তে¡ও দীর্ঘ অনুপস্থিতির পর তিনি কিভাবে নিজের দল এবং আগামী জাতীয় নির্বাচন পরিচালনা করবেন, দেশবাসী সেটি দেখার অপেক্ষায়। রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা মনে করেন, তারেক রহমানের আগামী দিনগুলো খুব কঠিন হবে। কারণ বিগত ১৭ বছরে এদেশে রাজনৈতিক ও সামাজিকসহ অনেক ক্ষেত্রে ব্যাপক পরিবর্তন ঘটে গেছে। এই পরিবর্তিত পরিস্থিতিতে তার আগের নেয়া পরিকল্পনাগুলো কিভাবে বাস্তবায়ন হবে, তা নিয়ে হয়তো তাকে আরো কিছুকাল ভাবতে হবে। তার অনুপস্থিতিতে জাতীয়তাবাদী দলের মধ্যে সৃষ্ট নানা ভরকেন্দ্রকে ঐক্যবদ্ধ করে সুসংহত করার কাজটিও যথেষ্ট কঠিন।
তিনি রাষ্ট্র কর্তৃক বাধ্য হয়ে নির্বাসনে যাওয়ার আগে চারদলীয় জোটের যে রাজনীতি দেখে গেছেন, সে রাজনীতি এখন আর নেই; বরং জোটের শরিকরা বিশেষ করে বিএনপি ও জামায়াতে ইসলামী বর্তমানে পরস্পর গুরুতর শত্রুতে পরিণত হয়েছে। এ পরিস্থিতি, বিশেষ করে জুলাই বিপ্লব-উত্তর রাজনৈতিক পরিবর্তনের পর নতুন মেরুকরণকে তিনি কিভাবে মূল্যায়ন করছেন তার উপরে নির্ভর করছে এদেশের ভবিষ্যৎ রাজনীতির গতিপ্রকৃতি। কারণ জুলাই বিপ্লবের পর প্রথাগত রাজনীতির অনেক কিছু বদলে গেছে। আর এই বিপ্লবের মধ্য দিয়ে এমন একটি তরুণ সমাজের উদ্ভব ঘটেছে, যারা আগামীতে যেকোনো অন্যায়ের বিরুদ্ধে সতর্ক প্রহরী হিসেবে কাজ করবে।
তবে তিনি এমন একটি পরিবার থেকে এসেছেন, যার পিতা জেনারেল জিয়াউর রহমান ছিলেন স্বাধীনতার ঘোষক, ছিলেন সেনাপ্রধান, রাষ্ট্রের চতুর্থ প্রেসিডেন্ট ও বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল বিএনপির প্রতিষ্ঠাতা এবং মা বেগম খালেদা জিয়া তিনবারের প্রধানমন্ত্রী ও জাতীয় ঐক্যের প্রতীক। বলা যায়, তারেক রহমানের বাবা ও মা উভয়েই বাংলাদেশে গণতন্ত্র, মতপ্রকাশের স্বাধীনতা ও জাতীয় ঐক্যের পথিকৃৎ। সুতরাং তারেক রহমান যত না তার পিতা-মাতার বৈষয়িক উত্তরাধিকার, তার থেকে অনেক বেশি তাদের রাজনৈতিক উত্তরাধিকার।
তাই তিনি ইতোমধ্যে উপলব্ধি করতে পেরেছেন, একটি গণতান্ত্রিক মানবিক রাষ্ট্র গঠন করতে হলে ঐক্যবদ্ধ প্রয়াস ছাড়া সম্ভব নয়। সে কারণে তিনি ফ্যাসিবাদবিরোধী রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে ঐক্য গড়ে তোলার ব্যাপারে নানা পদক্ষেপ নিতে শুরু করেছেন। বিশেষ করে দেশনেত্রীর জানাজায় দল-মত নির্বিশেষে সর্বস্তরের মানুষের অংশগ্রহণ ঐক্য গড়ে তোলার তার চিন্তাভাবনাকে আরো শাণিত করেছে। তাই এরই মধ্যে তিনি জামায়াতে ইসলামীসহ সমমনা দলের নেতাদের সাথে আলোচনা শুরু করেছেন।
তবে তারেক রহমান বাংলাদেশের রাজনীতিতে যে গুণগত পরিবর্তন আনতে চাচ্ছেন, সে ব্যাপারে তার আন্তরিক প্রয়াস থাকলেও সামনে রয়েছে অভ্যন্তরীণ ও ভূ-রাজনৈতিক জটিল সব বিষয়।
ইতোমধ্যে অনেকেই মনে করছেন, আগামী নির্বাচনে বিএনপি জোট বিজয়ী হয়ে সরকার গঠন করবে। আর সেটি হলে স্বাভাবিকভাবেই তারেক রহমানেরই প্রধানমন্ত্রী হওয়ার সম্ভাবনা বেশি। ফলে তাকে জুলাই সনদ বাস্তবায়ন, গুম-খুনের সাথে জড়িত আওয়ামী লীগ নেতাদের বিচার অব্যাহত রাখা, গণতন্ত্রকে প্রাতিষ্ঠানিক রূপ দেয়া, বিচার বিভাগের স্বাধীনতা নিশ্চিত করা, শেখ হাসিনার ১৫ বছরের ফ্যাসিবাদী শাসনামলে সমাজের সৃষ্ট বিভেদরেখা মুছে ঐক্য সৃষ্টি করা, ভূ-রাজনৈতিক জটিল মেরুকরণসহ নানা বিষয়ে নজর দেয়ার মতো কঠিন কাজ করতে হবে। এ ব্যাপারে তিনি কতটুকু প্রস্তুত, সেটি দেখার জন্য এখন দেশবাসী অপেক্ষায় রয়েছে।
সবশেষে আরেকটি প্রত্যাবর্তনের কথা উল্লেখ করে এই লেখা শেষ করতে চাই। সেটি ছিল ১৯৭২ সালের ১০ জানুয়ারি। সেদিন শেখ মুজিবুর রহমান পাকিস্তানের কারাগার থেকে মুক্তি পেয়ে লন্ডন ও দিল্লি হয়ে ভারতীয় সামরিক বিমানে করে সদ্য স্বাধীন দেশের রাজধানী ঢাকায় প্রত্যাবর্তন করেছিলেন। সেটিও ছিল বিপুল সংবর্ধনা। তিনি তেজগাঁও আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর থেকে সোজা রেসকোর্স ময়দানে আয়োজিত বিশাল সমাবেশে ভাষণ দিয়েছিলেন। আমি দেখেছি সেই সংবর্ধনা ও সমাবেশ। তখন অবিসংবাদিত নেতা হিসেবে শেখ মুজিবুর রহমানকে ঘিরে এদেশের গণতন্ত্রকামী মানুষের প্রচণ্ড আবেগ সে সংবর্ধনায় প্রতিফলিত হয়েছিল। কিন্তু অচিরেই তিনি তোষামোদকারীদের দ্বারা পরিবেষ্টিত হয়ে পড়েন এবং পরবর্তীতে গণতন্ত্রের কবর রচনা করে একদলের শাসন কায়েম, মতপ্রকাশ ও সংবাদপত্রের স্বাধীনতা হরণ, গুম-খুনসহ এমন ভীতিকর শাসন প্রতিষ্ঠিত করেন; যা গোটা জাতিকে দুঃস্বপ্নে ডুবিয়ে দিয়েছিল।
আবার স্বাধীনতার ৫৪ বছর পর আরেকটি ব্যাপক, বিপুল সংবর্ধিত একটি প্রত্যাবর্তন দেশবাসী প্রত্যক্ষ করেছে গত ২৫ ডিসেম্বর। সেটি তারেক রহমানের। তিনি এমন এক রাজনৈতিক পরিবারের উত্তরাধিকার হিসেবে সংবর্ধনা লাভ করেছেন, যে পরিবার বাংলাদেশে গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠা এবং দেশের স্বাধীনতা সার্বভৌমত্ব রক্ষার জন্য হত্যা ও নির্যাতনের শিকার হয়েছে। এই পটভূমিতে এদেশের মানুষ আশা করে, তারেক রহমানও ভবিষ্যতে তার পরিবারের সেই ধারাবাহিকতায় সমুজ্জ্বল হয়ে উঠবেন।



