নরেন্দ্র মোদির গুজরাটে মুখ্যমন্ত্রী থাকাকালীন ২০০২ ফেব্রুয়ারি-মার্চ মাসব্যাপী ঠাণ্ডামাথায় মুসলিম গণহত্যা হয়েছিল। যার ন্যায়বিচার আজও হয়নি। গুজরাটে আটবারের এমপি এহেসান জাফরিকে নৃশংস খুনের ঘটনায় অভিযুক্ত খুনিদের কোনো সাজা হয়নি। আজ সেই নরেন্দ্র মোদি পরপর তিনবার ভারতের প্রধানমন্ত্রী। আরএসএস ও করপোরেট পরিচালিত এই মোদি সরকার আরএসএসের মদদে ভারতে মুসলিম নাম, ইতিহাস ও ঐতিহ্য আস্তে আস্তে পাল্টে দিচ্ছে অথবা নাই করে দিচ্ছে। এখন সেই ক্ষমতাসীন মোদি সরকার ও আরএসএস চাইছে সরকারি অর্থে পুরোপুরি মুসলিম সমাজকে ভারত থেকে তাড়িয়ে দাও। তাদের কোনো অস্তিত রাখা যাবে না ভারতে।
বিষয়টি একটু খুলে বলা যাক। স্মরণ করা যেতে পারে ২০২৫ সালের ১৩-১৪ ডিসেম্বর ভারতের রাজধানী দিল্লির ভারত মণ্ডপমে ‘সনাতন রাষ্ট্র শঙ্খনাদ মহোৎসব’ হয়েছিল। ওই সম্মেলনের আয়োজন করেছিল সনাতন সভা নামে একটি সংগঠন। এ সম্মেলনে আরএসএস এবং বিজেপির অঙ্গসংগঠন হিসেবে হিন্দুত্ববাদী সংগঠনগুলো শামিল হয়। তথ্যের অধিকার আইন (আরটিআই) অনুসারে আবেদন করা জবাবে আরো জানা গেছে, মোদি সরকারের সংস্কৃতি মন্ত্রণালয় ও দিল্লির ক্ষমতাসীন বিজেপি সরকারের পর্যটন দফতর এ সম্মেলন আয়োজনে ৬৩ লাখ টাকা আর্থিক সহযোগিতা করেছে। সারা দেশের ক্ষমতাসীন মোদির নেতৃত্বে বিজেপি সরকারের সংস্কৃতি মন্ত্রণালয় ও দিল্লির ক্ষমতাসীন বিজেপি সরকারের পর্যটন দফতরের আর্থিক সহযোগিতায় অনুষ্ঠিত এ সম্মেলনের মঞ্চ থেকে ভারতে মুসলিম খেদানোর ডাক দেয়া হয়েছে। এ ডাক অনেকখানি হুঙ্কার ছাড়ার মতো। কেন্দ্রের বিজেপি সরকারের মন্ত্রী গজেন্দ্র সিং শেখাওয়াত, শ্রীপদ নায়েক, সঞ্জয় শেঠ, দিল্লির ক্ষমতাসীন বিজেপি সরকারের পর্যটনমন্ত্রী কপিল মিশ্র উপস্থিত ছিলেন। এ সম্মেলনে সুদর্শন টিভির প্রধান সুরেশ সাভাঙ্কে বলেছেন, ভারতে ২৫ শতাংশ মুসলিম অনুপ্রবেশকারী। তারা বাংলাদেশী, আফগানি ও পাকিস্তানি। এনআরসি করে তাদের তাড়াতে হবে। ভারতে মুসলিম জনসংখ্যায় লাগাম দেয়া দরকার।
বিজেপি নেতা অশ্বিনী উপাধ্যায়ের বক্তব্য ছিল— প্রত্যেক হিন্দু যদি একজনকে ধর্মান্তরিত করতে পারে, তাহলে আমাদের উদ্দেশ্য সফল হবে। এখানে অনেক ব্যবসায়ী আছেন, তারা সহজে তাদের মুসলিম কর্মীদের ধর্মান্তরিত করতে পারেন।
হিন্দু ফান্ডের সম্পাদক রাহুল দেওয়ানের বক্তব্য— আমাদের আক্রমণাত্মক কৌশল প্রয়োজন। সাংবিধানিকভাবে হিন্দু রাষ্ট্র চাই আমাদের।
কেন্দ্রের ও দিল্লির বিজেপি সরকারের আর্থিক পৃষ্ঠপোষকতায় এ ‘বিভাজন সম্মেলন’ এক দিকে যেমন মুসলিমদের আতঙ্কিত করে তুলেছে, অন্য দিকে তেমনি বিতর্ক উসকে দিয়েছে। দিল্লির হিন্দুত্ববাদী সংগঠনগুলোর ওই সম্মেলন শুধু দিল্লির মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকেনি, ভারতে ক্ষমতাসীন বিজেপি জোট সরকার বা বিজেপি-শাসিত ২০টি রাজ্যের মধ্যে এ বিভাজনের সম্মেলন করছে ও মুসলিম নিধনের ব্লুপ্রিন্ট তৈরি করছে, যা গভীর উদ্বেগের।
বিজেপি-শাসিত বা বিজেপি জোট শাসিত আসাম, বিহার, মহারাষ্ট্র, উত্তরপ্রদেশ, মধ্যপ্রদেশ, উত্তরাখন্ড, ছত্তিশগড়, রাজস্থান, হরিয়ানা— এ বিভাজনের সম্মেলন ধারাবাহিকভাব চলছে। ওই সব রাজ্যে বঙ্গভাষী পরিযায়ী শ্রমিকদের ওপর বহমুখী নির্যাতন চলছে। তাদের বেশির ভাগ মুসলিম। তাদের অনেককে বাংলাদেশী অনুপ্রবেশকারী তকমা লাগিয়ে একেবারে জঙ্গি দেগে দিয়ে গ্রেফতার করাও হচ্ছে। এ ধরনের সম্মেলন বা কর্মসূচি বিজেপি-আরএসএসের উদ্যোগে ভারতের রাজধানী দিল্লি বাদ দিয়ে বিভিন্ন বিজেপি-শাসিত রাজ্যেও আখছার চলছে।
ইতিহাস থেকেও আমাদের শিক্ষা নিতে হবে। স্পেন থেকে মুসলিম নিধন ও নির্মূল করার যে পদ্ধতি অবলম্বন করেছিল সেখানকার খ্রিষ্টান নাৎসিবাদীরা; ভারত থেকে মুসলিমদের কিভাবে নিধন করা যায়, সেই পথ ধরেছে ভারতে হিন্দু নাৎসিরা। স্পেন থেকে মুসলিমদের নির্মূলের পদ্ধতি ভারতের বিজেপি সরকার ও আরএসএস অনুসরণ করেছে। তবে ধাপে ধাপে অগ্রসর হচ্ছে। ভারতের অন্যতম সংবিধান স্বীকৃত ভাষা উর্দু বাদ দেয়া হচ্ছে। মহাকবি আল্লামা ইকবালের উর্দুতে লিখিত বিখ্যাত গান ‘সারে জাঁহাসে আচ্ছা হিন্দোস্তা হামারা’কে রাষ্ট্রীয় গানের মর্যাদা থেকে বাদ দেয়া হয়েছে ইতোমধ্যে। অথচ ভারতের প্রথম প্রধানমন্ত্রী পণ্ডিত জওয়াহেরলাল নেহরু ইকবালের গানটি রাষ্ট্রীয় গীতের মর্যাদা দিয়েছিলেন।
বিখ্যাত শহর ইলাহাবাদ বদলে হয়ে গেল প্রয়াগরাজ, মোগলসরাই হয়ে গেল দিনদয়াল, করিমগঞ্জ হয়ে গেল শ্রীভূমি। মোগল আমলসহ মুসলিম আমলের যাবতীয় ইতিহাস ইতিহাস পরিষদ ও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের পাঠ্যসূচি থেকে ইতোমধ্যে বাদ দেয়া হয়েছে। মহারাষ্ট্রের অরঙ্গাবাদ শহরের নাম পাল্টানো হয়েছে। সেখান থেকে মোগল সম্রাট আওরঙ্গজেবের মাজার স্থানান্তর করার চেষ্টা হয়েছে। প্রবল জনবিক্ষোভে তা সম্ভব হয়নি। বিখ্যাত দলিত নেতা, বুদ্ধিজীবী ও সম্পাদক ভি টি রাজশেকরের কথা একেবারে শতভাগ মিলে যাচ্ছে। ১৯৮৫ সালের ১৬-৩১ মে তার সম্পাদিত দলিত ভয়েস পত্রিকার সেই বিখ্যাত সম্পাদকীয় ‘হিন্দু নাৎসিবাদীরা স্পেনের পরীক্ষা : ভারত অনুসরণ করছে’। অসাধারণ এ সম্পাদকীয় বক্তব্য একেবারে অক্ষরে অক্ষরে মিলে যাচ্ছে বিজেপি-আরএসএসের কার্যকলাপে। ১৯৯৮ সালে সম্পাদকীয়টি ভি টি রাজশেকরের ‘ভারতীয় মুসলিমদের সমস্যা’ নামের গ্রন্থেও পুনর্মুদ্রিত হয়েছে।
২০২৪ সালের লোকসভা নির্বাচনে নরেন্দ্র মোদি ও অমিত শাহ যে ৪০০ আসনের স্বপ্ন দেখেছিল তা পুরোপুরি ধূলিসাৎ হয়ে গেছে। তাই নরেন্দ্র মোদির বিজেপি দলের নিরঙ্কুশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা নেই বলে ভারতকে এখনো হিন্দু রাষ্ট্র বানাতে পারেনি; কিন্তু বিজেপি সরকারের বিভিন্ন দফতর থেকে অর্থ খরচ করে কিভাবে মুসলিম নিধন করা যায়, তার ব্লুপ্রিন্ট বা নীলনকশা যথেষ্ট শক্তিশালীভাবে চলছে। ভারতের বিজেপি-শাসিত রাজ্যগুলোতে এ কর্মকাণ্ড চলমান বলে ওয়াকিবহাল মহল মনে করছে।
ইহুদি রাষ্ট্র ইসরাইল ফিলিস্তিনের ইতিহাস-ঐতিহ্য ধ্বংস করে দিয়েছে। ভারতের হিন্দু নাৎসিরাও মুসলিম নিধনে সেই খেলায় মেতেছে। ভারতের তথাকথিত ধর্মনিরপেক্ষ দলগুলোর বিরোধিতা সে রকম শক্তিশালী নয়। জানি না অদূর ভবিষ্যতে কী হবে? এটি এখন মিলিয়ন ডলারের প্রশ্ন।
লেখক : কলামিস্ট, প্রাবন্ধিক ও কবি



