চামড়া ও চামড়াজাত পণ্য রফতানির সম্ভাবনাময় খাত। পোশাক শিল্পের পর চামড়া শিল্পের স্থান। এ শিল্পকে এখনো সুষ্ঠু কাঠামোর মধ্যে নিয়ে আসা যায়নি। আমাদের নজর বেশি পোশাক খাতের প্রতি। চামড়া শিল্পে রফতানির সম্ভাবনা ধরে রাখতে হলে আমদানিযোগ্য কাঁচামাল, শুল্ক ব্যবস্থাপনা, পণ্য ছাড় করা ও ব্যবসায় সহজীকরণ করা দরকার। চামড়া শিল্পের সাথে প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে জড়িত ১২ লাখ মানুষের জীবন-জীবিকা। দেশে গড়ে উঠেছে ২৩০টির বেশি ট্যানারি। মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ মন্ত্রণালয়ের তথ্যানুযায়ী, দেশে প্রতি বছর মোট ৯১ লাখ ৩৬ হাজার ৭৩৪টি গবাদিপশু কোরবানি হয়।
কয়েক বছর ধরে স্থানীয় বাজারে কাঁচা চামড়ার দাম কম। পানির দামে চামড়া বিক্রি হয়। শুধু তাই নয়, চামড়া সঠিকভাবে সংরক্ষণ না করায় এবং উপযুক্ত দাম না পাওয়ায় অতীতে চামড়া ফেলে দেয়া হয়েছে। বুড়িগঙ্গা নদী বাঁচাতে ঢাকার হাজারীবাগ থেকে ২০১৭ সালে চামড়া শিল্প সাভারে স্থানান্তর করা হয়। কিন্তু সাভারে কেন্দ্রীয় বর্জ্য শোধনাগার (সিইটিপি), ডি ওয়াটারিং ইউনিট, পাম্প, জেনারেটর ও ল্যাবের কাজ এখনো শেষ হয়নি। সিইটিপি কার্যকর না থাকায় সব বর্জ্য গিয়ে ধলেশ্বরী নদীতে পড়ে। ফলে ধলেশ্বরীও এখন হুমকিতে। চামড়া শিল্প নগরীর সমস্যা সমাধানে দ্রুত কার্যকর পদক্ষেপ নিতে হবে। বিশ্বব্যাপী স্বীকৃত লেদার ওয়ার্কিং গ্রুপের (এলডব্লিউজি) সনদ পাওয়া যায়নি এখনো। ইউরোপ-আমেরিকার নাম করা আমদানিকারকদের কাছে সরাসরি চামড়া রফতানি করা যাচ্ছে না। ফলে এ খাতের রফতানি কাঙ্ক্ষিত মানের নয়।
বাংলাদেশে জুতার বাজারেও চামড়া শিল্পের বিরাট অবদান আছে। চামড়া ও চামড়াবিহীন দুই ধরনের জুতা তৈরি হয় দেশে। এতে আমাদের স্থানীয় বাজারের চাহিদা মিটিয়ে কিছু পণ্য বিদেশেও রফতানি হয়। রফতানি উন্নয়ন ব্যুরোর তথ্য, ২০১৬-১৭ অর্থবছরে রফতানি হয়েছিল ৭৮ কোটি ডলারের চামড়া ও চামড়াবিহীন জুতা। ২০১৭-১৮ অর্থবছরে রফতানি হয় ৮০.৯৬ কোটি, ২০১৮-১৯ অর্থবছরে ৮৭ দশমিক ৯৩ কোটি ডলার ও ২০১৯-২০ অর্থবছরে ৭৫ দশমিক ০৫ কোটি ডলারের জুতা রফতানি হয়। ২০২১-২২ অর্থবছরে খাতটি অতীতের রেকর্ড ভেঙে সর্বোচ্চ রফতানি আয় করলেও, পরের দুই বছর বৈশ্বিক অর্থনৈতিক মন্দা ও আন্তর্জাতিক মান পূরণ না হওয়ায় তা হ্রাস পায়। করোনা মহামারীর ধাক্কা কাটিয়ে ২০২১-২২ সালে এ খাত থেকে ১ দশমিক ২৪ বিলিয়ন ডলার (১২৪ কোটি ৫২ লাখ ডলার) আয় হয়, যা ছিল আগের বছরগুলোর তুলনায় একটি বিশাল উল্লম্ফন। মূলত জুতা ও চামড়াজাত পণ্যের আন্তর্জাতিক চাহিদা বেড়ে যাওয়ায় এ রেকর্ড আয় অর্জিত হয়।
রফতানি উন্নয়ন ব্যুরোর তথ্যানুযায়ী, রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধ এবং বিশ্বব্যাপী মূল্যস্ফীতিতে ২০২২-২৩ অর্থবছরে এ খাতের রফতানি আয় কমে প্রায় ১ দশমিক ২২ বিলিয়ন ডলারে (১২২ কোটি ২৩ লাখ ডলার) নেমে আসে। এ সময়ে রফতানি লক্ষ্যমাত্রা অর্জিত না হলেও, পূর্ববর্তী বছরের তুলনায় সামান্য ০.৪২ শতাংশ প্রবৃদ্ধি দেখা যায় যা মূলত চামড়াজাত পণ্যের ওপর নির্ভরশীল ছিল। ২০২৩-২৪ অর্থবছরে চামড়া ও চামড়াজাত পণ্যের রফতানি পরিস্থিতি ছিল আরো হতাশাজনক। এ সময় বৈশ্বিক বাজারে চাহিদা কমে যাওয়া এবং পরিবেশগত কমপ্লায়েন্স সমস্যায় চামড়া ও চামড়াজাত পণ্যের রফতানি উল্লেখযোগ্যভাবে কমে যায়। ২০২৩-২৪ অর্থবছরেও দাম কমে। এই দুই বছরে এ খাত থেকে রফতানি আয় হয়েছে যথাক্রমে ১১৭ কোটি ৫৫ লাখ ডলার ও ১০৩ কোটি ৯১ লাখ ডলার। ২০২৪-২৫ অর্থবছরে প্রথম ১১ মাসে রফতানি আয় এসেছে ১০৫ কোটি ৭৮ লাখ ডলার। মন্ত্রণালয় চামড়া ও চামজাড়াত পণ্য থেকে ২০৩০ সাল নাগাদ বছরে ১০ থেকে ১২ বিলিয়ন ডলার রফতানি আয়ের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করে ২০২০ সালের দিকে। কিন্তু বাস্তব চিত্র নেতিবাচক।
চামড়া শিল্পের সমস্যা : চামড়া শিল্পের সমস্যা বহুবিধ। এলডব্লিউজি সনদ না থাকায় চামড়ার রফতানিমূল্য পাওয়া যাচ্ছে না। দেশে যেমন কাঁচা চামড়ার দাম পাওয়া যাচ্ছে না, তেমনি ফিনিশড লেদার বা প্রক্রিয়াজাত চামড়ারও রফতানিমূল্য মিলছে না। বাধ্য হয়ে পানির দরে রফতানি করতে হচ্ছে। সে জন্য সিইটিপি কার্যকর করে গড়ে তোলার বিকল্প নেই। এছাড়া বাংলাদেশে চামড়া ও চামড়াজাত পণ্য উৎপাদন এবং বিপণনের প্রধান সমস্যা হলো আন্তর্জাতিক কমপ্লায়েন্স বা সনদের অভাব, সাভার চামড়া শিল্পনগরের অপর্যাপ্ত বর্জ্য ব্যবস্থাপনা, চামড়া সংগ্রহের দুর্বল ব্যবস্থাপনা ও দাম নির্ধারণ, দক্ষ কর্মীর অভাব এবং আন্তর্জাতিক মানের নিজস্ব ব্র্যান্ডের ঘাটতি। সাভারের হেমায়েতপুরে অবস্থিত চামড়া শিল্পনগরের কেন্দ্রীয় বর্জ্য পরিশোধনাগার কার্যকর নয়। এছাড়া কঠিন বর্জ্য ফেলার স্থায়ী ভাগাড় বা ডাম্পিং ইয়ার্ড না থাকায় পরিবেশ দূষণ হচ্ছে।
কোরবানির ঈদে বিপুল চামড়া সংগ্রহ হলেও সংরক্ষণের অভাব, মৌসুমি ব্যবসায়ীদের অদক্ষতা ও লবণসঙ্কটে অনেক সময় চামড়ার গুণগত মান নষ্ট হয়ে যায়। ছোট ও মাঝারি ট্যানারিগুলোর অর্থায়নের অভাব রয়েছে। এছাড়া কাঁচামাল আমদানি ও প্রক্রিয়াজাতকরণ ব্যয় বেড়েছে।
আন্তর্জাতিক বাজারে বাংলাদেশের নিজস্ব কোনো শক্তিশালী চামড়ার ব্র্যান্ড নেই। ফলে আন্তর্জাতিক ক্রেতা বা বিশ্বখ্যাত ব্র্যান্ডগুলোর জন্য কম মূল্যে ‘আউটসোর্সড’ পণ্য হিসেবে কাজ করতে হয়। চামড়া শিল্প খাতে অনেকগুলো চ্যালেঞ্জও রয়েছে। অন্যতম কঠিন বর্জ্য ব্যবস্থাপনা। অনেক বিদেশী প্রতিষ্ঠান প্রস্তাব নিয়ে আসছে। কিন্তু প্রয়োজনীয় ও কাঠামোগত সংস্কার এবং সময়োপযোগী পদক্ষেপের ঘাটতি আছে। চামড়া শিল্প উদ্যোক্তাদেরও সততা এবং পেশাদারিত্ব বজায় রেখে কাজ করতে হবে। ঋণের অর্থ অন্যত্র ব্যয় বা বিনিয়োগ না করে চামড়া খাতে ব্যবহার করতে হবে।
লেখক : অর্থনীতির বিশ্লেষক ও ব্যাংকার



