গণতন্ত্রের প্রত্যাবর্তন বনাম ক্ষমতার পুনর্বিন্যাস

নির্বাচনের সাথে অনুষ্ঠিত সংবিধান সংস্কার গণভোট ছিল বাংলাদেশের গণতান্ত্রিক যাত্রার একটি মোড় ঘোরানো অধ্যায়। প্রায় ৬৮ শতাংশ ভোটার সংস্কারের পক্ষে মত দিয়ে স্পষ্ট বার্তা দিয়েছেন যে, জনগণ শুধু সরকার পরিবর্তন নয়, শাসনব্যবস্থারও কাঠামোগত রূপান্তর চায়। এটি কোনো সাধারণ রাজনৈতিক সিদ্ধান্ত নয়, বরং রাষ্ট্রের ভবিষ্যৎ চরিত্র নির্ধারণের একটি ঐতিহাসিক ম্যান্ডেট। দীর্ঘদিনের ক্ষমতার কেন্দ্রীকরণ, দুর্বল জবাবদিহি ও প্রাতিষ্ঠানিক অকার্যকারিতার অভিজ্ঞতা থেকে জনগণ একটি অধিক ভারসাম্যপূর্ণ, গণমুখী ও দায়বদ্ধ সংবিধান প্রত্যাশা করছে

২০২৬-এর জাতীয় নির্বাচন কেবল সাংবিধানিক বাধ্যবাধকতা নয়, এটি ছিল রাষ্ট্রের রাজনৈতিক বৈধতা পুনর্গঠনের ঐতিহাসিক মুহূর্ত। ২০২৪-এর জুলাই গণ-অভ্যুত্থান যে নৈতিক ও গণ-রাজনৈতিক শক্তি তৈরি করেছিল, তার প্রাতিষ্ঠানিক স্বীকৃতি ছিল এই নির্বাচন। অন্তর্বর্তী শাসন থেকে জনগণের প্রত্যক্ষ ভোটে নির্বাচিত সরকারের হাতে ক্ষমতা হস্তান্তরের এই প্রক্রিয়া ছিল গণতন্ত্রের পরীক্ষামঞ্চ।

কিন্তু প্রশ্ন হলো, এই নির্বাচন কি সত্যিই জনগণের ইচ্ছার পূর্ণ প্রতিফলন, নাকি পুরনো শক্তির জায়গায় নতুন শক্তির কৌশলী পুনর্বিন্যাস? শান্তিপূর্ণ পরিবেশ, ব্যাপক ভোটার উপস্থিতি এবং আন্তর্জাতিক প্রশংসা— এসব ইতিবাচক উপাদানের পাশাপাশি ছিল প্রশাসনিক দুর্বলতা, স্বচ্ছতার সঙ্কট, ভূ-রাজনৈতিক প্রভাব এবং দলীয় পক্ষপাতের অভিযোগ। ফলে এই নির্বাচনকে একরৈখিক সাফল্যগাথা হিসেবে নয়, বরং জটিল বাস্তবতার সমালোচনামূলক পাঠ হিসেবে দেখা জরুরি।

পটভূমি : বিপ্লব থেকে ব্যালট
২০২৪ সালের গণ-অভ্যুত্থান মূলত বাংলাদেশের রাজনৈতিক দৃশ্যপট বদলে দিয়েছে। দীর্ঘদিনের কর্তৃত্ববাদী শাসনের বিরুদ্ধে জনগণের অসন্তোষ ও প্রতিরোধ শেষ পর্যন্ত রাষ্ট্রকে অন্তর্বর্তী ব্যবস্থার দিকে নিয়ে যায়। অন্তর্বর্তী সরকারের লক্ষ্য ছিল ক্ষমতা নির্বাচিত সরকারের হাতে হস্তান্তর করা।

এই প্রেক্ষাপটে ২০২৬ সালের জাতীয় নির্বাচন শুধু সময়মতো ভোট নেয়ার প্রক্রিয়া ছিল না। এটি তিনটি গুরুত্বপূর্ণ লক্ষ্য অর্জনের মাধ্যমে দেশের রাজনৈতিক পরিপক্বতা যাচাইয়ের মাধ্যম হিসেবে কাজ করেছে। প্রথমত, ২০২৪ সালের গণ-অভ্যুত্থানের নৈতিক বৈধতাকে নির্বাচনী প্রক্রিয়ার মাধ্যমে প্রাতিষ্ঠানিক স্বীকৃতি দেয়া। দ্বিতীয়ত, অনির্বাচিত অন্তর্বর্তী সরকারের হাত থেকে নির্বাচিত সরকারের কাছে ক্ষমতা হস্তান্তর। তৃতীয়ত, সংবিধান ও প্রতিষ্ঠানের সংস্কারের জন্য জনগণের সম্মতি ও ম্যান্ডেট সংগ্রহ।

তাই এই নির্বাচন ছিল ‘রুটিন’ বা নিয়মিত নির্বাচনের চেয়ে অনেক বেশি কিছু। এটি ছিল গণতান্ত্রিক রূপান্তরের একটি মাইলফলক। জনগণ কেবল সরকার পরিবর্তন করতে যাচ্ছিল না; তারা রাষ্ট্রের কাঠামো, শাসনের নীতি এবং সাংবিধানিক প্রক্রিয়ার প্রতি আস্থা প্রদর্শন করছিল।

অংশগ্রহণ ও শান্তিপূর্ণ পরিবেশ : একটি ইতিবাচক সূচনা
প্রায় ৫০টি দলের অংশগ্রহণে নির্বাচনের প্রতিযোগিতা বৈচিত্র্যময় হয়েছে। বিভিন্ন আদর্শ ও রাজনৈতিক শক্তির উপস্থিতি ভোটপ্রক্রিয়াকে কেবল সংখ্যাগত নয়, মানসিক ও সাংগঠনিক দিক থেকেও শক্তিশালী করে। উল্লেখযোগ্য ভোটার উপস্থিতি প্রমাণ করে, জনগণ নিজেদের রাজনৈতিক অধিকার প্রয়োগে উৎসাহী এবং গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়ায় আস্থাশীল। নির্বাচনের শান্তিপূর্ণ পরিবেশ বজায় ছিল; এটি বড় অর্জন।

তবে নির্বাচনের স্বচ্ছতা ও অংশগ্রহণের পূর্ণতা নিয়ে প্রশ্নও থেকে গেছে। বাংলাদেশ আওয়ামী লীগ ও তাদের মিত্রদের নির্বাচনে অংশগ্রহণ নিষিদ্ধ ছিল। অনেকে এটিকে ‘অসম্পূর্ণ প্রতিযোগিতা’ বলেছেন।

নির্বাচন কতটা সুষ্ঠু ও স্বচ্ছ
ভোটগ্রহণ প্রক্রিয়া মোটামুটি সুষ্ঠু এবং গ্রহণযোগ্য হলেও সবকিছু নিখুঁত ছিল না। ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশ (টিআইবি) নির্বাচনের সময় বেশ কিছু অনিয়ম ও প্রশাসনিক দুর্বলতার তথ্য প্রকাশ করেছে। এর মধ্যে ছিল বিচ্ছিন্ন কারচুপি, প্রভাব বিস্তার এবং কর্মকর্তাদের শৈথিল্য, যা ভোটের স্বচ্ছতা প্রশ্নবিদ্ধ করে।

ভোট গণনার ক্ষেত্রেও একই চিত্র দেখা গেছে। অধিকাংশ কেন্দ্রে গণনা শান্তিপূর্ণভাবে হলেও কিছু নির্বাচনী আসনে ফলাফল প্রস্তুত ও ঘোষণার প্রক্রিয়া স্বচ্ছ ছিল না। ধীরগতি, তথ্যপ্রবাহের অস্পষ্টতা এবং পর্যবেক্ষক পর্যায়ের সীমাবদ্ধতা ছিল। কিছু আসনে প্রার্থী ও দলের পক্ষ থেকে ভোট পুনর্গণনার দাবি ওঠে, যা নির্বাচনকে বিতর্কিত করেছে।

ইলেকশন ওয়ার্কিং অ্যালায়েন্স (ইডব্লিউএ) নির্বাচনে সংঘটিত গুরুতর অনিয়ম ও নির্বাচন-পরবর্তী সহিংসতার বিষয়ে গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করেছে। এর পর্যবেক্ষণে বলা হয়েছে, ২০২৪ সালের জুলাই বিপ্লবের পরও এই নির্বাচন সম্পূর্ণ কলঙ্কমুক্ত হয়নি। নির্বাচনের দিন সকাল পর্যন্ত ভোটপ্রক্রিয়া শান্তিপূর্ণ ছিল এবং ভোটার উপস্থিতিও সন্তোষজনক, কিন্তু দুপুরের পর বিভিন্ন কেন্দ্রে অনিয়মের অভিযোগ ওঠে।

একাধিক কেন্দ্রে পোলিং এজেন্টদের বাধা দেয়া বা জোরপূর্বক বের করা, ভোট গণনার সময় দীর্ঘসূত্রতা, ফলাফল ঘোষণায় বিলম্ব এবং রেজাল্টশিটে ঘষামাজার ঘটনা জনমনে সন্দেহ সৃষ্টি করেছে। এছাড়া প্রশাসনিক পদে চুক্তিভিত্তিক নিয়োগ ও রাজনৈতিক প্রভাবশালী কর্মকর্তাদের পদায়ন নির্বাচনকে পক্ষপাতমূলক ও প্রভাবিত করেছে। নির্বাচন-পরবর্তী পরিস্থিতি ছিল আরো উদ্বেগজনক। দুই শতাধিক সহিংস ঘটনা ঘটেছে, যার মধ্যে হত্যাকাণ্ড, শারীরিক হামলা, অগ্নিসংযোগ, লুটপাট ও রাজনৈতিক প্রতিহিংসা অন্তর্ভুক্ত।

ইডব্লিউএ মনে করে, এ নির্বাচন অংশগ্রহণ ও প্রক্রিয়ার দিক থেকে গুরুত্বপূর্ণ হলেও, কলঙ্ক ও সহিংসতামুক্ত হয়নি।

নিরাপত্তাবাহিনীর ভূমিকা : একটি বিরল নিরপেক্ষতা
নির্বাচনে বাংলাদেশ সেনাবাহিনী নিরপেক্ষ ভূমিকা পালন করেছে। তারা ভোটকেন্দ্র ও আশপাশ এলাকায় শৃঙ্খলা বজায় রেখেছে, কিন্তু রাজনৈতিক প্রক্রিয়ায় হস্তক্ষেপ করেনি। অতীতের নির্বাচনের তুলনায় এটি উল্লেখযোগ্য পরিবর্তন, যা জনগণের আস্থা বৃদ্ধিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে। সেনাবাহিনী তাদের পেশাদারিত্ব এবং দায়িত্ববোধের পরিচয় দিয়ে প্রমাণ করেছে, তারা নিরপেক্ষভাবে কাজ করতে এবং গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়ায় গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখতে পারে।

একইভাবে, বাংলাদেশ পুলিশও অধিকাংশ ক্ষেত্রে দায়িত্বশীল ও নিরপেক্ষ আচরণ করেছে। দেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে নিরাপত্তাবাহিনীর এমন নিরপেক্ষ আচরণ বিরল। এই নিরপেক্ষতা নির্বাচনী আস্থার ভিত্তি শক্ত করেছে এবং গণতান্ত্রিক সংস্কৃতি এগিয়ে নেয়ার ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ সাফল্য হিসেবে চিহ্নিত হচ্ছে।

সিভিল প্রশাসন ও নির্বাচন কমিশন : দুর্বলতার কেন্দ্র
নির্বাচনে সিভিল প্রশাসন ছিল সবচেয়ে দুর্বল অংশগুলোর একটি। নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট ও প্রিজাইডিং অফিসারদের অনেকেই নির্বাচনী নিয়ম ও বিধি কঠোরভাবে প্রয়োগে সক্ষম হননি। পর্যবেক্ষকরা ভোটকেন্দ্রগুলোতে স্বচ্ছতার অভাব এবং প্রশাসনিক অসঙ্গতির উদাহরণ তুলে ধরেছেন। গণনা ও ফলাফল প্রস্তুত প্রক্রিয়ায় স্বচ্ছতার ঘাটতি ছিল।

নির্বাচন কমিশন ভোটার তালিকা হালনাগাদ, প্রবাসী ভোটার এবং ডাক ভোটব্যবস্থায় সফল হলেও ফলাফল প্রস্তুত ও ঘোষণায় প্রযুক্তিগত দক্ষতা দেখাতে পারেনি। আধুনিক নির্বাচনে কেবল ব্যালট গ্রহণ নয়, তথ্য ব্যবস্থাপনা এবং ফলাফল সঙ্কলনও সমান গুরুত্বপূর্ণ। এ ক্ষেত্রে কমিশনের ঘাটতি ছিল।

অন্তর্বর্তী সরকারের নিরপেক্ষতা নিয়ে বিতর্ক
২০২৬ সালের নির্বাচনের প্রক্রিয়ায় অন্তর্বর্তী সরকারের নিরপেক্ষতা ছিল সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ শর্তগুলোর একটি। জনগণ ও রাজনৈতিক দলগুলো আশা করেছিল, অন্তর্বর্তী সরকার ভোটগ্রহণ এবং ক্ষমতার হস্তান্তরপ্রক্রিয়ায় সম্পূর্ণ নিরপেক্ষ থাকবে। তবে নির্বাচনের আগে কিছু উপদেষ্টার সাথে বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দলের ঘনিষ্ঠতার অভিযোগ ওঠে। এতে নির্বাচনের নিরপেক্ষতা নিয়ে সন্দেহ সৃষ্টি হয়। তবে প্রধান উপদেষ্টা মুহাম্মদ ইউনূস ব্যক্তিগতভাবে তুলনামূলক নিরপেক্ষ ভাবমর্যাদা বজায় রেখেছেন। তার নৈতিক অবস্থান এবং রাজনৈতিক ব্যক্তিত্ব ভোটারদের মধ্যে আংশিক আস্থা পুনঃস্থাপন করে। তিনি রাজনৈতিক পক্ষপাত এড়িয়ে চলার চেষ্টা করেছেন, যা নির্বাচনের শান্তিপূর্ণ ও গ্রহণযোগ্য পরিবেশ সৃষ্টিতে সাহায্য করেছে।

এর পরও পুরো অন্তর্বর্তী সরকারের ব্যবস্থাকে দলনিরপেক্ষ বলা কঠিন। কিছু উপদেষ্টার রাজনৈতিক প্রভাব এবং পূর্ববর্তী সম্পর্ক ভোটপ্রক্রিয়ার স্বচ্ছতা ও নিরপেক্ষতা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছে। এর অর্থ হলো, ভবিষ্যতে অন্তর্বর্তী সরকারের ক্ষমতা ও দায়িত্ব কার্যকরভাবে নিরপেক্ষ রাখতে আরও কাঠামোগত সংস্কার অপরিহার্য।

গণমাধ্যম : ক্ষমতার সাথে অবস্থান বদল
২০২৬-এর জাতীয় নির্বাচনে দেশের গণমাধ্যম স্বাধীন ও নিরপেক্ষ ভূমিকা রাখতে পারেনি। নির্বাচনের আগে বেশির ভাগ সংবাদমাধ্যম বাংলাদেশ আওয়ামী লীগ সরকারের প্রতি সমর্থনসূচক এবং তোষামোদমূলক রিপোর্টিং করেছে। তারা নানাভাবে ক্ষমতাসীন দলের কর্মকাণ্ডের প্রশংসা করেছে এবং বিরোধী শক্তি বা অভিযোগগুলোকে হালকা বা উপেক্ষা করেছে।

নির্বাচনের পর, যখন বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল ও তাদের জোট শক্তিশালী অবস্থান লাভ করেছে, তখন গণমাধ্যমের অনেক অংশ তাদের প্রতি আনুগত্য দেখাতে শুরু করেছে। এই দোলাচল প্রমাণ করে, সংবাদমাধ্যম কাঠামোগতভাবে রাজনৈতিক চাপ ও প্রভাবের কাছে কতটা সংবেদনশীল।

ভয়, আর্থিক প্রভাব এবং রাজনৈতিক চাপ— এসব মিলিয়ে সাংবাদিকতা প্রায়শই দলীয় প্রচারণার হাতিয়ার হয়ে ওঠে। ফলস্বরূপ, সাধারণ জনগণ স্বচ্ছ তথ্যের পরিবর্তে পক্ষপাতমূলক সংবাদ পেয়েছে। গণমাধ্যমের এই দ্বৈত চরিত্র ভোটারদের সিদ্ধান্ত গ্রহণে বিভ্রান্ত করেছে।

সাংবাদিকতার দায়িত্বপূর্ণ ও নিরপেক্ষ ভূমিকা নিশ্চিত করতে হলে রাষ্ট্র, রাজনৈতিক দল এবং সাংবাদিক সংগঠনগুলোকে কাঠামোগত সংস্কার ও স্বাধীনতা প্রদানের পদক্ষেপ নিতে হবে। না হলে, গণমাধ্যম ক্ষমতার সাথে অবস্থান পরিবর্তনের ধারায় সীমাবদ্ধ থাকবে; গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়ায় পূর্ণ সমর্থন দিতে পারবে না।

আঞ্চলিক ও আন্তর্জাতিক প্রভাব
নির্বাচন দেশের অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক প্রক্রিয়া হলেও, এবারের নির্বাচনে আঞ্চলিক এবং আন্তর্জাতিক ভূ-রাজনীতির গুরুত্বপূর্ণ প্রভাব ছিল। বিশেষ করে ভারতের গোয়েন্দা সংস্থা ‘র’-এর সক্রিয়তার বিষয়ে রাজনৈতিক মহলে ব্যাপক আলোচনা হয়েছে। ভারতের উদ্দেশ্য ছিল বাংলাদেশের রাজনৈতিক পরিবেশে প্রভাব বিস্তার ও ১১ দলীয় জোটের নির্বাচনী সম্ভাবনা সীমিত করা। একই সঙ্গে পাকিস্তান ও চীনও এ জোটের ফলাফলের প্রতি আগ্রহী ছিল; তারা দেখতে চেয়েছিল বাংলাদেশে রাজনৈতিক ভারসাম্য কেমনভাবে প্রতিফলিত হয়। এই আঞ্চলিক মনোযোগ প্রমাণ করে, বাংলাদেশের নির্বাচন শুধু অভ্যন্তরীণ গণতন্ত্রের পরীক্ষা নয়, বরং দক্ষিণ এশিয়ার রাজনৈতিক স্থিতির সাথেও সম্পর্কিত।

আন্তর্জাতিক পর্যবেক্ষণ সংস্থাগুলো অবশ্য ভোট প্রক্রিয়াকে ইতিবাচকভাবে মূল্যায়ন করেছে। কমনওয়েলথ অবজারভার গ্রুপ নির্বাচনকে ‘স্বচ্ছ, শান্তিপূর্ণ এবং গ্রহণযোগ্য’ হিসেবে উল্লেখ করেছে। ইন্টারন্যাশনাল রিপাবলিকান ইনস্টিটিউট ভোটারদের উৎসাহ এবং অংশগ্রহণকে গণতান্ত্রিক শক্তির প্রমাণ হিসেবে নিয়েছে। তারা ভোটারদের দীর্ঘ অপেক্ষা, শৃঙ্খলাবদ্ধ লাইন এবং সক্রিয় ভোটদানকে দেশের রাজনৈতিক পরিপক্বতার দৃষ্টান্ত হিসেবে দেখেছে।

তবে আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি সব সমস্যার সমাধান নয়। প্রশাসনিক দুর্বলতা, ভোট গণনায় স্বচ্ছতার ঘাটতি এবং সামাজিকমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া অভিযোগ আস্থার সঙ্কট তৈরি করেছে। অর্থাৎ অভ্যন্তরীণ প্রক্রিয়া ও সুশাসনের উন্নয়নের জন্য আরো স্বচ্ছতা, প্রযুক্তিনির্ভর ব্যবস্থা এবং রাজনৈতিক সদিচ্ছা প্রয়োজন। এই নির্বাচনের আঞ্চলিক ও আন্তর্জাতিক প্রভাব বাংলাদেশের ভবিষ্যৎ নীতি-প্রণয়ন এবং কূটনৈতিক অবস্থানকে প্রভাবিত করবে, কিন্তু ভেতরের রাজনৈতিক সংস্কারকে অবহেলা করে শুধু বাহ্যিক স্বীকৃতি গ্রহণ করা যথেষ্ট নয়।

কার লাভ, কার ক্ষতি : বিএনপি ও ১১ দলের অর্জন
নির্বাচনে বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল দুই-তৃতীয়াংশের বেশি আসনে জয়ী হয়ে ক্ষমতার কেন্দ্রে অবস্থান পেয়েছে। এটি কেবল সংখ্যাগত জয় নয়, বরং দীর্ঘ সময় ধরে অব্যাহত রাজনৈতিক প্রস্তুতি, সাংগঠনিক শক্তি এবং জনমতের ধারাবাহিকতার ফল। বিএনপির সাফল্যের পেছনে তিনটি মূল কারণ বিশেষভাবে লক্ষণীয়— প্রথম, দলীয় সাংগঠনিক ক্ষমতা; নির্বাচনী প্রচারণা, স্থানীয় কমিটি ও কর্মীদের সক্রিয়তা ভোটারদের কাছে কার্যকরভাবে পৌঁছেছে। দ্বিতীয়, ঐতিহাসিক নেতৃত্বের প্রতীক, জনপ্রিয় নেত্রীর প্রতিচ্ছবি ভোটারদের মধ্যে আস্থা ও আবেগ সৃষ্টি করেছে। তৃতীয়, আর্থিক সক্ষমতা।

এছাড়া, ১১ দলীয় জোটের অংশ হিসেবে বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী ৭৭টি আসন অর্জন করেছে। দলটি বিশেষত তরুণ ও নারী ভোটারদের মধ্যে প্রভাব বিস্তার করতে পেরেছে। জোটের অভ্যন্তরীণ সংহতি, নির্বাচনী মেনিফেস্টো এবং কার্যকর জনসংযোগ তাদের বিজয়ে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। তবে প্রশাসনের সহায়তা ও গণমাধ্যমের সমর্থনের অভাব তাদের কিছু অঞ্চলে শক্তি সীমিত করেছে।

ফলে বিএনপি ও ১১ দলীয় জোট কেবল সংখ্যাগতভাবে নয়, রাজনৈতিক মানসিকতাতেও নতুন প্রভাব বিস্তার করেছে। তাদের এই জয় দেশীয় রাজনীতিতে শক্তিশালী বিরোধী দল, গণতান্ত্রিক প্রতিদ্বন্দ্বিতা এবং নীতিভিত্তিক রাজনৈতিক সংস্কারের সম্ভাবনার নতুন মাইলফলক হিসেবে দেখা যেতে পারে। এই অর্জন আগামী সংবিধান সংস্কার ও রাজনৈতিক সমঝোতার প্রক্রিয়ায় বিএনপির প্রভাব সুদৃঢ় করবে।

সংবিধান সংস্কার গণভোট : ভবিষ্যতের দিকনির্দেশ
নির্বাচনের সাথে অনুষ্ঠিত সংবিধান সংস্কার গণভোট ছিল বাংলাদেশের গণতান্ত্রিক যাত্রার একটি মোড় ঘোরানো অধ্যায়। প্রায় ৬৮ শতাংশ ভোটার সংস্কারের পক্ষে মত দিয়ে স্পষ্ট বার্তা দিয়েছেন যে, জনগণ শুধু সরকার পরিবর্তন নয়, শাসনব্যবস্থারও কাঠামোগত রূপান্তর চায়। এটি কোনো সাধারণ রাজনৈতিক সিদ্ধান্ত নয়, বরং রাষ্ট্রের ভবিষ্যৎ চরিত্র নির্ধারণের একটি ঐতিহাসিক ম্যান্ডেট। দীর্ঘদিনের ক্ষমতার কেন্দ্রীকরণ, দুর্বল জবাবদিহি ও প্রাতিষ্ঠানিক অকার্যকারিতার অভিজ্ঞতা থেকে জনগণ একটি অধিক ভারসাম্যপূর্ণ, গণমুখী ও দায়বদ্ধ সংবিধান প্রত্যাশা করছে।

তবে গণভোটের ফলাফল কেবল ইচ্ছার প্রকাশ— বাস্তব পরিবর্তন নির্ভর করছে রাজনৈতিক সদিচ্ছার ওপর। এখন দায়িত্ব মূলত সংখ্যাগরিষ্ঠ দলের, যারা এই ম্যান্ডেটকে আইনে রূপ দেবে।

গণতন্ত্রের পথচলার মাঝামাঝি
জাতীয় নির্বাচন ২০২৬ নিখুঁত ছিল না, এটি ছিল ‘অসম্পূর্ণ সাফল্য’। তবে নির্বাচনকে শুধু সাফল্য হিসেবে দেখাও পুরোপুরি যথাযথ নয়। নির্বাচনের অসঙ্গতিগুলো উপেক্ষা করার মতো নয়। ২০২৬ সালের নির্বাচন বাংলাদেশের গণতান্ত্রিক যাত্রার মধ্যবর্তী ধাপকে চিহ্নিত করছে-এটি একদিকে সাফল্য, অন্যদিকে ভবিষ্যতের জন্য শিক্ষা ও চ্যালেঞ্জের নির্দেশক।

লেখক : নির্বাহী সম্পাদক, নয়া দিগন্ত

[email protected]