সাবরিনা নাজ
বাংলাদেশ একটি বদ্বীপ দেশ। পুরো দেশজুড়ে রয়েছে নদী, হাওর, বাঁওড় (প্রায় ৫৪ হাজার ৪৮৮ হেক্টর), প্রাকৃতিক ও কৃত্রিম হ্রদ, বিল, ম্যানগ্রোভ বন (প্রায় পাঁচ লাখ ৭৭ হাজার ১০০ হেক্টর), সোয়াম্প ফরেস্ট, পুকুর ও দীঘি (প্রায় এক লাখ ৪৭ হাজার হেক্টর), মোহনা এবং প্লাবনভূমিসহ অসংখ্য জলাধারের জটিল জাল। এসব জলাধার নিজস্ব বৈশিষ্ট্যে অনন্য ও গতিশীল বাস্তুতন্ত্র।
রামসার কনভেনশন অনুযায়ী, বাংলাদেশের প্রায় দুই-তৃতীয়াংশ অঞ্চল জলাভূমি হিসেবে শ্রেণিবদ্ধ, যার মধ্যে সামুদ্রিক পানিও অন্তর্ভুক্ত— যেখানে ভাটার সময় পানির গভীরতা ছয় মিটারের বেশি নয়। দেশের মোট আয়তনের অন্তত ৬.৭ শতাংশ এলাকা সবসময় পানির নিচে থাকে; ২১ শতাংশ এলাকা গভীরভাবে প্লাবিত এবং ৩৫ শতাংশ এলাকা অগভীর প্লাবনের অভিজ্ঞতা লাভ করে।
বাংলাদেশের মানুষের দৈনন্দিন জীবনে জলাভূমি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। জলাভূমির ব্যবহার সবার জীবনের অংশ হয়ে উঠেছে। এটি আমাদের সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যেরও অংশ— খ্যাতনামা গান, নাটক, সাহিত্যকর্ম, প্রামাণ্যচিত্র ও চলচ্চিত্রে জলাভূমির উপস্থিতি লক্ষ করা যায়। যদিও শহরের মানুষ এখনো একে প্রধানত বিনোদনের মাধ্যম হিসেবে দেখে। বিভিন্ন জীবিকা প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে জলাভূমির সাথে জড়িত। যেমন— জেলে, মাঝি, বেদে সম্প্রদায় (জলযাযাবর), কৃষক, শামুক-ঝিনুক সংগ্রাহক, ভোজ্য জলজ উদ্ভিদ সংগ্রাহক ও ভেষজ চিকিৎসক।
জলাভূমি জীববৈচিত্র্যে সমৃদ্ধ। জীববৈচিত্র্য নিজেই একটি সম্পদ। জলাভূমির প্রতিটি প্রাণ তার অস্তিত্ব, বৃদ্ধি ও প্রজননের জন্য জলাভূমির ওপর নির্ভরশীল। একই সাথে তারা নিজ নিজ আবাসস্থলে ভূমিকা রাখে; শক্তি ও পুষ্টি বিভিন্ন স্তরে স্থানান্তরে সহায়তা করে এবং মৃত্যুর পর সঞ্চিত শক্তি ও রাসায়নিক পদার্থ পরিবেশে ফিরিয়ে দেয়।
প্রতিটি জলাভূমিতে জীব ও জড় উপাদানের পারস্পরিক নির্ভরতা অত্যন্ত গভীর। অতিবৃষ্টি বা উজানের অতিরিক্ত পানির প্রবাহ থেকে সৃষ্ট বন্যা প্রতিরোধে জলাভূমি অতিরিক্ত পানি শোষণ করে। এটি নদীর পানির স্তর স্বাভাবিক রাখতে এবং পানি বিশুদ্ধ করতে সহায়তা করে।
জলাভূমিতে জন্মায় নানা উদ্ভিদ, প্ল্যাঙ্কটন ও পোকামাকড়, যা মাছসহ অন্যান্য প্রাণীর খাদ্য সরবরাহ করে। মানবসৃষ্ট কর্মকাণ্ডে দূষিত নদীর পানি পুনরুজ্জীবিত করতেও জলাভূমি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। বহু প্রাণী, বিশেষত পাখি, পরিযান ও প্রজননকালে জলাভূমিকে আবাসস্থল হিসেবে ব্যবহার করে।
বিশ্বে জলাভূমিই একমাত্র বাস্তুতন্ত্র, যার সংরক্ষণের জন্য বিশেষ আন্তর্জাতিক চুক্তি ও কনভেনশন রয়েছে। বাংলাদেশ সরকারও জাতীয় জলনীতি ১৯৯৯-সহ বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত ও ঘোষণা দিয়েছে, যদিও একটি পৃথক জাতীয় জলাভূমি নীতিও রয়েছে। ২০২৫ সালে অন্তর্বর্তী সরকার রাজশাহী বিভাগে দু’টি জলাভূমিকে সংরক্ষিত এলাকা হিসেবে ঘোষণা করেছে।
তবুও সব প্রচেষ্টা সত্ত্বেও বর্তমান পরিস্থিতি সন্তোষজনক নয়; বরং উদ্বেগজনক। প্রায় ৪৫ শতাংশ জলাভূমি ইতোমধ্যে বিলুপ্ত হয়েছে। ঢাকার নদী ও খালের পরিমাণ যথাক্রমে ৭৬.৬৭ ও ১৮.৭২ শতাংশ কমেছে। ১৯৯০ থেকে ২০২৪ সালের মধ্যে সারা দেশে জলাধারের আয়তন পরিবর্তনের হার ১৫.৭৪ থেকে ৩.৪৩ শতাংশে নেমে এসেছে।
জলাভূমি অবক্ষয়ের প্রধান কারণগুলোর মধ্যে রয়েছে—
অতিরিক্ত সম্পদ আহরণ, নির্বিচারে রাসায়নিক সার-কীটনাশক-আগাছানাশক ব্যবহার, জ্বালানি কাঠ সংগ্রহ, অবৈধ পাখি শিকার, অতিরিক্ত জনসংখ্যার চাপ এবং বিদেশী প্রজাতির আগ্রাসন।
কী করা যেতে পারে?
জলাভূমির মূল্য ও আমাদের জীবনে এর অপরিহার্যতা সম্পর্কে সচেতনতা বৃদ্ধি করতে হবে। জীববৈচিত্র্যের মূল্যায়ন ও মানচিত্রায়ন করতে হবে। জলাভূমি লিজ ব্যবস্থাপনা সঠিকভাবে পরিচালনা করতে হবে। গ্রামীণ অঞ্চলে ধান চাষের ধারণায় পরিবর্তন আনতে হবে। সংরক্ষণের জন্য জলাভূমির চার পাশে বাফার জোন গঠন করতে হবে।
ভূ-স্থানিক (Geospatial) প্রযুক্তি ব্যবহার করে জলাভূমির পরিবর্তন পর্যবেক্ষণ ও পূর্বাভাসভিত্তিক মডেল তৈরি করে সংরক্ষণ কৌশল নির্ধারণ করতে হবে। মাটিবিহীন কৃষি (soil-less agriculture) উৎসাহিত করতে হবে। আগাছানাশক, কীটনাশক ও অজৈব সারের ব্যবহার কমাতে হবে। পলিথিন ও পলিথিনজাত পণ্যের ব্যবহার সীমিত করতে হবে। আন্তঃসীমান্ত পানি বণ্টন নিয়ে কার্যকর আলোচনা করতে হবে। এসব উদ্যোগ একসাথে বাস্তবায়ন করতে পারলে ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য জলাভূমি সংরক্ষণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখা সম্ভব হবে।
লেখক : অধ্যাপক ও চেয়ারপারসন, উদ্ভিদবিদ্যা বিভাগ, রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়



