মুহাম্মদ জামাল উদ্দিন
রাজধানীসহ দেশের প্রতিটি জেলার তিন হাজার স্পটে ছোট-বড় সব রকম যানবাহন থেকে চাঁদা আদায় করা হচ্ছে। কোনো সমঝোতা নয়, এক প্রকার মালিক-শ্রমিকদের জিম্মি করে চলছে এ চাঁদাবাজি। সরকারদলীয় প্রভাবশালীদের আশ্রয়ে সিন্ডিকেটের মাধ্যমে সড়ক-মহাসড়কে চাঁদাবাজি করা হচ্ছে।
৫ আগস্ট-পরবর্তী অন্তর্বর্তী সরকার ক্ষমতা গ্রহণ করার পর মানুষ ভেবেছিল চাঁদাবাজি চিরতরে বন্ধ হয়ে যাবে। ইউনূস সরকার ক্ষমতা গ্রহণের কয়েক দিন পর থেকে পরিবহন সেক্টরে চাঁদাবাজি নতুন করে শুরু হয়। চাঁদাবাজের শুধু হাত বদল হয়েছে। বহু জায়গায় নতুন-পুরাতন যৌথভাবে এ কার্যক্রম সম্পাদন করছে। এতে করে চাঁদার হারও বিগত সময়ের তুলনায় বৃদ্ধি পেয়েছে। চক্রের নাম পরিবর্তন আর রসিদের রঙ বদলিয়ে চলছে কোটি কোটি টাকার চাঁদা বাণিজ্য।
সমিতির নামে টোকেন ব্যবহার করে তোলা হয় চাঁদা। ট্রাক-শ্রমিক কল্যাণ সমিতি, মালিক-শ্রমিক ফেডারেশন, বাসটার্মিনাল, সড়ক-পরিববহন টোল, পৌরসভা ও সিটি করপোরেশনের নাম করে তোলা হয় চাঁদা। কোথাও চাঁদা নেয়া হচ্ছে টার্মিনাল ব্যবস্থাপনার নামে, কোথাও পার্কিংয়ের নামে। সড়কে দায়িত্ব পালন করা আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্য, গোয়েন্দা সংস্থার সদস্য এবং থানা পুলিশের এক শ্রেণীর অসাধু সদস্য এসব চক্রের সাথে যুক্ত।
শ্রমিক ও মালিক সংগঠনের কল্যাণের নামে যে অর্থ আদায় করা হয় তা স্রেফ চাঁদাবাজি। এসব চাঁদার ৯০ শতাংশ চালক কন্ট্র্রাক্টরদের ইচ্ছার বিরুদ্ধে জোরপূর্বক নেয়া হয়। চাহিদামাফিক চাঁদার টাকা না দিলে গাড়ি ভাঙচুর ছাড়াও মারধর করা হয়। মাঠপর্যায় থেকে তোলা চাঁদার টাকা বিভিন্ন হাত ঘুরে কোথায় যায় এ বিষয়ে কেউ মুখ খুলতে চান না।
পণ্য পরিবহনের চাঁদাবাজিতে জড়িত প্রভাবশালী ক্ষমতাসীন রাজনৈতিক দলের নেতারা। তাদের ছত্রছায়ায় কর্মীবাহিনীর মাধ্যমে প্রতিদিন সড়ক-মহাসড়কে কার্যক্রম চালিয়ে যাচ্ছে। নিরুপায় হয়ে পরিবহন চালক ও মালিকরা বছরের পর বছর ধরে এসব চাঁদা পরিশোধ করে যাচ্ছেন। এই চাঁদার উপর ভর করে এক শ্রেণীর মালিক-শ্রমিক নেতা জিরো থেকে হিরো বনে গেছেন। কেউ কেউ এমপি-মন্ত্রীও হয়েছেন। সারা দেশে এ সেক্টরে লাখ লাখ সাধারণ শ্রমিককে পুঁজি করে রাজনীতির হাত শক্তিশালী করাসহ রাজনীতিকে জিম্মি করেছেন। প্রতিটি রাজনৈতিক সরকার নানা কারণে এ চক্রের কাছে জিম্মি হয়ে পড়ে। আছে হাটবাজারের খাজনা এবং মধ্যস্বত্বভোগীর দৌরাত্ম্য। ঢাকা-শহরের বাজারে কিভাবে কাঁচামালের দাম বেড়ে যায় তার নমুনা সম্প্রতি একটি দৈনিকের অনুসন্ধানে বেরিয়ে আসে।
বগুড়ার বাজার থেকে ক্রয়কৃত ৩৫ টাকা দামের বেগুন ঢাকার বাজারে এসে প্রতি কেজি ১০০ টাকা হয়ে যায়।
বগুড়া থেকে সবজি বোঝাই ট্রাক মাল নিয়ে ঢাকা আসতে জায়গায় জায়গায় চাঁদা, টোল খরচ ও খাজনা দিতে হয়। ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট গণ-অভ্যুত্থানে হাসিনা সরকারের পতনের পর জনগণের প্রত্যাশা ছিল— দেশ চাঁদাবাজমুক্ত হবে। কিন্তু পরিস্থিতির দৃশ্যমান কোনো পরিবর্তন হয়নি।
লেখক : প্রাবন্ধিক ও কলামিস্ট



