পুরনো ব্যবস্থা না পরিবর্তন

চব্বিশ একটি সুযোগ সৃষ্টি করেছে মাত্র। আজকের নির্বাচন ঠিক করবে, চব্বিশের ধারাবাহিকতায় প্রফেসর ইউনূস যে পরিবর্তনের সূচনা করেছেন তা কি পূর্ণতা লাভ করবে, নাকি পুরনো কর্তৃত্ববাদী ফ্যাসিস্ট ব্যবস্থাই ফিরে আসবে? দেশ কি দুর্নীতির রাহুগ্রাস থেকে মুক্তি লাভ করবে, নাকি লুটপাট, চাঁদাবাজি এ দেশের স্থায়ী বিধি লিপিতে পরিণত হবে? ভারতীয় আধিপত্যবাদ ফের ফিরে আসবে, নাকি বিশ্ব মঞ্চে এ দেশ ক্রমেই নিজেকে একটি আত্মমর্যাদাশীল জাতি হিসেবে মেলে ধরবে

ড. মুহম্মদ দিদারে আলম মুহসিন
অনেক প্রতীক্ষার পর অবশেষে ১২ ফেব্রুয়ারি, ২০২৬ এ দেশের মানুষ ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে তাদের ভোটাধিকার প্রয়োগ করছে। একই দিনে জুলাই সনদের ওপর গণভোটও অনুষ্ঠিত হচ্ছে।

বাংলাদেশের জন্য এটি একটি ঐতিহাসিক মুহূর্ত। চব্বিশের জুলাইয়ে এ দেশের আপামর জনতা বিশেষ করে তরুণ সমাজ যে বিপুল স্বপ্ন ও আশাবাদ নিয়ে জীবনবাজি রেখে ভারতের মদদপুষ্ট ফ্যাসিস্ট রেজিমকে উপড়ে ফেলেছিল, ১২ তারিখের নির্বাচনের ফলাফল তার ভবিষ্যৎ গতিপথ ঠিক করে দিতে পারে।

চব্বিশের আগস্টে এক রক্তক্ষয়ী গণ-অভ্যুত্থানের পর প্রফেসর ড. ইউনূস যখন এ দেশটি পরিচালনার দায়িত্ব নিজ কাঁধে তুলে নেন, তখন দেশের সব প্রতিষ্ঠান ও শৃঙ্খলা ভেঙে পড়েছিল। পতিত শক্তির দোসররা দেশের ভেতর থেকে নানাভাবে তার ওপর চাপ সৃষ্টি করে যাচ্ছিল যেন তিনি দেশটাকে স্থিতিশীল করতে না পারেন। অন্য দিকে তাদের পৃষ্ঠপোষক ভারতীয় আধিপত্যবাদ এ দেশে একটি কট্টর ইসলামী শক্তি ক্ষমতায় আসছে এবং সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের ওপর ব্যাপক নির্যাতন-নিপীড়ন চালাচ্ছে বলে ক্রমাগত অপপ্রচার চালিয়ে আন্তর্জাতিক অঙ্গনে বাংলাদেশকে প্রশ্নের মুখোমুখি করার সর্বোচ্চ অপচেষ্টা চালায়। উদ্দেশ্য, এত দিন যেভাবে তারা এ দেশটাকে তাদের তল্পিবাহক বানিয়ে শোষণ করে আসছিল, তা যেন অব্যাহত রাখা যায়।

দায়িত্ব গ্রহণের পর অন্তর্বর্তী সরকারের তাৎক্ষণিক দায়িত্ব হয়ে দাঁড়ায় জুলাই আন্দোলনের শহীদদের পরিবারকে সহায়তা দেয়া এবং আহতদের যথাযথ চিকিৎসা ও পুনর্বাসনের ব্যবস্থা করা, দেশে সামগ্রিক স্থিতিশীলতা ফিরিয়ে আনা এবং ভারতের বিরূপ প্রোপাগান্ডা মোকাবেলা করে আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলে দেশের ভাবমর্যাদা ধরে রাখা। দেশের মানুষ চেয়েছিল, এ দেশের তরুণ যুবারা তাদের বুকের তাজা রক্ত দিয়ে আধিপত্যবাদী শক্তির যে বিদায় ঘণ্টা বাজিয়েছে, তা যেন ফের ফিরে না আসতে পারে। পতিত রেজিম দেশের মানুষের উপর যে নিপীড়ন-নির্যাতন ও নির্বিচার হত্যাকাণ্ড চালিয়েছে, তা যেন ইনসাফ পূর্ণ বিচারের আওতায় আসে এবং রাষ্ট্র ব্যবস্থায় যেন একটি গুণগত পরিবর্তন আসে, যা ভবিষ্যতে রাষ্ট্রের বিভিন্ন অঙ্গের মধ্যে ক্ষমতার ভারসাম্য আনবে এবং ক্ষমতাসীনদের দেশের মানুষের কাছে জবাবদিহি করতে বাধ্য করবে। মানুষের আরো প্রত্যাশা ছিল, জুলাই অভ্যুত্থান চলাকালে যে বিপুলসংখ্যক মানুষ আহত-নিহত হয় কেবল তা নয়; বরং পতিত ফ্যাসিজমের সময়ে পিলখানা হত্যাকাণ্ড, শাপলা চত্বর হত্যাকাণ্ডসহ যে বিপুল সংখ্যক মানুষ বিনাবিচারে গুম-খুনের শিকার হয়েছে, প্রফেসর ইউনূসের সরকার এক এক সবগুলো বিষয় যথাযথ তদন্তসাপেক্ষে উপযুক্ত বিচারের আওতায় নিয়ে আসবে।

আপাতদৃষ্টিতে প্রফেসর ইউনূসের অন্তর্বর্তী সরকার এসব লক্ষ্য পূরণের উচ্চাভিলাষী পরিকল্পনা নিয়ে যাত্রা শুরু করেছিল বলেই অভিজ্ঞ মহলের ধারণা। কিন্তু দেশী-বিদেশী কায়েমি শক্তি শুরু থেকেই তাকে চেপে ধরে, যাতে তিনি দ্রুত একটি নির্বাচন দিয়ে সরে পড়তে বাধ্য হন। উপরন্তু সময়ের সাথে সাথে এটিও স্পষ্ট হতে থাকে, অর্পিত গুরু দায়িত্ব পালনে যে ধরনের অভিজ্ঞতা, মেজাজ ও দৃঢ়তার প্রয়োজন ছিল, তিনি যে টিমটি নিয়ে যাত্রা শুরু করেন তার মধ্যে এসবের যথেষ্ট ঘাটতি রয়েছে। তবুও অকূল পাথারে নাও ভাসানো এক হার-না-মানা নাবিকের মতো সব ঝড়-ঝঞ্ঝার সাথে যুদ্ধ করে তিনি পরম ধৈর্যে দাঁড় বেয়ে গেছেন। এ ক্ষেত্রে একজন দক্ষ সমঝোতাকারীর ভূমিকা নিয়ে তাকে এক দিকে যেমন খেয়াল রাখতে হয়েছে, দেশের ক্ষমতাপ্রত্যাশী রাজনৈতিক দলগুলো যেন তাদের ধৈর্য হারিয়ে না ফেলে, অন্য দিকে দেশের সাধারণ মানুষ যেন ভেবে না বসে যে, তিনি তাদের চাওয়া-পাওয়াগুলো আপসের চোরাবালিতে জলাঞ্জলি দিয়েছেন।

চার দিক থেকে যখন উনাকে চেপে ধরা হচ্ছিল, তখন উনি স্পষ্ট করে বললেন, ১৮ থেকে ২৪ মাসের মধ্যে উনি তার ওপর অর্পিত দায়িত্ব শেষ করে একটি নির্বাচন দিয়ে চলে যাবেন। একপর্যায়ে দেশের একটি প্রধান রাজনৈতিক দলের শীর্ষ নেতার সাথে কথা বলে তিনি আরো সুনির্দিষ্ট করে ’২৬-এর ফেব্রুয়ারির মাঝামাঝি নির্বাচনের আয়োজন করবেন বলে জানান। সব চ্যালেঞ্জ মোকাবেলা করে এবং সন্দেহ বাতিকে আক্রান্তদের মুখে চুনকালি দিয়ে তিনি অবশেষে প্রমাণ করলেন, তিনি এক কথার মানুষ।

প্রশ্ন হলো— তিনি যেসব গুরুদায়িত্ব কাঁধে নিয়ে তার যাত্রা শুরু করেছিলেন তার কদ্দুর কী হলো? মোটা দাগে বলা যায়, তার অনুরোধে জাতিসঙ্ঘের ব্যবস্থাপনায় জুলাই হত্যাকাণ্ডের একটি আন্তর্জাতিক তদন্ত সম্পন্ন হয়েছে, জুলাই হত্যাকাণ্ডের জন্য দায়ী শীর্ষ ব্যক্তিদের বিচার হয়েছে, একটি কমিশন গঠন করে পতিত ফ্যাসিজমের সময়কালীন গুমের ঘটনাগুলোর তদন্ত হয়েছে, বেশ কিছু চাকরিরত সেনা কর্মকর্তাসহ গুমের ঘটনায় জড়িত ব্যক্তিদের বিচারের মুখোমুখি করা হয়েছে, একটি স্বাধীন কমিশন গঠন করে পিলখানা হত্যাকাণ্ডের অধিকতর তদন্ত সম্পন্ন করা হয়েছে এবং সর্বোপরি দেশের মানুষের আকাঙ্ক্ষার নিরিখে দেশের সামগ্রিক সংস্কারের লক্ষ্যে একটি সনদ প্রণীত হয়েছে। এর বাইরে তার প্রায় পৌনে দুই বছরের দায়িত্বকালের একটি উল্লেখযোগ্য দিক ছিল, তিনি ভারতের চোখরাঙানিকে উপেক্ষা করে একটি স্বাধীন পররাষ্ট্রনীতি অনুসরণের চেষ্টা করে গেছেন।

দেশে মোটামুটিভাবে একটি স্থিতিশীল অবস্থা ফিরিয়ে আনতে সক্ষম হলেও প্রফেসর ইউনূসের সরকার কিছু ক্ষেত্রে নিদারুণ ব্যর্থতার পরিচয় দেয়। পতিত ফ্যাসিজম দেশময় বিভিন্ন সেক্টরে লুটপাট ও চাঁদাবাজির এক অভয়ারণ্য তৈরি করেছিল। দেখা গেল, তাদের বিদায়ের পর নতুন করে আরেকটি গ্রুপ সেই দায়িত্বটি বুঝে নিয়েছে। এ ছাড়া অনেকের ধারণা, প্রশাসন, বিচার বিভাগ, পুলিশ বাহিনী, সেনাবাহিনী, মিডিয়া, শিক্ষা ও সাংস্কৃতিক অঙ্গনে পতিত ফ্যাসিজমের আজ্ঞাবহ শক্তির বৃহদাংশ এখনো বহাল তবিয়তে আছে এবং ঘুরে দাঁড়ানোর জন্য সুদিনের প্রতীক্ষায় প্রহর গুনছে। উপরন্তু দেশের একটি প্রধান রাজনৈতিক দল প্রস্তাবিত সংস্কারগুলোর অনেকগুলোর ক্ষেত্রে মতভিন্নতা প্রকাশ করেছে এবং এমন অনুমান রয়েছে, ভবিষ্যতে ক্ষমতায় আসতে পারলে তারা এগুলো বাস্তবায়নে যথেষ্ট আগ্রহী নাও হতে পারে।

ব্রিটিশ ভারতের আজাদি আন্দোলনের সময়কাল থেকে এ দেশের মানুষ অনেক পরিবর্তনের সাক্ষী হয়েছে। কখনো নির্বাচন, কখনো বা আন্দোলন-সংগ্রাম, গণ-অভ্যুত্থান বা সামরিক অভ্যুত্থানের মধ্য দিয়ে পাল্টে গেছে দেশের সামগ্রিক গতিপথ। এই ধারাবাহিকতায় চব্বিশের জুলাই অভ্যুত্থান ছিল এক বিস্ময়কর গণপ্রতিরোধ, যার তুলনা এ দেশ কেবল নয়, এই উপমহাদেশ তথা বিশ্বের ইতিহাসে বিরল।

চব্বিশ একটি সুযোগ সৃষ্টি করেছে মাত্র। আজকের নির্বাচন ঠিক করবে, চব্বিশের ধারাবাহিকতায় প্রফেসর ইউনূস যে পরিবর্তনের সূচনা করেছেন তা কি পূর্ণতা লাভ করবে, নাকি পুরনো কর্তৃত্ববাদী ফ্যাসিস্ট ব্যবস্থাই ফিরে আসবে? দেশ কি দুর্নীতির রাহুগ্রাস থেকে মুক্তি লাভ করবে, নাকি লুটপাট, চাঁদাবাজি এ দেশের স্থায়ী বিধি লিপিতে পরিণত হবে? ভারতীয় আধিপত্যবাদ ফের ফিরে আসবে, নাকি বিশ্ব মঞ্চে এ দেশ ক্রমেই নিজেকে একটি আত্মমর্যাদাশীল জাতি হিসেবে মেলে ধরবে?

প্রিয় দেশবাসী! এখন আপনারাই ঠিক করবেন, এ দেশের ভবিষ্যৎ আপনি কাদের হাতে তুলে দেবেন— যারা দেশে একটি গঠনমূলক পরিবর্তন আনতে চান, নাকি যারা পুরনো ব্যবস্থা টিকিয়ে রেখে দেশে অনন্তকাল লুটপাট চালিয়ে যেতে চান। আপনাদের সুচিন্তিত রায় দেশকে নিয়ে যাবে পরিবর্তনের মোহনায়। আপনাদের ভুল সিদ্ধান্ত দেশকে ফের নিক্ষেপ করতে পারে অন্ধকারের অমানিশায়। সবার জন্য শুভ কামনা।

লেখক : অধ্যাপক ও সাবেক সভাপতি, ফার্মেসি বিভাগ, জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়।