গ্রিনল্যান্ড ডেনমার্কের অধীন স্বায়ত্তশাসিত অঞ্চল, হঠাৎ ট্রান্স-আটলান্টিক রাজনীতির কেন্দ্রবিন্দুতে পরিণত হয়েছে। কারণ প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প আর্কটিক অঞ্চলের ‘নিরাপত্তা’ নিশ্চিত করার যুক্তিতে যুক্তরাষ্ট্রের মালিকানা বা স্থায়ী নিয়ন্ত্রণের দাবি তুলেছেন। তিনি বারবার বলেছেন, চীন ও রাশিয়ার প্রভাব ঠেকাতে ওয়াশিংটনের জন্য গ্রিনল্যান্ড দখলে নেয়া বা সম্পূর্ণ নিয়ন্ত্রণে আনা জরুরি। সাম্প্রতিক সপ্তাহগুলোতে এই বক্তব্য এতটাই চরম পর্যায়ে পৌঁছায় যে, একপর্যায়ে ট্রাম্প ‘যেকোনো উপায়ে’, প্রয়োজনে সামরিক শক্তি ব্যবহার করেও গ্রিনল্যান্ড নেয়ার কথা বলেন। পরে তিনি সামরিক শক্তি ব্যবহারের বক্তব্য থেকে কিছুটা সরে আসেন। তবে গ্রিনল্যান্ডের ওপর যুক্তরাষ্ট্রের ব্যাপক নিয়ন্ত্রণের দাবি প্রত্যাহার করেননি। ইউরোপীয় ইউনিয়ন ও ন্যাটোর তীব্র প্রতিবাদের মধ্যেও এই অবস্থান ইউরোপজুড়ে গভীর উদ্বেগ তৈরি করেছে।
ট্রাম্প আসলে কেন গ্রিনল্যান্ড চাইছেন, তা বুঝতে হলে বিষয়টিকে তিনটি স্তরে দেখতে হয়— সামরিক কৌশলগত ভূগোল, অর্থনৈতিক ও সম্পদভিত্তিক প্রতিযোগিতা এবং অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক হিসাব।
গ্রিনল্যান্ডের অবস্থান উত্তর আটলান্টিক ও আর্কটিক অঞ্চলে। এই ভূমি উত্তর আমেরিকা ও ইউরোপকে সংযুক্ত করে এবং যুক্তরাষ্ট্র ও রাশিয়ার মধ্যে সবচেয়ে সংক্ষিপ্ত মিসাইল এবং বিমান রুটের কাছাকাছি। ভৌগোলিক বাস্তবতার কারণেই গ্রিনল্যান্ড দীর্ঘ দিন ধরে যুক্তরাষ্ট্রের কৌশলগত গুরুত্ব বহন করে আসছে। ১৯৫১ সালের যুক্তরাষ্ট্র-ডেনমার্ক প্রতিরক্ষাচুক্তির মাধ্যমে যুক্তরাষ্ট্র সেখানে সামরিক উপস্থিতি ও প্রতিরক্ষাসুবিধা পেয়েছে। যদিও সার্বভৌমত্ব স্পষ্টভাবে ডেনমার্কের হাতে রয়ে গেছে। শীতল যুদ্ধের সময় থেকেই যুক্তরাষ্ট্র গ্রিনল্যান্ডকে ক্ষেপণাস্ত্র সতর্কীকরণ ও আর্কটিক নজরদারির গুরুত্বপূর্ণ অংশ হিসেবে ব্যবহার করে আসছে। ইউরোপীয় বিশ্লেষকদের মতে, এই চুক্তি ও ন্যাটো কাঠামোর মধ্যেই যুক্তরাষ্ট্রের প্রয়োজনীয় সব সামরিক সুবিধা রয়েছে; তাই মালিকানার দাবি কৌশলগতভাবে অপ্রয়োজনীয়।
তবে ট্রাম্পের এই দাবির পেছনে ঐতিহাসিক নজিরও আছে। যুক্তরাষ্ট্র এক শতাব্দীরও বেশি সময় ধরে বিভিন্ন সময়ে গ্রিনল্যান্ড অধিগ্রহণের কথা ভেবেছে। ১৯ শতকের ষাটের দশকেই প্রথম এই ধারণা আলোচনায় আসে। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর প্রেসিডেন্ট ট্রুম্যানের প্রশাসন ডেনমার্ককে ১০০ মিলিয়ন ডলার দিয়ে গ্রিনল্যান্ড কেনার প্রস্তাব দেয়। যদিও সেই প্রস্তাব প্রত্যাখ্যাত হয়, এই ইতিহাসই আজ আবার ‘গ্রিনল্যান্ড কেনা’ বিতর্ককে উসকে দেয়। শীতল যুদ্ধের সময় যুক্তরাষ্ট্র উপলব্ধি করেছিল— মালিকানা নয়; বরং নিশ্চিত সামরিক প্রবেশাধিকারই তাদের জন্য যথেষ্ট।
আজকের বাস্তবতা অবশ্য ভিন্ন। গ্রিনল্যান্ড বিশ্বের বৃহত্তম দ্বীপ। এর আয়তন প্রায় ২১ লাখ ৭০ হাজার বর্গকিলোমিটার এবং এর প্রায় ৮০ শতাংশ বরফে ঢাকা। জলবায়ু পরিবর্তনে বরফ গলতে শুরু করায় আর্কটিক অঞ্চলের নৌপথ, সামরিক চলাচল ও সম্পদের প্রবেশাধিকার নতুন গুরুত্ব পাচ্ছে। একসময় প্রান্তিক মনে হওয়া আর্কটিক অঞ্চল এখন বড় শক্তিগুলোর প্রতিযোগিতার নতুন মঞ্চে পরিণত হয়েছে। একই সাথে, বিরল খনিজ ও গুরুত্বপূর্ণ কাঁচামালের বৈশ্বিক চাহিদা গ্রিনল্যান্ডের সম্ভাব্য সম্পদের দিকে নজর বাড়িয়েছে। যদিও বাস্তবে সেগুলো উত্তোলন করা ব্যয়বহুল, পরিবেশগতভাবে সংবেদনশীল এবং স্থানীয় রাজনৈতিক সম্মতির ওপর নির্ভরশীল।
এই প্রেক্ষাপটে যুক্তরাষ্ট্রের আরেকটি বাস্তব সমস্যা হলো আর্কটিক অঞ্চলে কার্যকরভাবে কাজ করার সক্ষমতা। বরফভেদী জাহাজ, বিশেষায়িত লজিস্টিক ব্যবস্থা এবং মিত্রদের সহযোগিতা ছাড়া সেখানে স্থায়ী প্রভাব বজায় রাখা কঠিন। এখানেই ট্রাম্পের অবস্থানের একটি বড় বৈপরীত্য স্পষ্ট হয়। তিনি যে চীন ও রাশিয়ার হুমকির কথা বলছেন, তা মোকাবেলার জন্য যুক্তরাষ্ট্রের সবচেয়ে বড় শক্তি হলো ন্যাটো ও ইউরোপীয় মিত্ররা। অথচ গ্রিনল্যান্ডের মালিকানা দাবি করে তিনি সেই মিত্রদের সাথেই সঙ্ঘাত তৈরি করছেন।
ট্রাম্পের এই কঠোর অবস্থানের পেছনে দরকষাকষির কৌশল ও অভ্যন্তরীণ রাজনীতিও বড় ভূমিকা রাখছে। অনেক বিশ্লেষকের মতে, ‘মালিকানা’র মতো চরম দাবি তুলে তিনি আসলে ডেনমার্ক ও গ্রিনল্যান্ড থেকে আরো বিস্তৃত সামরিক ঘাঁটি, রাডার ও ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিরক্ষাব্যবস্থা, বন্দর ও বিমানঘাঁটির ব্যবহার এবং ভবিষ্যৎ খনিজ ও অবকাঠামো প্রকল্পে যুক্তরাষ্ট্রের অগ্রাধিকার নিশ্চিত করতে চাইছেন। ঘরে বসে এই ফলাফলকে তিনি একটি ‘ঐতিহাসিক জয়’ হিসেবেও উপস্থাপন করতে পারবেন।
ডাভোসে অনুষ্ঠিত সাম্প্রতিক ওয়ার্ল্ড ইকোনমিক ফোরামে ট্রাম্পের বক্তব্য এই বিরোধকে আরো আন্তর্জাতিক রূপ দিয়েছে। তিনি সেখানে আবারো বলেন, চীন ও রাশিয়া থেকে গ্রিনল্যান্ডকে ‘রক্ষা’ করতে যুক্তরাষ্ট্রের নিয়ন্ত্রণ প্রয়োজন। ডেনমার্ক ও গ্রিনল্যান্ডের নেতারা সাথে সাথে স্পষ্ট করে দেন, সার্বভৌমত্ব নিয়ে কোনো সিদ্ধান্ত কেবল গ্রিনল্যান্ড ও ডেনমার্কই নিতে পারে। ন্যাটোর কোনো এখতিয়ার নেই কোনো সদস্য রাষ্ট্রের ভূখণ্ড নিয়ে দরকষাকষি করার। যদিও ট্রাম্প এখন সামরিক শক্তি ব্যবহারের হুমকি কিছুটা কমিয়েছেন। তার বক্তব্য ইউরোপজুড়ে অনিশ্চয়তা ও উদ্বেগ সৃষ্টি করেছে।
ট্রাম্পের সমর্থকরা যে সুবিধার কথা বলেন, সেগুলো পুরোপুরি কাল্পনিক নয়। যুক্তরাষ্ট্রের দৃষ্টিকোণ থেকে গ্রিনল্যান্ড আর্কটিক অঞ্চলে আগাম সতর্কীকরণ, মহাকাশ ও ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিরক্ষাব্যবস্থা, সামরিক নজরদারি এবং সঙ্কটকালে উত্তর আটলান্টিকে দ্রুত বাহিনী মোতায়েনের অনন্য অবস্থান দেয়। ভবিষ্যতে এটি গুরুত্বপূর্ণ খনিজের বিকল্প উৎস ও আর্কটিক নৌপথে প্রভাব বিস্তারের মাধ্যম হিসেবেও কাজে আসতে পারে। এই প্রেক্ষাপটে ট্রাম্প হয়তো মনে করছেন, চীন ও রাশিয়া ওই এলাকায় প্রভাব বিস্তার করতে পারে। এর আগেই তিনি যুক্তরাষ্ট্রের প্রাধান্য নিশ্চিত করতে চাইছেন।
কিন্তু প্রাধান্য প্রতিষ্ঠা করার নেতিবাচক দিকগুলো আরো গভীর ও বিপজ্জনক। প্রথমত, এই দাবি আন্তর্জাতিক আইনের মৌলিক নীতির সাথে সাংঘর্ষিক। কোনো রাষ্ট্রের সার্বভৌমত্ব চাপ, হুমকি বা শক্তি প্রদর্শনের মাধ্যমে বদলানো যায় না। যুক্তরাষ্ট্র নিজেই ১৯৫১ সালের চুক্তিতে ডেনমার্কের সার্বভৌমত্ব স্বীকার করেছে। দ্বিতীয়ত, এটি ন্যাটোর ঐক্যকে মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত করতে পারে, যখন জোটটি রাশিয়ার আগ্রাসন ও অন্যান্য নিরাপত্তা চ্যালেঞ্জ মোকাবেলায় ঐক্য রাখার চেষ্টা করছে। তৃতীয়ত, এটি আর্কটিক অঞ্চলের অপ্রয়োজনীয় সামরিকীকরণ ত্বরান্বিত করতে পারে। কারণ ইউরোপীয় দেশগুলো যুক্তরাষ্ট্রের ওপর আস্থা হারালে তারা নিজেদের নিরাপত্তা জোরদার করতে বাধ্য হবে।
চতুর্থত, এই বিরোধ রাশিয়া ও চীনের জন্য কৌশলগত সুযোগ তৈরি করে। ন্যাটোর অভ্যন্তরীণ বিভাজন মস্কোর জন্য লাভজনক, আর বেইজিং বাণিজ্যিক ও বৈজ্ঞানিক সহযোগিতার আড়ালে আর্কটিকে নিজের উপস্থিতি বাড়ানোর সুযোগ পেতে পারে। পঞ্চমত, এটি গ্রিনল্যান্ডের নিজস্ব জনগোষ্ঠী- বিশেষ করে আদিবাসী ইনুইট জনগণের অধিকার ও আত্মনিয়ন্ত্রণের প্রশ্নকে উপেক্ষা করে।
সবচেয়ে বড় বিষয় হলো— এই ঘটনা বৈশ্বিক শান্তির জন্য বিপজ্জনক দৃষ্টান্ত তৈরি করে। যদি শক্তিশালী রাষ্ট্রগুলো ‘নিরাপত্তার প্রয়োজনে’ অন্যের ভূখণ্ড দাবি করতে শুরু করে, তাহলে আন্তর্জাতিক নিয়মভিত্তিক ব্যবস্থা দুর্বল হয়ে পড়বে। ডেনমার্ক ও ন্যাটো তাই এখন জোর দিচ্ছে যৌথ নিরাপত্তা ও আর্কটিক অঞ্চলে সম্মিলিত প্রতিরক্ষা জোরদারের ওপর, ভূখণ্ড নিয়ে দরকষাকষির ওপর নয়।
সবমিলিয়ে, ট্রাম্পের গ্রিনল্যান্ড দাবি আসলে কয়েকটি বিষয়ের সমষ্টি— আর্কটিকের ক্রমবর্ধমান কৌশলগত গুরুত্ব নিয়ে বাস্তব উদ্বেগ, চুক্তিভিত্তিক ব্যবস্থার বদলে সর্বোচ্চ নিয়ন্ত্রণ চাওয়ার মানসিকতা, অভ্যন্তরীণ রাজনীতিতে বড় জয়ের নাটকীয় উপস্থাপন এবং ডেনমার্ক ও গ্রিনল্যান্ড থেকে আরো বিস্তৃত মার্কিন সামরিক ও কৌশলগত সুবিধা আদায়ের চেষ্টা।
শেষ পর্যন্ত যদি স্বচ্ছ প্রক্রিয়ায়, আলোচনার মাধ্যমে যুক্তরাষ্ট্রের প্রবেশাধিকার বাড়ে, তাহলে আঞ্চলিক স্থিতিশীলতা শক্তিশালী হতে পারে; কিন্তু যদি সার্বভৌমত্বকে দরকষাকষির বিষয় বানানো হয়, তাহলে আর্কটিক অঞ্চল এবং বৈশ্বিক ব্যবস্থাই আরো অস্থির ও সঙ্ঘাতপ্রবণ হয়ে উঠবে।
লেখক : নিরাপত্তা বিশ্লেষক



