ইরানের কথা বললেই শুধু একটি রাষ্ট্রের কথা মনে আসে না; মনে পড়ে এক দীর্ঘ সভ্যতার ইতিহাস। সাদী, হাফিজ, ওমর খৈয়াম, জামী, নিজামী— এই কবি-দার্শনিকদের দেশ ইরান শতাব্দীর পর শতাব্দী ধরে জ্ঞান, সাহিত্য ও সংস্কৃতির আলোকবর্তিকা হয়ে আছে। মোসলেউদ্দীন সাদীর দরুদর্শীয়া এখনো মুসলিম বিশ্বে মিলাদে পাঠ করা হয়। কিন্তু এই সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যের দেশটি গত চার দশক ধরে একটানা ভূরাজনৈতিক সঙ্ঘাতের কেন্দ্রে-বিশেষ করে যুক্তরাষ্ট্রের সাথে দ্বন্দ্বে।
আজ আবার আন্তর্জাতিক অঙ্গনে ভেসে উঠছে একটি প্রশ্ন— ইরানের ওপর কি নতুন করে মার্কিন হামলা আসন্ন?
বিরোধের শিকড় অনেক গভীরে
ইরান-আমেরিকা বিরোধ নতুন কিছু নয়। ১৯৭৯ সালের ইসলামী বিপ্লবই এই সঙ্ঘাতের মোড় ঘুরিয়ে দেয়। তার আগে শাহ রেজা পাহলভীর আমলে ইরান ছিল মধ্যপ্রাচ্যে যুক্তরাষ্ট্রের সবচেয়ে ঘনিষ্ঠ মিত্রদের একটি, দক্ষিণ কোরিয়া বা জাপানের মতোই মার্কিনপন্থী। কিন্তু বিপ্লবের মাধ্যমে ইমাম খামেনি ক্ষমতায় এসে সেই সম্পর্ককে উল্টে দেন। তিনি আমেরিকাকে আখ্যা দেন ‘ছোট শয়তান’।
তেহরানে মার্কিন দূতাবাস অবরোধ ও কূটনীতিকদের জিম্মি করার ঘটনা দুই দেশের সম্পর্কে স্থায়ী তিক্ততা সৃষ্টি করে। এরপর ইরাক-ইরান যুদ্ধ, নিষেধাজ্ঞা, বিমান ভূপাতিতের ঘটনা— সবকিছু মিলিয়ে অবিশ্বাসের প্রাচীর ক্রমেই উঁচু হয়েছে। ইরান বিশ্বাস করে, এসব ঘটনার পেছনে আমেরিকার প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষ ভূমিকা ছিল।
খোমেনীর মৃত্যুর পরও ইরানের নীতির মৌলিক পরিবর্তন হয়নি। বরং ‘প্রতিরোধ নীতি’ আরও শক্তিশালী হয়েছে।
পারমাণবিক প্রশ্নে উত্তেজনার নতুন অধ্যায়
বর্তমান সঙ্কটের কেন্দ্রবিন্দু পারমাণবিক কর্মসূচি। ইরান দাবি করে, তাদের পারমাণবিক প্রকল্প সম্পূর্ণ শান্তিপূর্ণ— বিদ্যুৎ উৎপাদন ও চিকিৎসা গবেষণার জন্য। কিন্তু যুক্তরাষ্ট্র ও তার মিত্রদের আশঙ্কা, ইরান গোপনে পারমাণবিক অস্ত্র তৈরির সক্ষমতা অর্জনের চেষ্টা করছে। ২০১৫ সালে ইরান ও বিশ্বশক্তিগুলোর মধ্যে পারমাণবিক চুক্তি (JCPOA) স্বাক্ষরিত হলেও পরে যুক্তরাষ্ট্র তা থেকে সরে দাঁড়ায় এবং কঠোর নিষেধাজ্ঞা আরোপ করে। ফলে পরিস্থিতি আবার অস্থির হয়ে ওঠে। নিষেধাজ্ঞা, অর্থনৈতিক অবরোধ ও সামরিক চাপ- সব মিলিয়ে ইরান কার্যত একপ্রকার ‘অর্থনৈতিক যুদ্ধ’-এর মধ্যে আছে।
এই প্রেক্ষাপটে মার্কিন প্রশাসনের তরফ থেকে সামরিক বিকল্পের ইঙ্গিত পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলছে।
কূটনৈতিক ভারসাম্যের চেষ্টা
তবে ইরানও বসে নেই। তারা বুঝেছে, সরাসরি যুদ্ধ হলে ক্ষতি উভয়েরই— কিন্তু মধ্যপ্রাচ্য জ্বলবে সবচেয়ে বেশি।
সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলী খামেনি ও প্রেসিডেন্ট মাসুদ পেজেকশিয়ান উভয়েই কূটনৈতিক সমাধানের পক্ষে কথা বলছেন। খামেনির ভাষায়, ‘আমেরিকা শুধু ইরানকে দুর্বল নয়, ধ্বংস করতে চায়’, তবু তিনি আলোচনার দরজা পুরোপুরি বন্ধ করেননি।
এখানে ইরানের কূটনৈতিক তৎপরতা লক্ষণীয়। সৌদি আরব ও সংযুক্ত আরব আমিরাত তাদের আকাশসীমা ব্যবহার করতে দেবে না— এমন অবস্থান নিয়েছে; তুরস্ক সম্ভাব্য হামলার নিন্দা করেছে; চীন ও রাশিয়া প্রকাশ্যে ইরানের পাশে।
এই সমীকরণ প্রমাণ করে, ইরান আর একঘরে নয়। আঞ্চলিক শক্তিগুলোর সাথে সম্পর্ক উন্নয়ন তাদের একটি বড় সাফল্য।
যুদ্ধ হলে কার লাভ
বাস্তব প্রশ্ন হলো, যুক্তরাষ্ট্র কেন ইরানে হামলা করতে চাইবে?
এর পেছনে তিনটি কারণ দেখা যায়। প্রথমত, ইসরাইলের নিরাপত্তা। ইসরাইল ইরানকে তাদের অস্তিত্বের জন্য হুমকি মনে করে। ফলে ওয়াশিংটনের ওপর চাপ থাকে কঠোর অবস্থান নেওয়ার।
দ্বিতীয়ত, তেল ও জ্বালানি রাজনীতি। হরমুজ প্রণালী দিয়ে বিশ্ব তেলের বড় অংশ পরিবাহিত হয়। ইরান এই পথ নিয়ন্ত্রণ করতে পারে— যা বিশ্ববাজারে বড় প্রভাব ফেলতে সক্ষম।
তৃতীয়ত, আঞ্চলিক প্রভাবের লড়াই। সিরিয়া, ইরাক, লেবানন, ইয়েমেনে ইরানের প্রভাব বাড়ছে— যা মার্কিন নেতৃত্বাধীন জোটের জন্য চ্যালেঞ্জ।
কিন্তু হামলা করলে কি সমস্যা মিটবে? বরং উল্টোটা হওয়ার সম্ভাবনা বেশি। ইরান সরাসরি যুদ্ধে না গিয়ে ‘প্রক্সি যুদ্ধ’-এর কৌশল নেয়— যা ইরাক, সিরিয়া বা লেবাননে বহুবার দেখা গেছে। ফলে সংঘাত ছড়িয়ে পড়বে পুরো মধ্যপ্রাচ্যে।
অর্থনীতি ও জনজীবনের প্রভাব
যুদ্ধের সম্ভাবনা শুধু কৌশলগত বিষয় নয়, এর বৈশ্বিক অর্থনৈতিক প্রভাবও গভীর।
হামলা হলে তেলের দাম লাফিয়ে বাড়বে। জ্বালানি সংকট দেখা দেবে। উন্নয়নশীল দেশগুলো— বিশেষ করে আমদানি-নির্ভর অর্থনীতি— চরম চাপে পড়বে। বাংলাদেশসহ দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলোতে মূল্যস্ফীতি বাড়বে, বাণিজ্য ঘাটতি বাড়বে, ডলার সঙ্কট তীব্র হবে।
অর্থাৎ, ইরান-আমেরিকা সঙ্ঘাত শুধু দুই দেশের সমস্যা নয়; এটি বিশ্ব অর্থনীতির জন্যও ঝুঁকি।
ট্রাম্প ফ্যাক্টর ও রাজনৈতিক অনিশ্চয়তা
মার্কিন রাজনীতিতেও এই ইস্যু গুরুত্বপূর্ণ। সাবেক প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের সময় ইরানের বিরুদ্ধে ‘সর্বোচ্চ চাপ’ নীতি নেওয়া হয়েছিল। তার বক্তব্য ও সিদ্ধান্ত অনেক সময় অপ্রত্যাশিত ও আক্রমণাত্মক ছিল। তিনি নিজেকে মধ্যপ্রাচ্যের শক্তির কেন্দ্র হিসেবে উপস্থাপন করতে চাইতেন। এই ধরনের ব্যক্তিকেন্দ্রিক সিদ্ধান্তপ্রবণতা পরিস্থিতিকে আরো অনিশ্চিত করে তোলে। কারণ কূটনীতির বদলে আবেগনির্ভর সামরিক পদক্ষেপ সঙ্ঘাত বাড়ায়।
বাস্তবতা : যুদ্ধ নয়, সমঝোতাই পথ
ইতিহাস বলছে, ইরানকে সামরিক শক্তি দিয়ে দমন করা যায় না। ৮ বছর ইরাকের সাথে যুদ্ধেও তারা টিকে গেছে। দীর্ঘ নিষেধাজ্ঞা সত্ত্বেও রাষ্ট্র কাঠামো ভেঙে পড়েনি। বরং প্রতিরোধ মনোভাব আরো শক্ত হয়েছে।
তাই সম্ভাব্য সমাধান একটাই—আলোচনা ও পারস্পরিক আস্থা।
ইরানও বলেছে, সম্মানজনক সমঝোতা হলে পারমাণবিক প্রশ্নে সমাধান সম্ভব। চাপ বা হুমকিতে তারা নতি স্বীকার করবে না।
শেষ কথা
মধ্যপ্রাচ্য ইতোমধ্যেই অস্থির। গাজা, সিরিয়া, ইয়েমেন, লেবানন— সবখানেই উত্তেজনা। এর মধ্যে ইরানে নতুন যুদ্ধ মানে গোটা অঞ্চলকে আগুনে ঠেলে দেওয়া। বিশ্বের জন্য এখন প্রয়োজন শান্তির রাজনীতি, শক্তির নয়। ইরানের মতো প্রাচীন সভ্যতার দেশকে আবার ধ্বংসস্তূপে পরিণত করলে তা মানবতারই পরাজয় হবে।
যুদ্ধের ডামাডোল নয়— কূটনৈতিক প্রজ্ঞাই পারে এই সঙ্কট থেকে বিশ্বকে রক্ষা করতে।
লেখক : সিনিয়র সাংবাদিক



