মোহাম্মদ আজিজুল হক
অতি সম্প্রতি পার্বত্য চট্টগ্রামকে বাংলাদেশের মূল ভূখণ্ড থেকে বিচ্ছিন্ন করার নানা হুমকি-ধমকি শোনা যাচ্ছে। ষড়যন্ত্রের জাল পাতা হচ্ছে। এই প্রেক্ষাপটে দেশের সংহতি রক্ষায় সেখানে সেনা কর্তৃত্ব বাড়ানোর প্রয়োজন অনুভূত হচ্ছে। সে বিবেচনায় পার্বত্য চট্টগ্রাম চুক্তির পুনর্মূল্যায়ন জরুরি হয়ে পড়েছে।
আইনের দৃষ্টিতে সবাই সমান এই মহান নীতিতে বাংলাদেশ সংবিধান স্বমহিমায় ভাস্বর হলেও এর ২৮(৪) ধারায় সমাজের পিছিয়ে পড়া অংশকে সমপর্যায়ে তুলে আনতে বিশেষ সুবিধা দেয়ার ব্যবস্থা রাখা হয়েছে। সংবিধানের ওই ধারার আওতায় ১৯৯৭ সালের ২ ডিসেম্বর পার্বত্য চট্টগ্রাম শান্তিচুক্তি সম্পাদিত হয়। চুক্তিতে পার্বত্য চট্টগ্রামের ১১টি জাতিগোষ্ঠীর অনুকূলে বেশকিছু বিশেষ সুবিধা দেয়া হয়। এর বিপরীতে পাহাড়ি জনগোষ্ঠী একটিমাত্র শর্ত তথা অস্ত্রসমর্পণের প্রতিশ্রুতি দেয়।
এরপর গত হয়েছে ২৮ বছর। এ সময়ে পাহাড়ের অন্যতম উপজাতি ‘চাকমা’ সম্প্রদায়ের উত্থান বেশ প্রণিধানযোগ্য। তারা শিক্ষা, চিকিৎসাসহ, সামাজিক বিভিন্ন সূচকে অন্যান্য উপজাতির তুলনায় তো বটেই, এমনকি মূল জনগোষ্ঠী বাঙালিদের চেয়েও ভালো অবস্থানে উঠে এসেছে।
দেশের ১৮ কোটি জনগণের মধ্যে কতজন সরকারি কর্মকর্তা বা কর্মচারী ‘বাঙালি’ রয়েছেন, তা বিবেচনায় নিয়ে বিপরীত পক্ষে কয়েক লাখ মাত্র চাকমার বিপরীতে কতজন সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারী দেশে কর্মরত আছেন, তার পরিসংখ্যান দেখলে বিষয়টি স্পষ্ট হয়ে যায়। প্রকৃতপক্ষে বাংলাদেশে বসবাসরত চাকমা উপজাতির জনগোষ্ঠীকে বর্তমানে আর কোনোভাবে পশ্চাৎপদ বলার সুযোগ নেই।
অথচ তারাই এখন বাংলাদেশ সংবিধানে পশ্চাৎপদদের অনুকূলে দেয়া ‘সমতা নীতি’র ব্যত্যয় ঘটানোর অধিকারকে, নিজেদের অনুকূলে ব্যবহার করে চলেছে। অধিকন্তু অনৈতিকভাবে ‘পশ্চাৎপদ’ অংশের সুযোগ-সুবিধার বড় অংশ, তারাই ভোগ করছে। শুধু তাই নয়, তারা পার্বত্য চট্টগ্রামের প্রকৃত পশ্চাৎপদ ন্যূনতম আটটি উপজাতি গোষ্ঠীকে তাদের প্রাপ্য সুবিধা থেকে বঞ্চিত করছে।
এর স্বাভাবিক প্রতিক্রিয়ায় বঞ্চিতরা ক্রমে ক্ষুব্ধ হয়ে উঠছে। এমনকি কোনো কোনো নৃগোষ্ঠী ‘স্বায়ত্তশাসন’-এর মতো দাবি তোলার পর্যায়ে চলে গেছে।
হালআমলে পার্বত্য চট্টগ্রাম শান্তি চুক্তির বিরোধিতা করে ছয়টি উপজাতি গোষ্ঠীর পক্ষ থেকে আলাদা দাবিনামা উত্থাপন এর স্বাভাবিক ফল। বেশ কিছু দিন ধরে পাহাড়ে ‘কেএনএফ’ তথা কুকি-চিন ন্যাশনাল ফ্রন্টের নানা রাষ্ট্রবিরোধী তৎপরতার প্রধান কারণও এখানে নিহিত। এ কারণে অনেকে বলেন, ‘এ চুক্তির মধ্যে এর ধ্বংস বা ব্যর্থতার বীজ লুকানো আছে।’ এ বক্তব্যের অনুকূলে বড় প্রমাণ হলো, ‘পার্বত্য চট্টগ্রাম আঞ্চলিক পরিষদ’-এর গঠন, যা প্রাসঙ্গিক চুক্তির মূল প্রতিপাদ্যের একটি অনুষঙ্গ।
২৫ সদস্যের এ পরিষদে চেয়ারম্যান হিসেবে একজন উপজাতি এবং উপজাতীয় মহিলা সদস্য হিসেবে দু’জন মহিলা সদস্যের প্রায় সবাইকে সংখ্যাগরিষ্ঠ ‘চাকমা’ উপজাতি থেকে নেয়া হয়েছে।
এ ছাড়া উপজাতীয় কোটায় মোট ১২ জনের মধ্যে ১০ জন সংরক্ষণ করা রয়েছে চাকমা, মারমা ও ত্রিপুরা উপজাতির জন্য। অবশিষ্ট আটটি উপজাতির (ম্রো, তঞ্চংগ্যা, লুসাই, বম, পাংখুয়া, খুমি, চাক, খিয়াং) জন্য মোট সংরক্ষিত কোটা মাত্র দু’টি। এ কারণে পাহাড়ি এলাকার কেবিনেট নামে পরিচিত, এ পরিষদের অসম আচরণ নিয়ে পিছিয়ে পড়া উপজাতিরা নিজেদের বঞ্চিত ভাবতে বাধ্য হচ্ছে। এ ছাড়া এ পরিষদ গঠনের লক্ষ্যে প্রণীত ‘ইলেক্টোরাল কলেজে’ও একইভাবে তাদের উল্লেখযোগ্য প্রতিনিধিত্ব রাখা হয়নি; ১০২ সদস্যের এ ফোরামে উপজাতীয় জনগোষ্ঠীর জন্য প্রতিনিধিত্ব নির্ধারিত ৯০টি। এর মধ্যে ‘চাকমা, মারমা ও ত্রিপুরাদের জন্য সংরক্ষিত মোট ৭৮টি, অবশিষ্ট আটটি উপজাতিগোষ্ঠীর জন্য আছে মাত্র ১২টি, যা আবার প্রভাবশালী চাকমারাই নিয়ন্ত্রণ করে।
আঞ্চলিক পরিষদের নিয়ন্ত্রণে রয়েছে তিনটি পার্বত্য জেলা পরিষদ। সেখানেও রয়েছে একই রকম অসমতা। যেমন, খাগড়াছড়ি পার্বত্য জেলা পরিষদ গঠনে চাকমা, মারমা ও ত্রিপুরাদের জন্য ২১টি সদস্য পদ সংরক্ষিত রাখা হলেও অন্যান্য উপজাতির কোনো প্রতিনিধিত্ব রাখা হয়নি।
রাঙ্গামাটি পার্বত্য জেলা পরিষদের ক্ষেত্রে উপজাতীয়দের জন্য ২০টি সংরক্ষিত পদের মধ্যে শুধু চাকমা ও মারমাদের জন্য নির্ধারিত কোটা ১৪টি; অবশিষ্ট ৯টি উপজাতির জন্য রয়েছে মাত্র ছয়টি।
সর্বোপরি বান্দরবান পার্বত্য জেলা পরিষদে উপজাতীয়দের জন্য সংরক্ষিত মোট ১৯টি পদের মধ্যে শুধু চাকমা, মারমা ও ত্রিপুরাদের জন্য নির্ধারিত মোট ১২টি পদ; অবশিষ্ট সাতটি পদ সংরক্ষণ করা রয়েছে বাকি আটটি উপজাতির জন্য।
মূলত যে চুক্তির (পার্বত্য চট্টগ্রাম চুক্তি) মাধ্যমে, প্রাসঙ্গিক আঞ্চলিক পরিষদ গঠন করা হয়েছিল, তার নির্মোহ পর্যালোচনা বা এর প্রয়োগ পরবর্তী অবস্থা বিবেচনায় গত ২৮ বছরেও কোনো টাস্কফোর্স বা জাতীয় কমিটি গঠন করা হয়নি। অথচ এ চুক্তিতে সংসদের পক্ষে স্বাক্ষর করেছিলেন জাতীয় সংসদের তৎকালীন হুইপ আবুল হাসনাত আবদুল্লাহ।
চুক্তিটি পাস হওয়া থেকে শুরু করে বিগত ২৮ বছরের কোনো জাতীয় সংসদকে, এ বিষয়ে কিছু অবহিত না করার কারণে এটি নিশ্চিত হওয়া যায়নি যে, তিনি সংসদের হুইপ হিসেবে এ চুক্তির একটি পক্ষ হয়ে স্বাক্ষর করেছিলেন কি না। একইভাবে চুক্তির অপর পক্ষের হয়ে স্বাক্ষর করেন জ্যোতিরিন্দ্র বোধিপ্রিয় লারমা ওরফে সন্তু লারমা। তিনিও পার্বত্য চট্টগ্রামের অধিবাসীদের পক্ষে নিজেকে উপস্থাপন করে এ চুক্তিতে স্বাক্ষর করেন।
অথচ পার্বত্য চট্টগ্রামের ৪৯ শতাংশ অধিবাসী বাঙালি হওয়ায় এবং অবশিষ্ট ৫১ শতাংশ পাহাড়ি জনগোষ্ঠীর নেতারা প্রধানত চারটি আলাদা আলাদা সংগঠনের নেতৃত্বে বিভক্ত থাকায় এবং সন্তু লারমা নিজেও, বিশেষ একটি সংঠনের নেতৃত্বে অধিষ্ঠিত থাকায়, পার্বত্য চট্টগ্রামের সব অধিবাসীর নেতা বা প্রতিনিধি হিসেবে এ চুক্তিতে তার স্বাক্ষর করা অনেকটা অনধিকার চর্চার শামিল। চুক্তি সম্পাদনের দীর্ঘ দিন পরও তিনি সংশ্লিষ্ট অধিবাসীদের মতামত নেননি। শুধু তাই নয়, চুক্তিতেও রয়েছে মৌলিক ত্রুটি। যেমন, মোটাদাগে চুক্তির স্টেক-হোল্ডার হলো পার্বত্য চট্টগ্রামের ‘পাহাড়ি ও বাঙালি অধিবাসীরা’। ওই সম্প্রদায় দু’টির বিবিধ ‘বিরোধ মীমাংসা’ করা এ চুক্তির প্রধানতম লক্ষ্য।
লক্ষণীয় যে, বিরোধ নিরসনের উদ্দেশ্যে পাঁচ সদস্যের যে কমিটি গঠনের কথা চুক্তিতে উল্লেখ করা হয়েছে, তাদের সবাই উপজাতীয় জনগোষ্ঠীর প্রতিনিধি। অর্থাৎ- এ চুক্তির ধারাগুলোতে বিরোধ নিষ্পত্তিতে গঠিত কমিটিতে বাঙালিদের কোনো প্রতিনিধিত্ব রাখা হয়নি, যা অন্যায্য। এ ছাড়া পার্বত্য চট্টগ্রাম সংক্রান্ত যেকোনো সিদ্ধান্ত গ্রহণে জাতীয় সংসদসহ সব কর্তৃপক্ষকে পার্বত্য চট্টগ্রাম আঞ্চলিক পরিষদের মতামত গ্রহণের বাধ্যবাধকতার যে বিষয়টি এ চুক্তিতে অন্তর্ভুক্ত, তা সংবিধান লঙ্ঘনের শামিল। এ ছাড়া এটি এককেন্দ্রিক বাংলাদেশের চরিত্রপরিপন্থী।
দেশের একটি জনগোষ্ঠীকে বিশেষ সুযোগ দানের লক্ষ্যে অন্য একটি বিশাল জনগোষ্ঠীর মৌলিক মানবাধিকার হরণ করা কোনো অবস্থাতে স্বাভাবিক কাজ হতে পারে না।
সার্বিক পটভূমিতে দেশের নাগরিকদের পশ্চাৎপদ অংশ হিসেবে বিবেচনায় নিয়ে রাষ্ট্র কর্তৃক উপজাতীয় জনগোষ্ঠীর অনুকূলে যে সুযোগ-সুবিধা ১৯৯৭ সাল থেকে গত ২৮ বছরব্যাপী দেয়া হচ্ছে, তার মেয়াদ আদৌ বাড়ানোর প্রয়োজন আছে কি না তা নিশ্চিত করতে অবিলম্বে একটি টাস্কফোর্স গঠন এখন সময়ের দাবি। বিশেষ করে চাকমাদের বিপরীতে দেয় সুবিধাদি, বঞ্চনাবোধ নিয়ে মানসিকভাবে জরাগ্রস্ত উপজাতিগুলো, তথা ম্রো, তঞ্চংগ্যা, খুমি, লুসাই, বম, চাক, পাংখুয়া, খিয়াং; ইত্যাদির অনুকূলে দেয়া হলে, সমতানীতি পালনের পাশাপাশি বর্তমানে ওই বিশেষ উপজাতিদের মধ্যে বিদ্যমান বঞ্চনাবোধ প্রশমিত করা সম্ভব। একই সাথে পার্বত্য চট্টগ্রাম (শান্তি) চুক্তিরও সময়োপযোগী পরিবর্তন ও পরিবর্ধন করে তা বাস্তবায়ন করার বিকল্প নেই।
উপরোক্ত তথ্যাবলি পর্যালোচনা সাপেক্ষে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণের নিমিত্তে নিম্নে কয়েকটি সুপারিশ পেশ করা হলো :
ক. অবিলম্বে পার্বত্য শান্তিচুক্তি পুনঃপর্যালোচনা করে পরবর্তী করণীয় নির্ধারণ করা।
খ. ‘চাকমা নৃগোষ্ঠী’ কোনোভাবে এখন পিছিয়ে পড়া নয়। তাই বাংলাদেশ সংবিধানে পিছিয়ে পড়া ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীর অনুকূলে গত ২৮ বছর ধরে যে সুযোগ-সুবিধা দেয়া হচ্ছে, তার আওতা থেকে চাকমা ‘নৃগোষ্ঠী’কে বাদ দেয়া যেতে পারে।
গ. বঞ্চনাবোধ থেকে রক্ষাসহ, পিছিয়ে পড়া নৃগোষ্ঠীর সদস্যদের সমতায় নিয়ে আসার লক্ষ্যে, চাকমা, মারমা ও ত্রিপুরা নৃগোষ্ঠী ছাড়া পার্বত্য চট্টগ্রামে বসবাসরত অন্য আটটি নৃগোষ্ঠীর অনুকূলে দেয় সরকারি সুযোগ-সুবিধার ন্যূনতম হার সরকার কর্তৃক নির্ধারণ করা যেতে পারে।
ঘ. চাকমা, ত্রিপুরা ও মারমা নৃগোষ্ঠী অবশিষ্ট আটটি প্রান্তিক নৃগোষ্ঠীর অগ্রগতির ক্ষেত্রে যেসব কৃত্রিম বাধা সৃষ্টি করছে তা দূর করতে স্থানীয় সেনা ও সিভিল প্রশাসনের দৃষ্টি আকর্ষণ করা যেতে পারে।
ঙ. পিছিয়ে পড়া আটটি নৃগোষ্ঠীর নেতা ও স্থানীয় বাঙালি জনগোষ্ঠীর নেতাদের সমন্বয়ে পুরো পার্বত্য চট্টগ্রামে একটি তৃতীয় স্রোত তৈরির উদ্যোগ নেয়া যেতে পারে।
চ. পার্বত্য চট্টগ্রামের সার্বিক বিষয় পর্যালোচনা করে করণীয় নির্ধারণের জন্য অনতিবিলম্বে এ বিষয়ে অভিজ্ঞ মহল ও উপযুক্ত গোয়েন্দা প্রতিনিধির সমন্বয়ে একটি টাস্কফোর্স গঠন করা যেতে পারে।
লেখক : নিরাপত্তা গবেষক



