শিক্ষকের জীবিকা

দায়িত্বে অবহেলা অবশ্যই শাস্তিযোগ্য; কিন্তু দায়িত্ব পালন করেও যদি একজন শিক্ষক সহায় জীবিকার বিকল্প পথ খুঁজতে চান, তাকে অপরাধী ভাবা সমাধান নয়। নিয়ন্ত্রণ নয়, আস্থা ও প্রণোদনার পরিবেশই শিক্ষাকে টিকিয়ে রাখে।

ফয়সল আহমদ বাবুল

সাম্প্রতিক সময়ে শিক্ষকরা অন্য পেশায় যুক্ত হলে ব্যবস্থা নেয়ার ঘোষণা নতুন বিতর্ক উসকে দিয়েছে। নীতিগতভাবে, রাষ্ট্রীয় চাকরিতে আচরণবিধি থাকা অস্বাভাবিক নয়। অতিরিক্ত পেশা বা ব্যবসায় যুক্ত হতে হলে অনুমতির বিধান বহু দেশে রয়েছে। এর উদ্দেশ্য স্পষ্ট-স্বার্থের সঙ্ঘাত এড়ানো এবং মূল দায়িত্বে পূর্ণ মনোযোগ নিশ্চিত করা; কিন্তু বাস্তব জীবন এবং কাগজের বিধান সবসময় সমান হয় না।

বাংলাদেশে এমপিওভুক্ত অনেক শিক্ষকের প্রারম্ভিক বেতন প্রায় ১২ হাজার ৫০০ টাকা, যা অনেকসময় মাসের মাঝামাঝি বা পরবর্তী মাসের ১৫-২০ তারিখে হাতে পৌঁছায়। এই আয়ে বাসাভাড়া, নিত্যপ্রয়োজনীয় দ্রব্য, চিকিৎসা খরচ, সন্তানের পড়াশোনা আর সবমিলিয়ে মাস পার করা কঠিন।

উন্নত বিশ্বে শিক্ষকরা মূল দায়িত্ব ঠিক রেখে গবেষণা, কনসালট্যান্সি, করপোরেট প্রশিক্ষণ, অনলাইন শিক্ষাদান বা পার্টটাইম উদ্যোগে যুক্ত থাকেন। সেখানে জোর দেয়া হয় স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতে, সম্পূর্ণ নিষেধাজ্ঞায় নয়। শর্ত একটাই– মূল দায়িত্বে অবহেলা চলবে না। এই ভারসাম্য নীতিকে মানবিক করে।

বাংলাদেশেও একই ধরনের ভারসাম্য জরুরি। আচরণবিধি থাকবে, স্বার্থের সঙ্ঘাত এড়াতে নিয়ম থাকবে; কিন্তু নিয়ম প্রণয়নের আগে শিক্ষকদের আর্থসামাজিক অবস্থার পূর্ণাঙ্গ মূল্যায়ন প্রয়োজন। ন্যায্য বেতন, সময়মতো প্রদান, স্বাস্থ্যসুরক্ষা, আবাসন সহায়তা এবং অবসর সুবিধা নিশ্চিত করা গেলে অনুমতির প্রশ্ন তীব্র হতো না।

সমাধান একতরফা কঠোরতা নয়, সংলাপে। নীতিনির্ধারকরা যদি শিক্ষকদের সাথে সরাসরি কথা বলেন– কিভাবে তারা সীমিত আয়ে সংসার চালান, কিভাবে সামাজিক মর্যাদা ও বাস্তব অভাবের মধ্যে সমন্বয় করেন, তবে বাস্তবসম্মত নীতিনির্ধারণ সহজ হবে।

দায়িত্বে অবহেলা অবশ্যই শাস্তিযোগ্য; কিন্তু দায়িত্ব পালন করেও যদি একজন শিক্ষক সহায় জীবিকার বিকল্প পথ খুঁজতে চান, তাকে অপরাধী ভাবা সমাধান নয়। নিয়ন্ত্রণ নয়, আস্থা ও প্রণোদনার পরিবেশই শিক্ষাকে টিকিয়ে রাখে।

লেখক : সিনিয়র শিক্ষক, সিরাজুল ইসলাম আলিম মাদরাসা, সদর, সিলেট