মোহাম্মদ রায়হান চৌধুরী
নারীর সম্মানে রাজনৈতিক দল ও রাষ্ট্রচিন্তকরা এগিয়ে আসবেন; এটাই স্বাভাবিক। কেননা নারীর সম্মান ও মর্যাদার মধ্য দিয়ে পরিবার, সমাজ, রাষ্ট্র ও জাতীয় ভিত চূড়ান্ত প্রতিষ্ঠা ও প্রকাশ পায়। সেই হিসেবে নারীর প্রতি শ্রদ্ধা, সম্মান ও ক্ষমতায়নে রাজনৈতিক দল ও রাষ্ট্রচিন্তকদের রাজনৈতিক আচরণে বহিঃপ্রকাশ বাঞ্ছনীয়। একইভাবে মুখাভিনয় আর বাস্তব কর্মকাণ্ড ভিন্ন হওয়া; জাতির সাথে প্রতারণার শামিল।
সম্প্রতি জামায়াত আমিরের এক্স একাউন্ট হ্যাকড হয় এবং নারীদের নিয়ে আপত্তিকর পোস্ট নিয়ে বিএনপি কর্তৃক তাড়াতাড়ি প্রতিক্রিয়াও দেখা যায়। যা অনেক ধর্ষিত মা-বোনরা ৩০ দিনেও কোনো প্রতিক্রিয়া বা প্রতিবাদ পাননি। আর দলীয় নেতাকর্মীদের দ্বারা ধর্ষণের প্রতিক্রিয়া বাদ দেয়া যায়। এছাড়া দেশের বিভিন্ন স্থানে জামায়াতের নারী নেত্রীদের ওপর হামলা, মারধর ও লাত্থি দিয়ে নির্বাচনী প্রচারে বাধা দেয়ার প্রতিক্রিয়া বারবার ভাইরাল হতে থাকে। জামায়াত নারী নেত্রীদের ওপর হামলার সময় বলা হয়, তারা ধর্মীয় আলোচনার নামে জান্নাতের টিকেট বিক্রি করছে। আলোচনার তাগিদে তা সত্য হিসেবে নিলেও এরকম হামলা ও নির্যাতন বা নারীর শ্লীলতাহানির মতো কোনো অধিকার ওই দল করতে পারেন কিনা? সে বিষয়ে নারী অধিকারকর্মী বা সচেতন মহলের কোনো কথা না থাকলেও; জামায়াত আমিরের বক্তব্য– ‘কোনো নারী দলীয় প্রধান হতে পারবেন না’-কে নারীর প্রতি অন্যায় ও অশোভন আচরণ হিসেবে দেখা হচ্ছে। যা অন্ধের কাছে আয়না বিক্রির মতো কপটতা।
উল্লেখ্য যে, জামায়াত নেতার আইডি হ্যাকিং বিষয়ে প্রচার বিভাগ বলেন, ‘এখানে একটা গভীর ষড়যন্ত্র আছে। জামায়াত আমিরের এক্স অ্যাকাউন্ট হ্যাক করে তারা কিছু খারাপ ও আপত্তিকর পোস্ট দিয়েছে। এতে বোঝা যায়, ঠাকুরঘরে কে রে, আমি কলা খাইনি। কিছু লোক তাৎক্ষণিক কর্মসূচি দিয়েছে। জামায়াতের আশঙ্কা, এ কাজের সাথে বিশেষ একটি দল বা তাদের সাইবার টিমের কিছু চক্রান্ত ও ষড়যন্ত্রকারী জড়িত আছে।’
নারীর ক্ষমতায়ন সকলে চায়। কিন্তু নারীকে ক্ষমতায়নের লোভ দেখিয়ে ভোগের সামগ্রী করা; ইসলামী মূল্যবোধ সম্পন্ন মানুষের সাথে জাগ্রত বিবেক মেনে নিতে পারে না। অতীতেও নারীর প্রতি অসম্মান ও অশ্রদ্ধার দোহাই দিয়ে; একশ্রেণির নারীবাদীরা ব্যারিস্টার মঈনুল হোসেনের ওপর হামলে পড়েছিল। যা বিবেকবান মানুষের কাছে চরম জুলুমের হাতিয়ার হিসেবে চিহ্নিত।
এ সমাজ ও রাষ্ট্র নারীকে যেকোনো পণ্যের অ্যাড বা প্রোডাক্ট বাজারজাত করার হাতিয়ার হিসেবে গ্রহণ করে। এতে ওই নারী আপন সৌন্দর্য পুঁজি করে; প্রোডাক্টের সৌন্দর্য বা মানের ওপর ফোকাস করে। এটি বৃহৎ বা গভীর অর্থে নারীকে ভোগ্য পণ্য হিসেবে উপস্থাপন করে। অর্থাৎ নারীর দেহ বা সৌন্দর্য যারা লোলুপতার বিচারে দেখে; তারাই প্রোডাক্টের মানকে নারীর সৌন্দর্যের মতো উপস্থাপন করে।
রাজনৈতিক ক্ষেত্রে নারী ক্ষমতায়ন। বেশ ভালো প্রস্তাব। এটি আধুনিক চিন্তার জন্য গ্রহণীয়। কিন্তু বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে গত ৫৪ বছরে পরিবারতন্ত্রের বাইরে কোনো নারীর দলীয় প্রধান হওয়ার প্রকৃষ্ট উদাহরণ আছে কি? যদি থাকেও তার দৃষ্টান্ত সাধারণ মানুষের নাগালে পৌঁছানো হলো না কেন?
ফেব্রুয়ারি আন্দোলন সংগ্রামের মাস। তা ছাত্রদল শুরু করলেও প্রশ্নবিদ্ধ করল। তাদের আন্দোলন নারীর সম্মান, মর্যাদা ও ক্ষমতায়ন হলেও; বরং তা রাজনৈতিক দ্বিচারিতার মূলকভাবে প্রকাশিত হলো। এর অন্যতম কারণ জামায়াতে নারী নেত্রীদের ওপর তাদের দমন-পীড়ন, গায়ে হাত উঠিয়ে আক্রমণ এবং শ্লীলতাহানি বিভিন্ন স্থানে ঘটলেও দলীয়ভাবে এদের অন্যায় কাজের বিরোধিতা বা প্রতিক্রিয়া না দেখিয়ে; তাদের ওই হীন কর্মকাণ্ডের স্বীকৃতিই প্রদান করল। যা বিএনপির কেন্দ্রীয় নেতাদের বিভিন্ন বক্তব্য জামায়াতের নারীর অসহিষ্ণু বক্তব্য প্রমাণ করে।
এ সত্ত্বেও নারী অধিকারের নামে ছাত্রদলের আন্দোলনের বিষয়টি যতটা অধিকারের; তার চেয়েও বেশি রাজনৈতিক। কিন্তু রাজনৈতিক অ্যাজেন্ডা হয়েও রাজনীতির আলোচ্য হতেও তা ব্যর্থ হয়েছে। রাজনীতিতে প্রতিপক্ষের ওপর চড়াও না হয়েও প্রতিপক্ষের ওপর প্রতিশোধ বা চড়াও হওয়া যায়। যেমন হ্যাকারদের নিয়ে সমালোচনা ও প্রতিক্রিয়া জানানোর মাধ্যমে; রাজনৈতিক সৌন্দর্য প্রকাশ পেতো এবং একইসাথে নারীর অধিকারও চাওয়া যেতো। যার মাধ্যমে এক ঢিলে দুই পাখি; রাজনৈতিক উদ্দেশ্য ও প্রতিপক্ষকে আঘাত করেও সহমর্মিতার সহযোদ্ধা হওয়া যেতো। প্রতিষ্ঠিত হতো রাজনৈতিক সৌন্দর্য এবং নারী সম্মানের; রাজনৈতিক হাতিয়ার নয়।
লেখক : সহকারী অধ্যাপক ও সদস্য, বাংলাদেশ পলিটিক্যাল থিংকারস।



