মোহাম্মদ জসিম উদ্দিন
কিংবদন্তি কণ্ঠশিল্পী, গবেষক, প্রাবন্ধিক এবং ‘ভাওয়াইয়া রাজপুত্র’ খ্যাত মুস্তাফা জামান আব্বাসী। তার জন্ম ১৯৩৬ সালের ৮ ডিসেম্বর, পশ্চিমবঙ্গের কোচবিহারের বলরামপুর গ্রামে। বাবা ছিলেন উপমহাদেশের প্রখ্যাত লোকসঙ্গীত সম্রাট, কিংবদন্তি ও মরমি কণ্ঠশিল্পী আব্বাসউদ্দীন আহমদ।
বিশ শতকের প্রথমার্ধে বাঙালি মুসলমান সমাজ আত্মপরিচয়ের সঙ্কটে ভুগছিল, তখন আব্বাসউদ্দীন আহমদই তার জাদুকরী কণ্ঠ ও লোকজ সুরে পিছিয়ে পড়া সমাজকে নিজেদের শেকড় চিনতে শিখিয়েছিলেন। তার পিতামহ মৌলভী জাফর আলী ছিলেন বৃহত্তর রংপুরের প্রতাপশালী আইনজীবী। চাচা আবদুল করিম ছিলেন একাধারে গীতিকার, কবি ও নাট্যকার। আবার তার মা লুৎফুন্নেসা আব্বাস ছিলেন বৃহত্তর নীলফামারীর সম্ভ্রান্ত পরিবারের সন্তান এবং নিজে একজন অত্যন্ত গুণী লেখিকা।
তার সঙ্গীতে হাতেখড়ি হয়েছিল উপমহাদেশের প্রখ্যাত ঠুমরি বিশেষজ্ঞ ওস্তাদ জমির উদ্দীন খাঁর ভ্রাতুষ্পুত্র ওস্তাদ কাদের জমিরীর স্নেহধন্য সাহচর্যে। দীর্ঘ এক যুগ ওস্তাদ মুন্সী রইছ উদ্দীনের কাছে উচ্চাঙ্গ সঙ্গীতের তালিম নেন। এ ছাড়াও ওস্তাদ গুল মোহাম্মদ খাঁ, ওস্তাদ সালামত আলী খাঁ, ওস্তাদ নাজাকাত আলী খাঁ এবং ওস্তাদ আসাদ আলী খাঁর মতো উপমহাদেশের দিকপাল ধ্রুপদি সাধকদের সান্নিধ্য তিনি লাভ করেন।
বাংলাদেশের সম্প্রচার ইতিহাসে মুস্তাফা জামান আব্বাসী এক অনন্য অধ্যায়। ১৯৪৭ সালে মাত্র ১২ বছর বয়সে বেতারে একটি নাটকে অভিনয়ের মাধ্যমে সম্প্রচার জীবনের শুরু। ষাট ও সত্তরের দশকে নাগরিক জীবনে যখন আধুনিক বাদ্যযন্ত্রনির্ভর সঙ্গীতের প্রভাব বাড়ছে, ঠিক সে সময়ে তিনি ‘ভরা নদীর বাঁকে’, ‘লৌকিক বাংলা’ এবং ‘আমার ঠিকানা’র মতো অনুষ্ঠানগুলোর মাধ্যমে নীরব সাংস্কৃতিক জাগরণ তৈরি করেন।
মুস্তাফা জামান আব্বাসী প্রবন্ধ, অনুবাদ, আত্মজীবনী, উপন্যাস, কাব্যগ্রন্থ এবং রম্য রচনাসহ বিচিত্র সব বিষয়ে প্রায় ৬০টিরও বেশি গ্রন্থ রচনা করেছেন, যা বাংলার সাহিত্য ও গবেষণার ভাণ্ডারকে অনন্য মাত্রায় সমৃদ্ধ করেছে।
বিশেষ করে বাংলার লোকসঙ্গীতের তাত্ত্বিক, ব্যাকরণগত ও ইতিহাসভিত্তিক গবেষণায় তার অবদান অবিস্মরণীয়। লোকসঙ্গীত নিয়ে তার রচিত ‘ইতিহাসের আলোকে বাংলার লোকসঙ্গীত’, ‘প্রাণের গীত’, ‘লঘু সঙ্গীতের গোড়ার কথা’ কিংবা ‘ভাওয়াইয়ার জন্মভূমি’ প্রভৃতি গ্রন্থ বর্তমানে লোকজ সংস্কৃতি গবেষক ও বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের আকরগ্রন্থ হিসেবে বিবেচিত। এই গ্রন্থগুলোর মাধ্যমে তিনি বাংলার অলিখিত ও লোকমুখে প্রচলিত লোকজ ঐতিহ্যকে সুনির্দিষ্ট ও প্রামাণ্য লিখিত দলিলে রূপান্তরিত করেছেন। ২০২৫ সালের ১০ মে তিনি ঢাকায় ইন্তেকাল করেন।
লেখক : সহযোগী অধ্যাপক, ইংরেজি বিভাগ, নর্দান বিশ্ববিদ্যালয়, বাংলাদেশ



