শিশু সুরক্ষায় সাঁতার শিক্ষা এখন সময়ের দাবি

বিশেষজ্ঞদের মতে, শুধু সরকারি বা বেসরকারি উদ্যোগ যথেষ্ট নয়; পরিবার, শিক্ষা প্রতিষ্ঠান এবং স্থানীয় সম্প্রদায়ের সমন্বিত প্রচেষ্টা প্রয়োজন। শিশুদের সাঁতার শেখানো, জলাশয়ের চারপাশে নিরাপত্তা ব্যবস্থা জোরদার করা এবং অভিভাবকদের সচেতনতা বৃদ্ধি করা গেলে পানিতে ডুবে মৃত্যুর হার উল্লেখযোগ্যভাবে কমানো সম্ভব।

আলম শামস
বাংলাদেশে প্রতিবছর অসংখ্য শিশু ও কিশোরের মৃত্যু হচ্ছে পানিতে ডুবে। বিশেষ করে বর্ষা মৌসুমে এ সংখ্যা উদ্বেগজনক হারে বেড়ে যায়। অধিকাংশ ক্ষেত্রেই সাঁতার না জানা এবং পর্যাপ্ত তদারকির অভাব এসব মৃত্যুর অন্যতম কারণ হিসেবে চিহ্নিত হচ্ছে। ফলে সন্তানদের নিরাপত্তা নিয়ে উৎকণ্ঠায় দিন কাটাচ্ছেন অভিভাবকরা।

গত ১ জুন কুমিল্লার চৌদ্দগ্রাম পৌরসভার ৯ নম্বর ওয়ার্ডে পুকুরের পানিতে ডুবে মারা যায় সপ্তম শ্রেণির শিক্ষার্থী আয়ান (১২)। সে প্রবাসী মো. মিজানুর রহমানের ছেলে। পুকুর থেকে উদ্ধার করে চৌদ্দগ্রাম উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে নেওয়া হলে কর্তব্যরত চিকিৎসক তাকে মৃত ঘোষণা করেন।

এর আগে ১৯ মে নাটোরের বড়াইগ্রাম উপজেলায় পুকুরে ডুবে মারা যায় দুই শিশু—মো. আরাফাত (১১) ও নূর মোহাম্মদ (১০)। একই এলাকার বাসিন্দা এই দুই শিশুর মৃত্যুতে এলাকায় নেমে আসে শোকের ছায়া।

আয়ান, আরাফাত ও নূর মোহাম্মদের মতো অসংখ্য শিশু প্রতি বছর পানিতে ডুবে প্রাণ হারাচ্ছে। প্রতিটি দুর্ঘটনার পর স্বজনদের আহাজারি আর শোকের মাতম সমাজকে নাড়া দিলেও স্থায়ী সমাধান এখনও অধরাই রয়ে গেছে।

বিশেষজ্ঞদের মতে, বাংলাদেশে শিশু মৃত্যুর অন্যতম বড় কারণ পানিতে ডুবে যাওয়া। ইউনিসেফের বিভিন্ন গবেষণা ও জরিপে দেখা গেছে, দেশে প্রতিবছর গড়ে প্রায় ১৭ হাজার শিশু পানিতে ডুবে মারা যায়। বিশ্বের অন্যান্য দেশের তুলনায় এ হার অত্যন্ত উদ্বেগজনক।

নদীমাতৃক দেশে সাঁতার না জানা বড় ঝুঁকি
নদীমাতৃক বাংলাদেশে খাল-বিল, পুকুর, ডোবা ও নদীর উপস্থিতি অত্যন্ত স্বাভাবিক। শহর কিংবা গ্রাম—সব জায়গাতেই কোনো না কোনো জলাশয় রয়েছে। এছাড়া প্রায় প্রতি বছরই দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে বন্যা দেখা দেয়, যার ফলে দীর্ঘ সময় পানি জমে থাকে। এমন বাস্তবতায় সাঁতার না জানা শিশুদের জন্য ঝুঁকি বহুগুণ বেড়ে যায়।

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, পানির সঙ্গে সহাবস্থানের এই দেশে সাঁতার শিক্ষা শুধু একটি দক্ষতা নয়, বরং জীবন রক্ষার অন্যতম উপায়।

শিশুদের সাঁতার শেখাতে নানা উদ্যোগ
পানিতে ডুবে শিশু মৃত্যু কমাতে দীর্ঘদিন ধরে কাজ করছে ইউনিসেফ-সমর্থিত প্রতিষ্ঠান ‘সেন্টার ফর ইনজুরি প্রিভেনশন অ্যান্ড রিসার্চ বাংলাদেশ’ (সিআইপিআরবি)। ২০০৫ সাল থেকে প্রতিষ্ঠানটি শিশুদের সাঁতার শেখানোর কার্যক্রম পরিচালনা করছে।

প্রতিষ্ঠানটির লক্ষ্য দেশের প্রতিটি শিশুকে সাঁতার শেখানোর মাধ্যমে পানিতে ডুবে মৃত্যুর ঝুঁকি কমিয়ে আনা। এ পর্যন্ত প্রায় ৩০ হাজার শিশুকে সাঁতার প্রশিক্ষণ দেওয়া হয়েছে।

অস্ট্রেলীয় সাঁতার প্রশিক্ষক জেমসের মতে, “একটি শিশু যদি অন্তত ৯০ সেকেন্ড পানিতে ভেসে থাকতে বা সাঁতার কাটতে শিখে, তাহলে অনেক ক্ষেত্রে তার জীবন রক্ষা করা সম্ভব।”

ইউনিসেফের স্বাস্থ্য ও পুষ্টি বিভাগের বাংলাদেশ প্রধান ব্রিথ লোকেটেলি-রসি জানান, ৪ থেকে ১০ বছর বয়সী শিশুদের জন্য বিশেষ সাঁতার প্রশিক্ষণ কর্মসূচি পরিচালনা করা হচ্ছে, যা শিশুদের জরুরি পরিস্থিতিতে পানিতে ভেসে থাকতে সহায়তা করে।

সচেতনতার অভাবই বড় কারণ
শিশুস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ ডা. জহুরুল হক সাগর বলেন, “সাঁতার শিক্ষা প্রতিটি মানুষের জীবন সুরক্ষার জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। পাঁচ বছর বয়স থেকেই শিশুদের সাঁতার শেখানো যেতে পারে।”

তিনি জানান, গ্রামাঞ্চলে অধিকাংশ দুর্ঘটনা ঘটে যখন অভিভাবকরা গৃহস্থালির কাজে ব্যস্ত থাকেন এবং শিশুরা অরক্ষিত অবস্থায় জলাশয়ের কাছে চলে যায়। পর্যাপ্ত নজরদারির অভাব ও সচেতনতার ঘাটতি এ ধরনের দুর্ঘটনার প্রধান কারণ।

ডা. সাগরের মতে, “আমাদের দেশে ছড়িয়ে-ছিটিয়ে থাকা অসংখ্য খাল-বিল, পুকুর ও নদীর কারণে শিশুদের সাঁতার শেখানো এখন সময়ের দাবি। এটি শুধু একটি খেলাধুলা নয়, বরং জীবন রক্ষার কৌশল।”

শিশু সুরক্ষায় আন্তর্জাতিক সহায়তা
বাংলাদেশে পানিতে ডুবে শিশু মৃত্যু প্রতিরোধে এগিয়ে এসেছে আন্তর্জাতিক বিভিন্ন সংস্থা। যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক ‘মাইকেল ব্লুমবার্গ ফাউন্ডেশন’ এ খাতে প্রায় ৭৭ কোটি টাকা সহায়তা দিচ্ছে।

এই অর্থায়নে দুই বছর মেয়াদি একটি প্রকল্প বাস্তবায়ন করা হবে। প্রকল্পের আওতায় ৮০ হাজার শিশুর তদারকি, নিরাপত্তা নিশ্চিতকরণ এবং সাঁতার প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা করা হবে। যেসব এলাকায় পানিতে ডুবে মৃত্যুর হার বেশি, সেসব অঞ্চলকে অগ্রাধিকার দিয়ে কার্যক্রম পরিচালিত হবে।

প্রাথমিক পর্যায়ে দেশের প্রত্যন্ত অঞ্চলের ডে-কেয়ার ও কমিউনিটি সেন্টারগুলোর মাধ্যমে প্রকল্পটি বাস্তবায়নের পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে।

প্রয়োজন সমন্বিত উদ্যোগ
বিশেষজ্ঞদের মতে, শুধু সরকারি বা বেসরকারি উদ্যোগ যথেষ্ট নয়; পরিবার, শিক্ষা প্রতিষ্ঠান এবং স্থানীয় সম্প্রদায়ের সমন্বিত প্রচেষ্টা প্রয়োজন। শিশুদের সাঁতার শেখানো, জলাশয়ের চারপাশে নিরাপত্তা ব্যবস্থা জোরদার করা এবং অভিভাবকদের সচেতনতা বৃদ্ধি করা গেলে পানিতে ডুবে মৃত্যুর হার উল্লেখযোগ্যভাবে কমানো সম্ভব।

বর্ষা মৌসুমে যখন চারপাশে পানির বিস্তার বাড়ে, তখন শিশুদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে সাঁতার শিক্ষাকে একটি জাতীয় অগ্রাধিকার হিসেবে বিবেচনা করার দাবি জানিয়েছেন সংশ্লিষ্টরা।