মো: মুখলেছুর রহমান
একটি সমাজে দারিদ্র্য শুধু উৎপাদনের স্বল্পতার কারণে সৃষ্টি হয় না; অনেক সময় সম্পদের অসম বণ্টনও দারিদ্র্যের অন্যতম প্রধান কারণ হয়ে দাঁড়ায়। যখন অল্পসংখ্যক বিত্তবান ব্যক্তি বা গোষ্ঠী তাদের প্রয়োজনের তুলনায় অনেক বেশি সম্পদ, জমি, পুঁজি ও অর্থনৈতিক সুযোগ নিজেদের নিয়ন্ত্রণে নিয়ে নেয়, তখন সমাজের বৃহৎ অংশ মৌলিক চাহিদা পূরণের সুযোগ থেকেও বঞ্চিত হয়। তাই দারিদ্র্য বিমোচনের কার্যকর কৌশল হিসেবে কেবল নতুন সম্পদ সৃষ্টি নয়, বরং সম্পদের অতিরিক্ত ও অপ্রয়োজনীয় কেন্দ্রীভূতকরণের ওপরও যুক্তিসঙ্গত নিয়ন্ত্রণ আরোপ করা জরুরি।
প্রত্যেক মানুষের ব্যক্তিগত সম্পদের অধিকার রয়েছে। কিন্তু সেই অধিকার সীমাহীন হতে পারে না। কারণ অর্থনীতি কোনো বিচ্ছিন্ন ব্যক্তির বিষয় নয়; এটি একটি সামাজিক ব্যবস্থা, যেখানে একজনের সিদ্ধান্ত অন্যদের জীবনযাত্রার ওপর সরাসরি প্রভাব ফেলে। যদি একজন ব্যক্তি বা কর্পোরেট গোষ্ঠী বিপুল পরিমাণ জমি, আবাসন, প্রাকৃতিক সম্পদ বা আর্থিক সম্পদ নিজেদের হাতে কেন্দ্রীভূত করে, তাহলে অন্যদের জন্য সুযোগের ক্ষেত্র সংকুচিত হয়ে যায়। এর ফলে কর্মসংস্থান, বাসস্থান, শিক্ষা ও স্বাস্থ্যসেবার মতো মৌলিক ক্ষেত্রেও বৈষম্য বৃদ্ধি পায়।
বর্তমান বিশ্বে সম্পদ বৈষম্য এমন এক পর্যায়ে পৌঁছেছে যে, অল্পসংখ্যক ধনী মানুষের হাতে বিপুল পরিমাণ সম্পদ কেন্দ্রীভূত, অন্যদিকে কোটি কোটি মানুষ এখনও দারিদ্র্যসীমার নিচে বসবাস করছে। এই বাস্তবতা প্রমাণ করে যে অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি একাই দারিদ্র্য দূর করতে পারে না। প্রবৃদ্ধির সুফল যদি সমাজের সর্বস্তরে পৌঁছাতে না পারে, তাহলে জিডিপির উচ্চ প্রবৃদ্ধিও সাধারণ মানুষের জীবনমানের উল্লেখযোগ্য উন্নতি ঘটাতে ব্যর্থ হয়।
অপ্রয়োজনীয় সম্পদ আহরণে নিয়ন্ত্রণ বলতে সম্পদ কেড়ে নেওয়া বা ব্যক্তিগত উদ্যোগকে নিরুৎসাহিত করা বোঝায় না। বরং এর অর্থ হলো এমন নীতিমালা প্রণয়ন করা, যা সম্পদের অস্বাভাবিক কেন্দ্রীভূতকরণ রোধ করবে এবং অর্থনৈতিক সুযোগের বিস্তৃত বণ্টন নিশ্চিত করবে। প্রগতিশীল করব্যবস্থা, অব্যবহৃত জমির ওপর কার্যকর কর, একচেটিয়া ব্যবসা নিয়ন্ত্রণ, উত্তরাধিকার সম্পদের যৌক্তিক কর এবং সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচিতে বিনিয়োগ—এসব উদ্যোগ সম্পদের ভারসাম্যপূর্ণ বণ্টনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে।
ইসলামী অর্থনৈতিক দর্শনেও সম্পদের অবাধ সঞ্চয়কে নিরুৎসাহিত করা হয়েছে এবং সম্পদের প্রবাহ সমাজের বিভিন্ন স্তরে ছড়িয়ে দেয়ার ওপর গুরুত্ব আরোপ করা হয়েছে। যাকাত, সদকা, ওয়াকফ এবং উত্তরাধিকার বণ্টনের বিধান মূলত সম্পদের অতিরিক্ত কেন্দ্রীভূতকরণ প্রতিরোধ এবং সমাজের দুর্বল জনগোষ্ঠীর অধিকার নিশ্চিত করার লক্ষ্যেই প্রণীত। এর মাধ্যমে সম্পদকে একটি সামাজিক আমানত হিসেবে বিবেচনা করা হয়, যা কেবল ব্যক্তিগত ভোগের জন্য নয়, সামষ্টিক কল্যাণের জন্যও ব্যবহৃত হওয়া উচিত।
একটি মানবিক ও টেকসই অর্থনৈতিক ব্যবস্থার জন্য দরকার এমন একটি ভারসাম্যপূর্ণ পরিবেশ, যেখানে মানুষ সম্পদ অর্জনের স্বাধীনতা ভোগ করবে, কিন্তু সেই স্বাধীনতা অন্যের মৌলিক অধিকার ও সুযোগকে ক্ষতিগ্রস্ত করবে না। তাই দারিদ্র্য বিমোচনের প্রকৃত লক্ষ্য হওয়া উচিত সম্পদ সৃষ্টির পাশাপাশি সম্পদের অপ্রয়োজনীয় কেন্দ্রীভবন নিয়ন্ত্রণ করা এবং এমন একটি অর্থনৈতিক পরিবেশ গড়ে তোলা, যেখানে সমাজের প্রতিটি মানুষ মর্যাদাপূর্ণ জীবনযাপনের সুযোগ পায়।
সুতরাং, দারিদ্র্য দূরীকরণের জন্য শুধু দরিদ্রদের সহায়তা করাই যথেষ্ট নয়; একই সঙ্গে এমন নীতি গ্রহণ করতে হবে, যা অল্পসংখ্যক মানুষের হাতে অতিরিক্ত সম্পদ ও সুযোগের অযৌক্তিক কেন্দ্রীভূতকরণ রোধ করে। কারণ একটি সমাজে যখন সম্পদ কেবল উপরের স্তরে জমা হতে থাকে, তখন নিচের স্তরে অভাব বাড়ে; আর যখন সম্পদের প্রবাহ সমাজজুড়ে ছড়িয়ে পড়ে, তখনই প্রকৃত অর্থে অন্তর্ভুক্তিমূলক উন্নয়ন ও সামাজিক ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠিত হয়।
লেখক
উপদেষ্টা, সেন্টার ফর ইসলামিক ইকোনমিক্স।



