আলি লারিজানি: ইরানের রাষ্ট্র, আদর্শ ও ক্ষমতার জটিল স্থপতি

আলি লারিজানি এমন এক ব্যক্তিত্ব, যিনি একই সঙ্গে বুদ্ধিজীবী ও ক্ষমতাবান, কৌশলী ও বিতর্ক সৃষ্টিকারী। বাস্তববাদিতা ও নৈতিক দ্বন্দ্বেও পড়েছেন তিনি। তার জীবন ইরানের রাজনীতির এমন একটি প্রতিচ্ছবি-যেখানে আদর্শ, ধর্ম, ক্ষমতা ও বাস্তবতা একে অপরের সঙ্গে ক্রমাগত সংঘর্ষে লিপ্ত।

মধ্যপ্রাচ্যের সাম্প্রতিক রাজনৈতিক অস্থিরতা ও ক্ষমতার পুনর্বিন্যাসের প্রেক্ষাপটে আলি লারিজানি একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তিত্বের নাম। ২০২৬ সালের মার্চে তাঁর হত্যাকাণ্ড শুধু একজন রাজনীতিকের সমাপ্তি নয়, বরং ইরানের ক্ষমতার কাঠামো, অভ্যন্তরীণ রাজনীতি এবং আঞ্চলিক ভূরাজনীতিতে এক নতুন অনিশ্চয়তার সূচনা। লারিজানিকে বোঝার জন্য তাঁকে কেবল একজন রাজনীতিক হিসেবে দেখলে ভুল হবে; তিনি ছিলেন একই সঙ্গে একজন দার্শনিক, নিরাপত্তা কৌশলবিদ, এবং ক্ষমতার অভ্যন্তরীণ কাঠামোর গুরুত্বপূর্ণ নির্মাতা।

মধ্যপ্রাচ্যের চলমান উত্তেজনার মধ্যে ইরান যুদ্ধের প্রতিবাদে সদ্য পদত্যাগী ট্রাম্পের সন্ত্রাস দমন উইংয়ের প্রধান ও মার্কিন রাজনীতিক জো কেন্ট মন্তব্য করেছেন, ইরানের প্রভাবশালী নেতা আলি লারিজানি শান্তি আলোচনার প্রক্রিয়ায় যুক্ত ছিলেন—এবং সেই অবস্থাতেই তাকে হত্যা করা হয়েছে। এর মাধ্যমে শান্তি প্রক্রিয়া বাধাগ্রস্ত করা হয়েছে। জো কেন্টের ভাষ্য অনুযায়ী: আলি লারিজানি আঞ্চলিক উত্তেজনা কমানোর লক্ষ্যে আলোচনা করছিলেন। তার হত্যাকাণ্ড সেই সম্ভাব্য শান্তি উদ্যোগকে থামিয়ে দিয়েছে। জো কেন্ট সরাসরি অভিযোগ করেন: তেল আবিব শান্তি চায় না বরং “স্থায়ী সংঘাত” বজায় রাখাই তাদের কৌশল এবং যুক্তরাষ্ট্র এই সংঘাতে “অস্ত্র” হিসেবে ব্যবহৃত হচ্ছে।

এর আগে ট্রাম্পের ভাইস প্রেসিডেন্ট জেডি ভ্যান্স ইরানের সাথে সর্বশেষ আলোচনায় সম্মত খসড়া দেখে উচ্ছ্বসিত হয়েছিলেন যে,ইরান তার ৪০০ কেজি সম্মৃদ্ধ ইউরেনিয়াম তৃতীয় দেশের কাছে হস্তান্তরে সম্মত হয়েছে এবং পারমানবিক কর্মসূচি স্থগিত রাখতে রাজি হয়েছে। এরপরে চুক্তি স্বাক্ষরের বিষয় সময়ের ব্যাপার ছিল। আর সে চুক্তিতে মুখ্য ভুমিকা ছিল আলি লারিজানির-যিনি বাইডেনের সময় ৬ শক্তির সাথে পরমাণু চুক্তির প্রধান আলোচক ছিলেন। কেন্টের বক্তব্যে স্পষ্ট-যুদ্ধ শেষ করার বিষয়ে তৃতীয় পক্ষের মাধ্যমে একটি যুদ্ধ বন্ধের সমঝোতার বিষয়েও সম্পৃক্ত ছিলেন লারিজানি।

Ali-Larijani

আলি লারিজানির ভূমিকা, তার হত্যার পেছনের কারণ এবং আঞ্চলিক শক্তিগুলোর প্রকৃত উদ্দেশ্য—সবকিছুই এখনো ধোঁয়াশায় ঢাকা। তবে একটি বিষয় পরিষ্কার; মধ্যপ্রাচ্যের এই সংঘাত কেবল সামরিক লড়াই নয়—এটি জ্বালানি, কূটনীতি এবং বৈশ্বিক ক্ষমতার ভারসাম্যের একটি জটিল সমীকরণে পরিণত হয়েছে। আর তাকে হত্যা করে নেতানিয়াহু-ট্রাম্প ইরানকে ধ্বংস করার জায়নবাদি পরিকল্পনা বাস্তবায়নে চূড়ান্ত বার্তা দিলেন বলেই মনে হয়।

শিকড় ও বুদ্ধিবৃত্তিক নির্মাণ
২.

ড. আলি লারিজানির জন্ম ইরানের নাজাফে একটি ধর্মীয় ও বুদ্ধিবৃত্তিক ঐতিহ্যবাহী পরিবেশে। তার পরিবার, বিশেষত লারিজানি পরিবার, ইরানের ধর্মীয়-রাজনৈতিক কাঠামোর সঙ্গে গভীরভাবে যুক্ত। এই পারিবারিক পটভূমি তাকে খুব অল্প বয়সেই রাষ্ট্র ও ধর্মের আন্তঃসম্পর্ক বুঝতে সাহায্য করে।

তবে তার ব্যক্তিত্বের সবচেয়ে আকর্ষণীয় দিক হলো তার দার্শনিক ভিত্তি। ইমানুয়েল কান্ট -এর দর্শন নিয়ে তার পিএইচডি থিসিস প্রমাণ করে, তিনি কেবল ক্ষমতার মানুষ নন, চিন্তার মানুষও। পশ্চিমা দর্শনের সঙ্গে তার পরিচয় তাকে ইরানের অনেক প্রচলিত কট্টরপন্থী রাজনীতিকদের থেকে আলাদা করেছে। তার চিন্তায় যুক্তি, কাঠামো এবং বাস্তববাদ একত্রে কাজ করেছে-যা পরবর্তীতে তাঁর রাজনৈতিক কৌশলেও প্রতিফলিত হয়।

১৯৮১ সালে ইসলামী বিপ্লবী রক্ষী বাহিনীতে (আইআরজিসি)যোগদানের মাধ্যমে তার রাজনৈতিক জীবনের সূচনা হয়। ইরান-ইরাক যুদ্ধের অভিজ্ঞতা তাকে রাষ্ট্রীয় নিরাপত্তা ও কৌশলগত চিন্তায় দক্ষ করে তোলে। আইআরজিসিতে তার ভূমিকা ছিল কেবল সামরিক নয়; এটি তাকে ইরানের ক্ষমতার কেন্দ্রের সঙ্গে যুক্ত করে। ইরানে প্রকৃত ক্ষমতা প্রায়ই নির্বাচিত সরকারের বাইরে থাকে-সেনাবাহিনী, ধর্মীয় নেতৃত্ব এবং নিরাপত্তা কাঠামোর মধ্যে। লারিজানি এই ত্রিমাত্রিক শক্তির সংযোগস্থলে নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করেন।

২০০৮ থেকে ২০২০ পর্যন্ত তিনি ইরানের পার্লামেন্টের স্পিকার ছিলেন। এই দীর্ঘ সময় তাকে একটি ‘সমঝোতাকারী’ নেতা হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করে। মাহমুদ আহমাদিনেজাদের কট্টর নীতির সঙ্গে তার যেমন দূরত্ব ছিল,তেমনি হাসান রূহানির তুলনামূলক উদার নীতির সঙ্গে তার একটি কৌশলগত সমঝোতাও ছিল।

লারিজানি মূলত একটি মধ্যপন্থী রক্ষণশীল ধারার প্রতিনিধিত্ব করেন।যেখানে রাষ্ট্রীয় স্থিতিশীলতা, ইসলামী আদর্শ এবং বাস্তববাদী কূটনীতি একসঙ্গে কাজ করে। এই অবস্থান তাকে একদিকে সংস্কারপন্থীদের কাছে গ্রহণযোগ্য করে, অন্যদিকে কট্টরপন্থীদের কাছেও পুরোপুরি প্রত্যাখ্যাত হতে দেয়নি।

লারিজানির সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা ছিল জাতীয় নিরাপত্তা নীতিতে। সুপ্রিম ন্যাশনাল সিকিউরিটি কাউন্সিলের সচিব হিসেবে তিনি ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচি ও আন্তর্জাতিক দরকষাকষির কেন্দ্রবিন্দুতে ছিলেন।

তিনি বুঝতেন যে, ইরানের জন্য পারমাণবিক কর্মসূচি কেবল প্রযুক্তিগত বিষয় নয়; এটি জাতীয় মর্যাদা, নিরাপত্তা এবং আন্তর্জাতিক ক্ষমতার প্রশ্ন। তাঁর কৌশল ছিল-চাপের মধ্যে থেকেও দরকষাকষির সুযোগ সৃষ্টি করা।

যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে উত্তেজনার মাঝেও তিনি সরাসরি সংঘর্ষের পরিবর্তে ‘নিয়ন্ত্রিত উত্তেজনা’ বজায় রাখতে চেয়েছিলেন। এই বাস্তববাদী কৌশল তাকে অনেকের কাছে ‘প্রাগম্যাটিক স্ট্র্যাটেজিস্ট’ হিসেবে পরিচিত করে।

৩.

২০২৫ সালের শেষ দিকে, যখন ইরানে রাজনৈতিক অস্থিরতা বাড়তে থাকে এবং আয়াতুল্লাহ আলি খামেনির উত্তরসূরি নিয়ে জল্পনা তুঙ্গে ওঠে, তখন লারিজানি হঠাৎ করেই ক্ষমতার কেন্দ্রবিন্দুতে উঠে আসেন। তিনি আবারও জাতীয় নিরাপত্তা পরিষদের শীর্ষে আসেন এবং খুব দ্রুতই ‘ডি-ফ্যাক্টো’ নেতা হিসেবে বিবেচিত হতে থাকেন। এর পেছনে কয়েকটি কারণ ছিল-আইআরজিসির সমর্থন;ধর্মীয় এলিটদের সঙ্গে পারিবারিক সম্পর্ক এবং প্রশাসনিক ও কূটনৈতিক অভিজ্ঞতা।

এই তিন শক্তির সমন্বয় তাকে এমন একটি অবস্থানে নিয়ে যায়, যেখানে তিনি আনুষ্ঠানিকভাবে সর্বোচ্চ নেতা না হয়েও কার্যত রাষ্ট্র পরিচালনা করছিলেন। তবে পশ্চিমারা লারিজানির রাজনৈতিক জীবনের বিতর্ক সৃষ্টি করা অধ্যায় মনে করেন ২০২৫-২৬ সালের বিক্ষোভ দমন। এই সময় তিনি কঠোর নিরাপত্তা নীতির পক্ষে অবস্থান নেন এবং এ সময় রাষ্ট্রের স্থিতি রক্ষায় ব্যাপক দমন-পীড়নের অভিযোগ ওঠে। যুক্তরাষ্ট্র্র ও ইউরোপীয় ইউনিয়ন ‘দমন অভিযানের স্থপতি’ হিসেবে অভিহিত করে তার বিরুদ্ধে নিষেধাজ্ঞা আরোপ করে। বলা হয়- এখানে তার দ্বৈত চরিত্র স্পষ্ট হয়-একদিকে তিনি যুক্তিবাদী ও কূটনৈতিক, অন্যদিকে প্রয়োজনে কঠোর ও নির্মম রাষ্ট্রযন্ত্রের অংশ।

২০২৬ সালের ১৭ মার্চ, ইসরাইল-যুক্তরাষ্ট্রের এক বিমান হামলায় তার মৃত্যু ঘটে। এই হত্যাকাণ্ড মধ্যপ্রাচ্যের চলমান সংঘাতকে আরো জটিল করে তুলবে। লারিজানির মৃত্যু কয়েকটি বড় প্রশ্ন উত্থাপন করে-ইরানের ক্ষমতার উত্তরাধিকার এখন কার হাতে যাবে? আইআরজিসি কি আরো সরাসরি ক্ষমতা দখল করবে? আঞ্চলিক সংঘাত কি আরো তীব্র হবে?

লারিজানির মৃত্যুর এই ঘটনা শুধু একজন ব্যক্তির মৃত্যু নয়; এটি একটি ক্ষমতার ভারসাম্যের পতন। লারিজানির সবচেয়ে বড় বৈশিষ্ট্য ছিল তার দ্বৈত পরিচয়-একদিকে, অংকের ছাত্র ও দর্শনের শিক্ষক, অন্যদিকে বাস্তব রাজনীতির কৌশলবিদ। সাম্প্রতিক সময়ের দুইজন একাডেমিক পটভূমির রাজনীতিবিদের সাথে তার তুলনা করা যায়- একজন হলেন-বসনিয়ার সাবেক প্রেসিডেন্ট আলিয়া ইজতবেগবিজ,অন্যজন তুরস্কের সাবেক প্রধানমন্ত্রী আহমদ দাউতুগ্লু। তাদের বই পশ্চিমের বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ে একাডেমিক রেফারেন্স হিসেবে পড়ানো হয়।

লারিজানি ইমানুয়েল কান্টের নৈতিক দর্শন নিয়ে কাজ করলেও বাস্তবে তার রাজনীতি অনেক সময় সেই নৈতিকতার বিপরীত দিকে গেছে বলে তার পশ্চিমের অনেক বন্ধু মনে করেন। তাদের ধারণা-এই বৈপরীত্যই তাকে একটি জটিল চরিত্রে পরিণত করেছে। ইরানে অনেকেই এর মধ্যে দেখতে পান রাষ্ট্রনৈতিক দূরদৃষ্টি যা তাকে দেশটির সর্বোচ্চ নেতার সবচেয়ে বিশ্বস্ত সহযোগিতে পরিণত করেছে।

আলি লারিজানিকে এককভাবে মূল্যায়ন করা কঠিন। তিনি না পুরোপুরি সংস্কারপন্থী, না পুরোপুরি কট্টরপন্থী। বরং তিনি ছিলেন ‘সিস্টেমের মানুষ’ যিনি রাষ্ট্রের স্থিতিশীলতাকে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দিয়েছেন, এমনকি তা ব্যক্তিস্বাধীনতার বিনিময়ে হলেও।

তার অবদান তিনটি ক্ষেত্রে বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ-

১. ক্ষমতার ভারসাম্য রক্ষা:

ইরানের জটিল রাজনৈতিক কাঠামোর মধ্যে তিনি বিভিন্ন শক্তিকে একত্রে ধরে রাখতে পেরেছিলেন।

২. কৌশলগত বাস্তববাদ: আন্তর্জাতিক চাপের মধ্যেও তিনি ইরানকে সম্পূর্ণ বিচ্ছিন্ন হতে দেননি।

৩. অভ্যন্তরীণ নিয়ন্ত্রণ:বিক্ষোভ দমন করে তিনি স্বল্পমেয়াদে স্থিতিশীলতা এনেছেন। তবে দীর্ঘমেয়াদে এর মূল্য কি হবে তা এখনো স্পষ্ট নয়।

আলি লারিজানি এমন এক ব্যক্তিত্ব, যিনি একই সঙ্গে বুদ্ধিজীবী ও ক্ষমতাবান, কৌশলী ও বিতর্ক সৃষ্টিকারী। বাস্তববাদিতা ও নৈতিক দ্বন্দ্বেও পড়েছেন তিনি। তার জীবন ইরানের রাজনীতির এমন একটি প্রতিচ্ছবি-যেখানে আদর্শ, ধর্ম, ক্ষমতা ও বাস্তবতা একে অপরের সঙ্গে ক্রমাগত সংঘর্ষে লিপ্ত।

আলি খামেনির পর তার মৃত্যুতে ইরান সবচেয়ে বেশি শূন্যতা অনুভব করবে। তার মৃত্যু একটি যুগের সমাপ্তি, কিন্তু তার নির্মিত ক্ষমতার কাঠামো ও রাজনৈতিক কৌশল এখনও ইরানের ভবিষ্যৎ নির্ধারণে প্রভাব ফেলবে। সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হলো ইরান কেন্দ্রিক প্রতিরোধ বলয়ের সাথে পাশ্চাত্যের গুরুত্বপূর্ণ সমঝোতার সেতুবন্ধনটি ইসরাইল লারিজানিকে হত্যা করে ভেঙে ফেলেছে। মধ্যপ্রাচ্যের ভবিষ্যৎ মেরুকরণে এর বড় প্রভাব পড়তে পারে।

লেখক : নির্বাহী সম্পাদক, নয়া দিগন্ত

[email protected]