ইরান যুদ্ধবিরতি : কী লাভ ঘরে তুলবে পাকিস্তান!

পাকিস্তান ইরান-যুক্তরাষ্ট্র যুদ্ধবিরতিতে মধ্যস্থতা করে কূটনৈতিক গুরুত্ব বাড়াতে ও অর্থনৈতিক ঝুঁকি কমাতে চাইছে। এই উদ্যোগ সফল হলে আন্তর্জাতিক ভাবমূর্তি ও বিনিয়োগে লাভ হতে পারে, তবে ব্যর্থ হলে দায়ও নিতে হতে পারে।

সৈয়দ মূসা রেজা
সংগৃহীত

বিশ্ব রাজনীতির মঞ্চে এক অবাক করা পটপরিবর্তন ঘটিয়ে মধ্যস্থতাকারীর ভূমিকায় অবতীর্ণ হয়েছে পাকিস্তান। ইরান ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যকার দীর্ঘদিনের যুদ্ধংদেহী মনোভাব প্রশমনে ইসলামাবাদের এই দৌড়ঝাঁপ এখন বিশ্বজুড়ে আলোচনার কেন্দ্রবিন্দু। খাদের কিনারে থাকা অর্থনীতি আর অভ্যন্তরীণ অস্থিরতায় জর্জরিত একটি দেশ কিভাবে বিশ্বশান্তির কারিগর হয়ে উঠল, তা নিয়ে কৌতুহলের শেষ নেই।

মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প খোদ পাকিস্তানের সেনাপ্রধান ফিল্ড মার্শাল আসিম মুনির এবং প্রধানমন্ত্রী শাহবাজ শরিফের অনুরোধে ইরানে হামলা স্থগিত করার ঘোষণা দিয়েছেন।

ট্রাম্পের দাবি, ইরানের বর্তমান শাসনব্যবস্থা ভেতরে ভেতরে ভীষণভাবে ভেঙে পড়েছে, তাই তেহরানকে একটি সুসংহত শান্তি প্রস্তাব তৈরির সুযোগ দিতেই এই যুদ্ধবিরতির মেয়াদ অনির্দিষ্টকালের জন্য বাড়ানো হয়েছে।

ট্রাম্পের এই অবস্থানে এটা পরিষ্কার যে তেহরানের পরবর্তী পদক্ষেপের জন্য ওয়াশিংটন এবার কোনো সময়সীমা বেঁধে দেয়নি। আর মার্কিন এই পদক্ষেপের পুরো কৃতিত্ব ট্রাম্প দিয়েছেন পাকিস্তানি নেতৃত্বকে।

প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প তার সোশ্যাল মিডিয়া প্ল্যাটফর্ম ‘ট্রুথ সোশ্যাল’-এ দেয়া পোস্টে সরাসরি উল্লেখ করেছেন, পাকিস্তানের সেনাপ্রধান ফিল্ড মার্শাল আসিম মুনির এবং প্রধানমন্ত্রী শাহবাজ শরিফের বিশেষ অনুরোধেই তিনি ইরানে সামরিক অভিযান আপাতত স্থগিত রাখার সিদ্ধান্ত নিয়েছেন।

পাশাপাশি তিনি বলেছেন, এই যুদ্ধবিরতির মানে এই নয় যে যুক্তরাষ্ট্র তার অবস্থান থেকে সম্পূর্ণ সরে এসেছে।

ট্রাম্প স্পষ্ট করে দিয়েছেন যে হরমুজ প্রণালীর উপকূলে ইরানের সমুদ্রবন্দরগুলোতে অবরোধ আগের মতোই বহাল থাকবে এবং মার্কিন সামরিক বাহিনী সব দিক থেকে যুদ্ধের জন্য প্রস্তুত থাকবে। যতদিন না ইরান একটি ঐক্যবদ্ধ প্রস্তাব জমা দিচ্ছে এবং তেহরান-ওয়াশিংটন দু’পক্ষের আলোচনা কোনো একটি চূড়ান্ত সিদ্ধান্তে পৌঁছাচ্ছে, ততদিন এই যুদ্ধবিরতি কার্যকর থাকবে।

ট্রাম্পের এই অভাবনীয় ঘোষণার পরপরই প্রধানমন্ত্রী শাহবাজ শরিফ যুক্তরাষ্ট্রের এই সিদ্ধান্তকে স্বাগত জানিয়েছেন। তিনি ট্রাম্পকে ধন্যবাদ জানিয়ে বলেছেন, এই পদক্ষেপ পাকিস্তানের কূটনৈতিক প্রচেষ্টার ওপর ওয়াশিংটনের গভীর আস্থা ও বিশ্বাসের বহিঃপ্রকাশ।

পাকিস্তানের এই নতুন ‘শান্তি রক্ষক’ সাজার পেছনে কেবল পরোপকার নয়, বরং নিরেট ব্যবসায়িক ও কৌশলগত স্বার্থ কাজ করছে। বছরের পর বছর ধরে আন্তর্জাতিক মহলে পাকিস্তানের ভাবমূর্তি ছিল অনেকটা ‘সমস্যা সৃষ্টিকারী’ দেশের মতো। কিন্তু বর্তমান পরিস্থিতিতে মধ্যপ্রাচ্যে অস্থিরতা বজায় থাকা মানেই পাকিস্তানের দেউলিয়া অর্থনীতির ওপর মরণকামড়। সৌদি আরবের সাথে নিরাপত্তা চুক্তি এবং পারস্য উপসাগর থেকে আসা জ্বালানি তেলের ওপর নির্ভরশীলতার কারণে এই অঞ্চলে যুদ্ধ লাগলে পাকিস্তান সরাসরি বিপদে পড়বে।

পাকিস্তানের ইনস্টিটিউট অফ ডেভেলপমেন্ট ইকোনমিক্স বা পাইড-এর একটি সাম্প্রতিক রিপোর্টে বলা হয়েছে যে জ্বালানি তেলের দাম বাড়লে পাকিস্তানের আমদানি খরচ বেড়ে যায়, যা মুদ্রাস্ফীতিকে আকাশচুম্বী করে তোলে। এছাড়া হরমুজ প্রণালী দীর্ঘকাল বন্ধ থাকলে পাকিস্তানের শিল্প খাতের কাঁচামাল আসা বন্ধ হয়ে যাবে এবং বৈদেশিক বাণিজ্যে বিশাল ঘাটতি তৈরি হবে। এই অর্থনৈতিক বিপর্যয় এড়াতেই পাকিস্তান দু’দেশের মধ্যে ‘ঘটকালি’ করতে মরিয়া হয়ে মাঠে নেমেছে।

আসিম মুনিরের নেতৃত্বে পাকিস্তান সেনাবাহিনী এখন দেশের ভঙ্গুর অর্থনীতি আর টালমাটাল রাজনীতিকে ছাপিয়ে নিজেদের সামরিক শ্রেষ্ঠত্বকে বিশ্বমঞ্চে ঢাল হিসেবে ব্যবহার করছে। মুসলিম বিশ্বের একমাত্র পরমাণু শক্তিধর রাষ্ট্র এবং ছয় লাখ সেনার বিশাল বাহিনী থাকা সত্ত্বেও পাকিস্তান এতদিন আন্তর্জাতিক রাজনীতিতে যতটা প্রভাব ফেলার কথা ছিল, তা পারছিল না। গত বছর জুনে আসিম মুনিরের হঠাৎ হোয়াইট হাউস সফর এবং পরবর্তীতে তেহরানের সাথে সুসম্পর্ক বজায় রাখার মাধ্যমে তিনি ট্রাম্পের কাছে একজন নির্ভরযোগ্য বার্তাবাহক হিসেবে নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করেছেন।

তেহরানও জেনেভা বা ভিয়েনার মতো প্রথাগত ইউরোপীয় কূটনৈতিক ব্যবস্থার চেয়ে পাকিস্তানের ওপর বেশি ভরসা করছে। এর বড় কারণ হলো, ১৯৭৯ সালের বিপ্লবের পর থেকে ওয়াশিংটনে পাকিস্তানের দূতাবাসই ইরানের স্বার্থ দেখাশোনা করে আসছে। পাকিস্তান একইসাথে চীন, যুক্তরাষ্ট্র ও উপসাগরীয় দেশগুলোর সাথে সুসম্পর্ক বজায় রাখতে পারার কারণেই এই অসাধ্য সাধন করতে পেরেছে।

তবে পাকিস্তানের এই নতুন কূটনৈতিক উচ্চতা ভারতের জন্য কিছুটা উদ্বেগের কারণ হতে পারে। দীর্ঘমেয়াদি দৃষ্টিতে দেখলে, পাকিস্তান যদি আন্তর্জাতিকভাবে একঘরে হয়ে থাকে, তবে তা ভারতের কৌশলগত স্বার্থের অনুকূলে থাকে। কিন্তু এখন বিশ্বজুড়ে পাকিস্তানকে ‘শান্তির দূত’ হিসেবে দেখা হচ্ছে। দিনশেষে এই দৃষ্টিভঙ্গি আসিম মুনির এবং পাকিস্তান সেনাবাহিনীর হাতকেই শক্তিশালী করবে। ঐতিহাসিকভাবে দেখা গেছে, পাকিস্তানের সেনাবাহিনী যখনই শক্তিশালী হয়েছে, তারা ভারতের প্রতি অধিকতর আক্রমণাত্মক মনোভাব দেখিয়েছে। তাছাড়া এই মধ্যস্থতার পুরস্কার হিসেবে যদি পাকিস্তানের জন্য বিদেশী বিনিয়োগ বা আধুনিক সমরাস্ত্রের বাজার খুলে যায়, তবে তা দক্ষিণ এশিয়ার শক্তির ভারসাম্য বদলে দিতে পারে। শেষ পর্যন্ত এই আলোচনা যদি সফল হয়, তবে পাকিস্তান বড় বিনিয়োগের পথ প্রশস্ত করতে পারবে; আর যদি আলোচনা ভেঙে যায়, তবে মধ্যস্থতাকারী হিসেবে পাকিস্তানের ওপরই ব্যর্থতার দায় চাপতে পারে। সূত্র : এনডিটিভি