ইসরাইলের মানবাধিকার গোষ্ঠীগুলোর ‘নিষিদ্ধ সত্য’

গাজায় গণহত্যা চলছে, বলছে ইসরাইলেরই দুই প্রখ্যাত সংগঠন

হলোকাস্টের ভয়ঙ্কর স্মৃতির ভেতরে গড়ে ওঠা একটি রাষ্ট্র যখন অন্য একটি জনগোষ্ঠীর জীবনকে অন্ধকারে ঠেলে দেয়, তখন আত্মসমীক্ষার সময় এসে যায়।

সৈয়দ মূসা রেজা
সংগৃহীত

ইসরাইলের ভেতর থেকে অবশেষে ভেঙে পড়লো নীরবতার প্রাচীর। প্রায় ২২ মাস ধরে চলা গাজার বিরুদ্ধে নৃশংস যুদ্ধের মধ্যে প্রথমবারের মতো দুটি শীর্ষস্থানীয় ইসরাইলি মানবাধিকার সংগঠন সরাসরি অভিযোগ করলো- ইসরাইল গাজায় গণহত্যা চালাচ্ছে।

এই ভয়ঙ্কর সত্য প্রকাশ করেছে আন্তর্জাতিক খ্যাতিসম্পন্ন দুই মানবাধিকার সংস্থা- বেতসেলেম এবং ফিজিশিয়ানস ফর হিউম্যান রাইটস–ইসরাইল বা সংক্ষেপে পিএইচআরআই। এ দুটো সংস্থা মূলত ইহুদি-ইসরাইলিদের নেতৃত্বে পরিচালিত। ফলে এই অভিযোগ শুধু আন্তর্জাতিক মহলের নয়, এখন তা ইসরাইলিদের নিজেদের মুখ থেকেও শোনা যাচ্ছে। এর মধ্য দিয়ে অধিকৃত ফিলিস্তিনের ভেতরকার এক নিষিদ্ধ আলোচনার দ্বার খুলে দিলো বলে বিশ্লেষকরা মনে করছেন।

এই প্রতিবেদনটি তৈরিতে ব্যবহার করা হয়েছে এপি’র (অ্যাসোসিয়েটেড প্রেস) সিনিয়র সাংবাদিক স্যাম মেডনিকের তেল আবিব থেকে পাঠানো প্রতিবেদন। মেডনিক দীর্ঘদিন ধরে ইসরাইল ও ফিলিস্তিনি অঞ্চলে সংঘাত, মানবিক সঙ্কট এবং মানবাধিকার লঙ্ঘন নিয়ে গভীর অনুসন্ধান চালিয়ে আসছেন। এর আগে তিনি আফ্রিকার পশ্চিম ও মধ্য অঞ্চল এবং দক্ষিণ সুদানেও যুদ্ধ পরিস্থিতি কাভার করেছেন।

যুদ্ধ নাকি গণহত্যা?

২০২৩ সালের ৭ অক্টোবর হামাসের আক্রমণের পর গাজায় ইসরাইল যে সামরিক অভিযান শুরু করে, সেটিকে বহু আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংগঠন, যেমন অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনাল ও হিউম্যান রাইটস ওয়াচ, ইতোমধ্যেই ‘গণহত্যা’ বলে উল্লেখ করেছে। দক্ষিণ আফ্রিকা এই অভিযোগে আন্তর্জাতিক বিচার আদালতে (আইসিজে) মামলা করেছে।

কিন্তু ইসরাইলের নিজস্ব ভূখণ্ডে, বিশেষ করে এমন একটি দেশে যা নিজেই দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের হলোকাস্ট অজুহাত উঠে এসেছিল, সেখানে গণহত্যা শব্দটি উচ্চারণ করাও ছিল প্রায় নিষিদ্ধের মতো। কারণ, ইসরাইলি সমাজে ‘গণহত্যা’ শব্দটি ছড়িয়ে আছে গভীর যন্ত্রণার স্মৃতি নিয়ে। ছয় মিলিয়ন ইহুদি নাৎসি বাহিনীর হাতে হত্যার স্মৃতি জড়িত দাবি করা হয়। আরো দাবি করা হয়, এটি বিশ্বের মানব ইতিহাসের ভয়ঙ্করতম অধ্যায়গুলোর অন্যতম।

এই প্রেক্ষাপটে ইসরাইলি দুই মানবাধিকার সংগঠনের এই বক্তব্য যেন একটা ট্যাবু বা নিষিদ্ধ বিষয় ভাঙার মুহূর্ত।

কী বলছে সংস্থাগুলো?

পিএইচআরআই–এর নির্বাহী পরিচালক গাই শালেভ বলেন, ‘ইসরাইলি জনমনে ‘গণহত্যা’ শব্দটি উচ্চারণ করলে অনেকেই তাকে ‘ইসরাইলবিরোধী’ বা ‘ইহুদিবিদ্বেষী’ তকমা লাগিয়ে দেয়। কিন্তু যদি ইসরাইলভিত্তিক সংগঠন গণহত্যা চলছে বলে উপসংহারে পৌঁছায়, তবে মানুষ সত্যিটা উপলব্ধি করতে বাধ্য।’

পিএইচআরআই–এর প্রতিবেদনে গাজার স্বাস্থ্যখাত ধ্বংস, বিদ্যুৎ ও পানি কেটে দেয়া, খাদ্য ঢুকতে বাধাগ্রস্ত করা ইত্যাদি বিশ্লেষণ করে বলা হয়, এগুলো আন্তর্জাতিক আইনে গণহত্যার সংজ্ঞার তিনটি প্রধান দিক পূরণ করেছে।

একইসাথে বেতসেলেম তাদের প্রতিবেদনে উল্লেখ করে, হামাসের হামলার পর ইসরাইলের নীতিতে পরিবর্তন এসেছে। দমন ও নিয়ন্ত্রণের কৌশল থেকে তেল আবিব এখন সরাসরি বিনাশ ও নিশ্চিহ্নীকরণ–এর পথে হাঁটছে। গাজাবাসীদের উদ্দেশে ইসরাইলি রাজনীতিকদের প্রকাশ্য বক্তব্য, যেমন ‘পুরো গাজা ধ্বংস করে দিতে হবে,’ কিংবা ‘সেখানে কোনো ভবিষ্যৎ নেই’ এই ভাষ্যগুলো প্রমাণ করে ইসরাইল সচেতনভাবে ফিলিস্তিনি সমাজকে ধ্বংস করতে চাইছে।

‘ব্যথিত’ স্বীকারোক্তি

পিএইচআরআই–এর গাই শালেভ, যিনি নিজে একজন হলোকাস্ট থেকে বেঁচে ফেরা ইহুদি পরিবারের নাতি, বলেন, ‘এই উপসংহারে পৌঁছানো আমার জন্য ভীষণ কষ্টকর। কিন্তু আমরা যে সমাজে বড় হয়েছি, যেখানে হলোকাস্ট শিক্ষা ছিল প্রাথমিক বিষয়, সেখানে সত্যের দায় এড়ানো যায় না।’

এই মন্তব্য এমন এক সময় এসেছে যখন গাজা যুদ্ধে ইসরাইলের ভেতরকার সমালোচনাগুলোও মূলত কেন্দ্রীভূত ছিল প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু–র যুদ্ধকালীন রাজনৈতিক সিদ্ধান্তের ওপরে। বেশিভাগ ইসরাইলি এখনো এই যুদ্ধকে ন্যায্য প্রতিরক্ষা হিসেবে দেখে এবং অনেকে মনে করে ফিলিস্তিনিদের মৃত্যুতে দায় মূলত হামাসের কারণেই। কারণ তারা বেসামরিক এলাকায় ঘাঁটি গেড়ে রেখেছে।

আন্তর্জাতিক আইন ও প্রতিবাদ

পিএইচআরআই–এর প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ইসরাইল ‘দলগতভাবে একটি গোষ্ঠীকে ধ্বংস করার উদ্দেশে তাদের জীবনধারণের পরিবেশ ধ্বংস করেছে’, যা ১৯৪৮ সালের জাতিসঙ্ঘের গণহত্যা প্রতিরোধ কনভেনশন –এর স্পষ্ট লঙ্ঘন।

এদিকে, আন্তর্জাতিক অপরাধ আদালত (আইসিসি) ইতোমধ্যেই নেতানিয়াহু ও সাবেক প্রতিরক্ষামন্ত্রী ইয়োভ গ্যালান্ত– এর বিরুদ্ধে যুদ্ধাপরাধের অভিযোগে আন্তর্জাতিক গ্রেফতারি পরোয়ানা জারি করেছে, যদিও ইসরাইল সরকার এ অভিযোগ প্রত্যাখ্যান করেছে। তবে ইসরাইল সরকার এখন পর্যন্ত বেতসেলেম বা পিএইচআরআই–এর নতুন প্রতিবেদনের বিষয়ে কোনো মন্তব্য করেনি।

ইসরাইলি জনমত বিভাজিত, সেনাদের দ্বিধা

ইসরাইলি সমাজের মূলধারায় এখনো এই অভিযোগগুলো ‘চরমপন্থী’ বলে বিবেচিত। তবে মানবাধিকার গোষ্ঠী বেতসেলেম গত এক দশক ধরেই ইসরাইলি সেনাবাহিনীর সাথে সব ধরনের সহযোগিতা বন্ধ করে দিয়েছে, কারণ তারা বিশ্বাস করে সামরিক তদন্তগুলো জালিয়াতিপূর্ণ ও তামাশা ছাড়া আর কিছুই নয়।

ইতোমধ্যে কিছু ইসরাইলি সেনাও এই যুদ্ধে অংশ নিতে অস্বীকৃতি জানিয়েছেন। তবে অধিকাংশ ইসরাইলি মনে করেন, গাজার মানুষের চেয়ে ইসরাইলি পণবন্দীদের মুক্ত করাই এখন প্রধান অগ্রাধিকার।

ইতিহাসবিদ টম সেগেভ বলেন, ‘জনমত কতটা বদলাবে জানি না। এখনো অধিকাংশ ইসরাইলির কাছে গাজার মানুষের দুর্দশার চেয়ে বেশি গুরুত্বপূর্ণ হচ্ছে- পণবন্দীদের ভাগ্য।’

আন্তর্জাতিক নিস্ক্রিয়তা ও নৈতিক প্রশ্ন

বেতসেলেম –এর আন্তর্জাতিক পরিচালক সারিত মিখায়েলি বলেন, ‘আমরা যদি সত্য বলার সাহস না দেখাই, তাহলে ভুক্তভোগীদের পাশে দাঁড়ানো হবে না। বিশ্ব সম্প্রদায়ের দায়িত্ব এখন স্পষ্ট অবস্থান নেয়া।’

হলোকাস্টের ভয়াবহতা থেকে উঠে আসা একটি জাতি যখন অন্য এক গোষ্ঠীর উপর পরিকল্পিত ধ্বংস চালাচ্ছে বলে নিজস্ব বুদ্ধিজীবীদেরই একাংশ অভিযোগ করছে তখন তা কেবল রাজনৈতিক বিতর্ক নয়, বরং এক গভীর নৈতিক ও ঐতিহাসিক প্রশ্ন।

উপসংহার

ইতিহাসের নির্মম পরিহাস হয়তো এটাই, যে জাতি ‘আর কখনো না’ বলেছিল, আজ তারই বিরুদ্ধে সেই অপরাধের অভিযোগ উঠছে। হলোকাস্টের ভয়ঙ্কর স্মৃতির ভেতরে গড়ে ওঠা একটি রাষ্ট্র যখন অন্য একটি জনগোষ্ঠীর জীবনকে অন্ধকারে ঠেলে দেয়, তখন আত্মসমীক্ষার সময় এসে যায়।

গাজা নিয়ে আন্তর্জাতিক রাজনীতি, কূটনীতি বা সামরিক বিশ্লেষণের বাইরে গিয়ে এখন প্রয়োজন সত্য মুখোমুখি হওয়া। সত্য বলার সাহস যদি ইসরাইলের ভেতর থেকেই উঠে আসে, তবে তাতে বিশ্ব অন্তত কিছুটা নৈতিক আলো খুঁজে পেতে পারে।