বাংলাদেশের অর্থনীতি এখন আর তত্ত্বের জায়গায় নেই এটি এখন সংকটের বাস্তবতায় দাঁড়িয়ে। উচ্চ মূল্যস্ফীতি, বৈদেশিক ঋণের চাপ, রাজস্ব ঘাটতি, দুর্বল ব্যাংকিং খাত এবং রাষ্ট্রায়ত্ত প্রতিষ্ঠানের দীর্ঘস্থায়ী লোকসান—এই বাস্তবতায় রাজনৈতিক দলগুলোর অর্থনৈতিক নীতির বিচার করতে হবে কঠোর মানদণ্ডে।
এই প্রেক্ষাপটে পলিসি সামিটে বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী যে অর্থনৈতিক নীতিমালা ঘোষণা করেছে, তা দেখে আগের ক্ষমতাসীন ধারার এবং বিএনপির প্রচলিত অর্থনৈতিক বক্তব্যের তুলনায় ভিন্ন দর্শন ও কিছুটা সাহসী পদক্ষেপ মনে হয়েছে। তবে প্রশ্ন হলো—এই ভিন্নতা কতটা বাস্তবসম্মত, আর কতটা ঝুঁকিপূর্ণ?
করনীতি: তিন ধারার তিন দর্শন
ক্ষমতাচ্যুত আওয়ামী ধারার অর্থনীতির মূল ভিত্তি ছিল—উচ্চ ভ্যাট, উচ্চ করহার, বড় বাজেট, বড় প্রকল্প। এর ফলাফল হলো অবকাঠামো দৃশ্যমান হলেও রাজস্ব কাঠামো দুর্বল রয়ে গেছে। কর আদায় বাড়েনি অনুপাতে, বরং ঋণ ও ব্যাংকিং ঝুঁকি বেড়েছে।বিএনপির সাম্প্রতিক বক্তব্যে দেখা যায়—কর কমানো হবে, ব্যবসাবান্ধব পরিবেশ তৈরি হবে। কিন্তু বিএনপি এখনও সংখ্যাভিত্তিক কর সংস্কারের স্পষ্ট রোডম্যাপ দিতে পারেনি। কথাবার্তায় মনে হচ্ছে তাদের নীতি মূলত পুরনো বাজারমুখী মডেলের পুনরাবৃত্তি। এই জায়গায় জামায়াত আলাদা কিছু দেখাতে পেরেছে। তারা সংখ্যা উল্লেখসহ সরাসরি বলছে—করহার কমবে, কিন্তু করদাতার সংখ্যা নাটকীয়ভাবে বাড়ানো হবে। NID-ভিত্তিক স্মার্ট কার্ড, করমুক্ত আয়সীমা ৬ লাখ টাকা, সর্বোচ্চ আয়কর ১৯ শতাংশ—এই প্রস্তাবগুলো মধ্যবিত্তের কাছে আকর্ষণীয়। কিন্তু আমার বিশ্লেষণ বলছে, বাংলাদেশের মতো দুর্বল প্রশাসনিক রাষ্ট্রে করদাতা বাড়ানো সবচেয়ে কঠিন সংস্কার। এটি করতে ব্যর্থ হলে জামায়াতের পুরো হিসাব ভেঙে পড়বে।
ভ্যাট ও ভোক্তা: জনপ্রিয়তা বনাম রাজস্ব বাস্তবতা
১৫ শতাংশ ভ্যাট থেকে ১০ শতাংশে নামানো রাজনৈতিকভাবে জনপ্রিয়, কিন্তু অর্থনৈতিকভাবে খুবই ঝুঁকিপূর্ণ সিদ্ধান্ত। আওয়ামী আমলে ভ্যাট ছিল রাজস্বের সহজ উৎস—যদিও তা ভোক্তাদের ওপর চাপ সৃষ্টি করেছে। বিএনপি এ বিষয়ে কৌশলী নীরবতা বজায় রেখেছে।
জামায়াত স্পষ্টভাবে ভ্যাট কমানোর কথা বলেছে। কিন্তু প্রশ্ন হলো—ভ্যাট কমালে রাজস্ব ঘাটতি কীভাবে পূরণ হবে? এর একমাত্র উত্তর—কর প্রশাসনের দক্ষতা ও দুর্নীতি দমন। কিন্তু এই দুই জায়গায় বাংলাদেশে অতীতে কোনো সরকারই কাঙ্ক্ষিত সাফল্য দেখাতে পারেনি। জামায়াত কিভাবে পারবে সেটি এখন বড় প্রশ্ন। না পারলে দেশ চরম ক্ষতির দিকে যাবে সেটিও অনুমেয়।
সামাজিক ব্যয়: প্রতিশ্রুতি বনাম সক্ষমতা
জামায়াতের পলিসি সামিটে দেওয়া নারীদের বিনামূল্যে উচ্চশিক্ষা, বিনাসুদে ছাত্রঋণ, শিশু ও প্রবীণদের ফ্রি চিকিৎসা, ৬৪টি বিশেষায়িত হাসপাতাল—এই প্রস্তাবগুলো আওয়ামী লীগের সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচির চেয়েও বিস্তৃত হয়েছে।
কিন্তু এখানেই বড় প্রশ্ন—বাংলাদেশ কি সত্যিই একটি কল্যাণ রাষ্ট্র চালানোর প্রশাসনিক সক্ষমতায় পৌঁছেছে? আওয়ামী লীগের অভিজ্ঞতা দেখিয়েছে, সামাজিক ব্যয়ের বড় অংশই লিকেজ ও দুর্নীতিতে হারিয়ে যায়। বিএনপি এই বিষয়ে তুলনামূলক সংযত। জামায়াত যদি একই প্রশাসনিক কাঠামো রেখে এই ব্যয় বাস্তবায়ন করতে চায়, তাহলে ফল ভিন্ন হবে—এমন নিশ্চয়তা দেখছি না।
শিল্প ও উদ্যোক্তা: সম্ভাবনার জায়গা
নতুন উদ্যোক্তাদের জন্য তিন বছরের গ্যাস–বিদ্যুৎ–পানি সংযোগ moratorium—এটি তিন ধারার মধ্যেই সবচেয়ে বাস্তবসম্মত প্রস্তাব। আওয়ামী আমলে শিল্পখাত সুবিধা পেয়েছে, কিন্তু তা মূলত বড় গোষ্ঠীকেন্দ্রিক। বিএনপি ঐতিহাসিকভাবে ব্যবসাবান্ধব হলেও স্টার্টআপ-কেন্দ্রিক নীতি স্পষ্ট নয়। এই জায়গায় জামায়াত একটি প্রবৃদ্ধিমুখী সিগন্যাল দিয়েছে। যা প্রশংসার দাবি রাখে। তবে রাষ্ট্রায়ত্ত সংস্থার দক্ষতা না বাড়লে এই সুবিধা লোকসান বাড়াবে বলে আমার ধারনা।
ঋণ ও রাষ্ট্রায়ত্ত খাত: নীরব সত্য
রাষ্ট্রায়ত্ত প্রতিষ্ঠানকে লাভজনক করার প্রতিশ্রুতি সব দলই দেয়। বাস্তবে কেউই সফল হয়নি। আওয়ামী আমলে ঋণ বেড়েছে, বিএনপি অতীতে সংস্কারে হাত দেয়নি। জামায়াতও এখানে ভিন্ন কিছু বলেনি—কেবল সদিচ্ছার কথা বলেছে। কিন্তু আমি মনে করি সদিচ্ছা অর্থনৈতিক সংস্কারে বিকল্প নয়।
পরিশেষে বলবো, জামায়াতে ইসলামির অর্থনৈতিক নীতি আওয়ামী ধারার তুলনায় কম রাষ্ট্রনির্ভর, বিএনপির তুলনায় বেশি কাঠামোবদ্ধ। এটি তাদের জন্য একটি রাজনৈতিক প্লাস পয়েন্ট। কিন্তু এই নীতির সফলতা নির্ভর করবে একটিমাত্র বিষয়ের ওপর। জামায়াত কি প্রশাসনিক সংস্কার ও দুর্নীতিবিরোধী কঠিন সিদ্ধান্ত নিতে পারবে? এই প্রশ্নের উত্তর না পাওয়া পর্যন্ত, এই নীতিকে সম্ভাবনাময় বলা যায়, কিন্তু নিরাপদ বলা যায় না। বাংলাদেশের অর্থনীতির বর্তমান অবস্থায় পরীক্ষানিরীক্ষার জায়গা খুব সীমিত। তাই প্রতিশ্রুতির চেয়ে বাস্তবায়নের সক্ষমতাই হবে চূড়ান্ত বিচার।
লেখক: সিনিয়র রিপোর্টার, বাংলাভিশন



