নাতি-পুতিদের নিয়ে শতায়ুর উৎসব: বিজ্ঞান কী বলে?

মিশরের আমেরিকান ইউনিভার্সিটি ইন কায়রোর ফারমাকোলজিস্ট শাইমা ইব্রাহিমের নেতৃত্বে গবেষকরা দীর্ঘ ৫৫ বছরের ১২৪টি গবেষণা পর্যালোচনা করে দেখেছেন, ১০০ বছর পার করার কোনো জাদুকরি একক সূত্র নেই।

সৈয়দ মূসা রেজা
শতায়ু ব্যক্তির জন্মদিনের কেক!
শতায়ু ব্যক্তির জন্মদিনের কেক! |সংগৃহীত

সৈয়দ মূসা রেজা

জন্মদিনের যে কেকটি কাটার জন্য আপনার সামনে আনা হবে, তা বেশ বড় হতে হবে। একশটি মোমবাতি রাখার জায়গা করা মুখের কথা নয়। ঘর ভর্তি বেলুন, ছেলে-মেয়ে, নাতি-নাতনি, নাতির ঘরের পুতিন এবং পুতিনের ঘরের সন্তানরাও থাকবে।

শতায়ু হওয়ার এমন স্বপ্ন অনেকে দেখেন। কিন্তু শেষ পর্যন্ত সেঞ্চুরি আর পিটাতে পারেন না। তা হলে? শতায়ুর রেখা স্পর্শ করা বা সে রেখা পার হতে হলে কী করতে হবে?

বিজ্ঞানভিত্তিক ওয়েবসাইট সায়েন্স অ্যালার্ট রোববার (১৯ জুলাই) জানিয়েছে, সহজে দীর্ঘজীবী হওয়ার কোনো শর্টকাট পথ আসলে নেই। পুঁথিঘরের কোনো নোটবই বা হাল আমলের গাইড বই কোনো কাজেই দেবে না। সবজি খাওয়া, শরীরচর্চা করা, ধূমপান না করা, নাকি একঝাঁক বন্ধু থাকা—পরামর্শের অভাব নেই।

শতায়ু পার করা বিখ্যাত মার্কিন নৃত্যশিল্পী ডিক ভ্যান ডাইকের মতে রহস্যটা হলো ইতিবাচক থাকা। তবে মিশরের আমেরিকান ইউনিভার্সিটি ইন কায়রোর ফারমাকোলজিস্ট শাইমা ইব্রাহিমের নেতৃত্বে গবেষকরা দীর্ঘ ৫৫ বছরের ১২৪টি গবেষণা পর্যালোচনা করে দেখেছেন, ১০০ বছর পার করার কোনো জাদুকরি একক সূত্র নেই।

মিশরের আমেরিকান ইউনিভার্সিটি ইন কায়রোর ফারমাকোলজিস্ট শাইমা ইব্রাহিমের নেতৃত্বে গবেষকরা দীর্ঘ ৫৫ বছরের ১২৪টি গবেষণা পর্যালোচনা করেছেন। ‘ডিসকভার পাবলিক হেলথ’ সাময়িকীতে প্রকাশিত এই পর্যালোচনায় দেখা গেছে, ১০০ বছর পার করার কোনো জাদুকরি একক সূত্র নেই। বরং শতায়ু হওয়ার পেছনে কাজ করে জিন, ডিএনএ মেরামত, খাওয়া-দাওয়া, শারীরিক সক্রিয়তা, সামাজিক যোগাযোগ এবং ভাগ্যসহ অসংখ্য বিষয়ের এক জটিল সমীকরণ। যারা ১০০ বছর বাঁচেন, তাদের কাছে কোনো গোপন কৌশল থাকে না; বরং জীবনজুড়ে ছোট ছোট কিছু ভালো অভ্যাসের সুফল তারা পান।

তবে বিজ্ঞানীদের জন্য একটি বড় খটকাও আছে। শতায়ুদের নিয়ে গবেষণা করার মানে হলো, যারা ১০০ বছর বাঁচতে পেরেছেন কেবল তাদেরই দেখা—যারা পারেননি তাদের নয়। ফলে কোনো নির্দিষ্ট স্বভাব মানুষকে দীর্ঘজীবী করেছে, নাকি বেঁচে যাওয়া মানুষদের মধ্যে ওটা কাকতালীয়ভাবে ছিল, তা নিশ্চিত হওয়া কঠিন।

গবেষকরা ১০০ বছর বা তার বেশি বয়সী (শতবর্ষী, সেমি-সুপারসেন্টেনারিয়ান ও সুপারসেন্টেনারিয়ান) মানুষদের জীবন নিয়ে হওয়া হাজার হাজার গবেষণাপত্র ঘেঁটে ১২৪টি বেছে নেন। তারা দেখতে পান, অতি দীর্ঘজীবীদের কোষ সাধারণ মানুষের চেয়ে ভিন্নভাবে বুড়ো হয়। তাদের শরীরে ডিএনএ মেরামত বেশি কার্যকর থাকে, কোষের শক্তিঘর বা মাইটোকন্ড্রিয়া সুস্থ থাকে এবং রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা ভালো কাজ করে। দীর্ঘায়ুর পেছনে জিনের ভূমিকা থাকলেও একক কোনো ‘দীর্ঘায়ু জিন’ নেই। অনেকগুলো জিন মিলে এই প্রভাব তৈরি করে।

পাশাপাশি জীবনযাত্রার ভূমিকাও ছিল দারুণ। বিভিন্ন দেশের শতায়ুদের মধ্যে দেখা গেছে, তারা মূলত উদ্ভিজ্জ খাবার খেতেন; হাঁটাচলা বা বাগান করার মতো দৈনন্দিন কাজে সক্রিয় থাকতেন; ধূমপান করতেন না এবং পরিবার ও সমাজের সাথে শক্ত বন্ধন রাখতেন। মানসিক চাপ সামলানোর ক্ষমতা এবং কম দুশ্চিন্তা করার স্বভাবও তাদের মধ্যে দেখা গেছে।

আরেকটি চমৎকার বিষয় হলো, শতায়ু ব্যক্তিরা রোগবালাই থেকে পুরোপুরি মুক্ত থাকেন না। তবে তারা রোগকে জীবনের অনেক পরের ভাগে ঠেলে দিতে পারেন। রোগ বালাইয়ের সাথে লড়াইয়ের ওপর ভিত্তি করে গবেষকরা শতায়ুদের তিনটি দলে ভাগ করেছেন—‘এসকেপার’ যারা রোগ এড়িয়ে চলেন, ‘ডিলেয়ার’ যারা রোগ অনেক দেরিতে বাঁধাতে পারেন এবং ‘সারভাইভার’ যারা কম বয়সেই রোগে আক্রান্ত হয়েও তা নিয়ে বহু বছর বেঁচে থাকেন।

তাই তো সেঞ্চুরি পিটিয়ে ওই রাজকীয় জন্মদিনের কেক কাটতে চাইলে, বিজ্ঞানের চিরন্তন পরামর্শগুলোই মেনে চলতে হবে। গবেষকরা বলছেন, অতি বৃদ্ধ বয়সে জিনের ভূমিকা নাটকীয়ভাবে বেড়ে গেলেও সাধারণ মানুষের ক্ষেত্রে পরিবেশ, অভ্যাস আর নিজের আচরণই আসল ভূমিকা রাখে। শতায়ুর রেখা ছুঁয়ে নাতি-পুতিদের নিয়ে উৎসব করার পথটা তাই খুব জটিল কিছু নয়—নিয়মিত হাঁটুন, মন খুলে বাঁচুন, আর পাতে রাখুন সবুজ সবজি।