‘গরুর গোশতের শুঁটকি’- একসময় যে খাবারটি মূলত গ্রামের ঘরোয়া সংরক্ষণ পদ্ধতির অংশ ছিল, এখন সেটিই ধীরে ধীরে জায়গা করে নিচ্ছে অনলাইন ব্যবসা, ফুড ভ্লগ আর শহুরে খাবারের তালিকায়।
বিশেষ করে ঈদুল আজহার সময় কোরবানির গোশত সংরক্ষণের উপায় হিসেবে অনেক পরিবার গরুর গোশতের শুঁটকি তৈরি করতো।
আগেকার দিনে আজকের মতো ধনী-গরীব নির্বিশেষে ঘরে ঘরে রেফ্রিজারেটর ছিল না। তাই, মানুষ তখন গোশতে লবণ, হলুদ ও বিভিন্ন মসলা মাখিয়ে রোদে শুকাতো। এতে গোশত দীর্ঘদিন ভালো থাকতো এবং পরে রান্না করেও খাওয়া যেত।
উত্তরাঞ্চল, উপকূলীয় অঞ্চল ও কিছু গ্রামীণ এলাকায় যুগ যুগ ধরে এভাবেই মাছের পাশাপাশি গোশতের শুঁটকিও করা হতো এবং কোথাও কোথাও এখনো তা টিকে আছে।
শুধু বাংলাদেশেই নয়, এশিয়া, আফ্রিকা, আমেরিকাসহ বিভিন্ন অঞ্চলে এর প্রচলন আছে এবং রোদে বা কৃত্রিম উপায়ে শুকানো গোশতের বেশ কদরও রয়েছে বিশ্বজুড়ে।
রোদ, ধোঁয়া আর স্মৃতিতে টিকে থাকা এক খাবার
সময় বদলেছে। রেফ্রিজারেটরের বদৌলতে বদলেছে খাবার সংরক্ষণের পদ্ধতিও। কোরবানির ঈদে গোশত রান্না ও বিতরণ করার পর এখন আর মানুষকে সেগুলো সংরক্ষণ করা নিয়ে ভাবতে হয় না।
কিন্তু কেউ কেউ আছেন, যাদের গরুর গোশতের শুঁটকির প্রতি আগ্রহ কমেনি। সেকারণেই এই রেফ্রিজারেটরের যুগেও তারা নিজেদের খাওয়ার জন্য গরুর গোশতের শুঁটকি তৈরি করেন।
আর এটি বোঝা যায় অনলাইনে গরুর গোশতের শুঁটকি বিক্রির হিড়িক দেখে। এটি এখন হলফ করে বলা যায়, সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ও অনলাইন ব্যবসার কারণেও এটি নতুন করে জনপ্রিয়তা পাচ্ছে। অনেকেই এখন এটিকে ঐতিহ্যবাহী খাবার হিসেবেও তুলে ধরছেন।
বর্তমানে যশোরের বেনাপোলে কর্মরত সরকারি কর্মকর্তা মো: কাউসার আহমেদ, যার জন্ম ও বেড়ে ওঠা বাংলাদেশের ময়মনসিংহ বিভাগের জামালপুর জেলায়। তিনি বিবিসি বাংলাকে বলছিলেন, ছোটবেলায় তিনি কোরবানির ঈদে তাদের গ্রামের প্রত্যেক ঘরে ঘরেই গরুর গোশতের শুঁটকি বানাতে দেখতেন। কারণ তখন ফ্রিজ ছিল না।
গরুর গোশতের শুঁটকি তৈরির জন্য সাধারণত গোশত পাতলা বা ছোট টুকরো করে কাটা হয়। এরপর লবণ, মরিচ, হলুদসহ বিভিন্ন মসলা মাখিয়ে কয়েকদিন রোদে শুকানো হয়।
কাউসার আহমেদ নিজেও নানা ধরনের খাবার রান্না করতে বা নতুন নতুন খাবার নিয়ে পড়াশোনা করতে পছন্দ করেন। তিনি তার স্মৃতি থেকে বলছিলেন, ‘সবসময় যে হলুদ-মরিচ মাখানো হতো, তা না। শুধু লবণ দিয়েও মেটালের চিকন তারের মাঝে ঝুলিয়ে কড়া রোদে দেয়া হতো।’
কোথাও কোথাও ধোঁয়ায় শুকানোর পদ্ধতিও ব্যবহার করা হয়। এতে গোশত বা মাছ সরাসরি আগুনে পোড়ানো হয় না। বরং, আগুনের একটু ওপরে বা পাশে ঝুলিয়ে রাখা হয়, যাতে আগুনের ধোঁয়া ও তাপে পানি কমে গিয়ে ধীরে ধীরে গোশত বা মাছ শুকিয়ে যায়।
বাংলাদেশের কিছু গ্রামীণ এলাকায়, বিশেষ করে যেখানে দীর্ঘদিন খাবার সংরক্ষণের প্রয়োজন হতো, সেখানে এই পদ্ধতি ব্যবহার করা হতো। এতে এক ধরনের আলাদা ধোঁয়ার স্বাদও যোগ হয়।
কাউসার আহমেদ এই প্রক্রিয়ায়ও শুঁটকি করতে দেখেছেন জানিয়ে বলেন, ‘গ্রামের মাটির চুলায় যখন রান্না হতো, সেই চুলার উপরে একইভাবে গোশত ঝুলিয়ে রাখা হতো। রান্নার যে তাপ, তাতে সেই রোদের কাজ হয়ে যেত। যারা স্মোকি ফ্লেভার চান, তারা এভাবে করতো।’
তিনি জানান, এভাবে গরুর গোশতের শুঁটকি করতে অনেক সময় দিতে হয় এবং সেই সময়টা দেয়া অনেকের জন্য এখন কঠিন।
তিনি হাসতে হাসতে বলেন, আগে এই শুঁটকি খেতে হলে এত কষ্ট করে সব নিজেরই করা লাগতো। এখন যেকোনো ঐতিহ্যবাহী খাবার অনলাইনে পাওয়া যায়।
চাঁদপুরের স্থানীয় সাংবাদিক কাদের পলাশ, যিনি সেখানকার ইতিহাস-ঐতিহ্য নিয়ে কাজও করেছেন, বিবিসি বাংলাকে বলছিলেন যে তিনিও তার মা-চাচিদের কোরবানি এলেই গোশতের শুঁটকি তৈরি করতে দেখেছেন। কিন্তু গত ২০ বছর ধরে তার পরিবারের আর কেউ তা বানান না।
প্রয়োজন ফুরিয়েছে, টিকে আছে স্বাদ ও ঐতিহ্য
এটি স্পষ্ট যে গরুর গোশত সংরক্ষণের পুরোনো পদ্ধতি ‘শুঁটকি’ অনেকের কাছে শুধু একটি খাবার না; বরং, পারিবারিক ও আঞ্চলিক ঐতিহ্যের অংশ।
দিনের পর দিন রোদে-ধোঁয়ায় গোশত শুকিয়ে আসছে দিনের জন্য সংরক্ষণ করার প্রয়োজনীয়তা এখন ফুরিয়েছে। তবুও এটি টিকে রয়েছে এর স্বাদ ও ঐতিহ্যের কারণে।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের পুষ্টি ও খাদ্য বিজ্ঞান ইনস্টিটিউটের অধ্যাপক মো: নিজামুল হক ভূঁইয়া এ নিয়ে বিবিসি বাংলাকে বলছিলেন, আজ থেকে পঞ্চাশ বছর আগে ফ্রিজ অপ্রতুল ছিল। অনেক পরিবারের কেনার সামর্থ্যও ছিল না। তখন মানুষ মাছ-গোশত শুঁটকি করে রেখে দিতো।
তিনি বলেন, ‘অনেকে এখনো সেই আগের প্রসেসটাই ফলো করছে বা ওই খাদ্যসংস্কৃতিকে রক্ষা করছে, তা মূলত এর (গরুর গোশতের শুঁটকির) স্বাদের কারণে।’
তবে তিনি মনে করেন, যেকোনো খাবার আসলে মানুষের অভ্যাসের ব্যাপার।
‘বরিশাল অঞ্চলে সেভাবে শুঁটকি খায় না, চরাঞ্চলগুলোতে অনেকে খায়। চট্টগ্রাম, কক্সবাজার, সিলেট, নেত্রকোনা– এই বেল্টে শুঁটকি খায়। চট্টগ্রাম মানেই শুঁটকি। এর মূল কারণ, হয়তো তাদের পূর্ব-পুরুষরা শুঁটকি খেত। অথচ সেখানেও কিন্তু সামুদ্রিক মাছ পাওয়া যায়, সেখানকার মাছ রফতানি করা হচ্ছে। অর্থাৎ, যেখানে সংস্কৃতি গড়ে ওঠে, সেখানেই মানুষ খায়।’
গরুর গোশতের শুঁটকি কিভাবে এসেছে, এর ‘আভিধানিক কোনো ব্যাপার নেই’।
তবে আগে মানুষ ‘গভীর সমুদ্রে মাছ ধরতে গেলে প্রসেস করে শুঁটকি নিয়ে যেত। শুধু গরুর গোশত না, মুরগির গোশত, মহিষের গোশতও নিয়ে যেত,’ যোগ করেন এই অধ্যাপক।
শুঁটকির পশ্চিমা সংস্করণ 'জার্কি'
এই অঞ্চলের পরিচিত গরুর গোশতের শুঁটকির সাথে মিল রয়েছে পশ্চিমা বিশ্বের জনপ্রিয় খাবার বিফ জার্কির। বিশেষ করে যুক্তরাষ্ট্রে এটি বেশ পরিচিত একটি খাবার।
বিফ জার্কি বলতে সাধারণত এমন শুকনো গরুর গোশতকে বোঝানো হয়, যা পাতলা করে কেটে মসলা বা সস মাখিয়ে মেরিনেট করে পরে শুকানো হয়, যাতে দীর্ঘদিন সংরক্ষণ করা যায়।
এটি সাধারণত স্ন্যাকস হিসেবে খাওয়া হয়। তবে এই খাবারের ধারণা অনেক পুরোনো।
যুক্তরাষ্ট্রের নর্থ ডাকোটা স্টেট ইউনিভার্সিটির একটি প্রকাশনায় বলা হয়েছে, ‘জার্কি’ (শুকনো গোশত) মূলত উত্তর ও দক্ষিণ আমেরিকার আদিবাসীদের গোশত সংরক্ষণের ঐতিহ্য থেকে এসেছে। তারা স্থায়ীভাবে এক জায়গায় থাকতো না।
কখনো খাবারের সন্ধানে বা ঋতু পরিবর্তনের সাথে সাথে তারা এক স্থান থেকে অন্য স্থানে যাতায়াত করতো। সেসময় তাদের খাদ্যের বড় উৎস ছিল মহিষ, এল্ক ও হরিণের মতো প্রাণী।
এসব প্রাণী শিকার করে তারা গোশত খেত। এক সাথে এত গোশত খেয়ে শেষ করতে পারতো না, কিংবা শীতকাল বা দীর্ঘ ভ্রমণের প্রস্তুতি নিতো, তখন তারা সেই গোশত সংরক্ষণ করতো।
রেফ্রিজারেশন বা ফ্রিজিং পদ্ধতি আবিষ্কারের আগে গোশত সংরক্ষণের উপায়ই ছিল সেটি শুকিয়ে ফেলা।
সেখানেও গোশত পাতলা করে কেটে উঁচুতে বেঁধে ঝুলিয়ে রোদে শুকানো হতো। কখনো মাছি তাড়াতে ও ধোঁয়ার স্বাদ যোগ করতে সেগুলো ধোঁয়ার ওপরেও রাখা হতো।
মূলত, গোশত শুকানো ও স্বাদ তৈরির নিজস্ব পদ্ধতি প্রতিটি পরিবারেরই আলাদা ছিল।
তবে বর্তমানের এই ‘জার্কি’ শব্দটি এসেছে দক্ষিণ আমেরিকার কেচুয়া ভাষার “চ’আর্কি” শব্দ থেকে, যার অর্থ শুকনো গোশত, যেটিকে স্প্যানিশরা ‘চারকি’ হিসেবে উচ্চারণ করতো।
কেচুয়া ছিল ইনকা সভ্যতার ইনকাসহ বহু আদিবাসী জনগোষ্ঠীর ভাষা। ঐতিহ্যগতভাবে চ’আর্কি তৈরি হতো লামা বা গরুর গোশতের পাতলা টুকরো রোদে শুকিয়ে ও ঠাণ্ডা রাতে জমিয়ে।
পরে স্প্যানিশরা যখন দক্ষিণ আমেরিকায় আসে, তখন সেখানকার আদিবাসীদের কাছ থেকে এই পদ্ধতি সম্পর্কে জানে এবং পরে আমেরিকাসহ নানা জায়গায় এটি ছড়িয়ে যায়।
একসময় এই জার্কি কাউবয় (যারা গরু বা অন্যান্য গবাদিপশু চরানো, দেখাশোনা করা ও এক জায়গা থেকে আরেক জায়গায় নিয়ে যাওয়ার কাজ করে) ও ভ্রমণকারীদের মাঝে জনপ্রিয় হয়ে ওঠে। কারণ খাবারটি সহজে বহন করা যেত এবং দ্রুত নষ্ট হতো না।
সুতরাং, মূল ধারণার দিক থেকে বিফ জার্কি আর বাংলাদেশের গরুর গোশতের শুঁটকি অনেকটাই একই ধরনের খাবার। দু’টিতেই গোশত শুকিয়ে সংরক্ষণ করা হয়, যাতে দীর্ঘদিন খাওয়া যায়।
তবে প্রস্তুত প্রণালী ও খাওয়ার ধরনে অঞ্চল ও সংস্কৃতিভেদে কিছু পার্থক্য রয়েছে।
গরুর গোশতের শুঁটকিতে পুষ্টিগুণ একই থাকে?
পুষ্টিবিদরা জানিয়েছেন, গরুর গোশতে রয়েছে আমাদের শরীরের জন্য প্রয়োজনীয় প্রোটিন, ভিটামিনস, মিনারেলস বা খনিজ উপাদান। যেমন- জিঙ্ক, সেলেনিয়াম, ফসফরাস, আয়রন। আবার ভিটামিনের মধ্যে রয়েছে ভিটামিন বি২ বি৩, বি৬, এবং বি১২।
আর এই পুষ্টিকর উপাদানগুলো-
১) রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বাড়ায়।
২) পেশি, দাঁত ও হাড়ের গঠনে ভূমিকা রাখে।
৩) ত্বক, চুল ও নখের স্বাস্থ্য ভালো রাখে।
৪) শরীরের বৃদ্ধি ও বুদ্ধি বাড়াতে ভূমিকা রাখে।
৫) ক্ষত নিরাময়ে সাহায্য করে।
৬) দৃষ্টিশক্তি ভালো রাখে।
৭) অতিরিক্ত আলসেমি বা ক্লান্তি বা শরীরের অসাড়তা দূর করে কর্মোদ্যম রাখে।
৮) ডায়রিয়া প্রতিরোধে সাহায্য করে।
৯) রক্তস্বল্পতা প্রতিরোধ করে।
১০) খাবার থেকে দেহে শক্তি যোগান দেয়।
১১) স্মৃতিশক্তি বাড়ায়
১২) অবসাদ, মানসিক বিভ্রান্তি ও হতাশা দূর করে।
এ বিষয়ে অধ্যাপক মো: নিজামুল হক ভূঁইয়া বলছিলেন, ‘গরুর গোশতের শুঁটকিতেও প্রোটিন গুণাবলী প্রায় একইরকম থাকে, খুব একটা নষ্ট হয় না। কিন্তু এর সাথে আবার বিভিন্ন ফুড অ্যাডিটিভস (খাবারে ব্যবহৃত সংযোজক উপাদান) যোগ করা হয়, যেজন্য এটা সুস্বাদু হয়। যেমন- টেস্টিং সল্ট। নরমাল গোশতের স্বাদ একরকম, শুঁটকির স্বাদও ভিন্নরকম। এজন্যই অনেক মানুষ শুঁটকি খেতে পছন্দ করেন।’
এ প্রসঙ্গে পুষ্টিবিদ সামিয়া তাসনিম বলেন, গরুর গোশতের শুঁটকি করা হলে সেখান থেকে পানির পরিমাণ বের হয়ে যায়। অর্থাৎ, ‘একই ওজনের গরুর গোশতে যে ৬৫ শতাংশ পানি, সেটা বের হয়ে ওজন কমে যাচ্ছে এবং সাধারণ গোশতের তুলনায় পুষ্টিও তুলনামূলক বেড়ে যাচ্ছে।’
শুঁটকি করার সময় অতিরিক্ত লবণ দেয়া হলে সোডিয়ামের পরিমাণ তাতে বাড়বে। তাই, রান্নায় করার সময় বাড়তি লবণ ব্যবহার না করাটাই ভালো বলে জানান তিনি।
কারণ গরুর গোশতে এমনিতেই প্রচুর পরিমাণে সোডিয়াম থাকে, যা রক্তচাপ বাড়িয়ে দেয়। আর উচ্চ রক্তচাপ থেকে হৃদরোগ, স্ট্রোক ও কিডনি জটিলতা দেখা দিতে পারে।
আর গোশত ঠিকভাবে শুকানো বা সংরক্ষণ না হলে ব্যাকটেরিয়া বা ফাঙ্গাস জন্মাতে পারে।
সূত্র : বিবিসি



