বহু দশক ধরে “বিকল্প স্বদেশ” ধারণা—অর্থাৎ জর্ডানই হবে ফিলিস্তিনিদের রাষ্ট্র—আম্মানের কূটনৈতিক মহলে দূরবর্তী দুঃস্বপ্ন বা ষড়যন্ত্র তত্ত্ব হিসেবে বিবেচিত হতো।
কিন্তু গাজায় চলমান বিধ্বংসী যুদ্ধ এবং ইসরায়েলের কট্টর ডানপন্থী সরকারের প্রেক্ষাপটে সেই আশঙ্কা এখন বাস্তবতার রূপ নিচ্ছে বলে মনে করছেন জর্ডানের নীতিনির্ধারকরা।
রোববার (১৫ ফেব্রুয়ারি) ইসরাইলি মন্ত্রিসভা অধিকৃত পশ্চিম তীরের বিস্তীর্ণ এলাকা ‘রাষ্ট্রীয় জমি’ হিসেবে ইসরাইলের বিচার মন্ত্রণালয়ের অধীনে নিবন্ধনের অনুমোদন দেয়ার পর আম্মানে উদ্বেগ চরমে পৌঁছায়। ইসরাইলের অর্থমন্ত্রী বেজালেল স্মোত্রিচ এ সিদ্ধান্তকে ‘বসতি বিপ্লব’ হিসেবে বর্ণনা করেছেন। এর ফলে ১৯৬৭ সাল থেকে সামরিক প্রশাসনের অধীনে থাকা অঞ্চলকে কার্যত ইসরাইলের সার্বভৌম ভূখণ্ড হিসেবে বিবেচনার পথ সুগম হচ্ছে।
জর্ডানের দৃষ্টিতে, এই প্রশাসনিক সংযুক্তিকরণ স্থিতাবস্থার অবসানের চূড়ান্ত ইঙ্গিত। একই সময়ে ইসরায়েলি বাহিনীর ‘আয়রন ওয়াল’ অভিযান জেনিন ও তুলকারেমের শরণার্থী শিবিরে ব্যাপক অভিযান চালাচ্ছে। ফলে জর্ডানের রাজনৈতিক ও সামরিক মহলে এখন প্রশ্ন—জোরপূর্বক স্থানান্তর হবে কি না—তা নয়; বরং কীভাবে তা ঠেকানো যায়।
জর্ডানের সাবেক উপপ্রধানমন্ত্রী মামদুহ আল-আবাদি আল জাজিরাকে বলেন, “স্থানান্তর এখন আর কেবল হুমকি নয়; এটি বাস্তবায়নের পথে। পশ্চিম তীরের পর লক্ষ্য হবে পূর্ব তীর—অর্থাৎ জর্ডান।”
‘নীরব স্থানান্তর’-এর আশঙ্কা
আম্মানের উদ্বেগ কেবল সামরিক আগ্রাসন নয়, বরং ‘সফট ট্রান্সফার’—অর্থাৎ পশ্চিম তীরে বসবাস অযোগ্য পরিস্থিতি তৈরি করে ধীরে ধীরে ফিলিস্তিনিদের জর্ডানে ঠেলে দেয়া।
রোববারের সিদ্ধান্তে ভূমি নিবন্ধন কর্তৃত্ব বিচার মন্ত্রণালয়ে স্থানান্তরকে জর্ডান এই প্রক্রিয়ার গুরুত্বপূর্ণ ধাপ হিসেবে দেখছে। শতাব্দীপ্রাচীন জর্ডানীয় ও অটোমান ভূমি রেজিস্ট্রি বাতিলের মাধ্যমে ফিলিস্তিনি সম্পত্তির আইনি সুরক্ষা দুর্বল করা হচ্ছে বলে তাদের আশঙ্কা।
আল-আবাদি ইসরাইলি সামরিক পরিভাষায় পরিবর্তনের দিকেও ইঙ্গিত করেন। তিনি বলেন, ইসরাইলি সেনাবাহিনীতে ‘গিলিয়াদ ব্রিগেড’ নামে একটি নতুন ইউনিট গঠন করা হয়েছে। “গিলিয়াদ আম্মানের নিকটবর্তী পার্বত্য অঞ্চল। এটি বৃহত্তর কৌশলগত পরিকল্পনার অংশ,” বলেন তিনি।
তার মতে, ১৯৯৪ সালের ওয়াদি আরাবা শান্তিচুক্তি বর্তমান ইসরাইলি নেতৃত্বের কাছে কার্যত অকার্যকর। “স্মোত্রিচের আদর্শ এখন রাষ্ট্রীয় নীতিতে পরিণত হয়েছে,” মন্তব্য করেন তিনি।
সামরিক বিকল্প ও ‘দ্বিতীয় বাহিনী’
কূটনৈতিক পথ সংকুচিত হওয়ায় জর্ডানের সামরিক প্রস্তুতি নিয়ে আলোচনা জোরদার হয়েছে। জর্ডান উপত্যকা এখন তাদের কৌশলগত প্রতিরক্ষার সামনের সারি।
অবসরপ্রাপ্ত মেজর জেনারেল মামুন আবু নাওয়ার ইসরাইলের পদক্ষেপকে ‘ঘোষণাহীন যুদ্ধ’ বলে অভিহিত করেন। তিনি বলেন, বাস্তুচ্যুতি চাপ বাড়লে জর্ডান উপত্যকাকে সামরিক নিয়ন্ত্রিত এলাকা ঘোষণা করা হতে পারে, যা আঞ্চলিক সংঘাতের ঝুঁকি তৈরি করবে।
সামরিক সক্ষমতায় বৈষম্য স্বীকার করলেও তিনি বলেন, জর্ডানের সামাজিক কাঠামোই তাদের শক্তি। “গোত্র ও কুলভিত্তিক সমাজ এক ধরনের দ্বিতীয় বাহিনী,” বলেন তিনি। “প্রতিটি গ্রাম ও গভর্নরেট হবে প্রতিরক্ষা লাইন।”
তবে পরিস্থিতিকে তিনি অস্থির বলে সতর্ক করেন। তার ভাষায়, “রেড লাইন অতিক্রম হলে আঞ্চলিক ভূমিকম্প ঘটতে পারে।”
যুক্তরাষ্ট্রের গ্যারান্টির ভাঙন
জর্ডানের উদ্বেগ বাড়িয়েছে যুক্তরাষ্ট্রের অবস্থান নিয়েও অনিশ্চয়তা। দীর্ঘদিন ধরে জর্ডানের স্থিতিশীলতা মার্কিন নীতির গুরুত্বপূর্ণ অংশ ছিল।
আল-কুদস সেন্টার ফর পলিটিক্যাল স্টাডিজের পরিচালক ওরাইব আল-রান্তাওয়ি বলেন, ওয়াশিংটনের ওপর কৌশলগত নির্ভরতা দুর্বল হয়ে পড়েছে। তার মতে, যুক্তরাষ্ট্র আঞ্চলিক অগ্রাধিকার আম্মান ও কায়রো থেকে উপসাগরীয় রাজধানীগুলোর দিকে সরিয়ে নিয়েছে।
তিনি বলেন, “দুই মিত্রের মধ্যে বেছে নিতে হলে ওয়াশিংটন ইসরাইলকেই বেছে নেবে।” ফলে জর্ডান একদিকে মার্কিন সহায়তার ওপর নির্ভরশীল, অন্যদিকে ইসরাইলের অস্তিত্বগত হুমকির মুখে—এমন এক জটিল অবস্থায় রয়েছে।
কূটনীতির পুনর্বিন্যাসের দাবি
জর্ডান ঐতিহ্যগতভাবে রামাল্লাহভিত্তিক ফিলিস্তিনি কর্তৃপক্ষের সঙ্গে সম্পর্ক বজায় রাখলেও হামাসসহ অন্যান্য গোষ্ঠীর সঙ্গে দূরত্ব রেখেছে। আল-রান্তাওয়ির মতে, এটি কৌশলগত ভুল।
তার ভাষায়, কাতার, মিসর ও তুরস্ক হামাসের সঙ্গে যোগাযোগ রেখে আঞ্চলিক প্রভাব বজায় রাখতে পেরেছে; জর্ডান সেই ভূমিকা হারিয়েছে।
‘সবচেয়ে খারাপ পরিস্থিতি’র প্রস্তুতি
আম্মানে এখন কেবল সতর্কবার্তা নয়, বরং প্রস্তুতির ভাষা জোরালো হচ্ছে। ফেব্রুয়ারির শুরুতে ৩৫ বছর পর জর্ডান বাধ্যতামূলক সামরিক প্রশিক্ষণ কর্মসূচি ‘ফ্ল্যাগ সার্ভিস’ পুনরায় চালু করেছে।
আল-আবাদি সর্বজনীন সামরিক প্রস্তুতির আহ্বান জানিয়ে বলেন, “সবাইকে অস্ত্র ধরার সক্ষমতা থাকতে হবে।” তিনি সাংস্কৃতিক প্রস্তুতির কথাও উল্লেখ করেন।
বিশ্লেষকদের মতে, পশ্চিম তীরে ভূমি নিবন্ধনের মাধ্যমে মালিকানা পরিবর্তনের যে প্রক্রিয়া শুরু হয়েছে, তা জর্ডানের জন্য ১৯৬৭ সালের পর সবচেয়ে বড় সংকট তৈরি করতে পারে।
আল-আবাদির কথায়, “বিশ্ব বক্তৃতা দেয়, নিন্দা জানায়—কিন্তু ইসরাইল কাজ করে যায়। যদি আমরা জাগ্রত না হই, তাহলে কৌশল হবে—‘হয় আমরা, নয় তারা’। তৃতীয় কোনো পথ নেই।”
সূত্র : আল জাজিরা।



