ফেডারেল রিজার্ভের সুদের হার কমানোর আশা এবং রাশিয়া ও ভেনেজুয়েলায় ভূ-রাজনৈতিক উত্তেজনা বৃদ্ধির কারণে গত দুই সপ্তাহে তেলের দাম সর্বোচ্চ স্তরে গিয়ে ঠেকেছে। সেজন্য বিশ্বব্যাপী তেল বাজারের পরিস্থিতি সংক্ষেপে পর্যালোচনা করা যাক।
মুদ্রানীতি ও ভূ-রাজনৈতিক উত্তেজনার মধ্যে তেলের মূল্যের অস্থিরতা
ব্রেন্ট তেলের দাম ০.১৪ শতাংশ বেড়ে ৬৩.৮৪ ডলার এবং মার্কিন ডব্লিউটিআই তেল ০.১৩ শতাংশ বেড়ে প্রতি ব্যারেল ৬০.১৬ ডলার হয়েছে। লন্ডন স্টক এক্সচেঞ্জ ফাইন্যান্সিয়াল গ্রুপের (এলএসইজি) তথ্য অনুযায়ী, ফেডারেল রিজার্ভ সভায় সুদের হার কমানোর আশায় বিনিয়োগকারীরা ৮৪ শতাংশ আত্মবিশ্বাসী। এই আত্মবিশ্বাস অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি এবং জ্বালানি চাহিদা বাড়াতে পারে। তবে এই বৈঠকটিকে ‘সাম্প্রতিক বছরগুলোতে সবচেয়ে বিভেদ সৃষ্টিকারী বৈঠক’ হিসেবে বর্ণনা করা হয়েছে। এর ফলাফল বাজারের গতিপথ পরিবর্তন করতে পারে।
দ্বিমুখী ঝুঁকি : ইউক্রেনের শান্তি এবং রাশিয়ার নিষেধাজ্ঞা
অপরদিকে ভূ-রাজনৈতিক ঝুঁকি একটি তেজি ফ্যাক্টর হিসেবে কাজ করে। এএনজে ব্যাংকের বিশ্লেষকরা সতর্ক করেছেন যে ইউক্রেনে ট্রাম্পের শান্তি প্রচেষ্টার ফলাফল তেল সরবরাহকে প্রতিদিন ২ মিলিয়ন ব্যারেল পর্যন্ত বাড়িয়ে দিতে পারে। ‘তেলের দামের প্রধান নিম্নমুখী ঝুঁকি হলো যুদ্ধবিরতি। অপরদিকে রাশিয়ার তেল অবকাঠামোর ক্রমাগত ক্ষতি উল্লেখযোগ্য একটি উর্ধ্বমুখী ঝুঁকি।’ একই সময় রাশিয়ার তেলের ওপর ‘সম্পূর্ণ সামুদ্রিক নিষেধাজ্ঞা’ দিয়ে জি-সেভেন এবং ইউরোপীয় ইউনিয়নের মধ্যে ‘মূল্যসীমা’ নির্ধারণের জন্য আলোচনা বিশ্বের দ্বিতীয় বৃহত্তম তেল উৎপাদক থেকে সরবরাহের মাত্রা আরো সীমাবদ্ধ করতে পারে।
বিশ্ব মঞ্চে জ্বালানি খেলোয়াড়গণ
কাতারের জ্বালানিমন্ত্রী সাদ আল-কাবি দোহা অর্থনৈতিক ফোরামে জোর দিয়ে বলেছেন, দেশটি বিশ্বব্যাপী তরলিকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস (এলএনজি) চাহিদা নিশ্চিত করতে প্রস্তুত আছে। আল-কাবি কাতারের উৎপাদন প্রতি বছর ৭৭ মিলিয়ন থেকে ১৪২ মিলিয়ন টন বৃদ্ধির কথা জানিয়েছেন, যার মধ্যে মার্কিন গোল্ডেন পাস টার্মিনাল থেকে ১৮ মিলিয়ন টনও রয়েছে। তবে আল-কাবি উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন, অতিরিক্ত সরবরাহে বিনিয়োগের অভাব দাম বাড়িয়ে দিতে পারে। কাতারের জ্বালানিমন্ত্রী কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা থেকে জ্বালানির ক্রমবর্ধমান চাহিদার দিকেও ইঙ্গিত করে বলেছেন, এআই এমন একটি কারখানার মতো যার ২৪/৭ শক্তির প্রয়োজন।
ড্রোন হামলার পর রফতানির রুট পরিবর্তন করেছে কাজাখস্তান
কৃষ্ণ সাগরে ক্যাস্পিয়ান পাইপলাইন কনসোর্টিয়াম সুবিধাগুলোতে ইউক্রেন হামলা চালানোর ফলে কাজাখস্তানকে বাকু-তিবিলিসি-সেহান পাইপলাইনের বিকল্প রুট ব্যবহার করে ৩০ শতাংশ রফতানি বৃদ্ধি করতে বাধ্য করা হয়েছে। ডিসেম্বরে এই রুট থেকে রফতানি প্রতিদিন প্রায় ৪৭ হাজার ব্যারেলে পৌঁছাবে বলে আশা করা হচ্ছে। বারবার ড্রোন হামলার পর রাশিয়ার পাইপলাইন ব্যবস্থা ‘চাপের মধ্যে’ থাকায় এবং অতিরিক্ত তেলের জন্য কাজাখস্তানের পর্যাপ্ত ক্ষমতা না থাকায় এই পরিবর্তন এসেছে।
জ্বালানি বাজারে হুমকি এবং সুযোগের কেন্দ্রবিন্দু : ভেনিজুয়েলা
ক্যারিবিয়ান অঞ্চলে মার্কিন সামরিক সম্পদের প্রায় ৩০ শতাংশ তেল বাজারকে গুরুতর অনিশ্চয়তায় ফেলে দিয়েছে। ভেনিজুয়েলার উৎপাদন প্রতিদিন ৩ মিলিয়ন ব্যারেল থেকে কমে ১.২ মিলিয়ন ব্যারেলে নেমে এসেছে। এখন তার তেল রফতানির ৯৫ শতাংশ সরাসরি চীনে পাঠায়। এটি সম্ভাব্য মার্কিন আক্রমণকে চীনের জ্বালানি নিরাপত্তার জন্য সরাসরি হুমকিগ্রস্ত করে তোলে। বিশ্লেষকরা মনে করেন এই চাপের মধ্যে ওয়াশিংটনের অন্যতম লক্ষ্য হলো পশ্চিম গোলার্ধে বেইজিংয়ের ক্রমবর্ধমান প্রভাব মোকাবেলা করা।
ইরান ও রাশিয়ার গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা : কৌশলগত প্রভাব
ভেনিজুয়েলার ওপর মার্কিন সামরিক আক্রমণের দৃশ্যপট বৈশ্বিক জ্বালানি মানচিত্রকে নতুন রূপ দিতে পারে। চীনে ভেনিজুয়েলার তেলের প্রবাহ বন্ধ করে দিলে এই শূন্যস্থান পূরণে ইরান ও রাশিয়ার মতো সরবরাহকারী দেশগুলোর কৌশলগত ভূমিকা নাটকীয়ভাবে বৃদ্ধি পেতে পারে। যদি মার্কিন পদক্ষেপের ফলে পশ্চিমা বাজারে ভেনিজুয়েলার তেল ফিরে আসে, তাহলে মার্কিন বাজারে মধ্যপ্রাচ্যের তেল উৎপাদকদের প্রতিযোগিতা তীব্র হবে এবং পূর্ব এশিয়ায় নতুন ক্রেতা খুঁজে বের করার প্রয়োজনীয়তা আরো স্পষ্ট হয়ে উঠবে।
বিশ্ব তেল বাজারগুলো ক্যারিবীয় অঞ্চলের পরিস্থিতির দিকে গভীরভাবে নজর রাখছে। কারণ সঙ্ঘাতের যেকোনো ঘটনা দেশটিকে তেলের দামের অস্থিরতার কেন্দ্রস্থল হিসেবে পুনঃপ্রতিষ্ঠিত করতে পারে। বিশেষ করে চীনের জন্য জ্বালানি নিরাপত্তা সমীকরণ পরিবর্তন করে দিতে পারে।
বর্তমান পরিস্থিতি প্রমাণ করে তেল বাজার একটি গুরুত্বপূর্ণ মোড়ে দাঁড়িয়ে আছে। একদিকে, সম্প্রসারণমূলক মুদ্রানীতি চক্র চাহিদাকে উদ্দীপিত করতে পারে। অন্যদিকে, ইউরোপ এবং ল্যাটিন আমেরিকায় ভূ-রাজনৈতিক উত্তেজনার উত্থান সরবরাহকে হুমকির মুখে ফেলতে পারে। এদিকে, কাতারের মতো খেলোয়াড়রা গ্যাস উৎপাদন বৃদ্ধি করে ভবিষ্যতের চাহিদা মেটাতে চাচ্ছে। অন্যদিকে তেল পরিবহন রুটগুলো সঙ্ঘাতের আশঙ্কায় পুনর্নির্মিত হচ্ছে। এই জটিল সমীকরণের চূড়ান্ত ফলাফল নির্ভর করে যুদ্ধ কক্ষ, কেন্দ্রীয় ব্যাংক এবং প্রেসিডেন্ট প্রাসাদের নেয়া সিদ্ধান্তের ওপর, যে সিদ্ধান্তগুলো আগামী মাসগুলোতে বিশ্বব্যাপী জ্বালানির দামের গতিপথ নির্ধারণ করতে পারে।
সূত্র : পার্সটুডে



