জার্মানির কট্টর ডানপন্থী দল অলটারনেটিভ ফর জার্মানি (এএফডি)’র সম্মেলন ঠেকাতে শনিবার হাজারো মানুষ বিক্ষোভে অংশ নিয়ে প্রধান সড়ক অবরোধ ও গণপরিবহন চলাচলে বিঘ্ন ঘটালেও শেষ পর্যন্ত দলটির কংগ্রেস বন্ধ করা যায়নি।
জার্মানির এরফুর্ট থেকে বার্তা সংস্থা এএফপি জানায়, বিক্ষোভকারীরা অবরোধ গড়ে তোলার আগেই এএফডির অনেক প্রতিনিধি ভোরে এরফুর্টের সম্মেলনকেন্দ্রে পৌঁছে যান। নির্ধারিত সময়েই সম্মেলন শুরু হয়।
দেশজুড়ে বিভিন্ন এলাকা থেকে আসা বিক্ষোভকারীরা মূলত শান্তিপূর্ণ কর্মসূচিতে অংশ নেন। জাতীয় জনমত জরিপে শীর্ষে থাকা দলটির বিরুদ্ধে তারা অবস্থান নেন। পুলিশের হিসাবে প্রায় ৩১ হাজার মানুষ বিক্ষোভে অংশ নেন, যদিও আয়োজকদের দাবি এ সংখ্যা অন্তত ৫০ হাজার।
তারা পূর্বাঞ্চলীয় থুরিঙ্গিয়া রাজ্যের রাজধানী এরফুর্টে প্রবেশের একাধিক সড়ক অবরোধ করেন। কেউ কেউ মোটরওয়ে সেতু থেকে দড়ি বেয়ে নিচে নেমে বিক্ষোভে অংশ নেন। এএফপির সাংবাদিকদের তথ্যমতে, কয়েকটি সংগঠন শহরের কেন্দ্রস্থলে অবস্থান কর্মসূচিও পালন করে।
শহর কর্তৃপক্ষ জানায়, বাস ও ট্রাম চলাচলে ব্যাপক বিঘ্ন ঘটে।
পূর্বাঞ্চলীয় শহর গেরা থেকে আসা ১৯ বছর বয়সী বিক্ষোভকারী লেনে ক্রুগ এএফপিকে বলেন, ‘ডানপন্থার দিকে ঝুঁকে পড়ার বিরুদ্ধে একটি বার্তা দেয়া জরুরি।’
তার ভাষায়, ‘এএফডি একটি গণতন্ত্রবিরোধী দল, যারা ঘৃণা ছড়ায়।’
এলা নামে আরেক বিক্ষোভকারী ট্রামলাইনে নিজেদের আটকে দেয়া একটি দলের সদস্য ছিলেন।
৪৪ বছর বয়সী এ বিক্ষোভকারী, যিনি শুধু নিজের প্রথম নাম প্রকাশ করেন, বলেন, ‘১৯৩৩ থেকে ১৯৪৫ সালের সময় আর কখনো ফিরে আসতে দেয়া যাবে না।’ তিনি নাৎসি শাসনামলের প্রতি ইঙ্গিত করেন।
তিনি আরো বলেন, ‘গণতান্ত্রিক দলগুলোকে বুঝতে হবে, এএফডির ওপর নিষেধাজ্ঞা আরোপ করা প্রয়োজন।’
দিন গড়ানোর সাথে সাথে বিক্ষোভকারীরা অবরোধ তুলে সম্মেলনকেন্দ্রের দিকে মিছিল করেন।
দুই দিনের এ সম্মেলন ঘিরে কয়েক হাজার পুলিশ মোতায়েন করা হয়েছে।
সহিংসতার আশঙ্কা থাকলেও অধিকাংশ বিক্ষোভ শান্তিপূর্ণ ছিল। তবে বিচ্ছিন্ন সংঘর্ষে পুলিশ মরিচের স্প্রে ব্যবহার করেছে বলে জানিয়েছে।
নাৎসি অতীতের কারণে জার্মানির অনেক মানুষ মনে করেন, কট্টর ডানপন্থী রাজনীতির বিরুদ্ধে অবস্থান নেওয়ার তাদের বিশেষ নৈতিক দায়িত্ব রয়েছে।
সমালোচকদের মতে, নাৎসিদের একটি ঐতিহাসিক সম্মেলনের ১০০ বছর পূর্তিতে কাছাকাছি ভাইমারে স্মরণীয় সেই সময়ের সাথে মিল রেখে এরফুর্টে এএফডির সম্মেলন আয়োজন ছিল ইচ্ছাকৃত উসকানি। তবে এ অভিযোগ অস্বীকার করেছে দলটি।
এএফডির সহ-সভাপতি আলিস ভাইডেল বলেন, দলটি গণতন্ত্রবিরোধী- এ অভিযোগ ভিত্তিহীন।
তিনি সম্মেলনে বলেন, ‘আমরাই জার্মানির নতুন গণমানুষের দল।’
তিনি আরো বলেন, ‘এএফডি দায়িত্ব গ্রহণের জন্য প্রস্তুত। কারণ আমরা, জার্মান জনগণ এবং জার্মানি সুশাসনের যোগ্য।’
সাবেক পূর্ব জার্মানির রাজ্যগুলোতে আসন্ন নির্বাচনে প্রথমবারের মতো ক্ষমতায় যাওয়ার লক্ষ্য নিয়ে এগোচ্ছে দলটি।
জরিপে দেখা যাচ্ছে, সেপ্টেম্বরে স্যাক্সনি-আনহাল্ট রাজ্যের নির্বাচনে দলটি একক সংখ্যাগরিষ্ঠতা পেতে পারে।
জাতীয় পর্যায়েও গত বছরের নির্বাচনের পর থেকে দলটি জনমত জরিপে শীর্ষে বা শীর্ষের কাছাকাছি অবস্থানে রয়েছে। ওই নির্বাচনে দলটি ২০ শতাংশ ভোট পেয়ে চ্যান্সেলর ফ্রিডরিশ মেরৎসের মধ্য-ডানপন্থী সিডিইউ/সিএসইউ জোটের পর দ্বিতীয় হয়েছিল।
পুনর্নির্বাচিত হলেন দুই সহ-সভাপতি
এএফডির আরেক সহসভাপতি টিনো ক্রুপাল্লাও ভাইডেলের বক্তব্যের প্রতিধ্বনি করে বলেন, ‘হয়তো খুব শিগগিরই আমরা একাই সরকার গঠন করতে পারব।’
তিনি বলেন, ‘যারা আমাদের দলীয় সম্মেলন বন্ধ করতে চেয়েছিল, সেই গণতন্ত্রবিরোধীদের জন্য সেটিই হবে সবচেয়ে উপযুক্ত জবাব।’
প্রত্যাশামতো ভাইডেল ও ক্রুপাল্লা আরো দুই বছরের জন্য দলের সহ-সভাপতি হিসেবে পুনর্নির্বাচিত হয়েছেন।
ভাইডেল ৮১ শতাংশ এবং ক্রুপাল্লা ৭০ শতাংশ ভোট পেয়েছেন। দুই বছর আগের নির্বাচনের তুলনায় এবার তাদের প্রাপ্ত ভোটের অবস্থান উল্টে গেছে; তখন ক্রুপাল্লা বেশি ভোট পেয়েছিলেন।
চ্যান্সেলর ফ্রিডরিশ মের্ৎস এএফডির উত্থান ঠেকানোকে নিজের অন্যতম প্রধান রাজনৈতিক লক্ষ্য হিসেবে ঘোষণা করেছেন। এএফডিকে ক্ষমতার বাইরে রাখতে অন্য সব দল তাদের সাথে জোট করতে অস্বীকৃতি জানিয়েছে।
এএফডির দাবি, সাবেক চ্যান্সেলর অ্যাঞ্জেলা মার্কেল এক দশক আগে বিপুলসংখ্যক শরণার্থী ও আশ্রয়প্রার্থীকে জার্মানিতে প্রবেশের অনুমতি দেওয়ার আগে খ্রিস্টীয় গণতান্ত্রিক দল যে রক্ষণশীল অবস্থান ধারণ করত, তারা এখন সেই রাজনৈতিক অবস্থানই প্রতিনিধিত্ব করছে।
তবে সমালোচকদের অভিযোগ, এএফডির কিছু নেতা নাৎসি অপরাধকে খাটো করে দেখেন এবং নিষিদ্ধ কট্টর ডানপন্থী উগ্রপন্থী গোষ্ঠীর সাথে তাদের যোগাযোগ রয়েছে।
দলের সবচেয়ে কট্টরপন্থী নেতাদের একজন বিয়র্ন হ্যোকে এ সম্মেলনে এএফডির তথাকথিত ‘অসামঞ্জস্য তালিকা’ সংশোধনের একটি বিতর্কিত প্রস্তাব তুলেছিলেন। এ তালিকায় উল্লেখ রয়েছে, কোন কোন উগ্রপন্থী সংগঠনের সদস্য হলে এএফডির সদস্য থাকা যাবে না।
তবে দলীয় নেতৃত্বের চাপের মুখে হ্যোকে শেষ পর্যন্ত প্রস্তাবটি প্রত্যাহার করেন। যদিও ভাইডেল ঘোষণা দেন, আগামী এক বছরের মধ্যে তালিকাটি পুনর্বিবেচনা করা হবে।
সূত্র : এএফপি/বাসস



