আন্তর্জাতিক অপরাধ আদালতের (আইসিসি) প্রেসিডেন্ট জাপানের তোমোকো আকানে এবং একজন জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তার ওপর মঙ্গলবার (১৮ আগস্ট) নিষেধাজ্ঞা আরোপ করেছে যুক্তরাষ্ট্র।
আইসিসি রাজনীতিকীকরণের অভিযোগ করে আদালতটির বিরুদ্ধে চলমান মার্কিন অভিযানের অংশ হিসেবে এ নিষেধাজ্ঞা দেয়া হলো।
হেগভিত্তিক আদালতটির জ্যেষ্ঠ বিচারিক আইনজীবী সেনেগালের আবদুলায়ে সেয়ের ওপরও নিষেধাজ্ঞা আরোপ করেছে ট্রাম্প প্রশাসন। আইসিসির বিরুদ্ধে এটি যুক্তরাষ্ট্রের সর্বশেষ পদক্ষেপ।
মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিও এক বিবৃতিতে বলেন, ‘এই ব্যক্তিরা আইসিসির এমন কর্মকর্তাদের তদন্ত, গ্রেফতার, আটক বা বিচারের উদ্যোগে সরাসরি যুক্ত ছিলেন, যাদের সরকার আইসিসির এখতিয়ার মেনে নেয়নি।’
তবে তিনি এর কোনো উদাহরণ দেননি।
মঙ্গলবার এর জবাবে আইসিসি বলেছে, মার্কিন নিষেধাজ্ঞা ‘আইনের শাসনকে দুর্বল করছে’।
আদালত এক বিবৃতিতে বলেছে, ‘আইন প্রয়োগের কারণে যখন বিচারিক কর্মকর্তাদের হুমকির মুখে পড়তে হয়, তখন আন্তর্জাতিক আইনভিত্তিক ব্যবস্থাই ঝুঁকির মধ্যে পড়ে।’
২০০২ সালে প্রতিষ্ঠিত আইসিসি সবচেয়ে গুরুতর নৃশংসতা ও অপরাধের জন্য অভিযুক্ত ব্যক্তিদের বিচার করে। কোনো দেশে জবাবদিহি নিশ্চিত করার মতো পর্যাপ্ত বিচারব্যবস্থা না থাকলে এটি সর্বশেষ আশ্রয় হিসেবে কাজ করে।
আন্তর্জাতিক অপরাধ আদালত প্রতিষ্ঠার চুক্তির পক্ষভুক্ত নয় যুক্তরাষ্ট্র। এরই মধ্যে আদালতটির কয়েকজন কর্মকর্তার ওপর নিষেধাজ্ঞা আরোপ করেছে দেশটি।
এই নিষেধাজ্ঞার ফলে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা যুক্তরাষ্ট্রে প্রবেশ করতে পারেন না। একইসাথে মার্কিন আর্থিক ব্যবস্থায় লেনদেনও করতে পারেন না।
ইসরাইলকে লক্ষ্য করে আইসিসির তদন্তের জেরেই মূলত এ পদক্ষেপ নেয়া হয়েছে। ইসরাইল যুক্তরাষ্ট্রের মিত্র। ২০২৪ সালে গাজা যুদ্ধের ঘটনায় ইসরাইলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহুর বিরুদ্ধে গ্রেফতারি পরোয়ানা জারি করে আদালতটি।
মঙ্গলবার সন্ধ্যায় সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্সে দেয়া এক পোস্টে নেতানিয়াহু মার্কিন নিষেধাজ্ঞাকে স্বাগত জানান। তিনি আইসিসিকে ‘ক্যাঙ্গারু আদালত’ আখ্যা দিয়ে বলেন, এটি আন্তর্জাতিক আইনের ভাষা ব্যবহার করে ক্ষমতার অপব্যবহারকে আড়াল করছে।
আইসিসির সদর দফতর নেদারল্যান্ডসের হেগে। দেশটির পররাষ্ট্রমন্ত্রী টম বেরেন্ডসেন এক্সে দেয়া এক পোস্টে বলেন, আইসিসির কর্মকর্তা ও কর্মীদের বিরুদ্ধে সর্বশেষ নিষেধাজ্ঞায় নেদারল্যান্ড ‘অসন্তুষ্ট’।
তিনি আরো বলেন, ‘আন্তর্জাতিক আদালত ও ট্রাইব্যুনালগুলোকে স্বাধীনভাবে তাদের দায়িত্ব পালন করতে সক্ষম হতে হবে।’
যুদ্ধাপরাধের শিকার ব্যক্তিরা
গত মাসে যুক্তরাষ্ট্র আইসিসির বিরুদ্ধে বড় ধরনের কূটনৈতিক অভিযান শুরু করে। আদালতটিকে আমেরিকানদের জন্য ‘হুমকি’ হিসেবে আখ্যায়িত করে দেশটি অংশীদারদের আইসিসি থেকে বেরিয়ে আসার আহ্বান জানায়।
ইতোমধ্যে চাদ ও ভেনিজুয়েলা আইসিসি থেকে সরে যাওয়ার ঘোষণা দিয়েছে। নিকোলাস মাদুরোকে ক্ষমতাচ্যুত ও গ্রেফতারের পর ভেনিজুয়েলা যুক্তরাষ্ট্রের সাথে ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক গড়ে তুলেছে।
ওই দেশগুলোর প্রত্যাহারে উদ্বেগ প্রকাশ করেছে আইসিসি। আদালত বলেছে, এ ধরনের পদক্ষেপ সম্মিলিতভাবে ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠার প্রচেষ্টাকে দুর্বল করতে পারে।
আইসিসি প্রতিষ্ঠার রোম সংবিধিতে স্বাক্ষর করেছিল যুক্তরাষ্ট্র। তবে চুক্তিটি কখনো অনুমোদন করেনি দেশটি। ইসরাইল ও রাশিয়াও আইসিসির সদস্য নয়।
রুবিও’র বিবৃতিতে বলা হয়, ‘ট্রাম্প প্রশাসন স্পষ্ট করেছে যে, আন্তর্জাতিক অপরাধ আদালত একটি দুর্নীতিগ্রস্ত এবং মারাত্মকভাবে রাজনীতিকীকৃত অতিরাষ্ট্রীয় আদালত। আদালতটি বিদ্বেষপূর্ণভাবে তার ক্ষমতার অপব্যবহার করেছে এবং এখতিয়ার অতিক্রম করেছে। রাষ্ট্রের সার্বভৌমত্বের ওপর এর আক্রমণ আমরা সহ্য করব না।’
গত সপ্তাহে চারটি মানবাধিকার সংগঠন আইসিসিকে লক্ষ্য করে ট্রাম্পের আরোপ করা নিষেধাজ্ঞার বিরুদ্ধে নিউইয়র্কের একটি আদালতে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের বিরুদ্ধে মামলা করে। সংগঠনগুলো বলেছে, এসব নিষেধাজ্ঞার কারণে যুদ্ধাপরাধের শিকার ব্যক্তিরা ন্যায়বিচারের সুযোগ থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন।
বাদী সংগঠনগুলোর একটি হিউম্যান রাইটস ওয়াচ (এইচআরডব্লিউ) মঙ্গলবার নতুন নিষেধাজ্ঞার নিন্দা জানিয়েছে।
এইচআরডব্লিউর মধ্যপ্রাচ্য ও উত্তর আফ্রিকা বিষয়ক পরিচালক বালকিস জাররাহ এক বিবৃতিতে বলেন, নিষেধাজ্ঞাগুলো ‘আন্তর্জাতিক আইনের প্রতি ট্রাম্প প্রশাসনের চরম অবজ্ঞার সর্বশেষ উদাহরণ এবং গুরুতর অপরাধে জড়িত আমেরিকান ও ইসরাইলি কর্মকর্তাদের ন্যায়বিচার থেকে রক্ষা করার প্রকাশ্য প্রচেষ্টা’।
২০২৩ সালে ইউক্রেন যুদ্ধের ঘটনায় রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিনের বিরুদ্ধে গ্রেফতারি পরোয়ানা জারি করে আইসিসি। এর জবাবে মস্কো আদালটির জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধেও গ্রেফতারি পরোয়ানা জারি করে।
সূত্র: বাসস



