দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর গড়ে উঠেছে যুক্তরাষ্ট্র-ইউরোপ মিত্র জোট। তাদের স্লোগানই ছিল- সবার তরে সবাই। তবে এই নীতিটা ক্রমেই ভেঙে চলেছেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। তিনি এখন ইউরোপের স্বার্থ দেখেন না। বরং নিজের স্বার্থকে তাদের উপর চাপিয়ে দিতে চান। এ নিয়ে ক্রমেই অসন্তোষ স্পষ্ট হয়ে উঠছে ইউরোপীয় নেতাদের মধ্যে।
সম্প্রতি ইউরোপীয় দেশ গ্রিনল্যান্ড নিয়ে উচ্চাভিলাস প্রকাশ করেছেন ট্রাম্প। তিনি বাসিন্দাদের আপত্তি উপেক্ষা করেই দ্বীপটির অধিগ্রহণ করতে চান। এ নিয়ে চাপা ক্ষোভ ক্রমেই টানাপোড়েনে পরিণত হতে শুরু করে। ইউরোপীয় নেতারা ইতোমধ্যে তীব্র প্রতিক্রিয়া জানিয়েছে। তারা প্রকাশ্যেই ডেনমার্কের নাগরিকদের প্রতি সংহতি জানিয়েছে।
এ নিয়ে ক্ষুব্ধ হয়েছেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট। তিনি ইউরোপীয় নেতাদের বিরুদ্ধে বাণিজ্য যুদ্ধ শুরুর হুমকি দিয়েছেন। তাতেও টলে যায়নি ইউরোপীয় নেতারা। তারা হুমকির পরও যৌথ বিবৃতি দিয়ে গ্রিনল্যান্ডের পাশে দাঁড়ায়। এমনকি কোনো কোনো নেতা ট্রাম্পের শুল্ক যুদ্ধের ঝুঁকি নিতেও নিজেদের মনোভাব প্রকাশ করেন। একইসাথে তারা ইউরোপীয় নেতাদের নতুন অর্থনৈতিক ও সামরিক দুর্গ গড়ে তোলার আহ্বান জানান।
তবে ইউরোপীয় ইউনিয়ন বাস্তবতা বুঝার চেষ্টা করছে। ইতোমধ্যে ইউক্রেন যুদ্ধ প্রমাণ করেছে যে রাশিয়ার বিরুদ্ধে যুদ্ধে জয়ী হওয়ার জন্য মার্কিন সাহায্য তাদের প্রয়োজন। যুক্তরাষ্ট্রের নিরাপত্তা নিশ্চয়তা ছাড়া ইউরোপ বা ন্যাটোভুক্ত দেশগুলো এখন রাশিয়ার আগ্রাসন বন্ধে প্রায় অক্ষম। সেজন্য ইচ্ছে করলেই তারা যুক্তরাষ্ট্র থেকে মুখ ফিরিয়ে নিতে পারবে না। এছাড়া নতুন কোনো সামরিক বা অর্থনৈতিক ব্যবস্থা গড়ে তুলতে হলেও তাদের কয়েক বছর সময় প্রয়োজন। যা ইউক্রেন-রাশিয়া যুদ্ধ শেষ হওয়ার আগে গড়ে তোলা সম্ভব নয়। সেজন্য আপাতত যুক্তরাষ্ট্রের সাথে দূরত্ব তৈরিতে আগ্রহী নন ইউরোপের অধিকাংশ নেতা।
বিষয়টি ফুটে ওঠে ইয়ান লেসারের এক বক্তব্যে। তিনি বলেন, ইউরোপে এখন যুদ্ধ চলছে। এ অবস্থায় জোটের কৌশলগত সুবিধা নেয়া বন্ধ করে দেয়া হবে নিতান্ত বোকামি। কিন্তু যুক্তরাষ্ট্র নিজেই যদি জোট থেকে দূরে সরে যায়, তাহলে ইউরোপকে অবশ্যই বিকল্প কিছু ভাবতে হবে।
ইউরোপের এই মনোভাব মার্কিন কর্মকর্তারা জানেন। এ বিষয়ে তারা যথেষ্ট সতর্কও রয়েছে। গত মাসে বার্ষিক জাতীয় নিরাপত্তা কৌশলপত্র প্রকাশ পেলে তা প্রতিভাত হয়। নিরাপত্তা কৌশলপত্রে মার্কিন কর্মকর্তারা সংশয় প্রকাশ করে বলেছেন, ইউরোপের কিছু দেশ ভবিষ্যতে নির্ভরযোগ্য মিত্র হিসেবে নাও থাকতে পারে। সেজন্য সেসব দেশে একই মতাদর্শের (কট্টর ডানপন্থী) ক্ষমতায়ন করা না গেলে মহাদেশটি হাতছাড়া হয়ে যেতে পারে। কৌশলপত্রে একইসাথে বলা হয়েছে, ইউরোপ যুক্তরাষ্ট্রের জন্য কৌশলগত ও সাংস্কৃতিকভাবে খুবই গুরুত্বপূর্ণ। তাদের সহজে হাতছাড়া করা যাবে না। সেজন্য সতর্কতার সাথে পদক্ষেপ গ্রহণ করতে হবে।
বিশ্লেষকরা বলছেন, একদিকে মার্কিন নেতারা ইউরোপীয় মিত্রদের প্রতি বিশ্বাস হারাতে শুরু করেছেন। অন্যদিকে ডোনাল্ড ট্রাম্প যেকোনো মূল্যে গ্রিনল্যান্ড অধিগ্রহণ করতে চান। এতে বুঝা যাচ্ছে যে যুক্তরাষ্ট্র-ইউরোপ জোটে অবিশ্বাস জায়গা করে নিয়েছে। এই বিশ্বাস ফিরিয়ে আনতে হলে প্রজন্মগত পরিবর্তন হতে হবে। এর আগে আর তা সহজে ফিরবে না।
গ্রিনল্যান্ড ইস্যুতে দূরত্ব তৈরি হলেও আপাতত যুক্তরাষ্ট্র থেকে ইউরোপ মুখ ফিরিয়ে নিচ্ছে না। বরং ইউরোপের নীতিনির্ধারণী নেতারা সমাধানের পথ খুঁজছেন। ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রী কিয়ার স্টারমারের মতো কয়েকজন নেতা কূটনৈতিক সমাধানের পক্ষে যুক্তি দিয়েছেন। আবার ফরাসি প্রেসিডেন্ট ম্যাক্রোঁসহ কিছু নেতা ঐক্যবদ্ধ ও সমন্বিতভাবে যুক্তরাষ্ট্রকে মোকাবেলার প্রত্যয় ব্যক্ত করেছেন।
তবে এটি ঠিক যে ইউরোপীয় ইউনিয়ন এখন বিশ্বাস করতে শুরু করেছে যে ট্রাম্পকে ছাড় দেওয়া হলে, তিনি আরো ছাড় দাবি করেন।
চলতি সপ্তাহে ইউরোপীয় নেতারা ইউরোপীয় নেতারা বেলজিয়ামের ব্রাসেলসে একটি বৈঠকে বসতে যাচ্ছেন। ধারণা করা হচ্ছে, সেখান থেকে তারা ট্রাম্পের উস্কানির বিরুদ্ধে ঐক্যবদ্ধ প্রতিক্রিয়া দেখাবেন। সেজন্য যুক্তরাষ্ট্র-ইউরোপ সম্পর্কের বাঁক-বদল দেখতে আমাদের আরো কিছুদিন অপেক্ষা করতে হবে।
নিউইয়র্ক টাইমসের একটি নিবন্ধের আলোকে কলামটি তৈরি করেছেন নয়া দিগন্তের সহ-সম্পাদক আবু সাঈদ



