ফ্রান্সের উচ্চবিদ্যালয় বা লিসেতে শিক্ষার্থীদের মোবাইল ফোন ব্যবহারে নিষেধাজ্ঞা নতুন শিক্ষাবর্ষের শুরু থেকেই কার্যকর হতে পারে বলে জানিয়েছে দেশটির সরকার। তবে সরকারের পক্ষ থেকে দ্রুত ব্যবস্থা চালুর ঘোষণা দেয়া হলেও বাস্তবে অনেক বিদ্যালয় এখনো এর জন্য পুরোপুরি প্রস্তুত নয়। ফলে নতুন আইন কার্যকর করা নিয়ে শিক্ষা প্রশাসন ও বিদ্যালয় কর্তৃপক্ষের মধ্যে কিছুটা অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছে।
ফ্রান্সের প্রেসিডেন্ট এমানুয়েল মাক্রোঁ সোমবার (২৪ আগস্ট) সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্সে জানান, উচ্চবিদ্যালয়ে মোবাইল ফোন নিষিদ্ধ করার আইন প্রণয়ন করা হয়েছে। তিনি বলেন, শিশুদের স্ক্রিন ব্যবহারের নেতিবাচক প্রভাব থেকে রক্ষা করার বিষয়টি আর অপেক্ষা করতে পারে না। তার মতে, বিদ্যালয় যদি মোবাইল ফোনমুক্ত হয়, তাহলে শিক্ষার্থীদের পড়াশোনার পরিবেশে শান্তি ও মনোযোগ ফিরে আসবে।
সরকারের মুখপাত্র মোদ ব্রেজোঁও একই দিন মন্ত্রিসভার বৈঠকের পর বিষয়টি নিশ্চিত করেন। তিনি জানান, উচ্চবিদ্যালয়ে মোবাইল ফোন নিষিদ্ধ করার ব্যবস্থা নতুন শিক্ষাবর্ষের শুরু থেকেই কার্যকর করা সম্ভব। তার বক্তব্য অনুযায়ী, সাংবিধানিক পরিষদের অনুমোদনের ফলে এই নিষেধাজ্ঞার জন্য এখন একটি সুস্পষ্ট ও শক্তিশালী আইনি ভিত্তি তৈরি হয়েছে।
তবে সরকারের ঘোষণার সঙ্গে বাস্তব পরিস্থিতির কিছুটা পার্থক্য রয়েছে। নিষেধাজ্ঞা কার্যকর করতে প্রতিটি উচ্চবিদ্যালয়কে তাদের অভ্যন্তরীণ বিধিমালা বা রেগ্লেমঁ ইন্তেরিয়র পরিবর্তন করতে হবে। এই পরিবর্তনের আগে বিদ্যালয়ের বিভিন্ন প্রশাসনিক ও শিক্ষাবিষয়ক কর্তৃপক্ষের সঙ্গে পরামর্শ করা প্রয়োজন। কিন্তু গ্রীষ্মের ছুটিতে অনেক বিদ্যালয় বন্ধ থাকায় সব প্রতিষ্ঠান এই প্রক্রিয়া সম্পন্ন করার সুযোগ পায়নি।
ফ্রান্সের উচ্চবিদ্যালয়ের প্রধানদের অন্যতম প্রধান সংগঠন এসএনপিডেন-ইউএনএসএ-এর জাতীয় সম্পাদক ফ্রাঁসোয়া রেনেঁ ফরাসি বার্তা সংস্থা এএফপিকে বলেন, অনেক বিদ্যালয় এখনো প্রস্তুত নয়। তিনি সরকারের এই সময়সূচিকে ‘ভুল সময় নির্বাচন’ বা ‘খারাপ সময়’ হিসেবে সমালোচনা করেন। তার বক্তব্য থেকে বোঝা যায়, আইন কার্যকর করার আগে বিদ্যালয়গুলোর পর্যাপ্ত প্রস্তুতি ও প্রশাসনিক ব্যবস্থা নিশ্চিত করা দরকার ছিল।
এই নতুন আইন নিয়ে আলোচনার আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো ১৫ বছরের কম বয়সীদের সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ব্যবহারে নিষেধাজ্ঞা। একই আইনে এই বিধান রাখা হলেও ফ্রান্সের সাংবিধানিক পরিষদ সেটি বাতিল করেছে। ফলে ১৫ বছরের কম বয়সীদের সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ব্যবহারে নিষেধাজ্ঞা আপাতত কার্যকর হচ্ছে না। বিপরীতে উচ্চবিদ্যালয়ে মোবাইল ফোন নিষিদ্ধ করার বিধানটি সাংবিধানিক পরিষদ অনুমোদন করেছে এবং সেটিই এখন বাস্তবায়নের পথে রয়েছে।
সরকারের যুক্তি হলো, শ্রেণিকক্ষে মোবাইল ফোন শিক্ষার্থীদের মনোযোগ নষ্ট করতে পারে এবং অতিরিক্ত স্ক্রিন ব্যবহারের কারণে তাদের শিক্ষাজীবন ও সামাজিক পরিবেশে নেতিবাচক প্রভাব পড়তে পারে। তাই বিদ্যালয়কে ফোনমুক্ত করার মাধ্যমে শিক্ষার্থীদের পড়াশোনায় মনোযোগ বাড়ানো এবং বিদ্যালয়ের পরিবেশ আরো শান্ত করা সম্ভব হবে বলে মনে করছে সরকার।
তবে নিষেধাজ্ঞা বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে বেশ কিছু প্রশ্ন সামনে রয়েছে। শিক্ষার্থীরা বিদ্যালয়ে প্রবেশের সময় ফোন কোথায় রাখবে, ফোন কীভাবে সংরক্ষণ করা হবে, নিয়ম ভঙ্গ করলে কী ধরনের ব্যবস্থা নেয়া হবে এবং জরুরি পরিস্থিতিতে অভিভাবকরা কীভাবে সন্তানের সঙ্গে যোগাযোগ করবেন—এসব বিষয় বিদ্যালয়গুলোকেই তাদের নিজস্ব বিধিমালায় নির্ধারণ করতে হবে।
ফলে আইন প্রণয়নের পর এখন মূল চ্যালেঞ্জ হলো সেটিকে বাস্তবে কার্যকর করা। সরকার চাইছে নতুন শিক্ষাবর্ষের শুরুতেই ফ্রান্সের উচ্চবিদ্যালয়গুলোতে মোবাইল ফোন নিষেধাজ্ঞা চালু হোক। কিন্তু বিদ্যালয়গুলোর প্রশাসনিক প্রস্তুতি, অভ্যন্তরীণ বিধিমালা পরিবর্তন এবং বাস্তব ব্যবস্থাপনা কত দ্রুত সম্পন্ন করা সম্ভব হবে, তার ওপরই নির্ভর করবে এই উদ্যোগের সফল বাস্তবায়ন।



