কিয়ার স্টারমারের পদত্যাগের পর যুক্তরাজ্যের নতুন প্রধানমন্ত্রীর দায়িত্ব পেয়েছেন অ্যান্ডি বার্নহাম। সোমবার লেবার পার্টির এই নেতাকে আনুষ্ঠানিকভাবে যুক্তরাজ্যের ৫৯তম প্রধানমন্ত্রী ঘোষণা করা হয়।
এদিন সকালে স্ত্রী মারি-ফ্রান্স ভ্যান হিলকে সাথে নিয়ে বাকিংহাম প্যালেসে গিয়ে ব্রিটিশ রাজা তৃতীয় চার্লসের কাছে নিজের পদত্যাগপত্র জমা দেন স্যার কিয়ার স্টারমার। এরপর বার্নহামকে ডেকে সরকার গঠনের জন্য অনুরোধ জানান রাজা।
যুক্তরাজ্যের নতুন প্রধানমন্ত্রী ৫৬ বছর বয়সী অ্যান্ডি বার্নহ্যাম ব্রিটেনের জন্য একটি ১০ বছরের উন্নয়ন পরিকল্পনা ঘোষণার প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন। একইসাথে তিনি জীবনযাত্রার ব্যয় সংকট মোকাবেলা এবং রাস্তায় গৃহহীন মানুষের রাতযাপন (রাফ স্লিপিং) বন্ধের অঙ্গীকার করেছেন।
ডাউনিং স্ট্রিটের সামনে দেয়া সংক্ষিপ্ত বক্তব্যে বার্নহ্যাম বলেন, বিশ্বকে দেখাতে হবে যে ব্রিটেন আবারো ‘স্থিতিশীলতা ফিরে পেতে’ সক্ষম। তিনি একটি ‘নতুন রাজনৈতিক মডেল’ এবং ‘নতুন অর্থনীতি’ গড়ে তোলার অঙ্গীকার করেন।
পররাষ্ট্রনীতি প্রসঙ্গে তিনি এর আগে গণমাধ্যমকে জানান, প্রধানমন্ত্রী হিসেবে তার প্রথম ফোনকলগুলো যাবে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প এবং ইউক্রেনের প্রেসিডেন্ট ভলোদিমির জেলেনস্কির কাছে। জেলেনস্কিকে তিনি আশ্বস্ত করবেন যে, ‘আমি শতভাগ আপনার পাশে থাকব।’
বার্নহ্যাম বলেন, তিনি শিগগিরই ‘ব্রিটেনের জন্য নতুন ১০ বছরের পরিকল্পনা’ উপস্থাপন করবেন, যদিও এ বিষয়ে বিস্তারিত কিছু জানাননি।
স্বল্পমেয়াদি লক্ষ্য হিসেবে তিনি জীবনযাত্রার ব্যয়ের চাপ কমাতে জনগণকে কিছুটা স্বস্তি দেওয়ার প্রতিশ্রুতি দেন।
তিনি আরো বলেন, দায়িত্ব গ্রহণের পর তার প্রথম নির্দেশ হবে রাস্তায় গৃহহীন মানুষের রাতযাপন বন্ধে উদ্যোগ নেয়া। উত্তর ইংল্যান্ডের একটি অঞ্চলের মেয়র থাকাকালে তিনি একই ধরনের উদ্যোগ নিয়েছিলেন, যদিও তা পুরোপুরি সফল হয়নি।
এছাড়া সরকারি ক্রয়নীতির মাধ্যমে শিল্পায়ন পুনরুজ্জীবিত করা এবং আরো বেশি সরকারি আবাসন নির্মাণের প্রতিশ্রুতিও দেন তিনি।
কঠিন চ্যালেঞ্জ
২০২৯ সালে পরবর্তী সাধারণ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হওয়ার কথা। তার আগে বার্নহ্যামের সামনে রয়েছে একাধিক কঠিন চ্যালেঞ্জ।
রোববার প্রকাশিত দ্য টাইমসে দেয়া এক সাক্ষাৎকারে তিনি বলেন, গত এক দশকের রাজনৈতিক অস্থিরতার অবসান ঘটাতে চান।
তিনি বলেন, ‘আমরা যেভাবে কাজ করে আসছি, তা কার্যকর হয়নি। আমি বিষয়টিকে এভাবেই দেখি।’
‘আমি ভিন্নভাবে কাজ করার চেষ্টা করব,’ যোগ করেন তিনি।
এখন নজর থাকবে তার নতুন মন্ত্রিসভা গঠনের দিকে, বিশেষ করে অর্থমন্ত্রী হিসেবে র্যাচেল রিভসের স্থলাভিষিক্ত কে হচ্ছেন, সে বিষয়ে।
গ্রেটার ম্যানচেস্টারের সাবেক মেয়র ‘কিং অব দ্য নর্থ’ নামে পরিচিত বার্নহ্যাম, স্টারমারের পদত্যাগের পর লেবার পার্টির নেতৃত্বে আসেন। দলটির এমপিরা মনে করেন, নাইজেল ফারাজের অভিবাসনবিরোধী রিফর্ম ইউকে পার্টির উত্থান মোকাবিলায় তিনিই লেবারের সবচেয়ে কার্যকর নেতা হতে পারেন।
অর্থনীতি ও বৈদেশিক চাপ
বার্নহ্যামের সামনে থাকা বড় চ্যালেঞ্জগুলোর মধ্যে রয়েছে দুর্বল অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি, সরকারের উচ্চ ঋণগ্রহণ ব্যয়, ক্রমবর্ধমান সামাজিক কল্যাণ ব্যয় এবং ছোট নৌকায় অনিয়মিত অভিবাসীদের আগমন, যা রিফর্ম ইউকের প্রতি জনসমর্থন বাড়িয়েছে।
এ ছাড়া যুক্তরাষ্ট্র-ইরান যুদ্ধের কারণে অস্থিতিশীল জ্বালানির দাম এবং প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের অধীনে যুক্তরাষ্ট্রের সাথে অনিশ্চিত সম্পর্কও তার সরকারের জন্য বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে উঠতে পারে।
দ্য টাইমসকে বার্নহ্যাম বলেন, তিনি সরকারি ব্যয় ও অর্থনীতি পরিচালনায় ভিন্ন পদ্ধতি গ্রহণ করবেন।
তার ভাষায়, ‘প্রাথমিক বিনিয়োগ, শুরুতেই প্রয়োজনীয় হস্তক্ষেপ এবং মানুষকে সফল হওয়ার সুযোগ করে দেয়ার ওপর আমি বেশি গুরুত্ব দেব; ব্যর্থতার মূল্য পরিশোধে নয়।’
২০২৪ সালের জুলাইয়ে ১৪ বছরের কনজারভেটিভ শাসনের অবসান ঘটিয়ে কিয়ার স্টারমারের নেতৃত্বে লেবার পার্টি বিপুল বিজয় অর্জন করেছিল। তবে একের পর এক কেলেঙ্কারি, নীতিগত ভুল এবং অবস্থান পরিবর্তনের কারণে গত জুনে তিনি প্রধানমন্ত্রী ও দলীয় নেতার পদ থেকে সরে দাঁড়ানোর ঘোষণা দেন।
২০০১ থেকে ২০১৭ সাল পর্যন্ত সংসদ সদস্য থাকা বার্নহ্যাম টনি ব্লেয়ার ও গর্ডন ব্রাউনের সরকারে মন্ত্রী হিসেবেও দায়িত্ব পালন করেছেন। পরে তিনি নিজেকে সাধারণ মানুষের ঘনিষ্ঠ নেতা হিসেবে নতুনভাবে প্রতিষ্ঠিত করেন।
তবে লেবার পার্টির নেতা এবং প্রধানমন্ত্রী হিসেবে প্রায় প্রতিদ্বন্দ্বিতাহীনভাবে দায়িত্ব গ্রহণের পর এখন প্রশ্ন উঠেছে, তিনি কীভাবে তার উচ্চাভিলাষী পরিকল্পনাগুলো বাস্তবায়ন করবেন।
এদিকে, ইউরোপীয় কাউন্সিলের সভাপতি আন্তোনিও কস্তা বার্নহ্যামকে অভিনন্দন জানিয়েছেন। জার্মান চ্যান্সেলর ফ্রিডরিখ ম্যার্ৎস দুই দেশের ঘনিষ্ঠ সম্পর্কের প্রতীক হিসেবে তাকে বার্লিন সফরের আমন্ত্রণ জানিয়েছেন।
সূত্র : বিবিসি, এএফপি



