যে ভাড়াটে কিশোর বন্দুকধারীদের ইউরোপজুড়ে হত্যাকাণ্ড চালাতে নিয়োগ দেয়া হয়

২০২২ সাল থেকে ফক্সট্রট নেটওয়ার্ক প্রায় ৩৫টি হত্যাকাণ্ডের জন্য দায়ী বলে ধারণা করা হয়। এছাড়া ইউরোপে ইসরায়েলি লক্ষ্যবস্তুর ওপর বেশ কয়েকটি হামলা ও হামলার চেষ্টার সাথেও তাদের সম্পৃক্ততা রয়েছে, যার মধ্যে বিস্ফোরক ও হ্যান্ড গ্রেনেড ব্যবহারের দু’টি ঘটনাও আছে।

নয়া দিগন্ত অনলাইন

Location :

Dhaka
বন্দুক নিয়ে ছবি তুলেছিলেন আতিলা আজিমভ
বন্দুক নিয়ে ছবি তুলেছিলেন আতিলা আজিমভ |সংগৃহীত

সুইডেনের স্টকহোমের একটি উপশহরে শীতের রাতে কালো পোশাক পরা এক ব্যক্তি অন্ধকার থেকে বেরিয়ে আসে। হাতে একটি পিস্তল নিয়ে সে ম্যাকডোনাল্ডসে শিফট শেষ করে বাড়ি ফেরা ২০ বছর বয়সী শিক্ষার্থী মুরাদ আবদেলকাদেরের দিকে এগিয়ে যায়।

বন্দুকধারী গুলি চালাতে শুরু করে। লক্ষ্যবস্তুর দিকে এগিয়ে যেতে যেতে সে বারবার গুলি করে। শেষ গুলিটি সে ভুক্তভোগীর মাথায় করে, যখন তিনি মাটিতে অসহায় অবস্থায় পড়ে ছিলেন।

ঘাতক ছিল ১৮ বছর বয়সী আতিলা আজিমভ। গত বছরের ফেব্রুয়ারির সেই রাতে সে ভুল মানুষকে হত্যা করেছিল।

সে এটি করেছিল টাকার জন্য। তাকে ভাড়া করেছিল ফক্সট্রট নেটওয়ার্ক, একটি সংঘবদ্ধ অপরাধী গোষ্ঠী, যারা ‘ভায়োলেন্স-অ্যাজ-এ-সার্ভিস’ কৌশলের জন্য কুখ্যাত হয়ে উঠেছে।

Kishor-gang

২০২২ সাল থেকে ফক্সট্রট নেটওয়ার্ক প্রায় ৩৫টি হত্যাকাণ্ডের জন্য দায়ী বলে ধারণা করা হয়। এছাড়া ইউরোপে ইসরায়েলি লক্ষ্যবস্তুর ওপর বেশ কয়েকটি হামলা ও হামলার চেষ্টার সাথেও তাদের সম্পৃক্ততা রয়েছে, যার মধ্যে বিস্ফোরক ও হ্যান্ড গ্রেনেড ব্যবহারের দু’টি ঘটনাও আছে।

এই চক্র হামলা চালানোর জন্য অর্থের বিনিময়ে কিশোরদের নিয়োগ করে। তবে প্রায় কখনও তাদের টাকা পরিশোধ করতে হয় না, কারণ বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই তারা ধরা পড়ে যায়।

যেমন নরওয়ের কিশোর ইয়োহানেস নাটল্যান্ড। বুধবার লন্ডনের ওল্ড বেইলিতে একটি জুরি তাকে ওয়েস্ট ইয়র্কশায়ারে পরিকল্পিত একটি হত্যাকাণ্ডের ষড়যন্ত্রে দোষী সাব্যস্ত করেছে।

সমস্যাটি মোকাবিলায় গঠিত ইউরোপোলের অপারেশনাল টাস্কফোর্স (ওটিএফ) গ্রিমের মতে, এই কিশোর ভাড়াটে খুনিদের সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের মাধ্যমে নিয়োগ করা হয় এবং কম্পিউটার গেমের ধাঁচে ‘গ্যামিফায়েড’ পদ্ধতিতে তাদের নির্দেশনা দেয়া হয়।

ইউরোপোলের ইউরোপিয়ান সিরিয়াস অ্যান্ড অর্গানাইজড ক্রাইম সেন্টারের প্রধান অ্যান্ডি ক্রাগ একে দুর্বল তরুণদের কাছে ‘পরিকল্পিতভাবে হত্যাকাণ্ড আউটসোর্স করা’ বলে বর্ণনা করেছেন।

বর্তমানে ওটিএফ গ্রিমে ১১টি দেশ যুক্ত রয়েছে, যেগুলো ভিএএএস প্রবণতায় আক্রান্ত। দেশগুলো হলো বেলজিয়াম, ডেনমার্ক, ফিনল্যান্ড, ফ্রান্স, জার্মানি, আইসল্যান্ড, নেদারল্যান্ডস, নরওয়ে, স্পেন, সুইডেন এবং যুক্তরাজ্য।

সুইডিশ সম্প্রচারমাধ্যম এসভিটির অনুসন্ধানী সাংবাদিক ডায়ামান্ট সালিহু তিন বছর ধরে ফক্সট্রট নিয়ে গবেষণা করছেন।

তিনি বলেন, ‘ফক্সট্রট নেটওয়ার্কের নেতাকে নির্দেশ দেয়া হচ্ছে, যাতে তিনি তার নেটওয়ার্ককে ব্যবহার করে শত্রুদের বিরুদ্ধে হামলা চালান। তারা হতে পারে ভিন্নমতাবলম্বী, শাসকগোষ্ঠীবিরোধী সাংবাদিক, আবার ইসরায়েলি লক্ষ্যবস্তুও হতে পারে।’

২০২৫ সালের এপ্রিলে যুক্তরাজ্য সরকার ফক্সট্রট নেটওয়ার্ক এর ওপর নিষেধাজ্ঞা আরোপ করে। এটি ছিল নাটল্যান্ডকে গ্রেফতারের এক মাস পর। তখন তার বয়স ছিল ১৮ বছর।

ফক্সট্রটের হয়ে হাডার্সফিল্ডের কাছে কোথাও একটি হত্যাকাণ্ড ঘটাতে সে যুক্তরাজ্যে উড়ে এসেছিল।

Kishor

কিশোর ঘাতক নাটল্যান্ডের ঘটনাটি ভিএএএস ব্যবস্থাটি কীভাবে কাজ করে তা তুলে ধরে।

নাটল্যান্ডের মা-বাবা দু’জনই স্টাভাঙ্গারের সাংবাদিক। তার শৈশব ছিল স্বচ্ছল। কিন্তু পরে সে মাদকে জড়িয়ে পড়ে এবং মানসিক বিভ্রমে আক্রান্ত হয়। এরপর তাকে পুনর্বাসনকেন্দ্র ও কিছু সময়ের জন্য শিশু নিবাসে থাকতে হয়।

সেখানে তার পরিচয় হয় আরেক কিশোরের সাথে, যে অনলাইনে ‘আননোন হাসলার’ নামে পরিচিত ছিল। এই আননোন হাসলারই প্রথম নাটল্যান্ডকে যুক্তরাজ্যে কাউকে হত্যা করার একটি অনলাইন প্রস্তাব পাঠায়।

এই প্রস্তাব এসেছিল ‘জেনারালেন’ নামের আরেক কিশোরের কাছ থেকে। ‘জেনারালেন’-এর বয়স তখন ১৬ বছর এবং সে আগের তিন বছর একটি শিশু নিবাসে কাটিয়েছে। পরে ‘জেনারালেন’-ই নাটল্যান্ডকে ওই হত্যাকাণ্ডের জন্য নিয়োগ করে। এরপর নাটল্যান্ডকে এজেন্ট ৪৭ নামের এক ফক্সট্রট সদস্যের কাছে পাঠানো হয়। এই নামটি নেয়া হয়েছে হিটম্যান গেম সিরিজ থেকে।

এজেন্ট ৪৭ নাটল্যান্ডের জন্য ম্যানচেস্টার বিমানবন্দরের একমুখী বিমান টিকিট বুক করেন এবং জরুরি পাসপোর্ট পাওয়ার প্রক্রিয়াতেও সহায়তা করেন। সিগন্যাল মেসেজিং অ্যাপ ব্যবহার করে তিনি যাত্রার প্রতিটি ধাপে নাটল্যান্ডকে নির্দেশনা দেন। পরে তাকে ‘ওয়ান’ ছদ্মনামধারী এক লজিস্টিকস সমন্বয়কারীর কাছে হস্তান্তর করা হয়।

কম্পিউটার গেমের চরিত্রের মতো আচরণ করে ‘ওয়ান’ তাকে একটি মানচিত্র ও ভিডিও পাঠায়, যেখানে হাডার্সফিল্ডের বনাঞ্চলে লুকিয়ে রাখা অস্ত্র কোথায় পাওয়া যাবে তা দেখানো হয়। পরে আরেকটি ভিডিওতে পায়ে হাঁটা টানেলের কাছে ঝোপঝাড়ে লুকানো নগদ অর্থ কীভাবে সংগ্রহ করতে হবে, তা দেখানো হয়।

নাটল্যান্ডকে যখন হাডার্সফিল্ডের একটি হোটেলে অস্ত্রসহ রাখা হয়, এজেন্ট ৪৭ আবার বার্তা পাঠায় : ‘আগামীকাল আমাদের অনেক কাজ করতে হবে।’

পরদিন সকালে নাটল্যান্ডকে গ্রেফতার করা হয়।

তাকে তখনো জানানো হয়নি কাকে হত্যা করতে হবে। সন্ত্রাসবাদবিরোধী তদন্তকারীরা এখনো খতিয়ে দেখছেন এটি অপরাধমূলক হত্যাকাণ্ড হওয়ার কথা ছিল কিনা।

নাটল্যান্ডকে যে কিশোর নিয়োগ করেছিল, সেই জেনারেলেন ছিল অত্যন্ত সক্রিয়। নাটল্যান্ডকে ভাড়াটে খুনি হিসেবে নিয়োগ দেয়ার পাশাপাশি সে অন্তত আরো দু’জনকে সুইডেনে হত্যাকাণ্ড চালানোর জন্য নিয়োগ করেছিল।

তারা ছিল আজিমভ, যে ভুল মানুষকে হত্যা করার দায়ে যাবজ্জীবন কারাদণ্ড ভোগ করছে এবং ১৭ বছর বয়সী এক কিশোর, যে তার সাড়ে তিন সপ্তাহ আগে দক্ষিণ সুইডেনের লুন্ডে আহমেদ জামজামকে গুলি করে হত্যা করেছিল।

দুই হত্যাকারীই কোনো টাকা পায়নি, কারণ তারা দু’জনই ধরা পড়ে।

সালিহু বলেন, এটি ফক্সট্রটের কার্যপদ্ধতিরই অংশ।

তিনি বলেন, ‘কিশোররা ধরা পড়লে তারা একেবারেই পরোয়া করে না। কারণ ধরা পড়ার পর তাদের প্রতিশ্রুত টাকা দাবি করার সুযোগ থাকে না। আমরা এই তরুণ হত্যাকারীদের কাউকে টাকা দেয়া হয়েছে, এমন উদাহরণ দেখিনি। ক্রমেই আরো কম বয়সী কিশোরদের নিয়োগ করা ছিল একটি কৌশলি নীতি। কারণ তারা ধরা পড়ার পরিণতি নিয়ে ততটা ভাবে না এবং ঝুঁকি নিতে বেশি প্রস্তুত থাকে।’

অবশেষে জেনারেলেন ধরা পড়ে যায়, কারণ সে নরওয়ের এক পুলিশ কর্মকর্তার ১৪ বছর বয়সী ছেলেকে হত্যার পরিকল্পনা করছিল। সে ছুরিকাঘাতের ওই হামলা চালাতে ১৫ ও ১৭ বছর বয়সী দু’জনকে নিয়োগ করে। কিন্তু ১৫ বছর বয়সী কিশোরটি পুলিশকে বিষয়টি জানিয়ে দেয়।

জেনারেলেন গ্রেফতার হওয়ার পর তদন্তকারীরা তার ফোনে হাডার্সফিল্ড হত্যার ষড়যন্ত্রের তথ্য খুঁজে পান। এর সূত্র ধরেই ব্রিটিশ পুলিশ সময়মতো নাটল্যান্ডকে গ্রেফতার করে।

মে মাসে জেনারেলেন দোষী সাব্যস্ত হয় এবং ১৪ বছরের কারাদণ্ড ভোগ করছে।

ওটিএফ গ্রিম গঠনের পর গত ১৫ মাসে কিছু সাফল্য পেয়েছে। পুলিশ ২৮০ জনের বেশি ব্যক্তিকে গ্রেফতার করেছে, যার মধ্যে কয়েকজন গুরুত্বপূর্ণ সন্দেহভাজনও রয়েছে।

সুইডিশ জাতীয় পুলিশের উপকমিশনার স্টেফান হেক্টর বলেন, তারা ‘অন্য দেশগুলোর সাথে সহযোগিতা ক্রমাগত সম্প্রসারণ’ করছেন এবং সংঘবদ্ধ অপরাধীদের দেখিয়ে দিচ্ছেন যে ‘বিশ্বের কোথাও তারা নিরাপদ বোধ করতে পারবে না।’

গ্রেফতারগুলো ফক্সট্রটের কার্যক্ষমতাকে কতটা দুর্বল করেছে, তা এখনো স্পষ্ট নয়। তবে অন্যান্য গোষ্ঠী, যার মধ্যে ফক্সট্রটের প্রতিদ্বন্দ্বী ডালেন নেটওয়ার্কও রয়েছে, ইতোমধ্যে দুর্বল কিশোরদের ব্যবহার করে হত্যাকাণ্ড চালানোর ভিএএএস পদ্ধতি গ্রহণ করেছে।

ফলে এই হুমকি এখনো খুবই বাস্তব।

এটি দ্রুত সুইডেন থেকে সমগ্র স্ক্যান্ডিনেভিয়া ও উত্তর ইউরোপে ছড়িয়ে পড়ে এবং নাটল্যান্ডের ঘটনা দেখিয়েছে যে গত বছর তা যুক্তরাজ্যেও পৌঁছেছিল।

সূত্র : বিবিসি