ফ্রান্সে ১৫ বছরের কম বয়সী শিশু-কিশোরদের সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ব্যবহারে নিষেধাজ্ঞা আরোপের আইন বাতিল করেছে দেশটির সাংবিধানিক পরিষদ। শুক্রবার (১৪ আগস্ট) দেয়া এক রায়ে পরিষদ জানিয়েছে, এ ধরনের ব্যাপক নিষেধাজ্ঞা শিশুদের মতপ্রকাশ ও যোগাযোগের স্বাধীনতার ওপর ‘অসামঞ্জস্যপূর্ণ’ হস্তক্ষেপ সৃষ্টি করে।
আইনটির প্রথম ধারাকে চ্যালেঞ্জ করে জুলাইয়ের শেষ দিকে সমাজতন্ত্রী ও বামপন্থী ‘লা ফ্রঁস ইনসুমিজ’ দলের কয়েকজন সংসদ সদস্য সাংবিধানিক পরিষদের দ্বারস্থ হন। তাদের আবেদনের পরিপ্রেক্ষিতে আইনটির সাংবিধানিক বৈধতা পর্যালোচনা করে পরিষদ। পরে তারা সিদ্ধান্তে পৌঁছায়, ১৫ বছরের কম বয়সীদের জন্য সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম পুরোপুরি নিষিদ্ধ করার বিধান শিশুদের মতপ্রকাশ ও যোগাযোগের স্বাধীনতার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়।
রায়ের পরপরই প্রেসিডেন্ট এমানুয়েল ম্যাক্রোঁ প্রধানমন্ত্রী সেবাস্তিয়েন লেকর্নুকে নতুন করে আইন প্রণয়ন করার কাজ শুরু করার নির্দেশ দিয়েছেন। এলিসে প্রাসাদের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, সাংবিধানিক পরিষদের সিদ্ধান্ত এবং ইউরোপীয় আইনি কাঠামো বিবেচনায় নিয়ে আইনটির একটি ‘আইনগতভাবে শক্তিশালী’ সংস্করণ তৈরি করতে হবে। ২০২৭ সালের বসন্তের মধ্যে এই সংস্কার বাস্তবায়নের ব্যাপারে প্রেসিডেন্টের অবস্থানও অপরিবর্তিত রয়েছে।
শিশুবিষয়ক হাই কমিশনার সারাহ এল হাইরি বলেছেন, তিনি সাংবিধানিক পরিষদের সিদ্ধান্ত মেনে নিলেও শিশুদের অনলাইন সুরক্ষার উদ্যোগ থেকে সরে দাঁড়াবেন না। ইউরোপীয় কমিশনের সঙ্গে সমন্বয় করে আইনগতভাবে নিরাপদ একটি ব্যবস্থা তৈরির কাজ আবার শুরু হবে বলেও জানান তিনি।
শিশুদের সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ব্যবহারের ফলে উদ্বেগ, বিষণ্নতা, ঘুমের সমস্যা এবং অনলাইন হয়রানির মতো ঝুঁকি তৈরি হতে পারে—এমন আশঙ্কা থেকেই ফরাসি সরকার নিষেধাজ্ঞার উদ্যোগ নিয়েছিল। শিশু অধিকার নিয়ে কাজ করা বিভিন্ন সংগঠনও দীর্ঘদিন ধরে অপ্রাপ্তবয়স্কদের সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ব্যবহার নিয়ন্ত্রণের দাবি জানিয়ে আসছিল।
তবে সাংবিধানিক পরিষদের সদস্যরা মনে করেন, প্রস্তাবিত নিষেধাজ্ঞার আওতা অত্যন্ত বিস্তৃত। এর ফলে এমন অনেক অনলাইন যোগাযোগসেবাও নিষেধাজ্ঞার আওতায় পড়তে পারে, যেগুলোর কারণে অপ্রাপ্তবয়স্কদের স্বাস্থ্য ও নিরাপত্তার ঝুঁকি এখনো যথেষ্টভাবে প্রমাণিত হয়নি।
আইনটি ১ সেপ্টেম্বর থেকে কার্যকর হওয়ার কথা ছিল। এর আওতায় টিকটক, স্ন্যাপচ্যাট, এক্স ও ইনস্টাগ্রামের মতো সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের পাশাপাশি ইউটিউবের মন্তব্য ও শেয়ারিংয়ের মতো সামাজিক ফিচার, হোয়াটসঅ্যাপ ও মেসেঞ্জারের মতো মেসেজিং সেবা এবং কিছু অনলাইন গেমও পড়ার কথা ছিল। অনলাইন বিশ্বকোষ এবং শিক্ষামূলক বা বৈজ্ঞানিক তথ্যভান্ডারের মতো কিছু সেবাকে আইনের আওতার বাইরে রাখা হলেও সাংবিধানিক পরিষদের মতে, এসব ব্যতিক্রম যথেষ্ট সীমিত ছিল।
বয়স যাচাইয়ের ব্যবস্থাও সাংবিধানিক পরিষদের উদ্বেগের অন্যতম কারণ। আইনটি কার্যকর হলে প্ল্যাটফর্মগুলোকে ব্যবহারকারীদের বয়স যাচাইয়ের জন্য এক বা একাধিক ব্যবস্থা চালু করতে হতো। কিন্তু বয়স যাচাই কীভাবে এবং কোন সীমার মধ্যে করা হবে, সে বিষয়ে আইনে পর্যাপ্ত সুরক্ষা নির্ধারণ করা হয়নি বলে মনে করেছে পরিষদ। এর ফলে ব্যবহারকারীদের ব্যক্তিগত গোপনীয়তা ক্ষুণ্ন হওয়ার আশঙ্কা তৈরি হয়।
ফরাসি অডিওভিজ্যুয়াল ও ডিজিটাল নিয়ন্ত্রক সংস্থা আর্কমের জুলাইয়ে প্রকাশিত এক গবেষণায় দেখা যায়, ১০ থেকে ১৪ বছর বয়সী শিশু-কিশোরদের দুই-তৃতীয়াংশের বেশি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম নিষিদ্ধ করার পক্ষে। ফলে সরকার ও শিশু সুরক্ষা সংগঠনগুলোর কাছে এই উদ্যোগের পক্ষে জনসমর্থনের একটি ভিত্তিও ছিল।
ফ্রান্সের উদ্যোগটি ইউরোপে অপ্রাপ্তবয়স্কদের সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ব্যবহারে আইনগত সীমা নির্ধারণের ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ হিসেবে দেখা হয়েছিল। তবে সাংবিধানিক পরিষদের রায়ের ফলে সেই উদ্যোগ আপাতত থমকে গেল। এর আগে ২০২৫ সালের শেষ দিকে অস্ট্রেলিয়া ১৬ বছরের কম বয়সীদের সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ব্যবহারে নিষেধাজ্ঞা আরোপকারী প্রথম দেশ হয়। এরপর ব্রাজিল, ইন্দোনেশিয়া, যুক্তরাজ্য ও নিউজিল্যান্ডসহ আরো কয়েকটি দেশে একই ধরনের বিধিনিষেধ নিয়ে আইন প্রণয়ন বা পরিকল্পনা করা হয়েছে।
ফ্রান্সে এখন সরকারের সামনে বড় চ্যালেঞ্জ হলো শিশুদের অনলাইন ঝুঁকি থেকে সুরক্ষা দেয়া এবং একই সাথে তাদের মতপ্রকাশের স্বাধীনতা ও ব্যক্তিগত গোপনীয়তা নিশ্চিত করা। সাংবিধানিক পরিষদের রায়ের আলোকে ম্যাক্রোঁ সরকার কী ধরনের নতুন আইন প্রস্তাব করে, সেটিই এখন আলোচনার কেন্দ্রবিন্দু।



