খোদ ইউরোপীয় ইউনিয়ন (ইইউ) তেল ও গ্যাসের সরবরাহ কমে যাওয়ায় দিশেহারা হয়ে পড়েছে। ইরান যুদ্ধের উত্তাপ এখন আর শুধু এশিয়ার সীমানায় আটকে নেই, তা সরাসরি আছড়ে পড়ছে ইউরোপের উপকূলে। তেল ও গ্যাসের সরবরাহ কমে যাওয়ায় এশিয়ার দেশগুলো আগে থেকেই ধুঁকছিল, কিন্তু এখন সেই একই ধাক্কায় দিশেহারা হয়ে পড়েছে ইউরোপীয় ইউনিয়ন।
ইউক্রেন সংকটের ক্ষত শুকানোর আগেই নতুন এই যুদ্ধ ইউরোপকে এমন এক চোরাবালিতে ফেলেছে, যেখানে তাদের অনেক শিল্পকারখানা এখন স্রেফ টিকে থাকার লড়াই করছে। পরিস্থিতি সামাল দিতে ইইউ ইতোমধ্যে জরুরি ব্যবস্থার এক নতুন প্যাকেজ ঘোষণা করেছে, কারণ জ্বালানির দাম যেভাবে আকাশ ছুঁয়েছে, তাতে সাধারণ মানুষের নাভিশ্বাস উঠে গেছে। এই যুদ্ধের মাশুল ইউরোপকে রণক্ষেত্রে দিতে হচ্ছে না ঠিকই, কিন্তু দিতে হচ্ছে বিদ্যুতের চড়া বিলে আর বাজারের ব্যাগে।
ইউরোপীয় কমিশনের দেয়া হিসাব কষলে দেখা যায়, যুদ্ধ শুরু হওয়ার পর থেকে জ্বালানি আমদানির পেছনে ইইউ অতিরিক্ত ২৪ বিলিয়ন ইউরো বা প্রায় ২৮ বিলিয়ন ডলার খরচ করে ফেলেছে। সহজ করে বললে, কোনো বাড়তি জ্বালানি না পেয়েও তারা প্রতিদিন গড়ে ৫৮ কোটি ৭০ লাখ ডলার বেশি খরচ করছে। এটি এক বিশাল অপচয় ছাড়া আর কিছুই নয়।
এদিকে, আন্তর্জাতিক জ্বালানি সংস্থা (আইইএ) এক কড়া হুঁশিয়ারি দিয়েছে। ইউরোপ তাদের প্রয়োজনীয় জেট ফুয়েলের ৭০ শতাংশই বিদেশ থেকে আমদানি করে। ফলে আগামী কয়েক সপ্তাহের মধ্যে সেখানে উড়োজাহাজের জ্বালানিতে বড় ধরনের টান পড়তে পারে। এই আশঙ্কায় ইউরোপীয় বিমানবন্দর অ্যাসোসিয়েশন সদস্য দেশগুলোকে অনুরোধ করেছে, যেন তারা দ্রুত বিমান চলাচলের ওপর থেকে সব ধরনের ট্যাক্স বা কর তুলে নেয়।
জ্বালানি সংকটের এই প্রভাব কতটা গভীর, তা বোঝা যায় জার্মানির লুফথানসা গ্রুপের সিদ্ধান্তের দিকে তাকালে। জ্বালানির দাম যুদ্ধের শুরুতে যা ছিল, এখন তার চেয়ে দ্বিগুণ হয়ে গেছে। খরচ বাঁচাতে তারা আগামী অক্টোবর পর্যন্ত তাদের সিডিউল থেকে ২০ হাজার ফ্লাইট বাতিল করার ঘোষণা দিয়েছে। শুধু আকাশপথ নয়, সমুদ্রের বুকেও নেমে এসেছে স্থবিরতা। ইউরোপীয় কমিশন জানিয়েছে, জ্বালানি আর কাঁচামালের দাম এতই বেড়েছে যে অনেক জেলে এখন মাছ ধরতে যাওয়াই বন্ধ করে দিয়েছেন। সমুদ্রে জাল ফেলে যে মাছ পাওয়া যাচ্ছে, তার চেয়ে জ্বালানি খরচ বেশি হওয়ায় লাভের মুখ দেখা তাদের পক্ষে অসম্ভব হয়ে দাঁড়িয়েছে।
মার্কিন সংবাদমাধ্যম সিএনএন তাদের এক বিশ্লেষণে বলেছে, ‘ইরান যুদ্ধের কারণে পারস্য উপসাগরে যে অস্থিরতা তৈরি হয়েছে, তার রেশ সহজে কাটার নয়। ইউরোপীয় কমিশনও স্বীকার করে নিয়েছে যে, যদি আজই যুদ্ধ থেমে যায়, তবুও পারস্য উপসাগর থেকে জ্বালানি সরবরাহের এই বাধা নিকট ভবিষ্যতে কাটবে না। ইউক্রেন যুদ্ধের ধাক্কা সামলে ইউরোপ যখন একটু ঘুরে দাঁড়াতে চাইছিল, ঠিক তখনই এই সংকট তাদের অর্থনীতির মেরুদণ্ড ভেঙে দিচ্ছে। এই যুদ্ধের প্রভাব এখন আর শুধু রাজনৈতিক বিবৃতিতে সীমাবদ্ধ নেই, বরং এটি ইউরোপের সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রাকে খাদের কিনারায় নিয়ে ঠেলে দিয়েছে।’
সূত্র : তাসনিম নিউজ অ্যাজেন্সি



