জাতিসঙ্ঘের সহকারী মহাসচিব সুদান যুদ্ধ বন্ধ করার প্রয়োজনীয়তার উপর জোর দিয়ে তার প্রতিবেশী সব অঞ্চলকে এ যুদ্ধের জটিল প্রকৃতি এবং যুদ্ধের বিস্তৃতি সম্পর্কে সতর্ক করেছেন।
জাতিসঙ্ঘের রাজনৈতিক ও শান্তিরক্ষাবিষয়ক সহকারী মহাসচিব ‘মোহাম্মদ খালেদ আল-খায়ারি‘ বলেছেন, ‘সুদানের ঘটনাবলী যদি সমাধান না করা হয়, তাহলে সুদানের প্রতিবেশীরাও ওই দেশের অভ্যন্তরে এবং আশেপাশে একটি আঞ্চলিক সঙ্ঘাতে জড়িত হওয়ার ঝুঁকি রয়েছে।‘
এই সতর্কতা এমন সময়ে এসেছে যখন কয়েক মাস ধরে জাতিসঙ্ঘের মানবাধিকারবিষয়ক হাই কমিশনার ভোলকার তুর্ক কর্ডোফানের মতো বিভিন্ন অঞ্চলে ক্রমবর্ধমান সহিংসতার বিপদ সম্পর্কে সতর্ক করে আসছেন এবং উত্তর দারফুর, বিশেষ করে এল ফাশারে অপরাধের পুনরাবৃত্তি রোধে জরুরি ব্যবস্থা নেয়ার আহ্বান জানিয়েছেন।
২০২৩ সালের এপ্রিল থেকে সেনাবাহিনী এবং র্যাপিড সাপোর্ট ফোর্সের মধ্যে রক্তক্ষয়ী যুদ্ধে জর্জরিত সুদানের সঙ্কট নতুন মাত্রা ধারণ করেছে। কয়েক দশক ধরে গৃহযুদ্ধ, দক্ষিণ সুদানের বিচ্ছিন্নতা এবং দারফুর সঙ্কটের পর সুদান এখনো স্থিতিশীলতার পথ খুঁজে পায়নি। সেনাবাহিনী এবং মিলিশিয়াদের মধ্যে ক্ষমতার লড়াই, জাতিগত ও উপজাতিগত দ্বন্দ্ব এবং অর্থনৈতিক স্বার্থ, বিশেষ করে প্রাকৃতিক সম্পদের নিয়ন্ত্রণ বর্তমান যুদ্ধের ভিত্তি তৈরি করেছে। এছাড়া মধ্যস্থতায় ধারাবাহিক ব্যর্থতা, বিদেশী হস্তক্ষেপ এবং বিবাদমান পক্ষগুলোর মধ্যে গভীর অবিশ্বাসের কারণে এই সঙ্কট দীর্ঘায়িত হচ্ছে।
সঙ্ঘাতের জটিলতা থেকে বোঝা যায় যে সুদানের সঙ্কট একটি সাধারণ সামরিক সঙ্ঘাতের চেয়েও অনেক বেশি কিছু। সঙ্ঘাতে জড়িত প্রতিটি পক্ষের নিজস্ব সামাজিক ও অর্থনৈতিক ভিত্তি রয়েছে, যার ফলে উভয় পক্ষেরই আলোচনার শর্তাবলী মেনে নেয়া বা পিছিয়ে আসা কঠিন হয়ে পড়েছে। খার্তুম এবং ওমদুরমানের মতো প্রধান শহরগুলোতে, সেইসাথে কর্দোফান এবং দারফুরের মতো স্পর্শকাতর অঞ্চলের সঙ্ঘাত গভীর সামাজিক বিভাজনকে তুলে ধরে, যা সমঝোতাকে কঠিন করে তুলেছে এবং সঙ্কটকে এমন একপর্যায়ে ঠেলে দিয়েছে যেখানে এটিকে আর সম্পূর্ণ গৃহযুদ্ধ হিসাবে বিবেচনা করা যায় না।
সুদানের যুদ্ধে বিদেশী শক্তিগুলোও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। সুদানের ভূ-রাজনৈতিক অবস্থান এবং প্রাকৃতিক সম্পদ, যার মধ্যে রয়েছে সোনা, তেল এবং বাণিজ্য পথ, সর্বদা বিদেশী শক্তিগুলোর দৃষ্টি আকর্ষণ করেছে। এই সম্পদগুলোতে প্রবেশাধিকারের প্রতিযোগিতা সুদানের বিরোধিতাকারী পক্ষগুলোকে বহিরাগত শক্তিগুলোর কাছ থেকে সমর্থন পেতে উৎসাহিত করেছে। বিশেষ করে কিছু আঞ্চলিক এবং আন্তঃ-আঞ্চলিক শক্তির বিদেশী হস্তক্ষেপ সঙ্কটকে দীর্ঘস্থায়ী করার ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছে। এই হস্তক্ষেপগুলো কেবল শান্তি প্রক্রিয়াকে ব্যাহত করেনি। বরং সঙ্কটের জটিলতাও বাড়িয়েছে।
কিন্তু সুদান যুদ্ধের মানবিক ও মানবাধিকার লঙ্ঘনের মতো বিষয়গুলো এই সঙ্কটের সবচেয়ে ভয়াবহ দিকগুলোর মধ্যে একটি। লাখ লাখ মানুষ বাস্তুচ্যুত হয়েছে এবং আরো লাখ লাখ মানুষ দুর্ভিক্ষ ও রোগের ঝুঁকিতে রয়েছে। দেশে মানবাধিকার লঙ্ঘন নিত্যদিনের ঘটনা হয়ে দাঁড়িয়েছে। আন্তর্জাতিক সংস্থাগুলোর প্রতিবেদন অনুসারে, নারী ও শিশুরা এই সঙ্কটের সবচেয়ে বেশি শিকার। এছাড়া এল ফাশারের মতো শহরগুলো দারফুরের অপরাধের পুনরাবৃত্তি প্রত্যক্ষ করেছে, যা আন্তর্জাতিক সম্প্রদায় এখনো প্রতিহত করতে পারেনি। বিশেষ করে যৌন সহিংসতা, বেসামরিক নাগরিকদের হত্যা এবং গুরুত্বপূর্ণ অবকাঠামো ধ্বংসের অসংখ্য প্রতিবেদন প্রকাশিত হয়েছে।
যুদ্ধের গুরুতর অর্থনৈতিক পরিণতিও হয়েছে। অর্থনৈতিক অবকাঠামো ধ্বংস, উৎপাদন ও বাণিজ্য বন্ধ এবং খাদ্য সঙ্কট, গণ অভিবাসন এবং আঞ্চলিক অর্থনীতির ক্ষতি চলমান এই সঙ্কটের অন্যতম পরিণতি।
সুদান আজ সম্পূর্ণ ধ্বংসের দ্বারপ্রান্তে; দেশটি প্রতিদিন সহিংসতার গভীরে ডুবে যাচ্ছে এবং প্রতিবেশী দেশগুলোতেও এই সঙ্কট ছড়িয়ে পড়ার ঝুঁকি প্রতি মুহূর্তে বাড়ছে। যদি এই যুদ্ধ আঞ্চলিক সঙ্ঘাতে পরিণত হয়, তাহলে কেবল সুদানই নয়, সমগ্র আফ্রিকা অস্থিতিশীলতা, গণ-অভিবাসন, অর্থনৈতিক পতন এবং রক্তাক্ত সঙ্ঘাতের ঢেউয়ের মুখোমুখি হবে। জাতিসঙ্ঘের এই সতর্কীকরণ সকল আন্তর্জাতিক পক্ষের জন্য একটি সতর্কবার্তা। কারণ আজ উদাসীনতার অর্থ এমন একটি আগুন জ্বালানো, যা আর নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব হবে না।
সূত্র : পার্সটুডে



