হরমুজ থেকে মালাক্কা, যে ৫ সমুদ্রপথের ওপর নির্ভরশীল বিশ্বের বাণিজ্য

হরমুজ প্রণালীতে চলমান সঙ্কট বৈশ্বিক বাণিজ্যের চরম এই ঝুঁকি প্রকাশ করেছে যে, বিশ্ববাণিজ্য মাত্র অল্প কয়েকটি সরু পানিপথের ওপর নির্ভরশীল। কিন্তু বর্ণিত পাঁচটি সমুদ্রপথই যে বাণিজ্যের একমাত্র গুরুত্বপূর্ণ পয়েন্ট বিষয়টি এমন নয়।

নয়া দিগন্ত অনলাইন
বিশ্বের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ কৌশলগত জ্বালানি পথ হলো হরমুজ প্রণালী
বিশ্বের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ কৌশলগত জ্বালানি পথ হলো হরমুজ প্রণালী |সংগৃহীত

ইরান-যুক্তরাষ্ট্র যুদ্ধের কারণে বিশ্বব্যাপী জ্বালানি ও কাঁচামালের বাজার ব্যাহত হয়েছে। যুদ্ধের একপর্যায়ে ইরান তেল পরিবহনের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ পথ হরমুজ প্রণালী কার্যত বন্ধ করে দিয়েছিল।

সেই সাথে গত দুই সপ্তাহে এই সমুদ্রপথ পার হতে চেষ্টা করা এক ডজনেরও বেশি জাহাজে হামলা করেছে ইরান।

যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প এই প্রণালীর জন্য তার ইউরোপীয় মিত্রদের চাপ দিয়েছেন। তিনি সতর্ক করে বলেছেন, হরমুজ প্রণালী পুনরায় খোলার জন্য যুক্তরাষ্ট্রের প্রচেষ্টাকে সমর্থন না করলে তা ‘নেটোর ভবিষ্যতের জন্য খুবই খারাপ’ হবে।

পারস্য উপসাগরে জাহাজ চলাচলে বাধার সৃষ্টি হওয়ায় ব্রেন্ট (অপরিশোধিত) তেলের দাম যুদ্ধ শুরুর আগে যা ছিল প্রতি ব্যারেল ৭০ ডলার, সেটি আরো বেড়ে ১০০ ডলার ছাড়িয়ে গেছে।

এর ফলে ভোক্তাপণ্য থেকে শুরু করে কৃষিসংক্রান্ত কাঁচামালসহ আরো নানা ধরনের পণ্যের বিশ্ব বাণিজ্যও প্রভাবিত হয়েছে।

কিন্তু এই যুদ্ধ আরো একটি বড় সমস্যাকে সবার সামনে নিয়ে এসেছে। সেটি হলো, আশ্চর্যজনক হলেও সত্য, বিশ্ব বাণিজ্য অল্প কিছু সরু সমুদ্রপথের ওপর নির্ভরশীল, যেগুলোকে প্রায়ই সামুদ্রিক ‘বটলনেকস বা চলাচলের সরু পথ’ বলা হয়ে থাকে।

নিচে বিশ্ব বাণিজ্যের জন্য সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ সমুদ্রপথগুলো সম্পর্কে এবং সেগুলো বাধাগ্রস্ত হলে সম্ভাব্য কী ধরনের ঝুঁকি হতে পারে সে বিবরণ তুলে ধরা হলো:

হরমুজ প্রণালী

বিশ্বের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ কৌশলগত জ্বালানি পথ হলো হরমুজ প্রণালী। এটি পারস্য উপসাগরকে ওমান সাগরের সাথে সংযুক্ত করেছে। সমুদ্রপথে পরিবাহিত অপরিশোধিত তেলের প্রায় ৩৯ শতাংশ এবং প্রাকৃতিক গ্যাসের ১৯ শতাংশ এই পথ দিয়েই যায়।

বাণিজ্যের অন্যান্য বটলনেকস বা চলাচলের সরু পথগুলোর তুলনায় এই হরমুজ প্রণালীর বৈশিষ্ট্য হলো, পারস্য উপসাগরীয় দেশগুলোর জ্বালানি রফতানির জন্য বাস্তবিকভাবেই এ পথটির কোনো বিকল্প নেই।

১৯৮০ সাল থেকেই ইরান মাঝে মাঝেই হরমুজ প্রণালী বন্ধ করে দেয়ার হুমকি দিয়ে আসছে। তবে গত ফেব্রুয়ারির শেষের দিকে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরাইল প্রথম ইরানের ভূখণ্ডে বিমান হামলা চালানোর পর জাহাজ চলাচলে যে বাধার সৃষ্টি হয়েছে, সেটি গত কয়েক দশকের মধ্যে উত্তেজনা যেভাবে বেড়েছে তার মধ্যে সবচেয়ে গুরুতর।

আন্তর্জাতিক জ্বালানি সংস্থার মতে এই যুদ্ধের কারণে, ‘বিশ্বের তেলের বাজারে ইতিহাসের সবচেয়ে বড় সরবরাহ বিপর্যয় ঘটেছে’ এবং বিশ্ববাজারে ক্রুড বা অপরিশোধিত তেলের দাম দ্রুত বেড়ে গেছে।

পারস্য উপসাগরে সামুদ্রিক পরিবহনে এই বাধার প্রভাব জ্বালানি খাতের বাইরেও ছড়িয়ে পড়ে। এই পারস্য উপসাগরীয় অঞ্চল দিয়ে বছরে ২৬ মিলিয়ন বা দুই কোটি ৬০ লাখের বেশি কন্টেইনার যাতায়াত করে এবং বিশ্বের সার রফতানির একটি উল্লেখযোগ্য অংশ এই হরমুজ প্রণালী দিয়েই পরিবহন করা হয়।

এ কারণেই সমুদ্রপথে জাহাজ চলাচলে দীর্ঘমেয়াদী বাধা বিশ্বের খাদ্য উৎপাদন খরচের ওপর সরাসরি প্রভাব ফেলবে।

সুয়েজ খাল

লোহিত সাগরকে ভূমধ্যসাগরের সাথে সংযুক্ত করেছে সুয়েজ খাল। যেটি এশিয়া ও ইউরোপের ভ্রমণের সময় কমপক্ষে ১০ দিন কমিয়ে দিয়েছে।

বিশ্বের মোট সামুদ্রিক বাণিজ্যের ১০ শতাংশই এই পানিপথ দিয়ে হয়। এরমধ্যে রয়েছে মোট কন্টেইনার পরিবহনের ২২ শতাংশ, যানবাহন চলাচলের ২০ শতাংশ এবং ক্রুড বা অপরিশোধিত তেলের ১০ শতাংশ।

যেহেতু এই সুয়েজ খাল মিশরের নিয়ন্ত্রণে রয়েছে সেহেতু এটি সহজে বা সরাসরি কোনো হুমকির সম্মুখীন হয় না। তবে এ পানিপথটি যে দুর্ঘটনার ঝুঁকি থেকে মুক্ত নয় তা ২০২১ সালে একটি বড় জাহাজ আটকে যাওয়ার ঘটনায় প্রমাণিত হয়।

ওই জাহাজ আটকে যাওয়ায় ছয় দিন সরু এ সুয়েজ খালটি বন্ধ ছিল। এর ফলে প্রায় ১০ বিলিয়ন বা এক হাজার কোটি ডলারের বাণিজ্য ক্ষতিগ্রস্ত হয়।

এই কৌশলগত খালটির সবচেয়ে বড় দুর্বলতা হলো লোহিত সাগরের দক্ষিণ প্রান্তে অবস্থিত বাবে আল মানদাব প্রণালী।

গাজায় হামাসের বিরুদ্ধে ইসরাইলের যুদ্ধের প্রতিবাদে ২০২৩ ও ২০২৫ সালের মধ্যে ইয়েমেনের ইরান-সমর্থিত গোষ্ঠী হাউছিরা বাণিজ্যিক জাহাজগুলোতে যে হামলা চালিয়েছিল তার ফলে অনেক জাহাজ পথ পরিবর্তন করে আফ্রিকা হয়ে যেতে বাধ্য হয়েছিল।

এই কারণে সুয়েজ খালে জাহাজ চলাচলের সংখ্যা যেটি ২০২৩ সালে ২৬ হাজারের বেশি ছিল, তা কমে পরের বছর ২০২৪ সালে ১৩ হাজারে নেমে দাঁড়িয়েছে।

ইরানের ওপর যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরাইলের হামলার প্রতিশোধ নিতে সম্প্রতি হাউছি নেতারা আবারো বাণিজ্যিক জাহাজে হামলার হুমকি দিয়েছে।

তারা সতর্ক করে বলেছে, তাদের ‘আঙ্গুল (বন্দুকের) ট্রিগারে রয়েছে’।

পানামা খাল

বৈশ্বিক সামুদ্রিক বাণিজ্যের প্রায় ২ দশমিক ৫ শতাংশ নিয়ন্ত্রণ করে প্রশান্ত ও আটলান্টিক সাগরকে সংযুক্তকারী পানামা খাল। এই ২ দশমিক ৫ শতাংশ তুলনামূলকভাবে কম মনে হলেও কন্টেইনারজাত পণ্য, গাড়ি ও শস্যের মতো উচ্চমূল্যের কার্গো এবং কৌশলগত পণ্য এই খাল বা সমুদ্রপথ দিয়ে বেশি পরিবহন করা হয়।

যুক্তরাষ্ট্রের মোট কন্টেইনার কার্গোবাহী পণ্যের প্রায় ৪০ শতাংশ এই সুয়েজ খাল দিয়ে পরিবহন করা হয়, যার বার্ষিক মূল্য ২৭০ বিলিয়ন ডলার।

এই খালের দুর্বলতা মূলত জলবায়ু পরিস্থিতি এবং রাজনৈতিক ইস্যু উভয় বিষয়ের সাথেই সংযুক্ত। ২০২৩ ও ২০২৪ সালে তীব্র খরা শুরু হলে খালের মিঠা পানির জলাধারগুলোতে পানির স্তর উল্লেখযোগ্যভাবে কমে যায়, ফলে জাহাজের সংখ্যা এবং আকার সীমিত করতে বাধ্য হয় মিশরীয় কর্তৃপক্ষ।

এরপর ২০২৫ সালের শুরুর দিকে যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প খালটির নিয়ন্ত্রণ নেয়ার হুমকি দেন। এই খালের কিছু বন্দর হংকংভিত্তিক হাচিসন কোম্পানি পরিচালনা করার বিষয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেন ট্রাম্প।

মালাক্কা প্রণালী

মালাক্কা প্রণালী বিশ্বের ব্যস্ততম সমুদ্রপথ। বিশ্বের সামুদ্রিক বাণিজ্যের ২৪ শতাংশ এই সমুদ্রপথ দিয়ে হয়। এরমধ্যে রয়েছে সমুদ্রপথে পরিবাহিত ক্রুড বা অপরিশোধিত তেলের ১০ শতাংশ এবং অটোমোবাইল বাণিজ্যের ২৬ শতাংশ।

সিঙ্গাপুরের পাশ দিয়ে গেছে এই মালাক্কা প্রণালী। যেটি বিশ্বের দ্বিতীয় ব্যস্ততম কন্টেইনার পোর্ট বা বন্দর।

চীন, জাপান ও দক্ষিণ কোরিয়ার জ্বালানির জন্য একটি প্রধান গেটওয়ে বা প্রবেশপথ এই মালাক্কা প্রণালী। চীনের তেল আমদানির প্রায় ৮০ শতাংশই এই পথ দিয়ে আসে। এই নির্ভরশীলতাকে ‘মালাক্কা ডিলেমা বা দ্বিধা বা উভয়সঙ্কট’ হিসেবে উল্লেখ করে বেইজিং।

পাইরেসি এখনো একটি কন্সট্যান্ট কনসার্ন বা অবিরাম উদ্বেগ হিসেবে রয়েছে। ২০২৫ সালে এই মালাক্কা প্রণালীতে ১৩০টিরও বেশি জলদস্যুতার ঘটনা ঘটেছে।

কিন্তু সবচেয়ে বড় ঝুঁকি হলো রাজনৈতিক ও ভূরাজনৈতিক ইস্যু। এই অঞ্চলে সামুদ্রিক আধিপত্য বিস্তার নিয়ে চীন ও যুক্তরাষ্ট্র বা ভারতের মধ্যে যে কোনো ধরনের উত্তেজনা বাড়লে এই প্রণালী দিয়ে জাহাজ চলাচল মারাত্মকভাবে ব্যাহত হতে পারে।

এছাড়া সুনামি ও আগ্নেয়গিরির অগ্ন্যুৎপাতের মতো প্রাকৃতিক দুর্যোগের শিকার হওয়ার ঝুঁকিতেও রয়েছে এই মালাক্কা প্রণালী।

উদাহরণস্বরূপ, ২০০৪ সালের ২৬ ডিসেম্বরের সুনামিতে এই প্রণালীর দক্ষিণ প্রবেশপথের উপকূলীয় অবকাঠামোর ব্যাপক ক্ষতি হয়েছিল।

তার্কিশ প্রণালী বা টার্কিশ প্রণালী

কৃষ্ণ সাগর ও ভূমধ্যসাগরের মধ্যে একমাত্র সমুদ্রপথ হলো তুরস্কের বসফোরাস ও দার্দেনেলিস প্রণালী। বিশ্বের সমুদ্র পরিবাহিত বাণিজ্যের ৩ শতাংশ এই প্রণালী দিয়ে পরিবহন করা হয়।

তবে এই পরিমাণ সামান্য মনে হলেও এই প্রণালীর মাধ্যমেই ইউক্রেন, রাশিয়া ও রোমানিয়া থেকে বিশ্বের মোট গম রফতানির প্রায় ২০ শতাংশ পরিবহন করা হয়।

এই প্রণালীর সবচেয়ে সরু অংশ ৭০০ মিটার চওড়া, এই রুট তুরস্কের ইস্তাম্বুল শহরের মাঝখান দিয়ে বয়ে গেছে। এ কারণে এখানে জাহাজ চালানো কঠিন হয়ে পড়ে এবং ছোটখাটো সংঘর্ষের ঘটনা এখানে সাধারণ বিষয়।

মন্ট্রেক্স কনভেনশন অনুযায়ী, এই প্রণালীগুলোতে প্রবেশাধিকার সামরিকভাবে নিয়ন্ত্রণ করে তুরস্ক।

২০২২ সালে ইউক্রেনে রাশিয়ার আগ্রাসনের পর থেকে আঙ্কারা এই ক্ষমতা ব্যবহার করে যুদ্ধজাহাজ চলাচল সীমিত করেছে, তবে বাণিজ্যিক জাহাজ চলাচলের পথ খোলা রেখেছে।

কৃষ্ণসাগর অঞ্চলে বাড়তে থাকা উত্তেজনা এই ভারসাম্য নষ্ট করতে পারে এবং বিশ্বব্যাপী শস্যের বাজারে বিপর্যয় ডেকে আনতে পারে। একইসাথে শক্তিশালী ভূমিকম্পের ঝুঁকিও এই অঞ্চলে আরেকটি বড় উদ্বেগের বিষয়।

হরমুজ প্রণালীতে চলমান সঙ্কট বৈশ্বিক বাণিজ্যের চরম এই ঝুঁকি প্রকাশ করেছে যে, বিশ্ববাণিজ্য মাত্র অল্প কয়েকটি সরু পানিপথের ওপর নির্ভরশীল। কিন্তু বর্ণিত পাঁচটি সমুদ্রপথই যে বাণিজ্যের একমাত্র গুরুত্বপূর্ণ পয়েন্ট বিষয়টি এমন নয়।

পুরো বিশ্বে এমন কমপক্ষে ২৪টি কৌশলগত সামুদ্রিক পয়েন্ট বা সমুদ্রপথ রয়েছে। এরমধ্যে তাইওয়ান, ডোভার ও বেরিং প্রণালীর মতো কিছু গুরুত্বপূর্ণ পানিপথ অন্তর্ভুক্ত।

এই পানিপথগুলোর প্রত্যেকটিই ভূ-রাজনৈতিক উত্তেজনা, জলবায়ু পরিবর্তন, পাইরেসি বা জলদস্যুতা ও প্রাকৃতিক দুর্যোগ বা দুর্ঘটনার মতো কোনো না কোনো নির্দিষ্ট ঝুঁকির মুখে রয়েছে।

সূত্র: বিবিসি