জাপানে ভোট গ্রহণ শুরু, রক্ষণশীল এজেন্ডার পক্ষে রায় চান তাকাইচি

গত ২৩ জানুয়ারি দেশটির সংসদ ভেঙে দেন প্রধানমন্ত্রী সানাই তাকাচি। ওই সময় তিনি ৮ ফেব্রুয়ারি আগাম নির্বাচনের তারিখ ঘোষণা করেন। তাকাচি জাপানের ইতিহাসে প্রথম নারী প্রধানমন্ত্রী।

নয়া দিগন্ত অনলাইন
জাপানের টোকিওতে এক নির্বাচনী প্রচারণা অনুষ্ঠানে বক্তব্য দেন জাপানের প্রধানমন্ত্রী সানায়ে তাকাইচি
জাপানের টোকিওতে এক নির্বাচনী প্রচারণা অনুষ্ঠানে বক্তব্য দেন জাপানের প্রধানমন্ত্রী সানায়ে তাকাইচি |সংগৃহীত

জাপানে শুরু হয়েছে সংসদ নির্বাচনের ভোটগ্রহণ। আজ রোববার (৮ ফেব্রুয়ারি) স্থানীয় সময় সকাল ৮টা থেকে ভোট দেয়া শুরু করেন দেশটির নাগরিকরা।

এ নির্বাচনে সংসদের নিম্নকক্ষের ৪৬৫ আসনেন জন্য ১ হাজার ২৮৪ প্রার্থী লড়াই করছেন।

গত ২৩ জানুয়ারি দেশটির সংসদ ভেঙে দেন প্রধানমন্ত্রী সানায়ে তাকাইচি। ওই সময় তিনি ৮ ফেব্রুয়ারি আগাম নির্বাচনের তারিখ ঘোষণা করেন। তাকাইচি জাপানের ইতিহাসে প্রথম নারী প্রধানমন্ত্রী।

গত বছরের অক্টোবরে প্রধানমন্ত্রীর দায়িত্ব নিলেও তার দল লিবারেল ডেমোক্র্যাটিক পার্টির (এলডিপি) সংসদে সামান্য ব্যবধানে সংখ্যাগরিষ্ঠতা ছিল। কিন্তু তিনি শক্তিশালী সংখ্যাগরিষ্ঠতা চাইছিলেন। এর ফলশ্রুতিতে ক্ষমতা গ্রহণ করেই আগাম নির্বাচনের সিদ্ধান্ত নেন।

প্রধানমন্ত্রী তাকাচির ক্ষমতাসীন লিবারেল ডেমোক্র্যাটিক পার্টির সঙ্গে মূল লড়াই হবে জাপান ইনোভেশন পার্টির।

নির্বাচনে প্রধানমন্ত্রী সানায়ে তাকাইচির নেতৃত্বাধীন রক্ষণশীল জোট বড় ধরনের বিজয় পেতে পারে বলে জনমত জরিপগুলো ইঙ্গিত দিচ্ছে।

আকস্মিকভাবে ডাকা এই নির্বাচনের মাধ্যমে প্রতিরক্ষা ব্যয় বৃদ্ধি, কঠোর অভিবাসন নীতি ও অর্থনৈতিক সংস্কারসহ উচ্চাভিলাষী কর্মসূচির পক্ষে নতুন জনসমর্থন আদায় করতে চান তাকাইচি। তার লিবারেল ডেমোক্রেটিক পার্টি (এলডিপি) ও জাপান ইনোভেশন পার্টি (ইশিন)–এর জোট নিম্নকক্ষের ৪৬৫টি আসনের মধ্যে ৩০০টিরও বেশি আসন পেতে পারে বলে একাধিক জরিপে পূর্বাভাস দেওয়া হয়েছে। বর্তমানে এই জোট ২৩৩টি আসন ধরে রেখেছে।

বিরোধী দলগুলো নতুন মধ্যপন্থী জোট গঠন এবং কট্টর ডানপন্থীদের উত্থান সত্ত্বেও বিভক্ত অবস্থায় থাকায় শক্ত প্রতিদ্বন্দ্বী হয়ে উঠতে পারেনি বলে বিশ্লেষকদের ধারণা।

৬৪ বছর বয়সী সানায়ে তাকাইচি জাপানের প্রথম নারী প্রধানমন্ত্রী। গত অক্টোবরে এলডিপির নেতা নির্বাচিত হওয়ার পর তিনি প্রধানমন্ত্রীর দায়িত্ব নেন। অতি রক্ষণশীল হিসেবে পরিচিত তাকাইচি “কাজ, কাজ আর কাজ”—এই স্লোগান সামনে রেখে প্রচার চালিয়েছেন। তার কঠোর কিন্তু প্রাণবন্ত নেতৃত্বের ধরন তরুণ ভোটারদের মধ্যে সাড়া ফেলেছে। তিনি আগেই ঘোষণা দিয়েছেন, এলডিপি সংখ্যাগরিষ্ঠতা না পেলে তিনি পদত্যাগ করবেন।

জীবনযাত্রার ব্যয় বড় ইস্যু

রোববার ভোটাররা ২৮৯টি একক আসনে সরাসরি ভোট দেবেন, আর বাকি আসনগুলো নির্ধারিত হবে দলীয় অনুপাতিক ভোটের মাধ্যমে। স্থানীয় সময় রাত ৮টায় ভোটগ্রহণ শেষ হবে। এরপরই এক্সিট পোলের ভিত্তিতে প্রাথমিক ফল প্রকাশ করবে গণমাধ্যমগুলো।

এবারের নির্বাচনে প্রধান ইস্যু হয়ে উঠেছে জীবনযাত্রার ব্যয় বৃদ্ধি। মূল্যস্ফীতি বাড়লেও প্রকৃত মজুরি সে অনুযায়ী না বাড়ায় সাধারণ মানুষ আর্থিক চাপে রয়েছে। দীর্ঘদিনের ধীর অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধিও উদ্বেগ বাড়িয়েছে। আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলের (আইএমএফ) তথ্যমতে, গত বছর জাপানের অর্থনীতি বেড়েছে মাত্র ১ দশমিক ১ শতাংশ, আর ২০২৬ সালে প্রবৃদ্ধি ০ দশমিক ৭ শতাংশে নেমে আসতে পারে।

এই পরিস্থিতিতে তাকাইচি দুই বছরের জন্য খাদ্যপণ্যে ৮ শতাংশ বিক্রয় কর স্থগিত রাখার প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন। এর আগে গত বছর কোভিড-১৯ মহামারির পর সবচেয়ে বড় প্রণোদনা প্যাকেজ ঘোষণা করে সরকার—২১ দশমিক ৩ ট্রিলিয়ন ইয়েন (প্রায় ১৩৬ বিলিয়ন ডলার)। এতে জ্বালানি ভর্তুকি, নগদ সহায়তা ও খাদ্য কুপনের মতো জীবনযাত্রা ব্যয় হ্রাসমূলক পদক্ষেপ অন্তর্ভুক্ত ছিল।

তাকাইচি ডিসেম্বরের মধ্যে প্রতিরক্ষা ও নিরাপত্তা নীতিতে বড় ধরনের সংশোধনের অঙ্গীকারও করেছেন। এর মধ্যে অস্ত্র রপ্তানির ওপর নিষেধাজ্ঞা শিথিল করা এবং যুদ্ধোত্তর শান্তিবাদী নীতির সীমা অতিক্রম করে আক্রমণাত্মক সামরিক সক্ষমতা বাড়ানোর পরিকল্পনা রয়েছে। পাশাপাশি বিদেশিদের সম্পত্তি মালিকানা ও অভিবাসন বিষয়ে আরও কঠোর নীতির পক্ষে তিনি অবস্থান নিয়েছেন।

আল জাজিরার টোকিও প্রতিনিধি প্যাট্রিক ফোক জানান, ৩০ বছরের কম বয়সী ভোটারদের বড় অংশের সমর্থন পাওয়া তাকাইচি তার “অভূতপূর্ব জনপ্রিয়তা” কাজে লাগিয়ে জোটকে ভূমিধস বিজয়ের দিকে নিতে চাইছেন।

ফোক বলেন, “কয়েক মাস আগেও এলডিপি ছিল সংকটে। সংসদে সংখ্যাগরিষ্ঠতা হারানো ও তহবিল কেলেঙ্কারিতে জর্জরিত দলটি তাকাইচির নেতৃত্বেই এই নাটকীয় প্রত্যাবর্তন ঘটিয়েছে।”

তুষারপাতের মধ্যেও ভোট

নির্বাচনের দিন দেশের কিছু অঞ্চলে রেকর্ড পরিমাণ তুষারপাত হয়েছে। উত্তর ও পূর্বাঞ্চলে কোথাও কোথাও ৭০ সেন্টিমিটার পর্যন্ত তুষারপাতের পূর্বাভাস থাকায় অনেক ভোটারকে প্রতিকূল আবহাওয়ার মধ্যেই ভোট দিতে হচ্ছে। যুদ্ধ-পরবর্তী সময়ে ফেব্রুয়ারিতে অনুষ্ঠিত এটি মাত্র তৃতীয় জাতীয় নির্বাচন।

তবে ফোকের মতে, তুষারপাত ভোটার উপস্থিতি কিছুটা প্রভাবিত করলেও ফলাফলে বড় কোনো পরিবর্তন আনবে না। তার ভাষায়, “অনেক ভোটারের ধারণা, বিরোধীরা ভিন্ন কোনো স্পষ্ট বিকল্প দিতে পারছে না। বরং তাকাইচির প্রবৃদ্ধিনির্ভর অর্থনৈতিক পরিকল্পনাই দীর্ঘমেয়াদে সুফল আনতে পারে।”

পররাষ্ট্রনীতিতে সম্ভাব্য পরিবর্তন

বিশাল বিজয় তাকাইচির পররাষ্ট্রনীতিতেও প্রভাব ফেলতে পারে বলে মনে করছেন বিশ্লেষকরা। ইন্টারন্যাশনাল ক্রিশ্চিয়ান ইউনিভার্সিটির অধ্যাপক স্টিফেন নাগি বলেন, এমন ফলাফল তাকাইচিকে দুটি গুরুত্বপূর্ণ লক্ষ্য অর্জনের সুযোগ দেবে—যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে জোট আরও দৃঢ় করা এবং চীনের প্রতি বাস্তববাদী দৃষ্টিভঙ্গি গ্রহণ।

তিনি বলেন, “বাণিজ্যিক সম্পর্ক বজায় রেখেও আঞ্চলিক নিরাপত্তা, জলবায়ু পরিবর্তন ও প্রতিরোধমূলক কৌশলে ভারসাম্য আনতে পারবেন তিনি।”

নাগি উল্লেখ করেন, বৃহস্পতিবার মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প তাকাইচিকে সমর্থন দেওয়ায় সেটি একদিকে যেমন সহায়ক, অন্যদিকে তেমনি কিছুটা বিতর্কিত। জাপানি জনগণ ট্রাম্পের শুল্কনীতি ও চীনের সঙ্গে ঘনিষ্ঠতার বিষয়ে উদ্বিগ্ন হলেও শক্তিশালী জাপান–যুক্তরাষ্ট্র জোটের ধারাবাহিকতায় তাকাইচির ওপর আস্থা রাখছেন বলে মনে করেন তিনি।

সূত্র: আল জাজিরা।