উত্তর কোরিয়ার হ্যাকারদের হাতে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা : বাড়ছে সাইবার হামলার ঝুঁকি

এআই প্রযুক্তি সাইবার অপরাধ জগতে বড় ধরনের পরিবর্তন এনেছে। এতে করে অপরাধীদের জন্য হ্যাকিং করা আগের চেয়ে অনেক সহজ হয়ে গেছে।

নয়া দিগন্ত অনলাইন
প্রতীকী ছবি
প্রতীকী ছবি |সংগৃহীত

উত্তর কোরিয়ার রাষ্ট্রীয় মদদপুষ্ট হ্যাকাররা এখন কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা এআই ব্যবহার করে সামরিক বাহিনী, কূটনীতি ও শিক্ষা খাতের ওপর সাইবার হামলা জোরদার করছে।

সোমবার (১০ আগস্ট) আল জাজিরা দক্ষিণ কোরিয়ার সাইবার নিরাপত্তা প্রতিষ্ঠান ‘জেনিয়ান্স’ এক প্রতিবেদনের বরাত দিয়ে জানায়, উত্তর কোরিয়ার গোয়েন্দা সংস্থার সাথে যুক্ত হ্যাকিং গ্রুপ 'কিমসুকি' ২০২৬ সাল থেকে ছদ্মবেশী ইমেইল হামলার (স্পিয়ার-ফিশিং) জন্য এআই দিয়ে তৈরি বিভিন্ন ভুয়া নথিপত্র ব্যবহার করছে।

সিউলভিত্তিক জেনিয়ান্স জানায়, হ্যাকাররা গবেষণা প্রতিবেদন বা আমন্ত্রণের মতো ভুয়া কায়দায় তৈরি ক্ষতিকর ফাইল স্বয়ংক্রিয়ভাবে বানাতে এআই প্রযুক্তি ব্যবহার করছে। ধরা পড়া এড়াতে কিমসুকি ইন্টারনেট সংযোগ ছাড়াই ওপেন সোর্স হাতিয়ার—যেমন ওলামা, জিপিটি-ফর-অল ও মিস্টি ব্যবহার করে বড় ভাষার মডেল পরিচালনা করছে।

জেনিয়ান্স তাদের প্রতিবেদনে জানায়, “এআই অল্প সময়ের মধ্যে বহু বিষয়ে অত্যন্ত নির্ভুল ও আকর্ষণীয় নথিপত্র তৈরি করতে পারে, যা সাইবার হামলাকারীদের জন্য অত্যন্ত কার্যকর এক হাতিয়ার। এই পরিবর্তনটি বিশেষ নজর কাড়ে, কারণ এটি কেবল ভুয়া নথিপত্র বানানোর উপায় বদলে দেয়নি, বরং সমাজে বিভ্রান্তি ছড়িয়ে বড় আকারের সামাজিক হামলার পথ খুলে দিয়েছে।”

সাম্প্রতিক বছরগুলোতে কিমসুকিসহ উত্তর কোরিয়ার রাষ্ট্রের সাথে সম্পর্কিত একাধিক হ্যাকার দলের বিরুদ্ধে অগণিত সাইবার হামলার অভিযোগ রয়েছে। এদের বড় উদ্দেশ্য ছিল আর্থিক ফায়দা লোটা। ব্রিটিশ ব্লকচেইন বিশ্লেষক সংস্থা 'এলিপটিক'-এর প্রতিবেদন অনুযায়ী, ২০২৫ সালের প্রথম নয় মাসেই উত্তর কোরিয়ার হ্যাকাররা ২০০ কোটি মার্কিন ডলারের বেশি ডিজিটাল মুদ্রা ক্রিপ্টোকারেন্সি চুরি করে।

এর আগে ২০১৪ সালে মার্কিন কর্তৃপক্ষ 'সোনি পিকচার্স'-এ সাইবার হামলার জন্য উত্তর কোরিয়াকে দায়ী করেছিল। কৌতুক সিনেমা 'দ্য ইন্টারভিউ'-তে উত্তর কোরিয়ার নেতা কিম জং উনকে ব্যঙ্গ করায় ক্ষিপ্ত হয়ে এ হামলা চালানো হয়।

ওয়াশিংটনের স্টিমসন সেন্টারের জ্যেষ্ঠ গবেষক জেনি টাউন আল জাজিরাকে বলেন, উত্তর কোরিয়ার হ্যাকিংয়ের অতীত ইতিহাস দেখলে এই নতুন কৌশল খুব একটা অবাক করে না। তিনি জানান, “উত্তর কোরিয়ার হ্যাকার ও প্রোগ্রামাররা তাদের হামলা জোরদার করতে এআই প্রযুক্তির ব্যবহারে পুরোপুরি সক্ষম। এটি সব অপশক্তির এক নতুন বাস্তব রূপ এবং উত্তর কোরিয়াও এর ব্যতিক্রম নয়।”

এআইয়ের দ্রুত অগ্রগতি একদিকে নতুন আশার আলো দেখাচ্ছে, অন্যদিকে অপশক্তি ও অনিয়ন্ত্রিত প্রযুক্তির ক্ষতিকর ব্যবহার নিয়ে বিশ্বজুড়ে উদ্বেগ বাড়াচ্ছে। সম্প্রতি মার্কিন গবেষকরা প্রথমবারের মতো এআই ব্যবহার করে প্রাকৃতিক পরিবেশের বাইরে নতুন ধরনের ভাইরাস তৈরি করেছেন। এটি চিকিৎসাবিজ্ঞানের অগ্রগতিতে ভূমিকা রাখার পাশাপাশি নতুন ধরনের বিপদের ঝুঁকিও বাড়িয়ে দিয়েছে।

সাইবার অপরাধ বিষয়ক বিশেষজ্ঞ মার্ক টি হফম্যান আল জাজিরাকে বলেন, এআই প্রযুক্তি সাইবার অপরাধ জগতে বড় ধরনের পরিবর্তন এনেছে। এতে করে অপরাধীদের জন্য হ্যাকিং করা আগের চেয়ে অনেক সহজ হয়ে গেছে।

হফম্যান আরও বলেন, 'এখন আর কারো কম্পিউটার সায়েন্সে স্নাতকোত্তর ডিগ্রি বা বিশেষ হ্যাকিং দক্ষতার দরকার নেই। দরকার শুধু একটা কম্পিউটার আর বদ মতলব। বিশ্বজুড়ে অপরাধীরা এই প্রযুক্তির ব্যবহার বাড়াবে, যার ফলে এআই-চালিত সাইবার হামলা আমাদের দৈনন্দিন জীবনের এক নিয়মিত ঘটনা হয়ে দাঁড়াবে।'