ভারতের মেঘালয় রাজ্যের ইস্ট খাসি হিলস্ জেলা থেকে উত্তরপ্রদেশের গাজিপুর জেলার দূরত্ব এক হাজার কিলোমিটারেরও বেশি।
এই দু’টি জেলা এবং তৃতীয় এক রাজ্য- মধ্যপ্রদেশের ইন্দোর গত কয়েকদিন ধরে ভারতের গণমাধ্যমের ফোকাসে উঠে এসেছে।
ইস্ট খাসি হিলস্ জেলায় ২ জুন ইন্দোরের বাসিন্দা রাজা রঘুবংশীর লাশ খুঁজে পাওয়া যায়। তবে তার সদ্যবিবাহিত স্ত্রীর কোনো খোঁজ পাওয়া যাচ্ছিল না সেদিন থেকেই। বিয়ের পরে নতুন বউ সোনম রঘুবংশীকে নিয়ে হানিমুনে গিয়েছিলেন রাজা রঘুবংশী।
তারা দুজনেই ২৩ মে থেকে নিখোঁজ ছিলেন। পরে, ২ মে রাজা রঘুবংশীর লাশ খুঁজে পাওয়ারও এক সপ্তাহ পরে সোনম রঘুবংশীকে সোমবার ভোররাতে পাওয়া যায় উত্তরপ্রদেশের গাজিপুরে। সেখানকার পুলিশ তাকে গ্রেফতার করে।
মেঘালয় পুলিশ তার বিরুদ্ধে স্বামীকে হত্যায় জড়িত থাকার অভিযোগে মামলা দায়ের করেছে।
যদিও সোনম রঘুবংশীর পরিবার বলছে যে তিনি নির্দোষ।
অনেক বিষয় এখনো স্পষ্ট নয়
যে বিষয়টা নিয়ে এখনো ধোঁয়াশা রয়ে গেছে, তার মধ্যে অন্যতম হলো মেঘালয় থেকে উত্তরপ্রদেশের গাজিপুরে কিভাবে পৌঁছলেন তিনি। আবার এতদিন ধরে নিখোঁজ থাকা সোনম রঘুবংশীর কাছে পুলিশই বা কী করে পৌঁছল, সেটাও অস্পষ্ট।
মেঘালয় পুলিশ গাজিপুর আদালত থেকে ট্রানজিট রিমান্ডে সোনম রঘুবংশীকে নিয়ে শিলংয়ের দিকে রওনা হয় সোমবার রাতে।
রাজা রঘুবংশীর লাশ খুঁজে পাওয়া গিয়েছিল মেঘালয়ের ওয়ে সওডোঙ জলপ্রপাতের কাছে। মেঘালয় পুলিশ প্রথম থেকেই বলে আসছিল যে খুন হয়েছেন তিনি।
এখন প্রশ্ন উঠছে তার হত্যাকাণ্ডে স্ত্রী সোনমের কি কোনো ভূমিকা ছিল?
সোনম রঘুবংশীর বাবা দেবী সিং অভিযোগ করছেন, মেঘালয় পুলিশ বিভ্রান্ত করছে। নিজের মেয়েকে তিনি নির্দোষ বলে দাবি করছেন। তারা সিবিআই তদন্তের দাবি করেছেন।
অন্যদিকে মেঘালয় পুলিশ বলছে, ওই ঘটনায় জড়িত সন্দেহে যখন অন্য তিনজন গ্রেফতার হলেন, তারপরেই সোনম রঘুবংশী প্রকাশ্যে আসেন এবং এই ঘটনাই ‘সব কিছু স্পষ্ট’ করে দিয়েছে।
কিভাবে সোনমের কাছে পৌঁছল পুলিশ?
গ্রেফতার হওয়ার আগের ১৭ দিন ধরে সোনম রঘুবংশীর খোঁজ চলছিল। রাজা রঘুবংশীর লাশের কাছে লাল আর কালো রঙের একটা রেইনকোট পেয়েছিল মেঘালয় পুলিশ। ওই রেইনকোট আর যে হোটেলে থাকছিলেন ওই দম্পতি, সেখানকার সিসিটিভি ফুটেজ ছাড়া পুলিশের কাছে সোনমের ব্যাপারে আর কোনো তথ্য ছিল না।
সোনম রঘুবংশীর বাবা দেবী সিং বলছেন, ‘৮ জুন গভীর রাতে সোনমের ভাই গোবিন্দ সিংয়ের কাছে উত্তরপ্রদেশ থেকে একটা ফোন আসে। সোনমই গাজিপুরের কোনো ধাবা থেকে সেই ফোনটা করেছিল। এরপরে আমরা পুলিশকে খবর দি। তখন রাত প্রায় ২টা। আমার মেয়ে শুধুমাত্র ওর ভাইয়ের সাথেই কথা বলেছিল।’
মহাসড়কগুলোর পাশে খাবারের দোকানগুলোকে ধাবা বলা হয়ে থাকে।
গাজিপুর পুলিশও বলছে, সোনম রঘুবংশীর ওই ফোন পেয়ে তার পরিবার খবর দেয় মধ্যপ্রদেশ পুলিশকে। তারা জানায় গাজিপুর পুলিশকে। এরপরেই ওই ধাবা থেকে উদ্ধার করা হয়।
তবে গাজিপুরের জাতীয় মহাসড়কের পাশের যে ধাবা থেকে পুলিশ সোনমকে নিয়ে আসে, সেটির মালিক সাহিল যাদব স্থানীয় সাংবাদিকদের কাছে দাবি করেছেন যে পুলিশের কাছে খবরটা দিয়েছিলেন তিনিই।
তার কথায়, ‘পরিবারকে ফোন করবে বলে সোনম আমার ফোনটাই চেয়ে নিয়েছিলেন। ফোনে কথা বলার সময়েই উনি কাঁদতে শুরু করেন। কিছুক্ষণ পরে তার ভাই আমাকে আবার ফোন করে বলেন যে আমি যেন স্থানীয় পুলিশকে খবর দেই। রাত প্রায় আড়াইটার দিকে পুলিশ এসে তাকে নিয়ে যায়।’
সাহিল যাদব দাবি করেছেন, তিনি সোনমের কাছে জানতে চেয়েছিলেন যে তার ধাবা পর্যন্ত তিনি কিভাবে পৌঁছলেন। কিন্তু কোনো জবাব দেন সোনম রঘুবংশী।
অন্যদিকে ইন্দোর পুলিশের ডেপুটি কমিশনার (ক্রাইম) রাজেশ দন্ডোনিয়া বলেছেন, ‘শিলং পুলিশের মাধ্যমে রোববার রাতে আমরা খবর পাই যে গাজিপুরের পুলিশ সোনম রঘুবংশীকে উদ্ধার করেছে। শিলং পুলিশ ইন্দোরে যোগাযোগ করে তিনজন সন্দেহভাজনের খবর দেয়। যৌথ অপারেশনে ওই তিনজনকে আমরা আটক করি।’
হেফাজতে থাকা ওই তিনজন সন্দেহভাজনকে শিলং পুলিশ জিজ্ঞাসাবাদ করছে।
‘মেঘালয় সরকার মেয়েকে ফাঁসাচ্ছে’
সোনম রঘুবংশীর বাবা দেবী সিং সাংবাদিকদের সাথে কথা বলতে গিয়ে জানিয়েছেন, তার মেয়ে সোনম রঘুবংশী নির্দোষ এবং মেয়ের ওপর সম্পূর্ণ আস্থা রয়েছে যে সে এমন কিছু করতে পারে না।
দেবী সিং বলেন, ‘দুই পরিবার আর ওদের দু’জনের সম্মতিতেই বিয়ে হয়েছিল। প্রথম দিন থেকেই মেঘালয় সরকার অসত্য কথা বলছে। গাজিপুরে যাওয়ার পর আমার মেয়ে নিজেই একটি ধাবা থেকে ফোন করেছিল। পুলিশ ধাবায় পৌঁছে সেখান থেকে নিয়ে এসেছে। সোনমের সাথে আমার কোনো কথা হয়নি।’
তিনি বলেন, ‘আমার মেয়ে কেন খুন করাতে যাবে? তাই যদি হয়, তাহলে ওরা বেড়াতে কেন যাবে? আমি কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অমিত শাহের কাছে আবেদন করছি এই বিষয়ে সিবিআই তদন্ত করুন। মেঘালয় পুলিশ একটা কাহিনী বানিয়েছে।’
রাজা রঘুবংশীর মা উমা রঘুবংশী জানান, ‘দু’টি পরিবারের সম্মতিতেই বিয়ে সম্পন্ন হয়েছিল। দু’জনেই খুশি ছিল। বিয়ের পরে সোনম যখন আমাদের সাথে ছিল, তাতে মনে হতো যেন অনেকদিনের সম্পর্ক আমাদের। আমরা বিশ্বাস করতে পারছি না সোনম এটা করতে পারে।’
রাজা রঘুবংশীর ভাই বিপিন রঘুবংশীর কথায়, ‘সবকিছুই খুব ভালো চলছিল। কিন্তু আমরা আমাদের ভাইকে হারিয়েছি। এর জন্য যারাই দায়ী হোক না কেন, তাদের কঠোরতম শাস্তি হওয়া উচিত।’
‘মেঘালয় সম্পূর্ণ নিরাপদ’
মেঘালয় পুলিশ জানিয়েছে, এই হত্যাকাণ্ডের পর সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে রাজ্যের বিরুদ্ধে বিদ্বেষমূলক মন্তব্য পোস্ট করা হচ্ছে। এতে রাজ্যের মানুষকে অপমান করা হচ্ছে।
এ নিয়ে সোমবার একটি সাংবাদিক সম্মেলনে রাজ্যের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী প্রেস্টোন টিংসংয়ের সাথে হাজির ছিলেন মেঘালয় পুলিশের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারাও।
এক প্রশ্নের উত্তরে পুলিশ কর্মকর্তারা বলেন, ‘রাজ্যের মানুষকে উদ্দেশ্য করে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ঘৃণা-ভরা পোস্টের ব্যাপারে আমরা স্বতঃপ্রণোদিত হয়ে ব্যবস্থা নিচ্ছি। যারা এইসব পোস্ট করেছেন, তাদের বিরুদ্ধে এফআইআর দায়ের করা হচ্ছে।’
স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী প্রেস্টোন টিংসং আবেদন করেন, মেঘালয়ের বিরুদ্ধে ‘নেতিবাচক আখ্যান’ যেন তৈরি না করা হয়।
তিনি বলেন, ‘আমি ভারত ও ভারতের বাইরে থাকা সবাইকে অনুরোধ করব, দয়া করে মেঘালয় সম্পর্কে নেতিবাচক ধারণা দেবেন না। সেটা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে হোক বা মূলধারার গণমাধ্যমে। কারণ এই সবই ভিত্তিহীন কথা, মেঘালয় সম্পূর্ণ নিরাপদ।’
বিয়ে, হানিমুন, নিখোঁজ, হত্যা
ইন্দোরের সাকার নগরের বাসিন্দা ২৯ বছর বয়সী রাজা রঘুবংশী ও ২৭ বছরের সোনমের বিয়ে হয় গত ১১ মে। তারা ২০ মে হানিমুন করতে মেঘালয় রওনা হন, আর ২৩ মে তারা নিখোঁজ হন।
নিখোঁজ হওয়ার ১১ দিন পর, ২ জুন ইস্ট খাসি হিলস্ জেলার ওয়ে সওডোঙ জলপ্রপাতের কাছে ১৫০ ফুট গভীর গিরিখাতে রাজা রঘুবংশীর লাশ পাওয়া যায়।
নিখোঁজ হওয়ার এক দিন আগে মেঘালয়ের নোংরিয়াটে পৌঁছেছিলেন এই দম্পতি। শেষবার তাদের দেখা গিয়েছিল শিপাড়া হোমস্টে থেকে চেক-আউট করে বেরিয়ে যেতে দেখা গিয়েছিল।
পুলিশ স্থানীয় লোকজন এবং ট্যুরিস্ট গাইডদের জিজ্ঞাসাবাদ করে দম্পতির খোঁজ চালাচ্ছিল, কিন্তু কোনো সূত্রই পাওয়া যায়নি।
অবশেষে যখন রাজা রঘুবংশীর লাশ পাওয়া গিয়েছিল, সেই সময়ে ইস্ট খাসি হিলস্ জেলার পুলিশ সুপার বিবেক সিয়াম জানিয়েছিলেন, ‘কোনো সন্দেহ নেই যে এটি একটি হত্যাকাণ্ড। আমরা অপরাধে ব্যবহৃত একটি ধারাল ছুরি উদ্ধার করেছি।’
কিন্তু তখনও সোনম রঘুবংশীর কোনো খোঁজ পাওয়া যায়নি।
সূত্র : বিবিসি



