ভারত প্রথমবারের মতো তাৎক্ষণিক ব্যবহারের জন্য ১২টি পরমাণু বোমা মোতায়েন করেছে। ডুবোজাহাজ ও ভূগর্ভস্থ সাইলোতে এগুলো প্রস্তুত রাখা হয়েছে।
স্টকহোম ইন্টারন্যাশনাল পিস রিসার্চ ইনস্টিটিউটের (সিপরি) ২০২৬ সালের বার্ষিক প্রতিবেদনের বরাতে ভারতীয় বিমান বাহিনীর অবসরপ্রাপ্ত এয়ার মার্শাল এবং নয়াদিল্লির সেন্টার ফর এয়ার পাওয়ার স্টাডিজের সাবেক মহাপরিচালক অনিল চোপড়া এই তথ্য জানিয়েছেন।
আন্তর্জাতিক সংবাদ সংস্থা আরটি শনিবার (১১ জুলাই) জানিয়েছে, সিপরির প্রতিবেদনে বলা হয়েছে যে ভারতের মোট পরমাণু বোমার সংখ্যা গত বছরের ১৮০টি থেকে বেড়ে বর্তমানে ১৯০টি হয়েছে। এর মধ্যে ১২টি পরমাণু অস্ত্র প্রথমবারের মতো তাৎক্ষণিক ব্যবহারের জন্য ডুবোজাহাজ ও ভূগর্ভস্থ সাইলোতে প্রস্তুত রাখা হয়েছে।
এ পদক্ষেপের মাধ্যমে ভারত তার দীর্ঘদিনের পৃথকভাবে মজুদ রাখার নীতি ভেঙে সাগরে সবসময় পরমাণু অস্ত্রের উপস্থিতি ও যুদ্ধের প্রস্তুতি নিশ্চিত করার কৌশলগত সক্ষমতা অর্জন করল।
ভারত ‘প্রথমে আঘাত না করার’ নীতিতে অটল থাকলেও দুই পরমাণু শক্তিধর প্রতিবেশী চীন ও পাকিস্তানের হুমকির মুখে এই পদক্ষেপ নিয়েছে। সিপরির তথ্য অনুযায়ী, চীনের কাছে বর্তমানে ৬২০টির বেশি পরমাণু বোমা রয়েছে। বেইজিং দূরপাল্লার ডিএফ-৫বি, ডিএফ-৪১ ক্ষেপণাস্ত্র, জিন-ক্লাসের ডুবোজাহাজ ও এইচ-৬এন বোমারু বিমান নিয়ে শক্তিশালী ত্রিমাত্রিক পারমাণবিক ব্যবস্থা গড়ছে। ২০৩০ সালের মধ্যে চীনের আইসিবিএম সংখ্যা রাশিয়া বা মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সমকক্ষ হতে পারে। বেইজিং এখন ‘লঞ্চ-অন-ওয়ার্নিং’ বা ক্ষেপণাস্ত্র শনাক্তের সাথে সাথেই পাল্টা আঘাতের প্রস্তুতি নিচ্ছে। অন্যদিকে, পাকিস্তানের কাছে রয়েছে ১৭০টি পরমাণু বোমা, যার গোড়াপত্তন করেছিলেন বিশিষ্ট পরমাণু বিজ্ঞানী আবদুল কাদের খান। এনপিটিবহির্ভূত পাকিস্তানের কোনো ‘প্রথমে আঘাত না করার’ নীতি নেই। তারা শাহীন-৩ ক্ষেপণাস্ত্র, এফ-১৬ ও মিরাজ যুদ্ধবিমানের পর এখন ডুবোজাহাজ থেকে নিক্ষেপযোগ্য ক্ষেপণাস্ত্র তৈরি করছে।
এই বৈরী পরিবেশে ভারত তার নিজস্ব ত্রিমাত্রিক পারমাণবিক শক্তি জোরদার করেছে। ভূমিতে রয়েছে ৫ হাজার কিলোমিটারেরও দূরপাল্লার অগ্নি-৫ আন্তঃমহাদেশীয় ক্ষেপণাস্ত্র, অগ্নি-পি ও অগ্নি-৪। আকাশে রাফাল, মিরাজ ২০০০ ও জাগুয়ার যুদ্ধবিমান পরমাণু বোমা বহনে সক্ষম। সবচেয়ে নিরাপদ সমুদ্রভাগে ২০১৬ সালে ‘আইএনএস অরিহন্ত’ মোতায়েনের পর ২০২৪ সালে ‘আইএনএস অরিঘাত’ এবং ২০২৬ সালের এপ্রিলে ‘আইএনএস অরিদমন’ নৌবাহিনীতে যুক্ত হয়েছে, যা ৩,৫০০ কিলোমিটার দূরত্বের কে-৪ ক্ষেপণাস্ত্র বহনে সক্ষম। ভারতের এই সাবমেরিন ও রিঅ্যাক্টর প্রযুক্তির উন্নয়নে এবং ক্রুদের সেন্ট পিটার্সবার্গ ও ভ্লাদিভোস্তকে প্রশিক্ষণে প্রধান অংশীদার হিসেবে ভূমিকা রেখেছে রাশিয়া। পূর্বে লিজ নেয়া আইএনএস চক্র-১ ও চক্র-২ এর পর ৩ বিলিয়ন ডলারের চুক্তিতে চক্র-৩ লিজ নেয়ার প্রক্রিয়াও চলছে।
সামরিক বা কূটনৈতিক ভাষায় 'ত্রিমাত্রিক পারমাণবিক ব্যবস্থা' বলতে একটি দেশের এমন এক শক্তিশালী সক্ষমতাকে বোঝায়, যার মাধ্যমে তারা একই সাথে তিনটি ভিন্ন মাধ্যম থেকে পারমাণবিক হামলা চালাতে পারে। এই তিনটি মাধ্যম হলো- ভূমি, আকাশ ও পানি। কোনো দেশের এই ত্রিমাত্রিক ব্যবস্থা থাকা মানে—শত্রুপক্ষ যদি আকস্মিক হামলায় তাদের ভূমির ক্ষেপণাস্ত্র ঘাঁটি বা আকাশের বিমানঘাঁটি ধ্বংসও করে দেয়, তা হলেও পানির নিচে লুকিয়ে থাকা সাবমেরিন বা ডুবোজাহাজ থেকে দেশটি পাল্টা মারাত্মক পারমাণবিক আঘাত হানতে পারবে। একে যুদ্ধের ভাষায় 'সেকেন্ড-স্ট্রাইক ক্যাপাবিলিটি' বা পাল্টা আঘাতের সবচেয়ে নিরাপদ ঢাল বলা হয়।
ভারতের এই কৌশলগত পারমাণবিক বাহিনী বা এসএফসি মূলত বেসামরিক রাজনৈতিক নেতৃত্বের অধীনস্থ পরমাণু কমান্ড কর্তৃপক্ষের নির্দেশনায় পরিচালিত হয়, যার প্রধান হলেন প্রধানমন্ত্রী ও নির্বাহী প্রধান জাতীয় নিরাপত্তা উপদেষ্টা। পূর্বে ডিআরডিও ও পরমাণু শক্তি বিভাগ অস্ত্র আলাদা রাখলেও এখন দ্রুত সাড়ার জন্য তা সুসংহত করা হচ্ছে। ভারত ‘প্রথমে আঘাত না করার’ নীতি ধরে রেখে সুরক্ষায় ‘মিরভ’ প্রযুক্তি, এস-৫ ক্লাসের সাবমেরিন ও হাইপারসনিক ক্ষেপণাস্ত্রের উন্নয়নে কাজ করছে।



