যে নির্বাসিত ভারতীয় রাজাকে কোনোদিন ব্রিটেনের বাইরে যেতে দেয়া হয়নি

ব্রিটেনে নির্বাসিত পাঞ্জাবের শেষ শিখ মহারাজা দুলীপ সিং ও তার পরিবারের সংরক্ষিত নানা স্মৃতিচিহ্ন নিয়ে লন্ডনে একটি প্রদর্শনী অনুষ্ঠিত হচ্ছে।

নয়া দিগন্ত অনলাইন
রাজা দুলীপ সিং
রাজা দুলীপ সিং |সংগৃহীত

উত্তরাধিকারসূত্রে পাঁচ বছর বয়সে শিখ মহারাজার উপাধি পেয়েছিলেন দুলীপ সিং (১৮৩৮-১৮৯৩)। কিন্তু ১৮৪৯ সালে ব্রিটিশরা শিখ সাম্রাজ্য দখলের পর তাকে ব্রিটেনে নির্বাসন দেয়া হয়। এরপর মহারাজা অনেকবার ভারতে ফেরার চেষ্টা করেছিলেন, কিন্তু তাকে কখনোই আর ফেরার অনুমতি দেয়া হয়নি।

শেষে ২৫ বছর বয়সে তিনি সাফোকে এলভেডেন হল কিনে নেন এবং তার প্রথম স্ত্রী জার্মান ও আবিসিনীয় বংশোদ্ভূত বাম্বা মুলারের সাথে সেখানে বসবাস করতে শুরু করেন।

দুলীপ সিং ছিলেন মহারাজা রঞ্জিত সিংয়ের ছোট ছেলে, যিনি ১৭৯৯ সালে পাঞ্জাবে শিখ সাম্রাজ্য প্রতিষ্ঠা করেছিলেন।

বাবা ও ভাইয়ের মৃত্যুর পর মাত্র পাঁচ বছর বয়সে দুলীপ সিং ওই রাজ্যের শাসক হন। তবে ১৮৪৯ সালে ব্রিটিশরা পাঞ্জাব দখল করে নেয়ার পর তাকে সিংহাসনচ্যুত করা হয়।

মাত্র ১৫ বছর বয়সে তাকে ইংল্যান্ডে নির্বাসনে পাঠানো হয় এবং জীবনের বাকি সময় সেখানেই কাটিয়ে দেন শেষ শিখ মহারাজা।

এক শতাব্দীরও বেশি সময় পরে, ১৯৯৬ সালে এসেক্সের হ্যালস্টেডের বাসিন্দা ইতিহাসবিদ পিটার ব্যান্স মহারাজার এলভেডেন হলের বাড়িটি পরিদর্শন করেন এবং প্রায় সাথে সাথেই দুলীপ সিংয়ের জীবনকাহিনীর ব্যাপারে আগ্রহী হয়ে ওঠেন।

এরপর তিন দশক ধরে তিনি ওই রাজাকে ঘিরে নানা গল্পগাঁথা সংগ্রহ করেন।

তিনি বলেন, গবেষণা করতে গিয়ে তার নিজের মনে হয়েছে তিনি যেন নিজের শেকড় অনুসন্ধান করছেন।

কারণ তিনি নিজেও শিখ বংশোদ্ভূত।

পিটার ব্যান্স বলেন, ১৮৫০-এর দশকে দুলীপ সিংয়ের ব্রিটেনে আগমনের মাধ্যমে এটা পরিষ্কার বোঝা যায় যে এ দেশে পাঞ্জাবি ইতিহাস কতটা গভীরভাবে প্রোথিত।

দুলীপ সিং এবং বাম্বা মুলার দম্পতির ছয়টি সন্তান ছিল। ব্যান্স বলেন, মহারাজার সবচেয়ে প্রিয় রাজকন্যা ছিলেন ক্যাথরিন (১৮৭১-১৯৪২)।

সাউথ এশিয়ান হেরিটেজ মান্থের শেষ সপ্তাহে ৫২ বছর বয়সী ব্যান্স বলেন, ‘তার গল্প অনেকটাই অনুল্লিখিত ছিল। তিনি সেইসব ইহুদি পরিবারকে রক্ষা করেছিলেন, যাদের কনসেনট্রেশন ক্যাম্পে নিয়ে যাওয়া হয়েছিল। তিনি এমন মানুষদের সাহায্য করেছিলেন যারা তার ধর্মের ছিল না, তার অবস্থান বা পটভূমির ছিল না, তার ঐতিহ্যের ছিল না। তারা তার কাছে সম্পূর্ণ অপরিচিত ছিল। তাদের সাহায্য করার বিষয়টি ছিল নিছক মানবতা।’

তিনি আরো বলেন, ‘আমি সত্যিই মহারাজার সন্তানদের সম্পর্কে আরো জানতে চেয়েছিলাম, কারণ আমি নিজেও অভিবাসী পরিবারের সন্তান হিসেবে তাদের সাথে নিজের আত্মপরিচয়ের অনুভূতিকে মেলাতে পারি। আমি এখানে (ইংল্যান্ডে) বড় হয়েছি এবং এখানেই জন্মেছি। তাই এ মিশ্র বংশোদ্ভূত সন্তানদের সম্পর্কে আমি জানতে চেয়েছিলাম, কারণ জাতিগতভাবে তারা ছিল পাঞ্জাবি, কিন্তু তারা বড় হয়েছে এখানে।’

গবেষণার শুরুর দিকে শিখ রাজার জীবন সম্পর্কে আরো জানতে ১৯৯০ এর দশকে ব্যান্স নরফোক ও সাফোকের স্থানীয় পত্রিকাগুলোতে বিজ্ঞাপন দেন, যাতে কেউ রাজ পরিবার সম্পর্কে আরো কোনো তথ্য জানলে ব্যান্সের সাথে যোগাযোগ করে।

তিনি বলেন, যারা এক সময় মহারাজার পরিবারকে চিনতেন বা মহারাজার পরিবারের জন্য কাজ করেছেন, এমন ৩০০ মানুষ তার বিজ্ঞাপনের জবাব দিয়েছিলেন।

এমনকি, তাদের অনেকের কাছেই রাজকন্যাদের দেয়া উপহার ছিল।

ব্যান্স বলেন, তিনি ওইসব নিদর্শনসমূহ কিনে নিতে চেয়েছিলেন।

কিন্তু ওই মানুষদের অনেকেই তাদের সেইসব স্মারক ও মূল্যবান জিনিসপত্র ব্যান্সকে বিনামূল্যে দিয়ে দেন, যাতে সেগুলো ব্যান্সের সংগ্রহে স্থায়ীভাবে সংরক্ষিত থাকে।

ব্যান্সের এই সংগ্রহ যুক্তরাজ্যে ২০২২ সালে প্রথমবার প্রদর্শিত হয়েছিল, যেখানে মহারাজা দুলীপ সিংয়ের পরিবারের ইতিহাস, স্মৃতি ও নিদর্শন সম্পর্কে একটি ধারণা পাওয়া যায়।

মহারাজার জন্ম হয়েছিল বর্তমান লাহোরে। তার বাবা রঞ্জিত সিংহের মৃত্যুর পর পাঞ্জাবে চরম অস্থিরতার সৃষ্টি হয়। এক পর্যায়ে পাঁচ বছর বয়সে শিখ সাম্রাজ্যের সিংহাসনে বসেন রাজপুত্র, যদিও কার্যত রাজ্যের শাসনকার্য পরিচালনা করতেন তার মা জিন্দ কৌর ও চাচা।

১৮৪৯ সালে মহারাজা দুলীপ সিংহকে সিংহাসনচ্যুত করার পর তরুণ মহারাজাকে তার মায়ের কাছ থেকে আলাদা করা হয় এবং মহারানিকে কারারুদ্ধ করা হয়েছিল।

এরপর দুলীপ সিংহকে তার লাহোরের বাড়ি থেকে সরিয়ে বর্তমানে উত্তর প্রদেশের অন্তর্ভুক্ত ফতেহগড়ে নিয়ে যাওয়া হয়।

সেখানে দুলীপ সিংহকে সেনা চিকিৎসক জন স্পেন্সার লোগান এবং তার স্ত্রী লেডি লোগানের তত্ত্বাবধানে রাখা হয়।

ইতিহাসবিদ ব্যান্সের কাছে মহারাজার পরিবারের যেসব স্মারক আছে, নিজের সে সংগ্রহকে তিনি নিজের জীবনের গুরুত্বপূর্ণ কাজ হিসেবে বর্ণনা করেন।

একইসাথে তেমনি একে তিনি তার প্রিয় একটি শখ হিসেবেও বর্ণনা করেন।

তিনি বলেন, ‘মহারাজার পরিবার ও পরিবারের সদস্যদের সাথে সম্পর্কিত আমার কাছে দুই হাজারের বেশি জিনিস রয়েছে। এক্ষেত্রে আমাকে স্বীকার করতেই হবে যে আমার সবচেয়ে প্রিয় জিনিসগুলোর একটি হলো তিন রাজকন্যার ডেব্যুটান্ট বলের (যে অনুষ্ঠানের মাধ্যমে উচ্চ-বংশীয় পরিবারের অল্প বয়েসী মেয়েদের ব্রিটিশ অভিজাত সমাজে পরিচয় করিয়ে দেয়া হত) একটি সুন্দর আলোকচিত্র। এটি প্রিন্সেস সোফিয়া দুলীপ সিংয়ের ছিল এবং তিনি এটি তার গডডটারকে দিয়েছিলেন। ছবিটি তোলা হয়েছিল হ্যাম্পটন কোর্টের (দক্ষিণ-পশ্চিম লন্ডন) ফ্যারাডে হাউসে।’

ব্যান্স বলেন, ছোট মেয়ে সোফিয়া সারাজীবন নারীর অধিকার আন্দোলনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছিলেন।

তবে তিনি যে একজন সাফরাজেট বা নারী ভোটাধিকার কর্মী ছিলেন, তা ব্যান্স জানতে পারেন সোফিয়ার এক গৃহপরিচারিকার মেয়ের সাথে কথা বলার পর।

বর্তমানে তার সংগ্রহে রয়েছে মহারাজার জ্যাকেট, রাজকন্যাদের শাড়ি, খেলনা, চিঠিপত্র এবং চিত্রকর্ম।

এই নিদর্শনগুলোর অনেকগুলোই পশ্চিম লন্ডনের কেনসিংটন প্যালেসে নভেম্বর পর্যন্ত প্রদর্শিত হচ্ছে, ‘দ্য লাস্ট প্রিন্সেসেস অব পাঞ্জাব’ শীর্ষক প্রদর্শনীর অংশ হিসেবে।

জাসা আলুওয়ালিয়া তার বোন রামানিকের সাথে লন্ডনভিত্তিক এ প্রদর্শনীর উপদেষ্টা হিসেবে কাজ করেছেন।

ভারতীয় ও ইংরেজ উভয় ঐতিহ্যের উত্তরাধিকারী এই অভিনেতা, অধিকার কর্মী ও লেখক বলেন, মিশ্র ঐতিহ্যের পরিচয়ের নিজস্ব অভিজ্ঞতার সাথে তিনি এ গল্পের মিল খুঁজে পেয়েছেন।

তিনি বলেন, ‘এ গল্পগুলো আমাকে এবং আমার বোনকে প্রভাবিত করেছে। আমাদের অভিজ্ঞতার মধ্যে মিলও আছে, পার্থক্যও আছে। এটিকে (এলভেডেন হল) আমার নিজের প্রতিফলনের মতো মনে হয়েছিল। বাইরের দিকটা খুব ইংরেজ, কিন্তু ভেতরের দিকটা খুব ভারতীয়।”

আলুওয়ালিয়া আরো বলেন, ‘আমরা এ গল্পগুলোর কাছে গিয়েছিলাম একবিংশ শতাব্দীতে ইংল্যান্ডে বেড়ে ওঠা মিশ্র ঐতিহ্যের পাঞ্জাবি হিসেবে আমরা কারা, তা বোঝার একটি উপায় হিসেবে। আমরা উপলব্ধি করেছি যে আমাদের গল্প কেবল আধুনিক সময়ের কোনো অনন্য গল্প নয়, এর একটি ইতিহাস আছে এবং আমরা ধারাবাহিক সাংস্কৃতিক আদান-প্রদানের উত্তরাধিকারের অংশ। এটি অত্যন্ত জীবন্ত ও সক্রিয় একটি ইতিহাস এবং এটি আমাদের জাতি হিসেবে আমরা কারা, তার ইতিহাস।’

তিনি বলেন, ‘আপনি যদি আমাদের জাতির ইতিহাস সঠিকভাবে তুলে না ধরেন, তাহলে অন্যরা এর কাল্পনিক সংস্করণ তৈরি করবে। আর সেটি আমাদের জাতি হিসেবে আমরা কারা, তার প্রকৃত গল্প নয়।’

সূত্র : বাসস